Sunday, 25 October 2020

বিশেষ কিন্নর ৬

 আজ দশমী।


আমাদের শারদীয়া কিন্নর দলের উৎসব শেষ হলো। 

আজ প্রধান সম্পাদকের কলমে আমাদের শেষ অঞ্জলি।


🙏


❤️


✍️


#চাঁদ 


#শতদ্রু_মজুমদার 


একটা লিটল ম্যাগাজিনের নাম সিঁড়ি l এর প্রতিটি সংখ্যাই বিশেষ সংখ্যা l মেলা -দিঘি -শ্মশান এর পর এবারের বিষয় চাঁদ !সম্পাদক জানিয়েছেন :কবিতা লিখতে হবে --ছড়া নয় !অবিশ্যি আগের সংখ্যায় ছড়া লিখেছিলাম !কিন্তু মাস খানেক হলো চাঁদ নিয়ে কোনো কবিতা লিখতে পারছি না !কবি সুকান্ত চাঁদকে ঝলসানো রুটির সঙ্গে তুলনা করেছেন l দীনেশ দাস বলেছেন :এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে !সাম্প্রতি সুবোধ সরকারের চাঁদ পড়লাম !দুর্দান্ত l মুশকিল হল আমার কলম দিয়ে একটা লাইনও বের হচ্ছে না l অথচ ছোটো বেলা থেকেই তো চাঁদ দেখে আসছি !আমাদের ভাড়া বাড়ির পিছন দিকে ছিল বাঁশবন !সেখানে চাঁদ দেখে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বিখ্যাত লাইন মনে পড়ত :বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই ---

গরমকালে রাতের দিকে রাজ মাঠে শুতে যেতাম !মাথার ওপর চাঁদ !মনে হত সরে সরে যাচ্ছে !কিন্ত চাঁদ স্থির l আসলে মেঘ সরে যেত বলে ওই রকম মনে হত !সে যাই হোক গিয়ে !

ডিউটিতে এলে আমার পকেটে একটা নোট বুক থাকে l কিছু মনে পড়লেই লিখে রাখবো !আমি 'মেঘমল্লার 'এপার্টমেন্ট এর কেয়ার টেকার !12ঘন্টা ডিউটি !চার হাজার দেয় !আগে একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করতাম l করোনার কোপে সেটা গেছে !একটা মাত্র ছেলে পালিয়ে বিয়ে করে আমাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না !আমার বউ ঘরে বসে ঠোঙা গড়ে !যেনতেন চলে যায় l 

#

তিন তলার একটা মেয়ে কবিতা লেখে !আমার সঙ্গে আলাপ আছে l আমাকে অনেক কবিতার বই দেয় পড়তে l ওর নাম রীতি l একদিন রীতিকে নিজের সমস্যার কথা বললাম !সে বললো একটু গভীর ভাবে ভাবুন ঠিক মনে আসবে !মাঝে মাঝে ছাদেও উঠতে পারেন l খুব ভালো চাঁদ দেখা যায় !একদিন উঠলাম !সেদিন ছিল পূর্ণিমা l নিটোল চাঁদ দেখলাম l আর সেটা দেখতে গিয়েই বিপত্তি !একটা নতুন স্কুটি চুরি গেল !দত্তবাবু রীতি মত চার্জ করলেন :আপনি ছাদে উঠেছিলেন কী করতে ?বলুন --আনসার মি !

আমি আস্তে করে বলি :চাঁদ দেখতে !

---হোয়াট ?বুড়ো বয়সে ভীমরতি !

#

কাজটা চলেই গেল !রীতি অনেক চেষ্টা করেছিল !কোনো ফল হলো না !আসার সময় সে আমার হাতে একটা চিরকুট দিয়েছিল !কবিতার লাইন ---মানে আমার কবিতার গাইড লাইন :

ছোটবেলায় মায়ের দেখানো চাঁদ 

মুছিয়ে দিয়েছে চোখের জল কত 

হায় !

সেই আমি আজ একই চাঁদের আলোয় মুছতে পারি না বুকের গভীর ক্ষত !


(কাব্যপংক্তি তানিয়া ব্যানার্জী )

বিশেষ কিন্নর ৫

 আজ মহানবমী। 

আজ রইল তৃষ্ণা বসাকের অনুবাদ গল্প। 


✍️


#আলোকবর্ষ


(ই সন্তোষ কুমার

মূল মালয়ালম থেকে  ইংরেজি অনুবাদ- পি এন  বেণুগোপাল)


ইংরেজি থেকে অনুবাদ- #তৃষ্ণা_বসাক 


‘জেমস, আমি আগে এখানে এসেছি। এখানে, এই রেলিংগুলো ধরে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম’ কমলা উচ্ছসিত গলায় বলল, ঝুলন্ত ব্রিজের রেলিংগুলো শক্ত  করে আঁকড়িয়ে, জলের  কলকল আওয়াজ শুনতে শুনতে।

‘যাত্রা শুরুর সময় তুমি বলেছিলে এটা’ জেমস হেসে বলল।

‘ও, তাই ? কিন্তু সত্যি, ঠিক এই জায়গাটাই। ঠিক এই জায়গাটাই। জাস্ট একটা ছোঁয়া, ব্যস সব মনে পড়ে যাবে। এটাই আশ্চর্য।’

‘সত্যি!’

‘হ্যাঁ জেমস। কিন্তু সেইসময় অনেক বেশি জল ছিল। দূর থেকেই শব্দ শোনা যেত। আমরা ঠিক বর্ষার পরেই এসেছিলাম।সেসময়ে আমরা ব্যঙ্গালোর থাকতাম, জানো। কেন, আমি যা বলছি, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?’

‘ওহ, এটা আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয় কমলা। তুমি অন্তত পাঁচ বছর আগে এসেছিলে, তাই না? তাহলে তুমি কী করে এত জোর দিয়ে বলতে পারো, তুমি ঠিক এই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে ছিলে?’

‘আমি পারি জেমস। আমি কিছু জিনিস দেখতে পাই, যা তুমি পাও না, যদিও তোমার চোখ বড় বড় করে খোলা।‘

‘তুমি সবসময় চোখের কথা বল’ জেমস বলল

কমলা জোরে হেসে উঠল। ‘আর কিছু না হোক, আমি অন্তত চোখ নিয়ে বলতে পারি, না জেমস?’

তারপর সে চুপ করে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জলস্রোতের শব্দ শোনার চেষ্টা করছিল।

একজন পর্যটক তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। ঝুলন্ত ব্রিজের রেলিংগুলো ক্যাঁচকোঁচ করে উঠল। 

‘হ্যাঁ আমি এখানে এমনি করেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ কমলা মনে করার চেষ্টা করল। সেটা সিজন টাইম ছিল, খুব ভিড়। লোকজন আমাদের গা ঘেঁষে ঠেলে চলে যাচ্ছিল। আর ব্রিজটা সাংঘাতিক দুলছিল। লোকের ধাক্কায় আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। ভাগ্যিস নন্দন আমায় ধরে ফেলেছিল। এইরকমই ছিল ও। সবসময় আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকত। নন্দন সবসময় আমার খেয়াল রাখত।’

‘আমার কথায় তুমি কি আপসেট হয়ে পড়লে?’ জেমস ওর ক্যামেরা শীর্ণ জলস্রোতের ওপর জুম করতে করতে জিগ্যেস করল।

‘এই, আপসেট হবার মতো কী আছে?’

‘কিছু না। কিন্তু আমি তোমাকে তোমার চোখ নিয়ে বলছিলাম’

‘তুমি আমার চোখ নিয়ে কথা বলোনি।ওটা আমার সমস্যা। চোখের দৃষ্টি নেই বলে তাকে কেন দোষ দিতে হবে, জেমস? আমি তোমায় একটা কথা বলব জেমস? নন্দন আমার চোখদুটোকে পুজো করত। ও বলত, আমার চোখ দুটো বড় বড়। সে এমনকি একবার আমার চোখে কাজলও টেনে দিয়েছিল’


‘তাই?’

‘হ্যাঁ’

‘ওহ, তাহলে সে তো নিশ্চয় দারুণ রোম্যান্টিক’

‘এটা কী, মাই ডিয়ার জেমস? ভালবাসার মানুষের চোখে কাজল পরানোর মধ্যে কিছু দোষ আছে?’

‘কে জানে? এটা কিন্তু কোনদিন আমার কাছে আশা করো না কমলা।’

‘জেমস, প্লিজ তুলনা করো না। প্রত্যেকে আলাদা, তাই না?’

যদিও তারা দুজনেই ঝর্নার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, তবু খুব গরম লাগছিল। 

চারটের ম্লান সূর্য বালির ওপর পাতার ছায়াচ্ছন্ন ছবি আঁকছিল। 

রাস্তার ধারের ফেরিওলার কাছ থেকে ওরা শশা কিনল। শসাগুলো সত্যি ঠান্ডা ছিল। এক কামড় দিয়ে, কমলা তার শসাটা ফালি ফালি করে দিতে বলল আর ফেরিওলাকে বলল তার ফালিগুলোয় লংকা গুঁড়ো আর নুন লাগিয়ে দিতে। কিন্তু জেমসের চা খেতে ইচ্ছে করছিল।

কমলা জিগ্যেস করল ‘তুমি ঝর্নার ছবি তুলেছ?’

‘হুঁ,’ অলসভাবে বলল জেমস। কিন্তু তার ক্যামেরা তার কাঁধে প্রিয় পোষ্যের মতো জিরোচ্ছিল। 

কমলা নিজের শসাটা শেষ করে বলল ‘বেড়াতে বেরিয়ে এইসব ছোট ছোট জিনিস নিয়ে খুশি থাকত নন্দন। কখনো কেউ ভাবতে পারে নন্দন খুব কিপ্টে, কিন্তু ঘটনা সেটা নয়। আসলে বাইরের খাবার থেকে সমস্যা হবে এই দুশ্চিন্তা করত। প্রায়ই বলত ‘পেট গড়বড় করবে’ কিন্তু যাই কারণ হোক, বেড়ানোর দুদিনের মধ্যেই সে একটা কাঠির মতো রোগা হয়ে যেত।

জেমস ওকে একটা কিছু জিগ্যেস করতে গিয়েও করল না

কমলা হাসল ‘ কাঠির মতো! তুমি কী করে দেখলে? তোমার জিভে এই প্রশ্নটাই উশখুশ করছে, না জেমস?’

‘এই, না’ জেমস নিজের লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করল। 

‘হ্যাঁ সোনা, আমি মন পড়তে পারি। আমরা যখন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরি, তখন তো নিজেদের চেহারা বুঝতে পারি, পারি না, জেমস?’

‘আমার এক কাপ চা চাই’ জেমস বলল।

তার সেলফোন বেজে উঠল, কিন্তু সে উপেক্ষা করল। ঝর্না থেকে সরু পথ ধরে বেরনোর জায়গাটা বেশ খানিকটা দূরে। ক্লান্ত কমলা ফুটপাথের ধারে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে পড়ল। 

‘অনেকদিন পরে এতটা হাঁটলাম আমি।’ ‘আমার পা ব্যথা করছে’ জেমস বলল। কমলা তার শাড়ির নিচটা তুলে পায়ের ডিমে মাসাজ করল। তার গা দিয়ে ঘামের গন্ধ বেরোচ্ছিল। কয়েকটা মেয়ে তাদের পাশ দিয়ে জোরে জোরে কথা বলতে বলতে ঝর্নার দিকে হেঁটে গেল।কমলা মাথা নিচু করে তার পা মাসাজ করতে থাকল যতক্ষণ না ওদের গলার স্বর দূরে মিলিয়ে গেল। 

‘তুমি কি ওদের দিকে তাকালে?’ কমলা জিজ্ঞেস করল

‘কাদের দিকে?’

‘এক্ষুনি আমাদের পাশ দিয়ে গেল, ওই মেয়েগুলো’

‘না তো, কেন?’

‘মিথ্যুক, তুমি  মেয়েদের দেখো না, নাকি?’

‘ওহ ওরা!’

‘ওরা কি সুন্দর ছিল?’

‘হবে হয়তো’

‘ লুকোচ্ছ কেন? সৌন্দর্য তো দেখার জন্যেই তাই না?’

‘ওহ, তোমার সঙ্গে থেকে কী করে আমি অন্য মহিলাদের দিকে তাকাব?’ জেমস হাসল

‘মহিলা নয়, মেয়ে। এরা কমবয়সী। ওদের কথা শুনলেই বোঝা যায়’

‘ওকে কমলা। হোক না’

‘নন্দনের সঙ্গে যখন থাকতাম, এই একটা দারুণ জিনিস ছিল। ও আমার জন্যে সবকিছু বর্ণনা করত।’

‘তুমি নিশ্চয় হিংসেয়  জ্বলে পুড়ে মরতে’

‘কেন? আমি তো আর বাচ্চা ছিলাম না’ কমলা হাসল

‘শুনবে জেমস। ব্যাঙ্গালোরে থাকতে প্রতি সন্ধেয় আমরা কোন না কোন মলে যেতাম আর ছেলেমেয়েদের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা ওদের কথা আলোচনা করতাম। দারুণ মজা হত। তুমি যদি টিটকিরি না করো, তবে তোমায় একটা দুষ্টুমির কথা বলি’

‘আমি তোমায় ঠাট্টা করি না। তুমি এর মাস্টার’

‘ধন্যবাদ জেমস’

‘বেশ। কিন্তু কী যেন আমায় বলতে যাচ্ছিলে তুমি?’

‘হাহা, মজার কথা একটা। কোথায় যেন থামলাম? হ্যাঁ, আমরা মলের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম তরুণ তরুণীরা ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। নন্দন আমায় বলেছিল, ছেলেমেয়েগুলোর লো ওয়েস্ট জিনসের ওপর দিয়ে ওদের অন্তর্বাস দেখা যাচ্ছে। সে সময় ওটাই চলছিল’

‘তো?’

‘তো কী? আমি নন্দন কে বলতাম আমাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানাতে। সারা সন্ধে ওই অন্তর্বাসগুলো নিয়ে আমরা মজা করতাম’

কমলা হাসতে শুরু করল, হেসেই চলল, যতক্ষণ না কাশতে শুরু করল।

‘তুমি একটু খেপি আছো কমলা’ জেমস বলল ‘তুমি একা নও, তোমরা দুজনেই। ও কেন তোমায় ছেড়ে চলে গেল আমি বুঝতে পারি না। তোমরা সত্যিই মেড ফর ইচ আদার’

কমলা কোন সাড়া করল না। সে তার শাড়ি ঠিক করল আর হাত জোড় করে ওখানেই অলসভাবে বসে রইল।তারপর সে তার চোখ বুজল। জেমস ওর চোখের পাতার পাণ্ডুর নগ্নতার দিকে তাকাল না। সে ক্যামেরা বার করে একটা পাতা ঝরানো গাছের ছবি তোলার চেষ্টা করল। পত্রহীন শাখায় তিনটে পাখি কিচিরমিচির করছিল। 

আবার তার সেলফোন বাজল। কিন্তু সে আগের মতোই কয়েকবার বাজার পর থামিয়ে দিল।

‘চলো যাওয়া যাক’ কমলা বলল। ‘ড্রাইভার নিশ্চয় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে’ 

‘এটা ওর কাজেরই মধ্যে পড়ে। এর জন্যে কি আমরা ওকে টাকা দিই না?’

‘ফোনটা ধরলে না কেন?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘ভাবলাম পরে ধরব’

‘এলিজাবেথ ছিল, তাই না?’

‘হ্যাঁ কেন?’

‘আন্দাজ করলাম। ও  এখনও তোমাকে ফোন করে যায়?’

‘ওর গরজ। আবার ফোন করবে’

‘কী সেই মহা দরকার?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘ওহ, কিছু না’

‘কিন্তু তবু... নাকি আমাকে বললে কোন সমস্যা হবে?’

‘কীসের সমস্যা? ও নিজেই তো একটা সমস্যা’

কমলা হাসে ‘ দাঁড়াও আমাকে আন্দাজ করতে দাও। ওয়াইল্ড গেস।তোমার কাছে এমন কিছু আছে যাতে ওর ক্ষতি হতে পারে। একটা চিঠি, কিছু তথ্য...। এইরকম কিছু, তাই না?’

‘এটা তো তোমার গেস, তাই না? আমি কেন বলব এটা ঠিক না ভুল?’

