আজ আরও তিনটি গল্প নিয়ে এলাম।
আপনাদের লজ্জা সরমের লেশ অবধি কিছু আছে?? ধারের টাকা শোধ না করে দিব্য বসে আছেন। ঘরে ঠিক সময় হাঁড়ি চড়ছে, আয়েশ ফুর্তি, বাচ্চার ফরমাশ সব মিটছে শুধু কিস্তি দেওয়ার সময় দুনিয়ার কাঁদুনি আপনাদের মুখে।-গলায় বেশ জোড় এনেই কথা গুলো বলে যাচ্ছিলো ঋষি। যাতে গলার আওয়াজ আশে-পাশের বাড়ির উঠোন পেরিয়ে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কালেকশন কোম্পানির এজেন্ট সে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে কালেকশন করা তার কাজ। তবে এখন যে কাস্টমার এর কাছে সে এসেছে এই বাড়িতে আজ এ প্রথম পা রাখলো।
বছর দুয়েক এর লোন টেনিওরে আগে ব্যাংক থেকেই টাকা কাটতো, লকডাউন এর বাজারে এবার কিস্তি ফেল। লক ডাউন উঠে গেছে কিন্তু কিস্তি জমা পড়ছেনা তাই আসতে হলো। বাইরে ছাতি ফাটানো রোদ তার উপর প্রিয়াঙ্কা দাস মানে কাস্টমারের ফোন অফ তাই মেজাজ টা খিটখিটেই হয়েছিল ঋষির।
শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছে প্রিয়াঙ্কা দাস বললো এত রোদে এসেছেন ঘরে আসুন একটু জিরোন তারপর কথা বলা যাবে।
কুটুমবিতা করতে আসিনি যে ঘরে এসে জিরোতে হবে। তাছাড়া মনুষত্ব তো আপনাদের নেই, ফোন করলে পাওয়া যায়না। আচ্ছা ফোন কেন অফ শুনি?
লোন আমার নামে হয়েছিল, কিন্তু ফোন নম্বরটা আমার স্বামীর তাই।
ডাকুন আপনার স্বামীকে। আরে, পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে আছেন কেন ডাকুন উনাকে। ঘরে যদি না থাকেন তো ফোনে কথা বলান।
-কি করে বলাবো নাম্বার তো অফ।
-সে তো জানি ফোন অফ। মাস খানেক ধরে ট্রাই করে না পেয়েই তো এসেছি। তা অন্য কোনো নম্বর নেই যাতে আপনার সাথে কথা হয়।
-কথা না হওয়ার জন্যই তো ফোন অফ করে দিয়েছেন উনি।
-মানে? একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো ঋষি।
-পাঁচামির থেকে পাথর বইতেন গাড়িতে। লকডাউন পরাতে আটকে পরলেন, তারপর আর ফেরেননি।
-ফেরেননি মানে? আপনি কোনো খবর নেওয়ার চেষ্টা করেননি?
_পাশেই আমার বোনের শ্বশুর বাড়ি, আটকে পরে কিছুদিন সেখানেই ছিলেন। তারপর আর..........
-আপনার বোন কে ফোন করেননি?
-করেছি, দুটো ফোন একসাথেই বন্ধ হয়েছে স্যার।
- - - মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। বছর দুয়েকের বাচ্ছা কাঁদতে কাঁদতে নেমে এল উঠোন দিয়ে, চারিদিক থমথমে, বাচ্ছা টাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল প্রিয়াঙ্কা দাস।
মুখে আর কোনো কথা আসছিলো না ঋষির। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু পিছু ডাক এল একটু খানি দাঁড়ান দাদা।
এক গ্লাস জল আর চীনা মাটির প্লেটে চারটে বাতাসা নিয়ে সামনে দাঁড়ালো প্রিয়াঙ্কা দাস। - ভর দুপুরে একটু জল না খেয়ে গেলে গৃহস্থের অমঙ্গল হবে। ঘরে কিছু নেই একটু বাতাসা দিয়েই---
মাথায় ঘোমটা,মুখে অমলিন হাসির সাথে বাতাসা ভরা প্লেট টা এগিয়ে ধরলো সে। জল ভরা স্টিলের গ্লাসটা নিয়ে এই প্রথমবার ভালোভাবে তাকালো ঋষি।.....স্বামীর মঙ্গল চিহ্ন বেশ বড়ো করেই আঁকা।
মহাসপ্তমীর বিকেলে শিখা পাশের বাড়ির মীনাক্ষীকে বলল , কি রে, ঠাকুর দেখতে যাবি না?
