আজ দ্বিতীয় পর্বের শেষ দিন। দশম পাতায় আমরা দুটি গল্প প্রকাশ করতে চলেছি। এতদিন ধরে এত লেখকের লেখা আপনাদের সামনে আনতে পেরেছি আমরা, এইই আনন্দ। এমন অদ্ভুত সময়ে এই প্রাপ্তি আনন্দ দিক।
কাল থেকে একটি সপ্তাহ জুড়ে পাঠকের দরবারে। আপনাদের মতামত আমাদের একমাত্র চালিকা শক্তি।
আগামী পাঁচই অক্টোবর থেকে প্রকাশ হবে আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ। স্বক্ষেত্রে কৃতী এই আত্মজনেরা তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের ঋদ্ধ করবেন। আপনাদের অখণ্ড মনোযোগ আশা করা অন্যায় হবেনা বলেই মনে করি।
গল্পটা শুরু হতে পারে একদম শেষদিন থেকে।
শেষ ফ্লাইটটা থেকে নেমে শ'য়ে শ'য়ে পায়ের ছাপ রেখে পায়েরা হেঁটে চলে গেলে, শ্রান্ত ক্লান্ত এয়ারপোর্ট চত্বর সাফসুতরো করে চলল কামেশ্বর। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, পায়ে গাম-বুট পরে লম্বা মপ দিয়ে চারপাশ স্যানিটাইজ করে চলেছে সে।
কাছেই সিঁড়ির রেলিং ও দরজার কাঁচ স্যানিটাইজ করছে বাজু। ঝুমরিতিলাইয়া থেকে ফোন এসেছিল মেয়ের। মেয়ে কেঁদেকেটে বাবাকে গ্রামে ফিরতে বলেছে। কামেশ্বর মেয়ের ফোনের গল্প, গ্রামে পরিযায়ীদের ফেরার গল্প করছিল, ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে ব্যস্ত আনোয়ারকে ও বাজুকে।
স্তব্ধ জনহীন রাত। করোনার জন্য ফ্লাইট ওঠা-নামা আপাতত বন্ধ থাকবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য। প্রত্যহ এমন স্যানিটাইজেশনের পর পরই অবশ্য আবার অগুনতি পায়ের ছাপে ভরে যায় এয়ারপোর্ট চত্বর।
আজ অন্য দৃশ্য। শহরের সর্বত্রই এখন কেবল করোনা হাওয়া। একটা ভ্রমের মতো কামেশ্বর বারে বারে মপটা পিছনে টানতে টানতে ভাবছে এই বোধহয় কারো সাথে ধাক্কা লাগলো। পরমুহূর্তেই আবার ভ্রমটা ভেঙে যাচ্ছে। এই ফুরফুরে স্যানিটাইজারের গন্ধ সমৃদ্ধ শূন্যতার রাত পেরোলেই কামেশ্বরের যাত্রা শুরু হবে ঝুমরিতিলাইয়ার উদ্দেশ্যে। আজ কামেশ্বর মেঝেতে নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছে, যে মেঝে এত বছর লক্ষ্য মানুষের পায়ের ছাপ রেখে চলেছে। জীবনেরও। অর্থনৈতিক সচ্ছলতারও বটে।
ক্রমশ নিভে যাচ্ছে উজ্জ্বল বাতিগুলো। যাদের ফেরার কথা ছিল তারা সবাই যদিও ফেরেনি। প্রতিদিনের কিয়স্কের বাইরের লম্বা লাইন আজ ফাঁকা। সর্বত্র মানুষের ছায়া পড়ে আছে কেবল। ছায়াগুলোর মাঝেও যোজন ফাঁক। সময়ের। দূরত্বের। ভয় মিশ্রিত নিষেধাজ্ঞারও বটে।
কামেশ্বর সেদিনের স্যানিটাইজেশনের কাজ শেষ করে
নিজের বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে মাথায় চাপিয়ে হাঁটা শুরু করল নো ম্যানস ল্যান্ড দিয়ে। ভোর হবার আগেই নিজেরই স্যানিটাইজড করা চত্বরে নিজেরই পায়ের ছাপ রেখে তার যাত্রা শুরু হল ঝুমরিতিলাইয়ার উদ্দেশ্যে। গেটের বাইরে দাঁড়ানো বাজু আর আনোয়ার তাকে পিছু ডাকলো, সে পিছন ফিরল। কিন্তু বুক কাঁপানো এম্বুলেন্সের শব্দ শহরের ভোর কাঁপিয়ে এক দিক থেকে আর এক দিকে যাওয়ায়, সে তাদের কথা কিছুই শুনতে পেল না। সামনে ফিরে এগিয়ে চলল গন্তব্যের টানে।