‘ইয়েস। এটাই আমার প্রশ্নের একদম সঠিক উত্তর’ কমলা হাসল। তারপর সে চুপ হয়ে গেল। 

‘এরকম করো না জেমস’ কমলা বলল ‘ওকে  ছেড়ে দাও’

জেমস সাড়া করল না।

‘জাস্ট ছেড়ে দাও’ কমলা বলল মাথা তুলে। ‘তুমি যদি রাগের মাথায় র‍্যাশ  কিছু করো তো পরে পস্তাবে। ঘৃণা জিনিসটা ভালবাসার মতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একঘেয়ে হয়ে যায়’

এবারেও জেমস কোন উত্তর দিল না। সে তাকিয়ে দেখল ডাল থেকে পাখিগুলো উড়ে গেছে। 

‘তোমার এক্স-র নামটা যেন কী? ওহ,হ্যাঁ, নন্দন। তুমি কি নন্দন বলে ডাকো?’ হঠাত জিগ্যেস করল সে।

‘আমার স্বপ্নে’ এই কথা বলে কমলা ওর হাত ধরল। কমলার হাত  অস্বাভাবিক রকমের  ঠান্ডা, জেমস ভাবল।

‘আচ্ছা, এই জায়গাটা কি ভালো জেমস?’

‘হ্যাঁ, কেন একথা জিগ্যেস করছ?’

‘আমি জানি না। কিন্তু কেন জানি গতবারের মতো লাগছে না’

‘কমলা উঠে এই বেঞ্চের একদম ধারে গিয়ে দাঁড়াও, হাতদুটো নামাও। এইতো, এবার আমি একটা ছবি নেব’

‘ঠিক আছে?’

‘একদম। আর একটা’

‘এই দিনের আলোয় তুমি ফ্ল্যাশ ব্যবহার করলে কেন?’

‘তুমি কি করে বুঝলে?’

‘আমি বুঝি। এটাই। নন্দন কখন ফ্ল্যাশ ইউজ করত না। ও স্বাভাবিক আলো পছন্দ করত।’

ওরা যখন গেট পেরিয়ে পার্কিং লটে গিয়ে দাঁড়াল, ক্যাব ড্রাইভার ওদের কাছে গাড়ি নিয়ে এল। সকালে হোটেলেই গাড়ি ঠিক হয়ে গেছিল। ড্রাইভার এক মাঝ বয়সী লোক। ও বলেছিল ওর বউ মালয়ালি। বোধহয় এই জন্যই কি  সে এদের প্রতি কন্সিডারেট ছিল? বুদ্ধ মন্দিরে পৌঁছতে এক ঘন্টার বেশি লাগল। ততক্ষণে গোধূলি হয়ে গেছে। কমলা নন্দনের সঙ্গে তার স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছিল। 

সেবার তারা মদিরের সামনে একটা হোটেলে উঠেছিল। সেটা চালাত লামারা। সন্ধেবেলা ওরা মন্দিরের রাস্তা ধরে অনেক ভেতরের গ্রামে চলে গিয়েছিল। রাস্তাটা ছিল নির্জন, পরিত্যক্ত। অন্ধকার হয়ে গেলেও নন্দন হাঁটা থামায়নি। সেটা ছিল উদবাস্তুদের গ্রাম, তাদের বাড়ি, মন্দির, ইস্কুল, দোকান আর তারপর ভুট্টা খেত। নন্দন তাকে সব খুঁটিয়ে বলেছিল। ফেরার পথে রাস্তার ধারের ঝুপড়ি থেকে ওরা চা খেয়েছিল। এটা চালাত একজন তরুণ উদ্বাস্তু। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা এই জায়গাতেই। তার মাতৃভূমি তার কাছে ছিল কানে শোনা এক দেশ।নন্দন সবসময়েই এইসব খুঁটিনাটি জানতে আগ্রহী ছিল। 

‘আমরা লামাদের হোটেলে থাকতে পারতাম’ কমলা বলল

‘ওই হোটেলে হয়তো বিদ্যুৎ জল কিছুই নেই’ ভাঙ্গা ভাঙ্গা মালয়ালমে ড্রাইভার বলল

‘কিন্তু বিদ্যুৎ দিয়ে কমলা কী করবে, তাই না?’জেমস বলতে বলতে থেমে গেল 

‘সত্যি।’ কমলা হাসল। ‘সবসময় আমরা কেন বিদ্যুৎ চাই? আমাদের আগেকার দিনের  লোক কি এটা ছাড়া বাঁচেনি?’

একজন ভিখারি তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইল, সে চেঁচিয়ে বলছিল সে অন্ধ। জেমস তার পার্স থেকে কিছু খুচরো বার করে তাকে দিল। 

‘একি জেমস, তুমি ওকে ভিক্ষা দিলে?’

‘বেচারা চোখে দেখতে পায় না’

‘ও কি চোখে দেখতে পায় না বলেই গরিব?’

‘তাই নয় কি?’

‘না। তাহলে তোমার হিসেবে আমিও তো গরিব?’

‘কক্ষনো না’

‘সেক্ষেত্রে তুমি ওকে ভিক্ষা দেবে কেবল সে অন্ধ বলে?’

জেমস উত্তর দিল না। দূরে সে দেখল বৌদ্ধ মন্দিরের সোনালি তোরণ আর সূর্যের আলোক স্নান । সে দৃশ্যটার ছবি নেবে কিনা ভাবল। 

‘একজনের চোখের দৃষ্টি নেই। ব্যস এইটুকুই’ কমলা বলে চল্ল ‘প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা সীমাবদ্ধতা আছে । তুমি কি সবাইকে ভিক্ষা দিয়ে চলবে? অন্ধ বলে ও যে কমা মানুষ তা কিন্তু নয়’

‘ওহ কমলা, তুমি আর তোমার দর্শন! নাকি এটা সেই ভদ্রলোকের থেকে এসেছে?’

‘নন্দন কক্ষনো কাউকে ভিক্ষা দিত না। এটা ছিল ওর নীতি’

‘তুমিও দাও না। এখানেই গল্প শেষ, তাই না?’

কমলা মন্দিরের হলের মেঝেতে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, যেন প্রার্থনা করছে। নৈঃশব্দ্য রহস্যময় মন্ত্রের মতো চারপাশে অনুরণিত হচ্ছে, সে অনুভব করল। 

রাতের জন্যে ওরা একটা হোমস্টেতে গেল। জেমস আগের রাতে ইন্টারনেটে এটা খুঁজে বার করেছিল। দোতলা একটা বাড়ি। অতিথিরা ওপরতলায় আর বয়স্ক দম্পতি নিচতলায়। তাদের ছেলেমেয়ে বাইরে আর তারা অন্য কিছু না, মূলত সঙ্গ পাবার জন্যেই অতিথিদের রাখত। ভাড়াও তুলনামূলকভাবে সস্তা, যেহেতু এটা টুরিস্ট সিজন নয়। 

‘ওরা ভেবেছে আমরা কাপল’ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বলল জেমস।

‘তুমি ওদের শুধরে দিতে পারতে’

‘যদি আমাদের চলে যেতে বলে তখন? এই রাতে আমরা কোথায় যাব? উনি আমাকে বললেন মিসেসের খেয়াল রাখতে। এও বললেন ব্যালকনির রেলিংগুলো নিচু, তোমাকে যেন একা যেতে না দি’

‘চিন্তা করো না। আমি ঘরের বাইরে বেরব না’

‘আমি ওদের কাছে এখন হিরো’

‘হ্যাঁ, তুমি এক বেচারি অন্ধকে নতুন জীবন দিয়েছ?’ কমলা হাসল

বিছানায় যাবার আগে জেমসের আবার একটা ফোন এল। কে ফোন করছে না দেখেই সে ফোনটা কেটে সাইলেন্ট মোডে করে দিল। 

কমলা তখনও বৌদ্ধ মন্দিরের কথা ভাবছিল। গতবার তারা দিনের বেশির ভাগ সময়টাই ওখানে কাটিয়েছিল। মন্দিরের চারপাশে ঘুরে বেড়িয়েছিল। হলে তিব্বতি কারুকাজ, দেওয়ালে পবিত্র মন্ত্রের ক্যালিগ্রাফি... নন্দন তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছিল। মাঝে মাঝেই লামাদের ধর্মচক্রের শব্দ। একটা বোর্ড থেকে নন্দন লামাদের পরম্পরার কথা পড়ে শুনিয়েছিল। তারপর তারা প্রার্থনা ঘরে চুপ করে বসেছিল। কমলা স্মৃতির মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে সে তার চোখ বুজল। 

‘এই ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’ কপালে ওর হাতের স্পর্শে চোখ খুলল কমলা। ছোট খসখসে হাত।

‘তুমি ড্রিংক করেছ, তাই না জেমস?’

‘জাস্ট একটা’ জেমস বলল ‘ফর আ বুস্ট’

‘আমার ভালো লাগে না’ কমলা বলল ‘ তুমি ড্রিংক করলে কিছুই ঠিকঠাক থাকে না’

‘জাস্ট ফ্র দা হেক অফ ইট। এলিজাবেথ কিন্তু এরকম ছিল না। মাঝে মাঝে আমরা একসঙ্গেও ড্রিংক করতাম’

‘ঠিক ড্রিংক নিয়ে কথা না। তুমি ড্রিংক করলে মনে হয় আমি অ্যালকোহলের সঙ্গে শুয়ে আছি। যেন ঘরে অন্য একটা লোক রয়েছে’

‘কিছু এসে যায় না’ জেমস ওকে কাছে টানল

‘এত জোরে ধরো না আমাকে জেমস। আমার লাগে’

সে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। যখন সে তার ঘাড় চাপল, কমলা কাশছিল, যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।  জেমসের ভালো লাগল না।

সে কল্পনা করছিল সে কমলার শরীরে পর্যটন করছে। ঝর্না, সরোবর উঁচু নিচু। ও কমলার গালে চুমু খেতে চাইলে, ও মুখ ঘুরিয়ে নিল। 

‘ তোমার মুখে মদের গন্ধ’ কমলা বলল। জেমস হঠাৎ মুখ সরিয়ে নিল।

‘তুমি সংগত দিচ্ছ না, কমলা’ ও বলল ‘এই জন্যেই কি আমরা এতটা দূরে এলাম?’

যেন সান্তনা দিচ্ছে এমনভাবে ওকে জড়িয়ে ধরল কমলা।এই আলিঙ্গন ওকে মনে পড়িয়ে দিল যখন বিকেলে ঝার্নার ধারে কমলার হাত ওকে ছুঁয়েছিল, সেই শীতল স্পর্শের কথা। 

‘এলিজাবেথ আবার ফোন করেছিল, তাই না?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘পাগল একটা’

‘এসব ভুলে যাও জেমস। তুমি এত অ্যাডামেন্ট কেন? আফটার অল, সে তোমার সঙ্গে তো অনেকদিন ছিল, তাই না?’


‘শিট!’ জেমস নিজের আলিঙ্গন থেকে কমলাকে সরিয়ে দিল।

‘আমি জানি, ও তোমাকে পছন্দ করত। সেটাই কি যথেষ্ট নয়? এটা কি বাধ্যতামূলক যে সারাজীবন একজনকেই পছন্দ করবে?’

‘ওহ, আমি কক্ষনো ওকে সেভাবে পছন্দ করিনি। ও এমন একটা কুত্তি’

জেমস একটা সিগারেট ধরাল। অর্ধেক খেয়ে সে নিভিয়ে কমলার হাত মাসাজ করতে শুরু করল ,হয়তো আরেকবার চেষ্টা করতেই।

সে অনুভব করল তার ডান বাহুতে কিছু একটা বেরিয়ে আছে, কাঁধের নিচে।

‘এটা কী?’

‘’ওহ ওটা’ কমলা বলল ‘একটা স্টিলের রড’

‘কী করে?’

‘একটা অ্যাক্সিডেন্ট। ঠিক আছে।’ কমলা তার বাঁ হাত দিয়ে ডান হাত ছুঁল। ‘ এই জন্যে তোমাকে বলেছিলাম আস্তে করে জড়াতে। এখনও লাগে এখানে। যদিও অনেক বছর হয়ে গেল’

‘কীভাবে হল?’

‘বেশ অনেকদিন আগে’ কমলা ক্যাজুয়ালি বলল

‘এটা বের করে দেবার সময় হয়নি?’

‘হ্যাঁ, আমার মনে হয়। কিন্তু না, এটা একটা স্মৃতি, তাই না জেমস? ওটা এখানেই থাকতে দাও’

জেমস কমলার রাতপোশাক খুলছিল।আলো জ্বালা রেখেই তারা নগ্ন হল। কমলা ওর কপালে নরম চুমু খেল। তারপর সে বিছানায় উঠে বসল।

‘আমার বুকটা দেখো’ যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, এমনভাবে বলল কমলা ‘এখানে একটা ফিকে লাল আঁচিল আছে না?’

‘কোথায়?’

‘এখানে... বাম বুকের নিচে, হার্টের খুব কাছে’

‘আমি আর বিশ্বাস করব না কমলা যে তুমি দেখতে পাও না’ জেমস আঁচিলটায় ঠোঁট চেপে বলল।

‘আমি জানতাম না’ কমলা হাসল

‘তাহলে? ওহ, নিশ্চয় নন্দন বলেছে, তাই না?’ জেমস বিদ্রূপ করে বলল।

‘আবার একবার তুমি ঠিকই ধরেছ’

যেকোন কারণেই হোক, এই প্রথমবার জেমস তার খুব কাছে নন্দনের উপস্থিতি টের পেল। ও শীতল হয়ে গেল।

‘শুধু তাই নয়, সে এমনকি আমার শরীরের জলবায়ুও জানত। বৃষ্টি, কুয়াশা, উষ্ণতা, একদম সত্যিকারের।

একবার আমার নিপলের দিকে তাকাও জেমস। এখন নিশ্চয় ওগুলো কালো, তাই না?’

‘তো?’ 

‘এর মানে আমার এখন মুড নেই। আমি বললাম না তোমায়? মুড থাকলে নিপলগুলো লাল হয়ে যেত’ কমলা হাসল। 

জেমসের আবার সন্দেহ হল নন্দন কাছেই আছে। তার মনে হল, যদিও নন্দন অদৃশ্য তবু ও তার কাছে হেরে যাচ্ছে। সে  জোর করে ওকে কাছে টানল। প্রায় আক্রমণ। কমলা নিঃশব্দে ওর জোর মেনে নিল। তার মনে হল তার মাথায় মৌমাছি গুনগুন করছে। জেমসের ভয়ঙ্কর খিদে থিতিয়ে গেল , কমলা অনুভব করল জেমস পাশে অবসন্ন হয়ে পড়ে আছে। গর্জমান নৈঃশব্দ্য ওকে ফুঁড়ে চলে যাচ্ছিল, সে ঘুমে তলিয়ে গেল।

ঘুম ভাঙতে কমলা সচেতন হল যে সে নগ্ন, হাতড়ে হাতড়ে সে তার রাতপোষাক পরে নিল। দূর থেকে, বোধহয় ব্যালকনি থেকে জেমসের গলা শোনা গেল। সে ফোনে তর্ক করছিল। তারপর কমলা শুনতে পেল সে ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে।

দুপুর অব্দি সে ঘর থেকে বেরোল না। একটি মেয়ে তার ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসে টেবিলে রাখল, কিন্তু সে ছুঁয়েও দেখল না। 

দুপুরে জেমস এল 

‘তুমি ব্রেকফাস্ট খাওনি?’ জেমস জিগ্যেস করল। 

‘আমার খিদে নেই’

‘স্নান করে নাও। লাঞ্চ করে আমরা বেরিয়ে যাব।’

‘কোথায়?’

‘থালাকাভেরি’ সে বলল ‘ ক্যাব আসবে’

‘না’ কমলা বলল ‘আমার শরীর ভালো লাগছে না’


‘ঠিক আছে, তাহলে গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু এসো কিছু খেয়ে নাও’

‘খিদে নেই’ কমলা বলল

‘জ্বর জ্বর?’

‘না’

‘তাহলে?’

‘তাহলে তাহলে তাহলে কিচ্ছু না। জাস্ট আমাকে একা থাকতে দাও’

‘আশ্চর্য নয় যে ও তোমাকে ডিভোর্স করেছিল’ জেমস ফেটে পড়ল

কমলা চিৎকার করে উঠল।

‘কে?’ কমলা কাঁপছিল। ‘কে আমাকে ডিভোর্স করেছে জেমস? কে তোমাকে এইসব ফালতু  কথা বলেছে?’

‘ওহ, বলব সেটা তোমায়? তুমি কি ওই নামটা সবসময় মন্ত্রের মতো জপছিলে না?’

কমলা কান্নায় ভেঙে পড়ল। দুজনের কেউই কিছুক্ষণ কথা বলল না। 

‘জেমস চলো লাঞ্চ করে আসি’ কমলা একটা তোয়ালে দিয়ে নিজের মুখ মুছে বলল। তারা চুপচাপ লাঞ্চ খেল। 

বিকেলে তারা ট্যাক্সিতে ম্যাঙ্গালোরের দিকে রওনা দিল। ট্যাক্সি অবিরাম শুষ্ক সব গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল।

‘জেমস’ কমলা ডাকল ‘সরি। আমি কি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি?’