-- না রে, বাবার কারখানা চারমাস ধরে বন্ধ , পুজোর কোনো কেনাকাটা হয় নি। মন মেজাজ ভালো নেই । এর মধ্যে কোথায় যাবো?
--- তাতে কী হয়েছে? আমার অবস্থা তো আরও খারাপ। দাদা তো পা ভেঙে কতদিন ঘরে বসে আছে । মায়ের সেলাই এর কাজ এ বছর নেই বললেই চলে । আর মার্চের পর থেকে আমার কোনো টিইশিনি নেই । হাত একদম খালি।
--- তা হলে? পথে বের হলে তো হাত খরচও লাগে ---
--- ছাই লাগে। ট্রামে বাসে উঠবো না। যতটা পারি হেঁটে ঘুরবো। খুব গল্প করবো। কোথাও ফাংশন হলে বসে গান শুনবো ।
--- ফিসফ্রাই, মোগলাই খাবো না, খিদে পেলে ঝালমুড়ি খাবো, চিনে বাদাম খাবো.... ... বলতে বলতে ওদের আর এক প্রতিবেশী বন্ধু শুচিস্মিতা ঘরে ঢুকলো।
ওর বাবা আর মীনাক্ষীর বাবা একই কারখানায় কাজ করেন। তিনিও চারমাস মাইনে পাননি।
শুচিস্মিতা বলে চলে, শিখাই ঠিক বলেছে। আমরা ঘরে বসে থাকলে কি সপ্তমী, অষ্টমী বসে থাকবে? না কি নতুন জামাকাপড় নেই বলে আমাদের প্যান্ডেলে ঢুকতে দেবে না? চল চল বেরিয়ে পড়ি.......।
তিন বন্ধু এক সাথে গলা জড়িয়ে গেয়ে উঠলো -----
চারিদিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি
ক্ষুদ্র দঃখ সব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে
আনন্দধারা বহিছে ভুবনে ।
সাতসকালে শিবতলা চৌমাথায় লাবুর চায়ের দোকানের সামনে কবি সম্পাদকের বেমক্কা ঝগড়া,'এসো লিখি' পত্রিকার সম্পাদক বিশ্বরঞ্জন চট্টরাজ বনাম কবি
ম নো চট্টোপাধ্যায়। ঝগড়াটা আশাদ্বিত নয়,
তবু বেঁধেছে ।
প্রথমে কথা কাটাকাটি ঝিম ঝিম বৃষ্টির মতো,পরে পরে দাঁড়াল প্রবল ঝড়ের মধ্যে ঝমঝম বৃষ্টি যেন।এমনিতে লাবুর দোকানে ভিড় লেগেই থাকে।চেঁচামেচি শুনে আরও কিছু মানুষ জড়ো হয়,ভিড় বাড়ে,মোড়ের মাথার রাস্তা জ্যাম হতে থাকে কাকতালীয় ভাবে গৌর মাস্টার এই পথ দিয়েই বাজারে যাচ্ছিলেন সাইকেলে,ভিড় দেখে নেবে পড়তে বাধ্য হন।
বয়স হয়েছে বলে আগের মতো দ্রুত সাইকেল চালান না,
সাবধানে ধীরে ধীরে চালান এখন । মাস্টারমশাই কে দেখে অনেকেই এগিয়ে আসে,শ্রদ্ধেয় মানুষ,সবাই চেনে,লেখক হিসেবে সমাজে খুব নামডাক তার ওপর অঙ্কের মাস্টারমশাই ।
-এত ভিড় কিসের!এই মহামারীর সময় অনেকের মুখে দেখছি মাস্ক নেই,কি ব্যাপার!সবাই চুপ। মাস্টারমশাই ও অনেককে চেনেন,তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা কবি আর সম্পাদকের দিকে দৃষ্টি গিয়ে পড়ে তাঁর, দুজনেই বিশেষ পরিচিত ।
মাস্টারমশাই নিজেই এগিয়ে গেলেন ওদের দিকে,দুজনেরই চেনা মুখে অচেনা অভিব্যক্তি দেখে জিজ্ঞেস করলেন,'স্রষ্টা মানুষেরা এমন থম থমে কেন?