মহানগর ছেড়ে রাজপথ ধরে কামেশ্বর দুই রাজ্যের সীমানার দিকে এগিয়ে চলেছে পায়ে হেঁটে। পথে পরে থাকা চিপসের, বিস্কুটের প্যাকেট, কোল্ড ড্রিংক্সের বোতল তুলে তুলে সে ডাস্টবিন খুঁজে খুঁজে ফেলার জন্য উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে চলেছে ঝুমরিতিলাইয়ার পানে। সব ব্যস্ত জনপদের দোকান-পাট বন্ধ। কাঁধের ব্যাগে থাকা বোতলের শেষ জল টুকু ঢেলে নিল শুকনো গলায়। শুধু জলটুকু থেকে পাওয়া চলচ্ছক্তি নিয়ে আবার সে এগিয়ে চলল।
কেবল যাওয়াটুকু, কেবল কামেশ্বরের যাওয়াটুকুই আজ খবর খবরের কাগজে। যদিও তার পথ ঝুমরিতিলাইয়ার আগেই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বোঝাই দশ চাকা ট্রাকের তলায় লালে লাল হয়ে গেছে -- এয়ারপোর্টের সমস্ত কর্মী ভিজে চোখে কাগজে ছাপার অক্ষরে পড়ছে, কামেশ্বর দিগন্ত বিস্তারী প্রান্ত বরাবর হেঁটে চলেছে অনন্তের পথে। সে পথ আর যে দিকেই যাক ঝুমরিতিলাইয়ার দিকে যাবে না কখনো।
খবরের দুনিয়ায় অবশ্য এটা কোনো কামেশ্বরের খবর নয়, শুধুই একটা সংখ্যার খবর যে সংখ্যা তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে নি।
বেণুদির জন্য ই বুঝি এতদিন যেন অপেক্ষা করে ছিল। মাত্র দু'বছরের ছোট্ট তাতাই,শ্যামল, পিসিমা আর বেণু-এই নিয়ে তাদের ছোট্ট সংসার।অবসরক্ষণে মাঝে মাঝে মনে পড়ে রাশভারী বাবার তৈরি করে দেওয়া সংসার কারাগারের কথা। বাবা বেকার শ্যামলের কাছ থেকে বেণুকে ছিনিয়ে নিয়ে অফিসার ছেলের হাতে সঁপে দেওয়া। সেই থেকে শুরু হয় বেণুর বন্দী জীবন। সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম স্বামীর পরিবারের কাছে বাঁজা তকমা নেওয়া এইসব মনে পড়ে বেণুর। এইসব লজ্জা হীনতার কথা কখনো কাউকে বলতে না পারার যণ্ত্রণা বয়ে বেড়ানো।
শারীরিক অসুস্থ স্বামী যখন রেল দুর্ঘটনায় মারা গেলে বাপের বাড়ি প্রত্যাবর্তন। ততদিনে বাবার মৃত্যু হয়েছিল। মায়ের ইচ্ছায় শ্যামলের সাথে আবার বিয়ে হয় বেণুর।বেণুর আবার নতুন জীবন শুরু হয়। শ্যামল একটি স্হানীয় কলেজের অধ্যাপক। শ্যামল মেয়েদের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হোক। কখনোই চায় না। তাই বেণুকে স্হানীয় এক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকার পদের জন্য সুপারিশ করে।তাতাই সারাদিন পিসি ঠাম্মার কাছে থাকে।তাতাই একটু বড় হলে স্কুলে ভর্তি করে। বাড়ি ফেরার সময় মা ও ছেলে একসাথে বাড়ি ফেরে। রান্না বান্না বেণু নিজেই করে।আর বাকি টুকুতে পিসিই হাত লাগায়। একদিন শ্যামলকে বেণু বললো-সে আর চাকরি করবে না। স্বামী সন্তান ও সংসারের প্রতি নজর দেওয়া তার একান্ত কর্তব্য।বেণু বললো-আমি সুখী গৃহকোণে লক্ষ্মীশ্রী হয়ে থাকতে চাই। শ্যামল আপত্তি করেনি। কারণ শ্যামল বুঝেছিল বেণুর কথর মধ্যে যুক্তি আছে। বর্তমানে বেণুদের উঠোনে ফুলের বাগান তার ই তৈরি। বাড়ি টা সুন্দর সাজানো গোছানো। পিসিমা কে রামায়ণ মহাভারত পড়ে শোনায় সময়মতো। বাড়ি তে টি ভি রাখেনা। এমন কি মোবাইল এর ব্যবহার করে না।পাছে তাতাই এসবের মধ্যে থাকলে পড়াশুনা র ক্ষতি হয়। একদিন শ্যামলের সহকর্মী বন্ধু বেণুর সাথে আলাপ করতে এলো। বন্ধু টি আলাপ শেষে শ্যামলকে বললো-শ্যামল ভগ্যবান।
অবসরে বেণু ভাবে-এক ই মানুষ কার ও কাছে অবজ্ঞার আবার কারও কাছে মহার্ঘ। জীবনের পালাবদল এভাবেই হয়।সব ই বিধির নির্বন্ধ!

No comments:
Post a Comment