‘ওহ না’ জেমস বলল

‘হ্যাঁ জানি কিন্তু... কিন্তু কিছু জিনিস বদলানো যায় না। এই স্টিল রডের মতো, সবসময় আমার মধ্যে থেকে যায়’

‘আমাদের সম্পর্কটা ছিল অনন্য, জেমস, মেড ফর ইচ আদার বলেছিলে তুমি। একদম তাই। আমাদের একটা গোপন চুক্তি হয়েছিল যে যদি আমাদের সম্পর্ক ভেঙ্গেও যায়, কোন আফসোস করব না। সেইকারণেই আমি তোমার সঙ্গে এলাম। এই ট্যুরটা করলাম। কিন্তু আমার মনে হয় আমি এই ভূমিকাটা জাস্ট হ্যান্ডল করতে পারছি না’

‘ছাড়ো’ জেমস বলল 

‘না, এটা অন্য কিছু। তুমি জিগ্যেস করছিলে ও কেন আমাকে ছেড়ে গেল। এতক্ষণ পর্যন্ত সেটা একটা গোপন কথা ছিল। আমি কাউকে বলিনি। এমনকি ম্যাঙ্গালোরের বন্ধুদেরও না। আমি কখনো কারো সহানুভূতি চাইনি। এমনিতেই আমার অন্ধত্বই আছে লোকের আহা উহুর জন্যে। এ নিয়ে আমি ফেড আপ। এর ওপর বিধবা যোগ হলে... না, আমি নিতে পারব না।’ 

‘কী বললে কমলা? বিধবা?’

‘সেটাই সত্যি কথা। নন্দন আর বেঁচে নেই। আমি একজন বিধবা।’

জেমস ওর হাত ধরল। হাতের শীতলতায় সে আবার বিস্মিত হল। 

টিলা আর উপত্যকার মধ্যে দিয়ে গাড়িটা মোটামুটি একই গতিতে চলছিল। 

‘কাবেরীর জন্ম একটা ছোট ঝর্না থেকে, তাই না?’ কমলা নিচু গলায় বলল ‘আর তারপর সে কত গ্রাম শহরে জল নিয়ে যায়, কত  খেতে সেচ দ্যায়। সত্যিই আশ্চর্য জেমস। আমার বোকার মতো গোঁ! আমাদের থলকাবেরি যাওয়া উচিত ছিল’

‘কিছু এসে যায় না। আমরা আবার আসতে পারি’ জেমস বলল

‘গত বার যখন এসেছিলাম, তখন নিচের ঢিপিমতো জায়গাটায় অনেকক্ষণ বসেছিলাম’ কমলা মনে করছিল ‘ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। একটা ছোট্ট মেয়ে এসে আমাদের পাশে বসল। নন্দন ওর ছবি তুলেছিল। আমি ছবিটা বাঁধিয়ে আমার ঘরে রেখেছি। এখনও ওখানেই আছে। তুমি খেয়াল করোনি?’

জেমস উত্তর দিল না। 

‘জেমস, তুমি আমাদের বেড়ানোর ছবি তুলেছ তো, না?’ কমলা জানতে চাইল ‘কার্ডটা কোথায়?’

‘ক্যামেরার মধ্যে’ জেমস বলল ‘ম্যাঙ্গালোরে গিয়ে প্রিন্ট করাব’

‘প্রিন্ট দিয়ে আমি কী করব? তুমি আমাকে কার্ডটা দেখাও। আমি একটু ছুঁই, অনুভব করি’

সে ক্যামেরা থেকে  কার্ডটা বার করে ওর মুঠোয় রাখল। 

ওকে হতবাক করে কমলা ওটা মুখে পুরে চিবোতে লাগল। তারপর গাড়ির দরজা খুলে থু থু করে ফেলে দিল।

‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি কমলা? সমস্ত ছবি গুলো নষ্ট হয়ে গেল, বুঝেছ?’ জেমস চিৎকার করে বলল

‘যেতে দাও’ ক্যাজুয়ালি বলল কমলা

জেমস বাইরে তাকাল। গাড়ি একটা ছোট শহরে ঢুকছে। ট্রাফিকের ভিড় বাড়ছে।

‘ বেজন্মা কোথাকার! আমি যখন ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ছবি তুলেছ না?’ কমলা জিগ্যেস করল। ‘আমার নগ্ন অবস্থায় তুলেছ। আমি সেটা আন্দাজ করেছিলাম’

জেমস ওর দিকে সতর্কভাবে তাকাল। ওই সাদা চোখের তারা... তার মধ্যে থেকে বিচ্ছুরিত আলো...  যেন তাকে আঘাত করবে, সে ভয় পেল। 

কমলা জোরে হাসল ‘ তুমি একজন অন্ধকে ব্ল্যাকমেল করতে পারবে না। কক্ষনো না! অন্ধের  নগ্নতা থাকে তার মনে। তবু, আমি চাই না ওই ছবিগুলো তোমার জিম্মায় থাকুক। তুমি এগুলো রাখার যোগ্য নও। তুমি জাস্ট একটা বিশাল... বিশাল বেজন্মা’

জেমস হাত দিয়ে মুখ মুছল। তারপর সে বাইরের দিকে তাকাল।

এখন গাড়ি ওয়ান-ওয়ে ট্রাফিক দিয়ে যাচ্ছে। ওদের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, হর্ন আর ভিড়ের আওয়াজ। গাড়িটা থেমে থেমে চলেছে। আরও কিছুক্ষণ এমন গুটিগুটি চলার  পর শেষ পর্যন্ত একটা সিগন্যালে দাঁড়াল।

‘জেমস সিগন্যালটা দেখো’ কমলা বলল

জেমস দেখল

‘ডিজিটগুলো দেখতে পাচ্ছো? পড়ো। আমরা এই সিগন্যালে আর কতক্ষণ দাঁড়াব?’

‘আরও চুরাশি সেকেন্ড’ জেমস লাল সংখ্যাগুলো পড়ে আস্তে আস্তে বলল।


🌹🌹


লেখক পরিচিতি- ই সন্তোষ কুমার মালয়ালম ভাষার এই প্রজন্মের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য লেখক। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা পনেরোর বেশি। সেরা গল্প সংগ্রহের জন্যে এবং উপন্যাস অন্ধাকরানঝি –র জন্যে দুবার পেয়েছেন কেরালা সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার যথাক্রমে ২০০৬ আর ২০১২ সালে। এই উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ- আইল্যান্ড অফ লস্ট শ্যাডোজ  ২০১৫ সালের ক্রসওয়ার্ড পুস্কারের জন্য বাছাই করা হয়েছিল। তাঁর দুটি গল্প থেকে মালয়ালম সিনেমা হয়েছে। তাঁর লেখা অনুবাদ হয়েছে ইংরেজি, তামিল, হিন্দি এবং জার্মান ভাষায়। বাংলায় অনুবাদ এই প্রথম। 


অনুবাদক পরিচিতি-তৃষ্ণা বসাক এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ কবি ও কথাকার। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কল্পবিজ্ঞান, মৈথিলী, হিন্দি ও মালয়ালম অনুবাদকর্মে তিনি প্রতিমুহুর্তে পাঠকের সামনে খুলে দিচ্ছেন অনাস্বাদিত জগৎ। জন্ম কলকাতায়। শৈশবে নাটক দিয়ে লেখালেখির শুরু, প্রথম  প্রকাশিত কবিতা ‘সামগন্ধ রক্তের ভিতরে’, দেশ, ১৯৯২। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘আবার অমল’ রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯৯৫। 


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক তৃষ্ণা পূর্ণসময়ের সাহিত্যকর্মের টানে ছেড়েছেন লোভনীয় অর্থকরী  বহু পেশা। সরকারি মুদ্রণ সংস্থায় প্রশাসনিক পদ, উপদেষ্টা বৃত্তি,বিশ্ববিদ্যালয়ের  পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে আঞ্চলিক ভাষায় অভিধান প্রকল্পের দায়িত্বভার- প্রভৃতি বিচিত্র  অভিজ্ঞতা তাঁর লেখনীকে এক বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। 

প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- পূর্ণেন্দু ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার ২০১২, সম্বিত সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩, কবি অমিতেশ মাইতি স্মৃতি সাহিত্য সম্মান ২০১৩, ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩, ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫, সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮, সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯,  কবি মৃত্যুঞ্জয় সেন স্মৃতি সম্মান ২০২০ ও অন্যান্য আরো পুরস্কার।

Saturday, 24 October 2020

বিশেষ কিন্নর ৩

 


মহাষষ্ঠীর শুভেচ্ছা। গ্রহণ করবেন। 
আজ এসেছে অনুবাদ। কবিতা। বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক আর্তুর রাঁবোর দুটি কবিতা।  

#অনুবাদ_কবিতা 

#তানিয়া_ব্যানার্জি 

কবি পরিচিতি 

আর্ত্যুর র‍্যাঁবো (১৮৫৪-১৮৯১)
বিশ্ব কবিতার বিস্ময় বালক ফরাসী কবি জ্যঁ নিকোলা আর্ত্যুর র‍্যঁবো পৃথিবীব্যাপী প্রকৃত কবিতাপ্রেমীদের কাছে সত্যিই এক বিস্ময়।
১৮৫৪ সালের ২০ অক্টোবর ফ্রান্সের শার্লভিল শহরে জন্ম তাঁর। মাত্র ৩৭ বছরের ছোট্ট জীবনে তিনি মূলতঃ কবিতা লিখেছিলেন ১৮৭০-৭৪,এই পাঁচ বছরই।প্রথম দিকে তিনি ছন্দবদ্ধ কবিতা দিয়েই তার কবিজীবন শুরু করলেও কবি জীবনের শেষ দুটি বছর তিনি গদ্যকাব্য রচনা করেছিলেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে ঘোষণা করে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মাত্র দুটি কবিতার বই আর ৮০ টি কবিতা এই গ্রহের মানুষ পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। চিরবাউন্ডুলে বাউল মন নিয়ে বেড়ে ওঠা কবি নিজের লেখা বহু কবিতা বহু পান্ডুলিপি একবার পড়েই ছিঁড়ে ফেলতেন,নইলে আরও কিছু কবিতা আমরা পেতাম।কবিতা বিষয়ে ধারণা বর্তমান সময়ের কবি ও কবিতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
"কবিতা লেখা যায় না,লেখা হয়।কবিতাকে কবি লেখেন না,বরং কবিকে মাধ্যম করে কবিতা রচিত হয়।"
১৮৯১ সালের ১০ নভেম্বর সকাল ১০ টায় এই বোহেমিয়ান কবি তার ৩৭ বছরের বিচিত্র জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

#শাশ্বত 

মিলনের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে প্রতিদিন সূর্য মিশে যায় সাগরের বুকে
এ এক শাশ্বত অনুভব। 
জ্বলন্ত দিনে, নিস্তব্ধ রাতে আত্মার প্রহরী ফিসফিসিয়ে বলে যায় এক অনাদি মিলনগাথা
নিত্যকার চাহিদা থেকে মুক্তি চাও
পাড়ি দাও অনন্তের পথে
আশাহীন, নিস্তরঙ্গ স্থৈর্য 
শেষে একমাত্র যন্ত্রণা চিরন্তন। 
তবুও,
অনাদিকালের সূর্য প্রতিদিন হারায় অনন্ত সাগরের বুকে 
মিলনের শাশ্বত অনুভব যন্ত্রণার বুকে মিলিয়ে যায়।

❣️❣️

#ফুল 

একটি সোনার দেহলী-রেশমের সুতোয় বোনা ধুসর পাতলা সবুজ মলমলের জাল,
তামাটে সূর্যের মতো বিবর্ণ স্ফটিকের থালা।
আমি দেখছি রুপোর ফিলিগ্রির গালিচায় লতানো গাছের মতো বিছিয়ে আছে, চোখে আর চুলে। 
হলদে গিনি আর রত্নের ঝলকানি,
মেহগিনির থামের ওপর পান্নার সবুজ গম্বুজ। 
সাদা একগোছা মলমল আর চুনীর ঝরণা। 
ভগবানের চোখের মত নীলাভ গভীর আর মায়াময়। 
আকাশ আর সাগর আলিঙ্গন করে মর্মরের তাজা ও সতেজ গোলাপ।

❣️❣️


বিশেষ কিন্নর ৪


 আজ মহাঅষ্টমী। দেবী আমাদের জীবত্ব থেকে দেবত্বে উন্নীত করুন। সন্ধি পেরিয়ে আমরা যেন তাঁর অমৃত পরশ পাই। 

🙏


আজকের গল্প দেবী আরাধনার গল্প। লিখেছেন এই সময়ের অন্যতম বলিষ্ঠ কলমকার মহুয়া মল্লিক। 


#দেবতার_গ্রাস


#মহুয়া_মল্লিক                         

                                 (এক)

‘টিকলিকে কি আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি মা?”

নিবেদিতা গোছগাছ করছিল, মেয়ের কথা কানে যেতেই সেসব থামিয়ে ঘুরে দাঁড়াল, “মানে, আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাস মানে?”

“এত মানে মানে করছ কেন? ইটস ভেরি সিম্পল। না বোঝার তো কিছু নেই।” নেল ফাইলিং করতে করতে রিয়া এবার ফুঁসে উঠল।

এই হয়েছে এক জ্বালা। শহরের মানুষদের এখন গ্রামে পুজো কাটানোটা একটা ফ্যাশান। অনেকেই ঠিক পুজোর আগে আগে গাঁ গঞ্জের বনেদি বাড়ির পুজোর সন্ধান করে বেড়ায়। তাদের সঙ্গী হয়েও অনেকে বহুবার গেছে। একেই পুজোর ব্যস্ততা, তারপর অতিথি আপ্যায়নে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়। সারা বছর বাইরে থাকে দায়িত্ব পালন করেনা, শরিকদের এই অভিযোগ শুনতে শুনতে এমনিতেই বিরক্ত হয়ে যায় নিবেদিতা। তার উপর প্রতিবারই সমীরের বন্ধুবান্ধব না হয় অফিস কলিগদের আসা। কেউ পুজোর চারদিন কাটিয়ে যায়, কেউ আবার একবেলা কাটিয়ে চলে যায়। তাদের খাওয়া দাওয়া, বিশ্রামের আয়োজন, পুরনো বিছানা বার করে রোদে দেওয়া সব নিবেদিতাকে একা সামলাতে হয়। জা’রা এড়িয়ে এড়িয়ে চলে। নিবেদিতা সব সামলে নেবার পর ভালমানুষের মত মুখ করে সামনে এসে বলে, “সারা বছর অফিস সামলে পুজোর কটা দিনও তোমার বিশ্রাম নেই।”

“আর বিশ্রাম!” নিবেদিতা ফোঁস করে উঠেও সামলে যায়। এরা তাকে তাতিয়ে দিয়ে মজা দেখতে চায়। ট্রলিটা মোটামুটি গোছান হয়ে গেছে। সমীরের নতুন দুটো শার্ট দরজির দোকান থেকে এসে গেলেই সে দুটো নিয়ে নিলেই কাজ শেষ। মেয়ের দিকে তাকায়, রিয়ার মুখে অভিমানের মেঘ থমকে আছে। ওর মাথায় হাত রেখে নিবেদিতা জিজ্ঞেস করে, “ওর বাড়ির লোক সঙ্গে যাবে? টিন এজার একটা মেয়েকে নিয়ে যাওয়া মানে অনেক দায়িত্ব, আমি সেটা ভেবেই একটু রিএক্ট করে ফেলেছিলাম।”

“যেন ওর বাড়ির লোক গেলে তুমি কত খুশি হতে? আর আমাদের গ্রামের লোকজন সব বাঘ না ভাল্লুক যে ওকে চোখেচোখে রাখতে হবে? আমি ওকে বারণ করে দেব মা।”

মেয়ের রাগ দেখে নিবেদিতা ফিক করে হেসে ফেলে। ঠিক আছে এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। প্রতি বছরই এমন কত গেস্ট তাদের সঙ্গী হয়। বরং রিয়া আর টিকলি একসঙ্গে ঘুরবে ফিরবে। যদিও রিয়া দিব্যি ওখানে মানিয়ে নেয় সবার সঙ্গে। মাটিতে বসে কলাপাতায় খাওয়া, মেঝেতে ঢালাও বিছানা করে শোয়া সবকিছুই মেয়ে হাসিমুখে মেনে নেয়। নিজের মেয়েকে পুজোর কটা দিন নিবেদিতা চিনতে পারেনা। শহুরে মেয়েটা এই কটা দিন যেন মাটির মেয়ে হয়ে যায়। কে বলবে এই মেয়েটাই অন্য সময়, পান থেকে চুন খসলে অশান্তিতে ফেটে পড়ে। 

সমীর বলে, যাকে যেখানে মানায়। এই কংক্রিটের শহরে জোর করে আটকে রাখলেই কি আমরা এই শহরের হয়ে গেলাম?