আর যায় কোথায় ,মাস্টারমশাই মুখ থেকে কথাটা খসাতে না খসাতেই দুজনের কে আগে অভিযোগ জানাবে এই নিয়ে হুটোপাটি লাগিয়ে দেয় ।
-একে একে আস্তে বল,এত উত্তেজিত কেন,মাথা গরম করলে সব সৃষ্টি জ্বলেপুড়ে মাথাতেই ছাই হয়ে যাবে ।আলতো করে বলেই চাপা হাসলেন মাস্টারমশাই ।কবির মাথায় তাপমাত্রা বেড়েই ছিল ,আরম্ভ করল,'আপনি জানেন কি জানি না বিশ্বরঞ্জন ওর পত্রিকার একটা কবিতা সংখ্যা বের করেছে,'
-শুনেছি,হাতে পাইনি
-একটা কবিতা দিয়ে ছিলাম ।
-তো কি হয়েছে তাতে
-আমার কবিতাটা টানা গদ্যে ছাপার জন্য বলে ছিলাম তা না করে একটা লাইনকে বাদ দিয়ে লম্বালম্বী একসাইডে ছেপে দিয়েছে ।টানা গদ্যে ভেতরে ভেতরে যে স্পন্দন তৈরি হতো কবিতাটার ,এখন কি তাই হবে,পাঠক পড়তে পড়তে নাক সেঁটকাবেই।
সম্পাদকের একটাই কথা,ভালো লেগেছে ছেপেছি,খারাপ সমালোচনা পাইনি।
-সংখ্যাটা একবার দাও,চোখ বোলাই।
সম্পাদক এক কপি বার করে দেয় ।পত্রিকাটি আগাপাশতলা দেখতে দেখতে কবি মনো চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় চোখ আটকে দেন মাস্টারমশাই ।
' অতীতের অস্থির পটভূমি থেকে ' দীপ্তিময় আমি ডাকছি,তোমারই অতীতের অস্থির পটভূমি থেকে ডাকছি/অধিক কিছু বলার নেই/জানি তুমি অনেক বছর পূত হয়ে বসে আছ ওখানে/একবার বেরিয়ে দেখ,বড় জটিল যন্ত্রণায় ভুগছে সবাই/সঠিক কক্ষপথ হারিয়ে যাচ্ছে/ভালোবাসার মুক্তবিন্দু ইলেকট্রন কণার থেকে আরও ছোট হয়ে গেছে/হাত বাড়িয়ে কেউ খুশি নিতে চাইছে না!/বসন্ত ফেরত চলে গেছে/চারদিকে বিষাক্ত বাতাস ছেয়ে আছে /পাশবিকতায় লজ্জা পাচ্ছে পশুপাখিরাও/এখন রং দেখলেই ভেতরে বেহাগ বাজে /শিশু ভোরের ঘাসের আগায়
শিশিরের রং বড় ভালো লাগে শুধুই/একবার এস একবার---!
কবিতাটা পড়তে পড়তে আলতো স্বরে বললেন, ' টনা গদ্যে যেটা বলছ---! তবে---! এবার কবি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, 'বলুন,কবিতাটা ঘেঁটে গেছে কি না! পাঠক খাবে?'

No comments:
Post a Comment