“কে আটকে রেখেছে তোমাদের?” ভ্রু কুঁচকে নিবেদিতা সেইসব মুহূর্তে অবাক হয়ে সমীরকে দেখে। পুজো কেটে গেলেই সবকিছু আবার স্বাভাবিক। ঐ কটা দিন এ বাড়ির মানুষগুলো যেন একটা ঘোরের মধ্যে কাটায়। প্রথম প্রথম কলকাতার পুজো ছেড়ে গাঁয়েগঞ্জে পড়ে থাকতে নিবেদিতার একদম ভালো লাগতনা। একবার জোর করেই নিজের জন্য নেপাল যাবার টিকিট করে ফেলল। রিয়া তখন জন্মায়নি। সমীর কিছু বলেনি, টিকিটটা দেখে মুচকি হেসেছিল। তারপর বলেছিল, “কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে দেব, তুমি অসুস্থ। যাও নিজের মত কাটাও, আমার তরফ থেকে কোনও চাপ নেই।” 

নিবেদিতা খুশি হয়েছিল, তবে সমীরের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মুচকি হাসির রহস্যটা ধরতে পারেনি। সেটা পেরেছিল সপ্তমীর রাত্রে। ষষ্ঠীর দিনটা নিবেদিতা একা ছটফট করেছে। সপ্তমীর সকালে তার ফ্লাইট। সে একা ঘুরতে যাচ্ছে শুনে মা বাবা চোখ কপালে তুলেছিল। অনেক মেয়েই এখন সোলো ট্রাভেলার হিসাবে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে, নিবেদিতা ল্যাপটপ খুলে সেইসব দেখিয়ে বাবা মাকে আশ্বস্ত করেছিল ঠিকই, কিন্তু ষষ্ঠী থেকেই কেমন অস্থিরতা বাড়তে শুরু করল। সপ্তমীর ভোরে ট্যুরটা ক্যান্সেল করে একটা গাড়ি নিয়ে শ্বশুরবাড়ির পুজোয় যোগ দিতে বেড়িয়ে পড়েছিল। ওকে দেখেই সমীরের মা, কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেছিল, “বলেছিলাম না জগজ্জননী ঠিক আমার বৌমাকে সুস্থ করে দেবেন।”

সপ্তমীর রাতে সিঁড়ির কোণে একটু একান্তে সমীর, নিবেদিতাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আমি জানতাম তুমি ঠিক এখানে ছুটে আসবে। তোমার লাফালাফি দেখছিলাম শুধু। মাঝখান থেকে কিছু টাকা গচ্চা গেল।”

“তুমি জানতে?” অবাক হয়ে নিবেদিতা জিজ্ঞেস করে। “হ্যাঁ জানতাম তো মা তোমাকে আমাদের এই জামগ্রামে ঠিক টেনে আনবেন।” ভুল বলেনি সমীর। সেই থেকে যতই হাবেভাবে বিরক্তি দেখাক, নিবেদিতা নিজেও এই কটা দিন নন্দীবাড়ির পুজো ছাড়া আর কিছু কল্পনা করতে পারেনা। সারাবছর এই দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।


                                     (দুই)

 নন্দীবংশের দশ পুরুষ আগের দুই বংশধর,  কুবেরশঙ্কর ও কামদাশঙ্কর নামের দুই যুবক  উত্তর চব্বিশপরগনার হালিশহর থেকে হুগলী জেলার পান্ডুয়ার অন্তর্গত এই জামগ্রামে আসেন ভাগ্য অন্বেষণে। গ্রামেই একটি বটবৃক্ষের তলায় তাঁরা তেলেভাজার দোকান দেন। তেলেভাজা বোঝ তো? মাধবদাদু প্রতিবারের মত একই কাহিনী অতিথিদের শোনাতে শোনাতে রিয়াদের মত ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করেন। এইসব কেক পেস্ট্রি খাওয়া আদুরে বাচ্চারা কি তেলেভাজা বুঝবে? টিকলি ঘার নেড়ে জানায়, চপ, বেগুনিকে তেলেভাজা বলে। মাধবদাদু খুশি হয়। অতিথিদের মধ্যে বড়দের হাতে হাতে চায়ের কাপ। সবাই গল্পে মশগুল। আসলে এই বিশাল অট্টালিকার মত বাড়ি দেখেই সবাই বুঝে গেছে এর কন্দরে কন্দরে অনেক গল্প লুকিয়ে আছে। রিয়াই বলেছিল, “মাধবদাদু এই দুর্গা পুজো কেন শুরু হয় সেই গল্পটা শোনাও।” উৎসাহে মাধব দাদুর কোটরে ঢোকা চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে ওঠে। তিনি এ বাড়ির পুরনো ঢাকি, এখন তাঁর বংশধররা এই কাজ করে থাকে। টিকলি তাড়া দেয়।

মাধবদাদু শুরু করেন, তেলেভাজার দোকান বেশ ভালই চলছিল। একদিন দু’জনে দুপুরে দোকান বন্ধ করে পুকুর ঘাটে যান স্নান করতে। সেখানে গিয়ে তো চক্ষু চড়াক। এক ফকিরবাবা নিজের পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বার করে পুকুরের জলে পরিস্কার করছেন। এইরকম দৃশ্য দেখে দু’জনেই ভয়ে কাঁপতে থাকে। ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে ফকিরবাবা ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরান, তারপর বলেন, “যা দেখলি কারুকে বলবি না, এ জিনিস আমি কারুকে দেখাইনা। এই নে এই স্বর্ণমুদ্রাটা রাখ। এই দিয়ে নতুন ব্যাবসা শুরু কর, তোদের ভাগ্য ফিরে যাবে।

কুবেরশঙ্কর ও কামদাশঙ্কর পরের দিন ভোরের আলো ফোটার আগেই স্বর্ণমুদ্রাটি হাতে নিয়ে চলে যান ভাগ্য অন্বেষণে। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যান বিদ্যাধরী নদীর তীরে। সেখানে সেইসময় জাহাজ আসত। বেচাকেনা চলত। স্বর্ণমুদ্রাটি ব্যায় করে কিছু সুপুরি কিনে অপেক্ষা করতে থাকেন নদীর পাড়ে বসে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন, এক বিদেশী বণিক সমস্ত সুপুরি উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। সেই শুরু, তারপর তাদের নিজস্ব আড়ত হল। তাঁদের ব্যাবসা এতই ফুলেফেঁপে উঠল যে একসময় নন্দীরা পূর্বভারতের প্রধান সুপুরি রফতানিকারী ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেন। 

ফকিরবাবার আশীর্বাদে একে একে সবই হল, ধনসম্পত্তি, মানসম্মান, প্রতিপত্তি, জামগ্রামের এই প্রাসাদ। দুর্গাপুজোর প্রচলনও হল। তবে প্রথম দিকে ভোগ দেওয়া প্রথার প্রচলন ছিলনা। প্রায় আড়াইশ বছর আগে একবার ব্যাবসায় প্রচুর লাভ হবার পর ভোগের প্রচলন হল। তবে এই বংশের পুজোর নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। নবমীর দিন ভোগ দেওয়া হয় মা’কে। আর এই ভোগ প্রথম দুজন ফকিরকে উৎসর্গ করা হয়, ফকিরদের খাওয়াদাওয়ার পর বাড়ির লোক সহ অতিথিরা ভোগ গ্রহণ করেন। আসলে নন্দীবংশের পূর্বপুরুষরা বিশ্বাস করতেন, ফকিরবাবার কৃপাতেই তাঁদের এই বাড়বাড়ন্ত। এখন তো দেশগ্রামেও তেমন ফকিরবাবাদের দেখা মেলা ভার! তাই দুইজন সজ্জন মুসলিম ব্যক্তিকে আগে ভোগ উৎসর্গ করা হয় এখন।

মন্ত্রমুগ্ধের মত সবাই এতক্ষণ মাধবকাকার মুখে পারিবারিক ইতিহাস, পুজোর উৎপত্তি শুনছিল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চূড়ান্ত নিদর্শন এই অজ পাড়াগাঁয়ের পুজোয়। কেউ কেউ বলল, “অনেক পুণ্য করলে এমন পুজো দেখার সৌভাগ্য হয়।”

টিকলি খুব এক্সাইটেড। রাত পোহালেই তো নবমী। এই আশ্চর্য ভোগ নিবেদন সে দুচোখ ভরে দেখবে।

                                    (তিন)

মা কাকিমাদের মত রিয়া এবার লাল পাড় সাদা শাড়ি পরেছে। সামনের বছর টুয়েলভে উঠবে, এই আব্দারটুকু নিবেদিতা মেনে নিয়েছে। বুদ্ধি করে টিকলির জন্যও শেষ মুহূর্তে একইরকম আরেকটা শাড়ি কিনে ফেলেছিল। দুই বান্ধবী, কাকে একটা ম্যানেজ করে পান্ডুয়ার বাজার থেকে টানা নথ আনিয়েছে। দুজনেই সুন্দর করে সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টিকলি তো সকাল থেকে কতবার যে জিজ্ঞেস করেছে, “আন্টি ভোগ কটা নাগাদ শুরু হবে? ফকিরবাবারা কোথায় বসে খাবেন?” নিবেদিতা নৈবেদ্যের থালা সাজাতে সাজাতে বলে হবে হবে, সব সময় মত হবে। এই মেয়েটাকে জিন্স, কেপ্রি আর হটপ্যান্টের বাইরে কোনদিন অন্যকিছু পরতে দেখেনি। এই মেয়েও কটা দিন এখানকার মেয়েদের মতই সালোয়ার কামিজ পরেছে। আজ তো আবার শাড়ি পরে দিব্যি ম্যানেজ করে ফেলেছে। সত্যিই মায়ের লীলা। মায়ের ছোঁয়ায় সবাই কেমন পাল্টে যায়! উগ্রতা, নীচতা, হিংসা ভুলে সবাই আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠে। ঠাকুরদালানে বসেই হাসিমুখে দর্শনার্থী সামলাতে সামলাতে নিবেদিতা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিল একবার। কী অদ্ভূত প্রশান্তিতে ভরা মুখ, স্নিগ্ধ মাতৃ মূর্তির দিকে তাকালে বুকে ভরসা জাগে। দু”হাত কপালে ঠেকায় সে।

নিবেদিতা অনেকক্ষণ ধরে দেখছে বাড়ির পুরুষদের মধ্যে গুঞ্জন। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতেই তারা বারবার ঘড়ির দিকে চোখ রাখছে। ব্যাপারটা কি? কোনও সমস্যা নাকি? আশেপাশে মেয়ে দুটোও নেই, বাড়ির মহিলারা কাজে ব্যস্ত। কাকে যে জিজ্ঞেস করে নিবেদিতা ! নিজে প্রসাদের থালা নিয়ে বসে আছে, এসব ছেড়ে উঠতেও পারছেনা।

মাধবকাকা এসে ধুপ করে সিঁড়ির এক ধারে বসে থামে মাথা রাখে। “এদিকে তো বিপদ মেজমা, বেলা যে বয়ে যায়, এখনও তো বাবারা এসে পৌঁছল না। তারা না অন্নভোগ গ্রহণ করলে এতজন কখন খেতে বসবে বলুন তো?”

সর্বনাশ! বেলা যে বয়ে যাচ্ছে নিবেদিতা টের পায়নি। এবারে জনসমাগমও তেমন হয়েছে। প্রসাদ দিতে দিতে হিমসিম খেয়ে যেতে হচ্ছে। বেশ কয়েকবার মূল প্রসাদের সঙ্গে ফল কেটে মেশান হয়েছে। নিবেদিতা বলে, “কারুকে খোঁজ নিতে পাঠাচ্ছেনা কেন?”

ছোটকর্তা নিজে গেছে এনফিল্ড নিয়ে। দুজনকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে আসবে। সেটা শুনে আশ্বস্ত হয় নিবেদিতা। কিন্তু একটু পরেই সমীরের ছোট ভাই ফিরে এসে জানায়, “অতিথিদের পরিবারে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, তারা বর্ধমান গেছে, ফিরলেই এখানে চলে আসবে।”

মাথায় বজ্রাঘাত হয় সকলের। একেই ফকিরবাবাদের পাওয়া যায়না। অল্প সংখ্যক মুসলিম পরিবারের বসবাস, তাদের মধ্যে থেকেই অতিথি নির্বাচন করে নিমন্ত্রণ করা হয়। সবকিছুরই একটা নিয়ম আছে, হুট করে কারুকে ধরে এনে ভোগের থালার সামনে বসিয়ে দিলে তো হয়না! সমীরের ভাই বলছে, এত চিন্তা করার কিছু নেই। ফোনে কথা হয়েছে। মেমারী রেলগেটে গাড়ি আটকে গেছে তাই দেরি হচ্ছে, ওঁরা এলেন বলে।

একটু পরেই সবাই দেখে সেই দুজনের বদলে অন্য দুইজন মুসলিম ভদ্রলোক হেঁটে আসছেন ঠাকুরদালানের দিকে। মাকে করজোড়ে প্রণাম করে বাড়ির পুরুষদের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন। “আজ্ঞে, আমরা সেলিমদের আত্মীয়, আপনাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে আমাদেরকে পাঠান হল।”

সাদরে আপ্যায়ন করে ভিতর মহলে ওঁদের বসান হল। বাড়ির বড়বউ পঞ্চব্যাঞ্জনের থালা সাজিয়ে দিল অতিথিদের সামনে। তৃপ্তি করে দুজনে খেয়ে উঠে বললেন, “নিন আপনাদের কাজ শুরু করে দিন। গনগনে রোদে অতিথিরা অপেক্ষা করছেন। আমাদের নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, আমরা একটু ঘুরেফিরে চারদিকটা দেখি।”

হৈ হৈ করে কর্মযজ্ঞ শুরু হল। প্রায় তিনশ মানুষ ভোগ খাবার আশায় অপেক্ষা করে আছেন। ত্রিপলের ছাউনির নিচে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। নিবেদিতা অনেকক্ষণ থেকে রিয়াকে দেখতে পাচ্ছেনা। কোথায় গেল মেয়েটা? ওর ভাইবোনেদের বাহিনী তো এদিকেই আছে।  এমনকি টিকলিকেও দু একবার দেখেছে। কিন্তু রিয়া, সে কই? মায়ের মন কু ডাকে। নিবেদিতা এসব ছেড়ে একটু এগিয়ে যাচ্ছিল, পিছন থেকে কে যেন ডাকল, “মেজমাকে বল, মিষ্টি আর পান মেজমার দায়িত্বে আছে।”

একটু পরেই আবার একটা হৈ হৈ। মাধবকাকাই খবর এনে দিল, “মেজমা শুনেছেন? সেলিম বাবুরা তো এসে হাজির হয়েছেন, তাঁরা অবাক, কোনও আত্মীয়কে তো তাঁরা পাঠাননি।” নিবেদিতার এসবে মনে নেই, হবে কেউ। শহরেও তো কত বিয়ে বাড়িতে আমন্ত্রিতের বদলে অন্য লোকজন খেয়ে যায়। মেয়েটা যে কোথায় গেল!

পল্টু ছুটতে ছুটতে আসে, “ও মেজমা, রিয়াদিদি পুকুর পাড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।” নিবেদিতা সব ছেড়ে পড়িমরি দৌড়ায়। সঙ্গে টিকলি সহ আরও অনেকে। চোখেমুখে জল ছিটিয়ে রিয়ার জ্ঞান ফেরান হল। সমীর গজগজ করছে, “নিশ্চয় শাড়ি পরে হোঁচট খেয়েছে, এই রোদের মধ্যে না ঘুরে ঠাকুরদালানে বসতে পারত।”

রিয়া চোখ খুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। তারপর পুকুর ঘাটের বাঁধানো সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, “এখানেই তো সেই শেরওয়ানি পরা ভদ্রলোক ছিলেন, কোথায় গেলেন?” নিবেদিতার মুখেচোখে ভয়। সেই মুসলিম ভদ্রলোকদের কারুকে উদেশ্য করেই রিয়া কিছু বলছে। লোকটা কি গাছে ঘেরা নির্জন এই পুকুর পাড়ে মেয়েটাকে একা পেয়ে...

“লোকটা না খাবার পর এদিকে এল, তারপর পেট থেকে নাড়িভুঁড়িগুলো বার করে জলে ধুচ্ছিল।  জলে আমার ছায়া পড়তেই আস্তে আস্তে মুখ ঘুরিয়ে আমাকে দেখে হাসল। তারপর বলল, বেটি এ জিনিস আমি কারুকে দেখাইনা, তুই দেখে ফেলেছিস, তোর খুব ভাল হবে, আমি দোয়া করছি।” শিউরে উঠলেন উপস্থিত সবাই। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল প্রত্যেকের। ফকিরবাবা আজও নন্দী বংশকে বিপদআপদের হাত থেকে আগলে রাখছেন, বুঝতে কারুর অসুবিধা হলনা। টিকলি জীবনেও এমন পুজো কোনদিন দেখেনি। সবাইকে দেখে টিকলিও মাথায় হাত ছোঁয়াল, যদিও জানেনা মা দুর্গা নাকি ফকিরবাবা কার জন্য এই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। নাকি সবশক্তির এক অদ্বিতীয় আধারের উদ্দেশে সবাই এই নবমীতে প্রণত !


( মূল তথ্যকে অবিকৃত রেখে এই কাল্পনিক কাহিনি রচনা করা হয়েছে।

তথ্য সূত্র - মুসলমানের দুর্গাপুজো, চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য)

🌹🌹


Friday, 23 October 2020

বিশেষ কিন্নর ২

 আজ মহাসপ্তমী। শুভ শারদীয়ার শুভেচ্ছা জানবেন সকলে। আজ একটি অনুবাদ গল্প রইল। রূপান্তর করেছেন প্রখ্যাত অনুবাদক নন্দিতা ভট্টাচার্য। 

🙏


✍️


#পাথর_ও_প্রজাপতি

                                                      


মূল অসমীয়া গল্পঃ মনিকা দেবী 

                                                     

 বাংলা রূপান্তরঃ #নন্দিতা_ভট্টাচার্য


১৯৭৯ সালে মঙ্গলদই শহরে জন্ম । গুয়াহাটী সন্দিকৈ মহাবিদ্যালয়ে কলেজ শিক্ষা আরম্ভ এবং কটন মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী । তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশ হয় ‘অসম বানী ‘ কাগজে। প্রকাশিত গল্প সংকলন প্রিয় আলাপ, সখিয়তী, মইদাম’র জোনাকী(২০০৮), জহর-মহর এবং বানপানী আহিচি চমাকে-ভমাকে । বর্তমানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত মনিকা দেবী ২০০৫ সালে ‘ প্রিয় আলাপ ‘ বইটির জন্য ‘ মুনীন বরকটকী পুরস্কার এবং ২০১৪তে ‘ জহর-মহর’ বইটির  সাহিত্য একাডেমীর যুব পুরস্কার লাভ করেন। 


কাপড় মেলা তারে প্রজাপতিগুলো পড়েছিল নির্জীব, নিষ্প্রাণ। মেলে দেয়া কাপড়ে ও প্রজাপতিগুলোকে বসিয়ে দিল। প্রজাপতি আঁকড়ে ধরে রইল কাপড়গুলোকে। উড়ে উড়ে পড়ে গেল না, আপ্রাণ ঝুলে রইল ।

অনেকদিন আগে ও একঝাক প্রজাপতি দেখেছিল । রংবেরঙ্গের একঝাক প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছিল মাঠে। ওদের গাঁয়ের মাঠ। প্রজাপতির পেছন পেছন ছুটেছিল । প্রজাপতি ওকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। 

প্রজাপতির কথা ভাবতে ভাবতে মাধব ছাদের ওপরে গিয়ে দাঁড়াল। 

                                             ****  

বলতে গেলে কাছের কেউ নেই আমাদের । একটি মাত্র দেওর , নাম মহেন। মহেনকে  নিজের ছেলের মতই দেখতাম। গ্রামের বাড়ী থেকে নিয়ে এলাম ওকে। পড়াশোনা করালাম । দাদা ওকে চাকরি যোগাড় করে দিল। শহরে কেনা জমিতে ওকে এনে স্থিতু করলাম। ঘরবাড়ী গুছিয়ে দিলাম। ধুমধাম করে বিয়েও দিলাম।

ভাবলাম বুড়ো বয়েসে সাহারা দেবে। তেষ্টা পেলে জল দেবে,ক্ষিদেতে এক গরাস ভাত । আর পাব উভৈনদীর স্নেহ ভালবাসা।

 কিন্তু বিয়ে করেই মহেন হাঁড়ি আলাদা করল, আলাদা থাকতে শুরু করল।আলাদা হল চরু-হাঁড়ি , কথা বার্তা। সবকিছুই অন্যরকম । এখনই এই অবস্থা , আমরা বুড়োবুড়ি অথর্ব হলে তো এরা কলা দেখাবে ।

এখন মাধবই আমাদের আশা ভরসা। অন্ধের যষ্টি । গ্রাম থেকে নিয়ে এসছি ওকে । অনাথ ছেলেটি । গ্রামে কাকার কাছে থাকত। আমরা নিয়ে আসায় কাকা খুশীই হয়েছেন। ভাবছে আপদ বিদায় হল।

আমাদের জন্য মাধব অপুতের পুত, আমি না বিইয়ে কানাইয়ের মা। ওকে লেখাপড়া শেখাচ্ছি।  ম্যাট্রিক দিয়েছে এবার। পাশও করবে একবারে। উনি বলেছেন ওকে কোনও একটা অফিসেও ঢুকিয়ে দেবেন। 

মাধবের বিয়ে দেব ধুমধাম করে। মাধবের বৌ দেবে তেষ্টায় এক গেলাস জল, ক্ষিদেয় এক গরাস ভাত এবং উভৈনদীর স্নেহ- মমতা। 

ছেলে বৌ , নাতি পুতি সহ ভরভরন্ত সংসার । আবার আমার সংসার উপচে পড়বে।

 এগুলো ভাবতে এত ভাল লাগে । 

আলসেতে প্রজাপতি হয়ে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে ।

                                            **** 

বরখুড়ী ওকে বড় ভালবাসে। আর ও ভালবাসে প্রজাপতি। শহরের প্রজাপতিগুলো নির্জীব, নিষ্প্রাণ । গ্রামের ফেলে আসা প্রজাপতির কথা কথা খুব মনে পড়ে ওর । 

বরখুড়ী ওকে নিজের ছেলের মত ভালবাসে । পরীক্ষার কয়দিন ওকে কুটোটি নাড়ত দেয় না । পড়ার টেবিলেই রেখে যায় ফল-মূল-দুধ । ভাট–চা সব কিছুই ঘরেই পৌঁছে যায়।   

বরখুড়ীর সঙ্গে ও বাজারে যায় । বরখুড়ী ওকে সার্ট কিনে দেয়, প্যান্ট কিনে দেয় । গেঞ্জি , জাঙ্গিয়াও কিনে দেয় খুড়িমা। ম্যাট্রিক পাস করলে খুড়িমা ওকে একটা ঘড়ি কিনে দেবে। এখনও ওর ঘড়ি যে নেই তা নয় ! তাবে পরীক্ষায় পাশ করলে একটা দামী ঘড়ি পাবে। একজোড়া দামী জুতোও পছন্দ করে রেখে এসেছে ও । 

ওর জীবনে কোনও কিছুর অভাব নেই। শুধু প্রজাপতিগুলো হারিয়ে গেছে ওর জীবন থেকে । 

ছাদে এলেই ও প্রজাপতিগুলোর কথা ভাবে। 

বরখুড়ি ওকে কাপড় মেলতে দেয় না । মেখলা-পেটিকোট এগুলো ছুঁতে দেয় না ওকে। ছোটখুড়ি ওকে বার বার কাপড় মেলতে বলে ওর ভালই লাগে। ছাদে আসতে পারলে ওর খুব আনন্দ হয়। কাপড় মেলার ক্লিপগুলোকে ওর প্রজাপতির মত লাগে। 

সত্যিকারের প্রজাপতিগুলো তো ওকে কেউ ফিরিয়ে দেবে না। 

                                            ***** 

দাদা বউদিরা এই মাধবটাকে এখনও পুষে রেখেছে কেন ?

আমি কি করে জানব ? 

ওরা মরলে এই মাধবই তো সব সম্পত্তির মালিক হবে। আমারদের বুড়ো আঙ্গুল চুষতে চুষতে দিন যাবে। 

ও আমিও ভাবছি কথাটা । ভাবতেই থাকবে নাকি কিছু পথ বার করবে। ওর মতলব তো ভাল বুঝছি না । মেয়ে দুটোও বড় হচ্ছে। খেয়াল আছে তোমার?

সেই তো, কখন কি হয় ঠিক নেই। 

জেনে শুনেও কেউ সাপ পুষে রাখে! কাপড় মেলতে পারলে ওকে আর পায় কে। এদের দুজনের প্যান্টি মেলতে গিয়েও এক গাদা সময় কাটিয়ে আসে। নাড়া চাড়া করে। 

কি করি বলত ! আমাকে এতদিন বলনি কেন ? এটা একটা কথার কথা হল!  কিছু একটা তো করতেই হবে।  ভয়ংকর বিপদ হবে নয়ত ।

                                           **** 

তারপর বাড়ী একদিন তোলপাড় । ছোটখুড়ির চিৎকারে গগন ফাটল। দৌড়ে এলেন ছোট খুড়া । মাধব নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে ছোটখুড়ির চান দেখছিল। ছাদে দাঁড়িয়ে ও নাকি সবসময় ছোটখুড়ির চান দেখে। আজ ধরা পড়েছে।  ছোটখুড়ি নাকি ব্যাপারটা আজই খেয়াল করলেন ছোটখুড়ির চোখে চোখ পড়েছিল বলে !

খুড়িদের চানঘর নাকি ছাঁদ থেকে খুব স্পষ্ট দেখা যায় । পেছনের বেড়ার ফুটো দিয়ে নাকি ভেতরে কেউ চান করলে তাকে পরিষ্কার দেখা যায়। ছোটখুড়ি চিৎকার করে বাড়ী মাথায় তুললেন। ছোট খুড়া মাধবকে টেনে হিঁচড়ে বড়খুড়ার সামনে এনে ফেললেন । আজই কিছু একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। হয় ছোটখুড়ারা থাকবেন নয়ত মাধব থাকবে এই বাড়ীতে। 

                                             **** 

হেস্ত-নেস্ত করা হল । মাধব পোটলা।  পুটলি বাঁধল । ছোট পুটুলি । এতগুলো জামা কাপড়ের মধ্যে থেকে ও শুধু পুরানো জামাটাই নিল। আর দুটো প্যান্ট। তাতেই ভরে গেল ওর ছোট ঝোলা। বরখুড়ী সুর ধরে কাঁদলেন । বারে বারে তিনি মাধবের পথ আটকাতে লাগলেন। চোখের জলে রাস্তা অস্পষ্ট হল। 

মাধবেরও খুব কষ্ট হচ্ছিল। তবুও কাঁদল না মাধব । মাধবের চোখের জল পাথর হয়ে স্থির আটকে রইল। 

                                               ****

অনেকদিন আগে অনেকগুলো প্রজাপতি সঙ্গে  উড়ে বেড়াচ্ছিল ও। বাতাস থেকেও হাল্কা ছিল ওর শরীর । 

এখন থম মেরে পড়ে রইল একটি নিস্পন্দ পাথর। প্রজাপতি ওকে আর উড়িয়ে নিতে পারছে না। প্রজাপতির ছিন্ন ভিন্ন শরীর পড়ে রয়েছে। 

ওর মনের মাঝের উড়ন্ত প্রজাপতিরা মাথা খুঁড়ে মরছে পাথরে । 

                                             **********


🌹🌹



Wednesday, 21 October 2020

বিশেষ কিন্নর ১

 মহাপঞ্চমী থেকে শুরু হলো বিশেষ কিন্নর। 

যারা কলম ধরেছেন তাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই। 


ইতি


কিন্নর দলের পক্ষে

সম্পাদকমন্ডলীর সদস্যগণ


🙏


🌹🌹🌹


#সম্পর্কের_রসায়ন_সম্পাদক_ও_লেখক


#জ্যোতিপ্রকাশ_সাহা 


দুটো গল্প দিয়ে শুরু করি। ঠিক গল্প নয় ঘটনা। আজ থেকে প্রায় তিপান্ন বছর আগে তৎকালীন সময়ের একজন নবীন লেখক আমেরিকা থেকে ফিরছেন। ভীষণ জনপ্রিয় লেখক তখন তিনি।  দমদম বিমানবন্দরে নেমে তিনি ট্যাক্সিতে উঠে যাবেন এমন সময় দেখেন এক ভদ্রলোক ট্যাক্সির জানলা দিয়ে তাকে কিছু বলতে চাচ্ছেন। সেই লেখক তাঁকে দেখেই অবাক, সাগরদা আপনি? সেই ভদ্রলোক অর্থাৎ লেখকের সাগরদা বললেন, এদিকে এসেছিলাম, শুনলাম তুমি আসছো, তাই একটু অপেক্ষা করে গেলাম। তা বলি কি, এই বিদেশ ভ্রমণের লেখাটা মাথায় রেখো। 

পাঠক, নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধে হচ্ছেনা, এই সাগরদাই  হচ্ছে বিখ্যাত সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। হ্যাঁ, যখনকার কথা বলছি তখন সাগরময় ঘোষ খাতায়-কলমে সম্পাদক ছিলেন না। কিন্তু সেই সময়ে দেশ পত্রিকার সম্পাদক অশোক কুমার সরকার তাঁকে "দেশ" সম্পাদনার ক্ষেত্রে প্রায় সমস্ত ক্ষমতাই দিয়ে দিয়েছেন।  তাই ভাল একটা লেখা যোগাড়ের জন্য তিনি বিমানবন্দর অবধি পৌঁছে গিয়েছিলেন।  লেখক ছিলেন মনিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, যাকে আমরা 'শঙ্কর' নামেই চিনি। সৃষ্টি হয়েছিল 'এপার বাংলা ওপার বাংলা'। ধারাবাহিকভাবে সেই সময় ‘দেশে'তে প্রকাশিত হয়েছিল।  

এই ঘটনাটা উল্লেখ করলাম এই কারণে যে একজন প্রকৃত সম্পাদক একজন লেখকের কাছ থেকে কিভাবে লেখা বের করে আনতে হয় সেটা জানেন এবং তার জন্য  ধৈর্য ধরতে পারেন। ধৈর্যের কথা যখন উঠলো তখন আর একটা ঘটনার কথা বলি, রামকিঙ্কর বেইজকে নিয়ে সমরেশ বসুর 'দেখি নাই ফিরে'  উপন্যাসের জন্য এই সাগরময় ঘোষ দশ বছর অপেক্ষা করেছিলেন। 

    আসলে সম্পাদককে একটু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হয়। কার কাছ থেকে ভালো লেখা পাওয়া যাবে, সেইটা আগেই তাকে বুঝতে হয়।  তারপর লালন পালন।  প্রবীণ নবীন সকল লেখকদের কাছ থেকে তার সেরা লেখাটা আদায় করার দক্ষতাই একজন সম্পাদকের মান নির্ধারিত করে। এই কাজে সম্পাদক সাগরময় ঘোষ অনেকটাই এগিয়ে থাকবেন। সম্পাদক অবশ্যই জ্ঞানী মানুষ হবেন, কিন্তু তার সেই জ্ঞানকে জাহির না করে লেখকদের মতকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া‌ই তার প্রধান কাজ হ‌ওয়া উচিত। 

  এ ব্যাপারে আর একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি। বুদ্ধদেব বসু তখন 'কবিতা' পত্রিকা করছেন। তরুণ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা তার কাছে পাঠিয়েছেন। কবিতাটির একটি লাইন সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু অন্যমত পোষণ করে কবিতাটি ফেরত পাঠালেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। উদ্দেশ্য কবিতাটি সুনীল আবার নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করে তার কাছে পাঠাবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন হয়ে গেলো সুনীল আর কবিতা তার কাছে পাঠাচ্ছেন না। তাই তিনি নিজেই সুনীলকে তাগাদা দিলেন তোমার কবিতা, কি হলো? সুনীল আবার সেই কবিতাটি এতোটুকু কাটাছেঁড়া না করে বুদ্ধদেব বসুর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। বুদ্ধদেব বসু বুঝলেন, এবং কবিতাটি তিনি তার পত্রিকায় ছাপতে দিলেন। অর্থাৎ তিনি নিজস্ব অহংকে বিসর্জন দিয়ে একজন তরুণ কবিকে মান্যতা দিলেন। একজন সম্পাদক এভাবেই লেখক-কবি তৈরি করেন। সাগরময় ঘোষ রসিকতা করে বলতেন, আমি তো স্টেজের মালিক,  স্টেজ ভাড়া দিই, নাচবে তুমি। ভুগলে তুমি ভুগবে।  এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই অনন্য। একজন লেখককে বুঝিয়ে দেওয়া, লেখা ভালো না হলে তুমি কিন্তু আর পাঠক মনে জায়গা করে নিতে পারবে না।

  এতো গেল বাণিজ্যিক কাগজের সম্পাদকের কথা। বাণিজ্যিক কাগজের সম্পাদকের অনেকগুলো সুবিধা থাকে। তারা লেখকের কাছ থেকে টাকা দিয়ে লেখা কেনেন,  ফলে লেখক জানেন যদি পাঠকের পছন্দ না হয় তাহলে বাণিজ্যিক কাগজ আর তার লেখা চাইবে না, তাই সদা সচেষ্ট থাকেন লেখার মান নিয়ে। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের এই সুবিধাটুকু নেই। তারা লেখকের ভালো লেখাটুকু পাওয়ার জন্য কোন টাকা পয়সা দিতে পারেননা। তাই তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর জোর দিতে হয়। অধিকাংশ লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক একটা অহমিকায় ভোগেন। তারা নিজস্ব অহংবোধে ভাল লেখকদের পাত্তা দিতে চান না। এটা কখনই কাম্য নয়।  লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের, যারা ভালো লিখছেন, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রটি মেরামত  করতে হবে। কোন ঘটনায় লেখক এর ওপর ক্ষুব্ধ হলেও, যদি সে ভালো লেখে, তাকে আবার লেখার জন্য আহ্বান জানাতে হবে। সম্পাদকের নিজস্ব ইগোকে বর্জন করতে হবে। প্রকৃত সম্পাদক এটাই করে থাকেন। লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, লেখকদের সঙ্গে  সুসম্পর্ক স্থাপন করে, ভালো লেখাটি আদায় করলে, তার পত্রিকাটিও যথার্থ মানে পৌঁছতে পারবে বলে মনে করি।


❣️❣️



Monday, 19 October 2020

চতুর্থ পর্ব পঞ্চম পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#চতুর্থ_পর্ব


#পঞ্চম_পাতা


আজ একটি গল্প ও দুটি নিবন্ধ প্রকাশিত হলো। 

চতুর্থ পর্ব এখানেই শেষ।

বোধন গল্পটি দিয়ে পুজোর মাকে কাঠি পড়ল। 


আগামীকাল থেকে #বিশেষ_কিন্নর। আগামী ছ'দিন আপনাদের কাছে কিন্নর দল আনবে জমকালো সম্ভার। 

🙏


✍️


#বোধন


#সুব্রত_দেব 


-সনু ----

-হ্যাঁ,মা যাই।মা'র ডাকে সনু ছুটে আসে।

- আজকে বৃহস্পতিবার, লক্ষ্মী পুজোর দিন।আজকে আমায় পাঁচ টাকা ত দিলি না।

-ও হো মা! তুমি না--- আচ্ছা প্রতি লক্ষ্মীবারে তোমাকে টাকা দিতে হবে? কী হবে তোমার টাকা দিয়ে, সবই ত এনে দিচ্ছি,কিছু লাগলে বলো।

-- না,থাক।

সনুর এই হয়েছে জ্বালা! এমনিতেই সংসার চালাতে

হিমসিম খাচ্ছে,তায় এর ওর আবদার। গজরাতে

গজরাতে বেরিয়ে যায়।

একটা সময় মা অনেক করেছে সংসারের জন্য।

হাঁস,মুরগি,ছাগল পালন থেকে টিউশন কিছুই বাদ দেয়নি। শুধুমাত্র সংসারের সুরাহার জন্য। বাবার জুট মিল ত বছরে ছমাসের ওপর বন্ধই থাকত। তাও চলছিল,বাবা চলে যাবার পর মা-ই শক্ত হাতে হাল ধরেছিল,তা না হলে---

এসব ভাবতে ভাবতে সন্ধে বেলায় বাড়ি ফেরে সনু।

দেখে, মা পুরোনো ট্রাঙ্ক থেকে কাপড়, পোশাক,জামা সব বার করছে।

-এ কী করছ,সন্ধেবেলায়। 

-সনু ,তোর এই জামাটার কথা মনে আছে?

--হ্যাঁ, কিন্তু এখন এগুলো বার করলে কেন?

-এমনি। এই জামাটা তোর বাবাকে টিউশনের টাকা 

জমিয়ে কিনে দিয়েছিলাম। এখনও কী সুন্দর

রয়েছে!

--তখন কত টিউশন করেছি,আর এখন-- বাবার দেওয়া রংবেরঙের শাড়ি গুলো উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে গভীর শ্বাস ফেলে সনুর মা।


# আর কয়েকদিন বাদেই পুজো। কী যে হবে, মিলও বন্ধ।কোনো রকমে সবজি বেচে দিন চলছে। ছোট মেয়েটার একটা নতুন জামা কিনতে হবে-- এসবই ভাবছিল সনু। সেদিনের মত কাচা বাজার বিক্রি সেরে সনু দুপুরে বাড়ি ফেরে। বাড়িতে ফিরতেই বৌ

মণি বলে -জানো, মা আজ বাসনউলি কে মা-র সব 

পুরোনো কাপড় বেচে দিয়েছে।

-বেচে দিয়েছে?

--তবে আর বলছি কী?

-- তাই নাকি! দাঁড়াও দেখছি।

- মা, কিছু টাকা দাও ত।

-টাকা! আমি কোথায় পাব? মাঝে মাঝে টুকিটাকি

দু একটা টাকা যা দিস তা ত পুজোর এটা সেটা কিনতেই খরচ হয়ে যায়।

ও! তা হলে তোমার কাছে কিছু নেই।

-না।

সনু খুব বিরক্ত হয়ে চলে যায়।

মণি যে বলল - মাকে পুরোনো কাপড় বেচতে দেখেছে,আর ও চাইতেই বলল টাকা নেই!

দেখতে দেখতে পুজো চলে এল। পাড়ার চন্ডীমন্ডপে প্রতিমা এসে গেছে। ছেলের দল কলাবউ স্নান করাতে গেছে। অন্যবার সনু ছেলের দলে থাকে।

এবারে মন ভালো নেই, মিল বন্ধ।

বাচ্চা ছেলে মেয়ের দল নতুন জামা পরে মন্ডপে খেলে বেড়াচ্ছে। ওদের মধ্যে মিনির পরণেই পুরোনো জামা। সনুর বুক টা হু হু করে ওঠে।

ও বাড়ির দিকে ছোটে।-আজ মা-র সাথে হেস্ত নেস্ত করবেই। সেদিন কটা টাকা চাইলাম দিল না- মেয়েটার একটা ভালো জামা কিনবে ভেবেছিল--

বাড়িতে ঢুকতেই মার গলা শুনতে পায় । সনু এদিকে আয় ত।

সনু বিরক্ত হয়ে মার কাছে যায়।

-দিদি ভাইয়ের জন্য এই জামাটা কিনেছি,কেমন

হয়েছে দেখ ত?

-- সনু অবাক হয়ে একবার লাল টুকটুকে ফ্রক টার

দিকে তাকায় আর তাকায় মা-র অমলিন মুখের দিকে।

--কি রে কী দেখছিস অমন করে?তোর জন্যও একটা গেঞ্জি আর বউমার একটা ব্লাউজ আনিয়েছি। দেখ পছন্দ কি না?

মিনি বাড়ি ফিরে জামা পেয়ে ত বেজায় খুশি। ঠিক 

সেই সময় বাড়ির গেটে বাসনউলি ফুলমনির হাঁক শোনা যায় 

--কী গো বুড়ি মা,একবার বাইরে এসে দেখো।

সনু ছুটে বাইরে গিয়ে দেখে ফুলমণির পরণে মা-র

দেওয়া লাল শাড়ি। রুপোলি আলোয় আজ এত বছর বাদেও ঝলমল করছে। 

সনু খেয়াল করে নি কখন যেন মাও এসে দুয়ারে দাঁড়িয়েছে। ঘুরে তাকায় মায়ের দিকে। দূরে চণ্ডীমণ্ডপে ঢাক বাজছে। তাই ত! আজ যে ষষ্ঠী, মায়ের বোধন।


🌹🌹


✍️


#যুদ্ধ_কেন


#অনিন্দিতা_মণ্ডল 


 দুই নায়ক, দুই মনীষী, দুজনেই ইহুদি বলে নাৎসি জার্মানির চোখের বিষ। একজন আলবার্ট আইনস্টাইন অন্যজন সিগমুণ্ড ফ্রয়েড। যুদ্ধের বিভীষিকা আইনস্টাইন তাঁর গবেষণাগারে বসেও উপলব্ধি করেছিলেন। অনুভব করেছিলেন হাজার হাজার মানুষের অত্যাচারিত হওয়ার কষ্ট। সেই নৃশংস ঘটনা তাঁর মানসে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি শান্তির পক্ষে কথা বলেছেন। 

 ১৯২৭ সালে আইনস্টাইন ও ফ্রয়েডের সাক্ষাৎ হয়। সেই সাক্ষাতকারে তাঁরা কী কথা বলেছিলেন তা জানা যায়না। কিন্তু তারপর থেকে চিঠির আদানপ্রদান চলতে থাকে দুজনের মধ্যে, যে চিঠি ১৯৩৩ সালের আগে প্রকাশিত হয়নি। এখন সেই প্রকাশিত চিঠির সংকলনটি দুষ্প্রাপ্য। ইংরিজি অনুবাদে মাত্র দুহাজার কপি ছাপা হয়েছিল, যা নিঃশেষিত হয়ে যায়। যা পাওয়া যায় তা হল, সেই কথোপকথনের সংক্ষিপ্তসার। 

 দেখতে পাচ্ছি, তেইশ বছরের বড় ফ্রয়েডকে আইনস্টাইন লিখছেন, ফ্রয়েডের বিজ্ঞানচেতনা ও সত্যানুসন্ধানের যে গভীর বোধ তা তাঁকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। তদানীন্তন যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক বিশ্ব আজকের চেয়ে অন্যরকম ছিলোনা। আজ যেমন আমরা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, চরম স্বৈরাচারী ও একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকার বলে নিজেদের মনে করছি, আজ থেকে একশো বছর আগেও পটভূমির বিশেষ হেরফের হয়নি। বিচলিত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার রাজা তাই এমন একটি শাস্ত্রশাখাকে জগতের দরবারে স্বীকৃতি দিচ্ছেন যা আমরা এখনও সেভাবে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বলে মানতে পারিনা। অবশ্যই সে আমাদের চিন্তার সঙ্কীর্ণতা। আইনস্টাইন ১৯৩১ সালে ইন্সটিটিউট ফর ইন্টেলেকচুয়াল কোঅপারেশনে আমন্ত্রিত হন। সেখানেই তিনি দ্বিধাহীন ভাষায় ফ্রয়েডের ভাবনাকে সমর্থন করে তাঁকে এই প্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রণ করেন। সেই থেকে একটি চিঠির সিরিজ জন্ম নেয়। আমরা হতভাগ্য যে সেটির পূর্ণ রূপ থেকে আমরা বঞ্চিত। 

 কী ছিল আইনস্টাইনের জানার কথা? যিনি পদার্থবিদ্যার পরমতম রূপকে কল্যাণকর মনে করে এসেছেন চিরকাল, চিরকাল অনন্ত জ্ঞানরাশিকেই ঈশ্বর মনে করেছেন, তিনি একজন মনস্তত্ত্ববিদের মনীষাকে কেমন করে ভাবনার বৃত্তে স্থান দিচ্ছেন? তখনই মনে ভাসছে, কী অসহায় বিজ্ঞানী! রাজনীতির ক্ষমতালিপ্সুদের কাছে যিনি অসহায়। তিনি বলছেন, আপনিই জানিয়েছেন, মানুষের মনের দুই বিপরীতধর্মী প্রবৃত্তির কথা। একদিকে যেমন জীবনের প্রতি ভালোবাসা ও কামনা তেমনই অন্যদিকে বিধ্বংসী প্রবৃত্তি। আমরা পৃথিবীর ইতিহাসে দেখেছি মহামানবেরা সর্বকালেই একথা বলেছেন। এই ধ্বংসাত্মক হিংসাত্মক প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি পেতে হবে। মনের গভীরে লালন করতে হবে কল্যাণকর বৃত্তি। মানুষকে ভালবাসতে হবে। ঘৃণা নয়। কিন্তু তিনি যত বড় মহাপুরুষই হোন না কেন, তাঁর কথায় জগতের কতটুকু উপকার হয়েছে? এখন আপনার কাছে এই চিরন্তন সমস্যার কি কোনো প্রতিকার আছে? আমি আপনার দ্বারস্থ হয়েছি, কারণ আমি জানি আপনার চিন্তার জগতে কোনো কুয়াশা নেই। সোজা জিনিস আপনি সোজা দেখতে পান। 

 আমরা একবার ফ্রয়েডের উত্তর দেখে নিই। তাঁর যুক্তিতে এসেছে ‘ক্ষমতা’ ও ‘অধিকার’ নামে দুটি শব্দ। ক্ষমতাকে তিনি প্রাথমিক স্তর থেকে, অর্থাৎ পশু যেমন তার দৈহিক বলকে কাজে লাগিয়ে এলাকা দখল করে সেই স্তর থেকে ক্রমে গোষ্ঠী ও শেষে রাষ্ট্র ক্ষমতার ক্রম অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অধিকার শব্দটি আরও জটিল এক ধারণা। অধিকার বলতে প্রাথমিক স্তরে তিনি ব্যক্তিমানসে যে স্বাধীন ভোগদখলের বৃত্তি থাকে তাকেই বুঝিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী স্তরে যেখানে গোষ্ঠী ও ক্রমে রাষ্ট্র এসে পড়েছে, সেখানে এই ‘অধিকার’ শব্দটি ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই এসেছে সন্ত্রাস। হিংসা ও প্রতিহিংসার মাধ্যমে সেই সন্ত্রাসের পরিপুষ্টি। ক্রমে রাষ্ট্রীয় স্তরে সেই সন্ত্রাস রাষ্ট্রনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

 মানুষের মন থেকে হিংসার বৃত্তি মুছে দেওয়া সহজ নয়। কারণ প্রাথমিক আদিম বৃত্তি এটি, যা দিয়ে সে নিজের খাদ্য আশ্রয়ের অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকারকে বলবৎ করেছে। একটু নিজেদের দেশের দিকে তাকাই। ভারতবর্ষ। এই প্রাচীন ভূখণ্ডে দুই সর্বনাশা যুদ্ধ দুটি মহাকাব্যের বিষয়। কালজয়ী দুটি মহাকাব্য থেকে আমরা প্রতিনিয়ত জানতে পারি রাজনীতির কুটিল সব চক্রান্ত, বিধ্বংসী যুদ্ধ এবং অজস্র মানুষের হত্যাকাণ্ড। সেই যুদ্ধকে মান্য ও ন্যায়সঙ্গত করতে রচিত হয়েছে গীতা নামক এক উপদেশাবলী। নিয়তির দোহাই দিয়ে যেখানে মহৎ প্রবৃত্তির মানুষকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিপক্ষ নিজেরই ভাই। 

 নিজেদের কামনা চরিতার্থ করতেই তাই আমরা যুদ্ধে যোগ দিই। একেবারেই স্বার্থপর বৃত্তি, যা এইসময় কখনই শুধুমাত্র একক মানুষের অধিকারকে স্থিত করেনা, পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়। 

 তাই আইনস্টাইন সেই সব মহামানবের মতো মানবকল্যাণে যুদ্ধ প্রতিহত করার স্বপ্ন দেখলেও এখনও পর্যন্ত তা স্বপ্নই রয়ে গিয়েছে। তাহলে কি আমরা এখনও অন্ধকার থেকে বের হতে পারব না? এখনও পাশবিক বৃত্তির চর্চা থেকে সরবো না? মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র কখনই যুদ্ধ বন্ধ করবেনা, সন্ত্রাসে সে মদত দেবে। বরং মানুষের শুভ বোধ তাকে এক একক বিশ্বে জাগরিত করতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নিষ্প্রয়োজন। যেখানে মানুষের বাসস্থান কোনো অধিকারের কাঁটাতারে ঘেরা নয়। আমাদের সেই বিশ্বের প্রতি অচঞ্চল প্রার্থনা জারি রাখতে হবে। 


তথ্যসুত্রঃ https://en.unesco.org/courier/marzo-1993/why-war-letter-freud-einstein


🌹🌹


✍️


#হে_বরণীয়_পাগলামি


#অমূল্যরঞ্জন_ভট্টাচার্য 


দুই কিশোর গ্রামের সাঁকোর উপর দিয়ে যেতে যেতে একজন অপর জনকে ঠেলে ফেলে দিল । সে-ই আবার আহত বন্ধুকে বাড়ি এনে তার ক্ষত স্থান থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত নির্বিকার হয়ে দেখতে লাগল । 

এই কিশোরটিই আবার এক আহত পাখিকে এনে সেবা শুশ্রূষা করে বাঁচাতে চেষ্টা করেও পারল না। মৃত পাখিটির গায়ে পিঁপড়ে জমেছে । সে পিঁপড়েগুলি খেয়ে নিল । 

নিষ্ঠুরতা, বীভৎসতা , আবেগ হীনতা । কৈশোরেই বোঝা গেল এই ছেলে হবে এক ক্রিমিনাল । 

অথচ আশ্চর্য ! সে হল এক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী । 


প্যারিস । 

এক বৃহৎ সংস্থার শোরুম উদবোধন করবেন এক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী আজ। 

বিজ্ঞাপনে নাম দেওয়া হয়নি । সংস্থার অনেক অনুরোধেও অনেক ঘুরেও তাঁর কাছ থেকে একটি ছবি পাওয়া গেল না । পেলে বিজ্ঞাপন জোরদার হত । 

যাক, বিশাল দর্শকের ভিড় । কেউ জানেনা কোন শিল্পী উদবোধন করবেন । শোরুমের পর্দা সরে গেল । 

দেখা গেল একটি বড় গামলায় বসে আছেন শিল্পী । 

সম্পূর্ন নগ্ন ।

" আ রিয়াল লাইফ পোট্রেট । "

হাসি, হুল্লোড়ে ফেটে পড়ছে চারদিক । তার নাম হাজার কন্ঠে ~ সালভাদার , সালভাদার .... 


হ্যাঁ, ইনিই হলেন বিখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি (১৯০৪ ~ ১৯৮৯) । যাঁর মানসিক লক্ষ্মণ ছিল ক্রিমিনালের তিনিই হলেন চিত্রশিল্পে সুররিয়ালিজমের অনন্য শিল্পী । যে ধারার প্রভাব সাহিত্যে প্রসারিত হয়েছে। যেমন জীবনানন্দের কবিতায় । 


দালির প্যাশান তাঁর গোঁফ । মুখমন্ডল থেকে বেরিয়ে আসা সরু গোঁফ দুটি যেন ডানা মেলে আছে । তাই তাঁর নাম হয়ে গেল " দ্য মুসটাস আইকন "।


##

আসলে অনেক বিখ্যাত শিল্পী , স্রষ্টার আচরনে বিস্ময়কর বৈপরীত্য দেখা যায় যা আমাদের সাধারন বিশ্লেষণে পাগলামি বলে মনে হয় । আসলে কেউ পাগল নয় । তাঁদের মনোবিশ্লেষন নিয়ে যদিও অনেক চিত্তাকর্ষক লেখা আছে, আমরা এখানে সেগুলি সর্তকভাবে এড়িয়ে যাব। 

সীমিত পরিসরে আমাদের এই কথকতা এমনি কয়েকজনকে নিয়ে যাঁরা নিজস্ব ক্ষেত্রে মহীয়ান , চিরস্মরণীয় । 


##


১) এলবার্ট আইনষ্টাইন (১৮৭৯ ~ ১৯৫৫) এর ড্রাইভার জানাচ্ছেন রাস্তায় একটি মরা ফড়িং দেখে তিনি খেয়ে ফেললেন । পড়ে থাকা সিগারেট টুকরো কুড়িয়ে এনে সেই তামাক পাকিয়ে ধুমপান করতেন । মানুষজন পরিহার করে নির্জনতায় অপার বিস্ময়ে এই বিশ্বসৃষ্টিকে দেখতেন। ভাবতেন তাঁর তত্ত্বের মূল উপাদান " টাইম এন্ড স্পেস " নিয়ে । 

বেহালা বাজাতে বাজাতে চোখ দিয়ে জল পড়ত । 

বস্তুজগত আর কল্পনার সিমফনিতে কোমল হৃদয় চাইত মাধুর্য্যময়ীদের । 

তিনি হয়েছিলেন " লেডিস ম্যান "। 

এক তুতোবোনের সঙ্গে সর্ম্পক গভীর হল । নাম এলসা । এদিকে স্ত্রী মারিক । 

তারপর অনেক টানাপোড়েন , অশান্তি । সে অন্য কাহিনি । 


২) বিটোফেন (১৭৭০ ~১৮২৮) । পুরোনাম লুডভিগ ফান বিটোফেন । বিশ্ব শ্রেষ্ঠ সুরকার ও পিয়ানোবাদক । জার্মানির এই শিল্পীর " সিমফনি ৭ ", " সোনাটা ১৪ র " সুরে বিশ্ব প্লাবিত । ত্রিশ বছর বয়সে থেকে তাঁর শ্রবন শক্তি কমে যায় । 


তা, মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি ? 

অত্যন্ত নোংরা থাকতেন । পোশাকও ভীষণ নোংরা । 

মাথা গরম আর প্রচন্ড রাগ । মারামারি করতেন বাড়িওয়ালা আত্মীয়পরিজনদের সাথে । কাজের লোকদের যা পেতেন ছুঁড়ে মারতেন । যা হয় । নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন । 

বিস্ময়্কর যে এত বিখ্যাত মানুষটির জীবনে প্রেম আসেনি। চিরকুমার রয়ে গেলেন । 

কি বৈপরীত্য ~ ক্রোধ আর সংগীত । কল্পনার সুর ঝংকার আর প্রেমহীন হৃদয় । অথচ তাঁর সুর সৃষ্টিতে ঘটেছে ধ্রুপদি আর রোমান্টিকতার মেলবন্ধন। 

স্রষ্টা আর তাঁর সৃষ্টিকে কি ভাবে মেলাতে পারি ? 


৩) মাইকেল এঞ্জেলো (১৪৭৫ ~ ১৫৫৪) ইটালির রেনেসাঁর এই চিত্রশিল্পী বিশ্বের প্রথমসারির চারজন চিত্রকরদের অন্যতম। তাঁর আঁকা সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি হল " গড ক্রিয়েটেড আদম " সিস্টিন চ্যাপেলের দেওয়ালে অংকিত । 

এই বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ছিলেন নিজের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অমনোযোগী।

থাকতেন ভীষন নোংরা। স্নান করতেন না। পোশাক পালটাতেন না। জুতো কখনই খুলতেন না। পরে জুতো খুলে দেখা গেল সাপের খোলসের মত পায়ের চামড়া উঠে আসছে । এক ভয়ংকর রোগ ~ অটিজম। 

চলমান জীবন থেকে সম্পূর্ন বিমুখ । নিরলস মনোযোগ শুধু নিজের কাজে । 

সৃষ্টিশীলতা কি জন্ম নেয় বিচ্ছিন্নতা থেকে ? আমরা জানিনা। 


৪) নিকলাস টেসলা (১৮৫৬ ~ ১৯৪৩) ছিলেন এক প্রতিভাবান পদার্থবিদ ও ইঞ্জিনিয়ার । 

এনার ছিল শুচিবাই যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে অপ্রেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা ওসিডি । এর সাথে আমরা পরিচিত। 

টেসলার ছিল পরিষ্কার রাখার শুচিবাই। কোন কিছু স্পর্শ করতেন না। হয়ত ধূলো জমে আছে । বাড়ির কাজের লোকেরা তটস্ত । 

আরো একটা ব্যাপার আছে টেসলার । সেটা হল যা কিছু করবেন সেটা তিন বা তিনের গুণিতক সংখ্যা হতে হবে । সিনেমা হলে গেলে হলের পুরো সীমানাটি তিনবার ঘুরবেন৷। হোটেলে গেলে তিন প্যাকেট ন্যাপকিন নেবেন যার মধ্যে আঠারোটি ন্যাপকিন আছে । 


এগুলিকে পাগলামি বললেও প্রতিভাবানদের মানায় । তাঁদের সবকিছুই মানায় । কারন তাঁরা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় " দশের বাইরে " যে । 


৫) সিগমন্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬ ~১৯৩৯) । অষ্ট্রেলিয়ান এই নিউরো বিজ্ঞানীর যুগান্তকারী আবিষ্কার চেতনার ত্রিস্তরীয় অস্তিত্ব ~ কনশাস, সাব-কনশাস ও আনকনশাস মনোরোগ চিকিৎসায় নূতন দিগন্ত খুলে দেয় । তাঁর স্বপ্ন বিশ্লেষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। 


তা, ফ্রয়েড সাহেব ছিলেন তামাকুসেবী । চেন স্মোকার। মুখে ক্যানসার । তেত্রিশবার অপারেশান হল । তামাক ছাড়তে গিয়ে হলেন অবসাদ আক্রান্ত৷। এবার ধরলেন কোকেনের নেশা । কি প্রশংসাই না করলেন কোকেনের । এটা তাঁর মতে " ম্যাজিকাল সাবসটেন্স "। 


৬) টমাস এডিসন (১৮৪৭ ~১৯৪৯ ) ছিলেন বহু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের আবিষ্কারক, যেমন ফোনোগ্রাম, ইলেক্ট্রিক বাল্ব, সিনেমার ক্যামেরা - এরকম প্রায় একশো রকমের যন্ত্র । 

এডিসনের ছিল স্বল্প ঘুম । কাজের ফাঁকে ঝিমুনি আসত, যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় পলিফোসিক । 

তিনি হাতে রাখতেন মার্বেল । মেঝেতে প্লেট । চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়লে হাতের মার্বেল প্লেটে পড়ে শব্দ হত , আর তিনি জেগে উঠতেন। 

এরকম স্বল্প ঘুমাতেন লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি যাঁর অন্যতম বিখ্যাত পেন্টিং " দ্য লাষ্ট সাপার " আর বিস্ময়কর "মোনালিসা "। আরও বিস্ময়কর মৃত্যুর আগে লিওনার্দো র শেষ কথা ~ মোনালিসা মোটেই উচ্চস্তরের কাজ নয় । 

মহান স্রষ্টারা চির অতৃপ্ত ।


🌹🌹

চতুর্থ পর্ব চতুর্থ পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#চতুর্থ_পর্ব


#চতুর্থ_পাতা


আজ এসেছে চারটি অণুগল্প। আক্ষরিক অর্থেই চারটি অণুগল্প। 


✍️


#পাঁজর


#সমীরণ_রায় 


এক্সরে প্লেট টা আলোর দিকে তুলে ধরে ডাক্তার বাবু বললেন,-আপনার বুকের পাঁজর তো একদম ঠিক আছে অনিমেষ বাবু।কোনো ক্র্যাক তো চোখে পড়ছে না।ডাক্তার বাবু অনিমেষ বাবুর দিকে হাসি মুখে তাকালেন,-বয়েস হয়েছে তো আপনার।সাবধানে থাকবেন।উনআশির অনিমেষ অবাক হয়ে তাকালেন ডাক্তার বাবুর দিকে,-আপনি কিছুই খুঁজে পেলেন না ডাক্তারবাবু।কিছুই চোখে পড়লো না আপনার?তার পর কাঁপা কাঁপা হাতে আস্তে আস্তে নিজেই এক্সরে প্লেট টা আলোর দিকে তুলে ধরলেন ডাক্তার কে দেখানোর জন্য -দেখুন ডাক্তার বাবু।এই দেখুন ।এই খান টা।ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।

কাঁপা হাতের আঙুল দিয়ে নিজের বুকের পাঁজরের নানা ভাঙা জায়গায় দেখাতে দেখাতে নিজেই বিড়বিড় করে চললেন -আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমার পুরোটাই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।


🌹🌹


✍️


#সৈকত_থেকে


#দত্তা 


সন্ধ্যে নেমে আসছে। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেলো সৈকতে বসে কেবলই সমুদ্রের ঢেউ গুণে চলেছে মানবী। প্রতিটা ঢেউ যেন এক একটা সেকেণ্ডের কাঁটা। একহাত দূরেই বসে আছে সৌম্য । তার চোখও নিবদ্ধ ঐ ঢেউগুলোর দিকে , অসম্ভব শান্ত ও স্থির। তিথির একরকম জোরাজুরিতেই তাদের এইবার দীঘা ঘুরতে আসা। কবে যে এতটা বড় হয়ে গেছে মেয়েটা মানবী বুঝতেই পারেনি এতদিন।লকডাউনের কারণে ইদানীং অফিসের কাজ সে বাড়ি বসেই সারে । সেদিন রাতে খাবার টেবিলে বসে মুখ নীচু করে রুটির শেষ টুকরোটা মুখে পুরতে পুরতে বলেছিলো, " মা, দূরত্বটা তোমাদের মনের। সোনালী মুখার্জি সেটা মেপে দিয়েছে মাত্র। একবার শেষ চেষ্টা করো না তোমরা , আমার জন্য? একটু কোথাও ঘুরে এসো দু'জনে।আমি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি!" বলেই আর্দ্র চোখে তাদের দিকে তাকিয়েছিলো অনেকক্ষণ । সে চোখে কি ছিলো জানে না মানবী কিন্তু নিজেকে ভীষণ দীনহীন মনে হয়েছিলো তার।তাকিয়ে দেখেছিলো সৌম্যও খাওয়া বন্ধ করে থালায় আঙুল ফেলে চুপ করে বসে আছে।


"সৌম্য না!" 

একটা জলদগম্ভীর কন্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরলো মানবীর। দেখলো সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন সাদা কোঁচকানো পাঞ্জাবী পরিহিত এক ভদ্রলোক।মাথার কোঁকড়ানো চুল হাওয়ায় ফুলেফেঁপে বুনো ঝোপের মত লাগছে ।

"আরে নিরুপমদা, এখানে?একাই? আলাপ করিয়ে দিই , আমার স্ত্রী, মানবী।"

মানবী দু'হাত আলগাভাবে তুলে নমস্কার জানালো। এই মানুষটার কথা সৌম্যর মুখে আগে বহুবার শুনেছে সে। খুব রসিক মানুষ।কিন্তু কিছুতেই সেই সব গল্পের সাথে এনাকে মেলাতে পারলো না সে। সৌম্যর প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে পায়ের তলার বালির দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বললেন," আমি একাই রয়ে গেছি সৌম্য। দীপালী চলে গেছে আমাকে ছেড়ে ।আর, রিয়াকে, ওরা ছিনিয়ে নিয়েছে।"

"মানে?" সৌম্য অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে বসলো।

"জঙ্গলটায় ওরা কেউ খুঁজে পায়নি রিয়াকে। শুধু আমার হাতে একমুঠো ছাই এনে দিয়েছিলো পাশের বাড়ির পবনদা।ভানু, রবীন , কাস্টমসে ছিলো যারা ওরাও এসেছিলো। সবাই মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিলো।"

মানবীর মাথার ভেতর ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো , গা হাত পা ঝিমঝিম। হাত বাড়িয়ে সৌম্যর ডান হাতের কব্জিটা চেপে ধরলো। বুঝতে পারলো সৌম্যর হাতটাও বেশ শিথিল হয়ে গেছে। দু'জনের মধ্যে এখন ইঞ্চি কয়েক ব্যবধান মাত্র। নিরুপমবাবুর দৃষ্টি এখন দূরের ঢেউয়ে নিবদ্ধ । সৌম্য বাঁ হাতটা মানবীর হাতের ওপর রাখলো।


এভাবেই বেশ কয়েক মিনিট কাটার পর নিরুপমবাবু কিছু না বলেই ঢেউয়ের দিকে এগোতে শুরু করলেন। উদ্বেগের স্বরে সৌম্য বলে উঠলো , "চলো , ফিরি।"


মানবী দেখলো , নিরুপমবাবুর ঝাঁকড়া চুল আর সাদা পাঞ্জাবী অন্ধকারের মধ্যে বিন্দুর মত মিলিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের ভেতর ঠিক কতখানি অন্ধকার থাকে কে জানে! পালানোর পথ কি ঢেউ জানে? ফেরার জন্য পেছন ঘুরে সে দেখলো, রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। মানবী ভাবতে থাকলো রাস্তার বিতর্কিত আলোগুলো এতটা মায়াবী হয় কেন?


🌹🌹


✍️


#রং_নম্বর


#রীতা_মজুমদার


ফোন বাজছে।এই সাত সকালে ফোন করল কে ? বিরক্তির সঙ্গে ঘুম ভাঙলো পারমিতার। রবিবার পারমিতা একটু দেরী করে ওঠে।এটাই তার অভ্যাস। বিয়ের পর থেকে অর্নব এটাই দেখে আসছে। রবীন্দ্রনাথের গান ভেসে আসছে। কিন্তু ঠিক কোন দিক থেকে ? পারমিতা বুঝতে পারছে না। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে কিছুই বোঝা যায় না।অর্নব কখন পাশ থেকে উঠে গেছে পারমিতা বুঝতে পারেনি। অবশ্য প্রতি রোববার বেড টি টা অর্নব নিজে বানায়। আজও তাই বেড টি নিয়ে হাজির। এর পর বাজার যাবে। ফোনটা এগিয়ে দেয় পারমিতার দিকে। মন থেকে বিরক্তি ভাব চলে গেল পারমিতার।


এরকম দুয়েকটা কল আসে। তখন শুধুই শুনতে হয়। বলার কিছুই থাকে না। ফোন রেখে ধীরে ধীরে ব্যালকনির দিকে পা বাড়াল পারমিতা। চোখে জল আসছে। খুব কষ্ট করে সেই জল বাঁধ দিল পারমিতা। নিজেই অবাক হয়ে গেল। বিশ বছর !! বিশ বছর কম সময় না। এতগুলো বছর পরও কষ্ট হচ্ছে। ঠিক আপনজনের মত। তবে কি সুজয়কে সে এখন ও ভালোবাসে ? সুজয়ের সঙ্গে প্রথম বিয়ে হয় পারমিতার খবর কাগজে বিঞ্জাপন দিয়ে বিয়ে। বছর খানেকের মধ্যে ডির্ভোস হয়ে গেল। দুজনের সম্মতিতে ডির্ভোস। খুব সহজেই হয়ে গেল। সুজয়ের মা ফোন করেছিল। গতকাল মাঝরাতে সুজয় মারা গেছে। সেরিব্রালস্ট্রোক।


পিঠে অর্নবের হাত। অর্নব কখন ব্যালকনিতে এসেছে বুঝতে পারেনি পারমিতা। "কার ফোন তোমাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে "--- অর্নবের গলায় উদ্বেগ। প্রথম বিয়ের কথা সবই জানে অর্নব। কিন্তু সুজয়ের মৃত্যুর কথা বলল না পারমিতা। বলতে ইচ্ছে করল না। " রং নম্বর, কি ভাষায় যে কথা বলল সেটাই বুঝলাম না। বুঝতে চেষ্টা করলাম বেশ খানিকটা সময় ধরে "--- স্বাভাবিক সুরে কথাগুলো বলল পারমিতা।স্বাভাবিক সুরে কথাগুলো বলতে খুব কষ্ট হল তার।


🌹🌹


✍️


#ত্রিপল 


#মধুরিমা_চক্রবর্তী 


চন্দ্রনাথবাবু তাঁর পাকানো গোঁফে তা দিতে দিতে বাড়ির সামনে পায়চারি করছেন। মাথায় ছাতা। চোখে হাল্কা হলুদ কাঁচের চশমা। টকটকে রঙ, কোঁকড়া চুল আর ছ'ফুট উচ্চতায় আজও তাঁকে এই পঞ্চাশ বছর বয়সেও নায়ক মনে হয়। তিনি হেঁকে বললেন,"এদিকটায় একটু ফাঁক রয়ে গেল। জল ঢুকবে যে। ঠিক করে ঢাকো।" ঘূর্ণিঝড় আসবে শুনেই গোটা দোতলা বাড়িটা তিনি লোক লাগিয়ে ত্রিপল দিয়ে ঢেকেছিলেন। এই ক'দিন আগে বাড়ির বাইরেটা নতুন রঙ হয়েছে। তাই ঝড়ের খবর হতেই তিনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। কিন্তু হলে কী হবে! যা প্রচণ্ড ঝড় হল কাল, তাতে ত্রিপল আর ঠিকঠাক নেই। যেভাবে তছনছ হয়ে গেছে তাতে কিছু নতুন ত্রিপল আবার লাগাতে হচ্ছে অনেক জায়গায়। ভালো খরচের ব্যাপার। তা হোক। চন্দ্রনাথবাবুর এসব ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য নেই। এখন ক'দিন বৃষ্টির রেশ থাকবে। আবহাওয়া দপ্তর বলেছে। হঠাৎ ত্রিপলের একটা কাপড় নিচে পড়ে গেল। চন্দ্রনাথবাবুর পায়ের ঠিক সামনে। কিন্তু তিনি কিছু বোঝার আগেই দু'টো কালো কালো নোংরা মতো হাভাতে লোক ছোঁ মেরে ত্রিপলটা নিয়ে দৌড় দিল। চন্দ্রনাথবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন,"অ্যাই, অ্যাই, তোরা কারা? আমার ত্রিপল নিয়ে যাচ্ছিস কেন?" ওরা পেছন ফিরে কী বলল কে জানে। কিন্তু চন্দ্রনাথবাবুর যেন কানে এল,"যাদের মাথায় ছাদ নেই, এ ত্রিপল তাদের।" কে বলল কথাটা! আশেপাশে তো কেউ নেই! চন্দ্রনাথবাবুর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কাছেপিঠে একটা কলোনি আছে। ছোটো ছোটো খোলার ঘর। সেটা কালকের ঝড়ে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। পাড়ার ছেলেগুলো ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে। এমন একটা পাড়ায় থেকে তিনি গর্ব বোধ করলেন। এ-ক-শো টাকা চাঁদা দেওয়ার আত্মপ্রসাদ অনুভব করলেন। তিনি ভাবলেন, ওই সব আধা মানুষগুলো একটু ভিজলে কিচ্ছু হবে না। বড়ো জোর একটু জ্বর হবে, কাশি হবে। আবার সেরে যাবে। ওদের ওষুধ লাগে না। খাওয়া জুটছে, এই না কত! ভাবতে ভাবতে খেয়াল হল, সেই লোক দু'টো বেশ কিছু দূর চলে গেছে। তিনি আবার চেঁচালেন,"আয় এদিকে। ত্রিপলটা নিয়ে আয় বলছি। নাহলে লোক দিয়ে ধরে আনাবো। শাস্তিও পাবি।" তিনি দেখলেন তাঁর ধমকে কাজ হয়েছে। লোক দু'টো ত্রিপলটা মাথার ওপর ধরে এদিকে ফিরে আসছে। কিন্তু তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিনি একবার চোখ রগড়ালেন। একী! লোক যেন দু'টো নয়! চারটে! তারপর আটটা... ষোলোটা... বত্রিশটা...! ক্রমশ বাড়ছে। যত কাছে আসছে তত বাড়ছে সংখ্যাটা। চন্দ্রনাথবাবুর চশমার পাওয়ার গণ্ডগোল করছে নাকি! রঙিন চশমা খুলে ফেললেন চোখ থেকে। সাদা চোখেও একই জিনিস দেখলেন। বাড়তে বাড়তে এখন অগুনতি লোক। এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। আশ্চর্য ভাবে ওই একটা ত্রিপলের নিচে সবার মাথা ঢেকে গেছে। আসতে আসতে ওরা খানিকটা তফাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। চন্দ্রনাথবাবু হতবাক হয়ে দেখছেন। ভীত হয়ে দেখছেন। তাঁর মাথায় ধরা ছাতা হাত থেকে খসে পড়ে গেছে।


🌹🌹

Sunday, 18 October 2020

চতুর্থ পর্ব তৃতীয় পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#চতুর্থ_পর্ব


#তৃতীয়_পাতা


আজ তিনটি গল্প প্রকাশ হলো। 


✍️


#আলাপ 

            

#অরুণ_দে 


---আমি ফাউ ।

ফাউ কাকে বলে , আশা করি আপনারা সকলেই জানেন । তবুও আমি না বলে পারছিনা । যেমন এই ধরুন , মাখা সন্দেশ এক কেজি কিনলেন  দোকানদার হাতে করে লেচির আকারে আরও খানিকটা দিয়ে দিলেন ,-এটাই ফাউ ।

এক /দেড় ডজন কলা কিনলেন , কলাওয়ালা একটা/দুটো বেশী দিয়ে দিলেন । -এটাও ফাউ ।

 এখনকার বড় বড় কোম্পানিগুলোতে তো ফাউ'এর ছড়াছড়ি । 'বায় থ্রি গেট থ্রি ।'

এই যে আমার বড় বড় দাদারা লোক্যাল ট্রেনে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে কাজ করছে , ওদের লাইসেন্স আছে । আমার নেই । আমি কম বয়সী ।

ওরা কাজ করতে করতে মাঝে মধ্যে অনুমতি দেয় ।

'ফাউ' হিসেবে আমি ঢুকে পড়ি লোক্যাল কামরায় ।

          এবার বলুন তো , ছেলেরা বিয়ে করার সময়

টাকা পায় ,গয়না পায় ,কণে পায় । ফাউ পায় কোনটি ?

বলতে পারলেন না তো !

নিতে কনে'টি পায় ফাউ ।

ঠিক মেয়েদের বেলায় ঘর পায় , বর পায় । নিতে বরটি পায় ফাউ ।

এই রাস্তা-ঘাটে , মাঠে জোড়া-জোড়ায় লীলা দেখতে পান সেখানে অসর্তক হয়ে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেই , এসে হাজির তাদের ফাউ । 

না । আর নয় । এমন উদাহরণ টানলে এই মেচেদা থেকে খড়্গপুর পোঁছে যাব । পাপী পেটকা স‌ওয়াল থেকেই যাবে । 

#

আজ আপনাদের কাছে এমন একটা জিনিস নিয়ে এসেছি , যা পৃথিবীর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মধ্যে অন্যতম । আপনার দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগেই  । বলুন তো কি ?

পারলেন না ।

লেখাপড়া , চাকরি-বাকরী , হিসেব-নিকেষ , সম্পত্তি আদান-প্রদান করতে গেলে একে অবশ্যই দরকার ।

বলুন ?

  আবার পারলেন না ।

প্রেম-বিরহ , কবিতা , গল্প , উপন্যাসের সৃষ্টি কর্তারা একে অনুপস্থিত করে একটি শব্দ‌ও প্রকাশ করতে পারেন না। ক‌ই বলুন ?

এবার‌ও সবাই চুপ ।

আমার শেষ ক্লু ।

ফাঁসির রায় দানের পর , ইনি মৃত্যুবরন করেন ।

 যাক্ কেউই যখন পারলেন না । তখন শেষ করলাম আমার দাদাগিরি ।

তাহলে দেখুন । 

এই হল , আপনাদের করা প্রশ্নের উত্তর ।

তিনটে কিনলে , একটা ফাউ । মাত্র দশ টাকা । 

চলতে আরম্ভ করলে থামবে না ।  আপনার মনের ভাবনা'কে প্রকাশ করতে গিয়ে আপনি থমকে গেলে ,এও থমকে থাকবে আপনার দু'আঙ্গুলের  মাঝে । আর ফাউটা যদি কাজে না লাগে ,  টুক করে ফেলে দেবেন । 

যেমন , পৃথিবীর স্টেশনে আমাকে চুপ-চাপ ফেলে দেওয়া হয়েছিল  , কোন একদিন ।


🌹🌹


✍️


#ছায়ানট 


#বাসবদত্তা_কদম 


শেয়ালদা থেকে আটটা ছেচল্লিস’এর লোকাল টা রোজ ধরে রেজ্জাক। 

কোনোদিন কল্যাণী, কখনো মদনপুর, শিমুরালী এমন কি গেদের দিকেও চলে যায়। কাস্টমার এর সঙ্গে দর কষাকষি ও নানান কথা কইতে কইতে।

তিরিশ বছর ধরে যাতায়াতে , বেশ পরিচয় হয়ে গেছে যাত্রীদের সঙ্গে। এখন তারা পরিচিত কাস্টমার। গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া, মোজা বিক্রি করতে কোনো অসুবিধা হয় না। তারা ওর থেকেই নেয়। 


সে বাড়িতে নিয়ে যায় মুঠো মুঠো রোদ্দুর। 


নতুনরা ঠিক ভরসা পায় না।  আজকালকার ছেলে মেয়েদের ‘মল-ই’ ভরসা। কিনবে, বিশ টাকার মাল আশি টাকায়। ওদের স্ট্যাটাস ধরে রাখাটাই বড় কথা।

এই করে 'ও' দুটো মেয়ের বিয়ে দিয়েছে।

ছেলেটা কে দিয়েছে, এ বছর কলেজে।

বাড়িটায় টালিরচালা তুলেফেলে, এসবেস্‌টহর দিয়েছে গত বছরে।

মনে আশা, ছেলেটার হিল্লে হয়ে গেলে  ছেড়ে দেবে এ ব্যবসা। 

পরক্ষণেই ভাবে, সে কি পারবে? এত বছরের সম্পর্ক, ছেদ করতে!


ক'দিন ধরেই লক্ষ্য করছে, ওর বগিতে ওরই মতন জিনিসপত্র  নিয়ে মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ছে একটা মাঝবয়েসী  ছেলে। 

রাগ হয়।  

ইচ্ছে হয় সপাটে চড় মেরে নামিয়ে দেয়। 

মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, হকার্স ইউনিয়নে ছেলেটাকে নিয়ে বলবে।

একে দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়।

কদিন আগে একটু ধমকেছিল। 

ছেলেটা কিছু বলেনি। নিচু করে রেখেছিল মুখ। 

আজ সকালে মদনপুর যাবার সময় নৈহাটি  থেকে এক-ই বগিতে উঠলো ছেলেটা। 

রেজ্জাকের পায়ের রক্ত মাথায় উঠছে, বেশ বুঝতে পারছে।

একসময় মনে হল টুক করে ধাক্কা দিয়ে......

লক্ষ্য করে দেখে, বেশ দু চারটে বিক্রি করছে নতুন ছেলেটা।   


এবার সে কল্যাণীতে নামার তোড়জোড় করছে। 

কিন্তু এ কি! ট্রেন টা ছাড়তেই, লোকের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। 

এমন সময় রেজ্জাকের ডান হাত টা ওর ডান হাত কে ধরে টেনে নেয় ভিতরে। কামরায় হৈ চৈ। ব্যস্ততা সকলের। ছেলেটা ছলছলে চোখ নিয়ে অন্যদের দিকে তাকিয়ে কাঁপছে।

রেজ্জাক এইক'দিন তেমন করে তাকায়নি ওর দিকে।যাও বা তাকিয়েছে, তাতে শুধু ছিল ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য। আজ ভালো করে ওর দিকে তাকিয়ে, চমকে ওঠে! এই রে!


এ তো একেবারে আমাদের শিবুর মুখ!

শিবু ওর খুব কাছের বন্ধু ছিলো। একসঙ্গে কাজ করতো। দু'বছর আগে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে এক্সিডেন্টে চলে যায়। 

পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো, ও তো শিবু হকারের ছেলে। দুবছর আগে ট্রেন এক্সিডেন্টে যে মারা গিয়েছিল।

রেজ্জাকের কাছে সব পরিস্কার হয়ে যায়।

ভারী হয়ে ওঠে মন।

ছেলেটার এখন ছায়ার দরকার। 

রেজ্জাক তাকালো করুণ হয়ে।


সে বুঝল, সে ক্রমেই একটা গাছ হয়ে যাচ্ছে।


🌹🌹


✍️


#বিনাশ


#নন্দিতা_সিনহা


ভর সন্ধ্যায় দরজায় খুব জোরে জোরে ধাক্কা শুনে জানালায় ছুটে গেলেন দাস গিন্নি। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছে । সুমিত্রার অমন জোয়ান তাগড়া ছেলে দুটোর বিদেশ বিভূঁই এ  রেলের চাকায় বেঘোরে মরার খবরটা এমনই বুকে ধাক্কা দিয়েছিল। কে দেয় আবার অমন ধাক্কা?  


আমরা দিদি..


কী চাই বাবা?


চাঁদা ...


সত্যি তো! কত বাচ্চার পেটে ভাত নেই। লকডাউনে বিল্টু প্রতাপদের হকারি গেছে। মাস্ক বেচে আর কত পায় ! বাচ্চা গুলো উপোসে মরে। চাঁদা করে ওদের জন্যই এখনো রান্না দরকার।এসব ভেবে তিনি বলেন, তা কত করে নিচ্ছ ? 


দিদি এবারের দুগগা পুজোর খচ্চা বাড়ছে । গত বারের থেকে বেশি দেবেন। 


পুজো !!


দাস গিন্নি অবাক হলেন। আবছায়ায় ওদের ভাল করে দেখেন, ঢোকা কপাল, চোখা চোখ। ঠিকঠাক পা রাখতে পারছে না মাটিতে।আরো অবাক হন, দিদার বয়সীকে এরা দিদি বলে কেন?এ পাড়ায় না হোক তিরিশ বছর আছেন তারা.... তাকে দিদি? উদ্দেশ্য টা কী ?


এবার পুজোটা না করলেই তো হয়। চারিদিকে যা অবস্থা! 


কী বলেন, মাইরি,  হেসে বাঁচি না। পাব্লিক  বছরে চারটে দিন আনন্দ ফুত্তি, মা আসবে, ঢাক বাজবে না !


ঢাক বাজবে ,আবার?


চারপাশের এত মানুষের বুকের ভিতর যে বেদনার ঢাক বেজে চলেছে অহর্নিশ তাতে এদের কোনো হেলদোল নেই!  পুজোতে ঢাকের শব্দ চাই?


ঢাক শুনে দিদি থম মেরে গেলেন যে! মাইরি,আমাদের গোপাল যা দারুন বাজাতে পারে.. দেখবেন নাকি পরখ করে?


কে যেন তাকে ঠেলে সরিয়ে,সামনে এলো।


এবার আবার  গোদের ওপর বিষফোঁড়া সেনিটাইজার। কুমোর,  লাইট,শোলা প্যান্ডেল পোসাদ, খচ্চা কম? তাপর ভোগের খরচ


দাস গিন্নি ওদের মহাপ্রসাদের কথা স্মরণ করলেন। 


একজন হঠাৎ চোখ লাল করে বলল, এবারে কম দিলে কিন্তু বহুত লাফড়া হয়ে যাবে। গলায় শাসানি। দাস গিন্নিও  কেমন যেন  হঠাৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। 


বিল্টুর বউটা তখন বেরচ্ছিল। লকডাউনে রান্নার কাজ নিয়েছে। ছেলেগুলো আড়চোখে  তাকে দেখে কনুই এর ঠেস দিয়ে নিঃশব্দ বার্তা চালাচালি করল।


একজন শিস দিয়ে গান ধরল। দাস গিন্নির খুব নার্ভাস লাগল, বুঝতে পারলেন, তাঁর বুকের ভিতরটায় কারা যেন গরম শিশে ঢেলে দিল। নাকে যেন বাতাস আর    ঢুকছে না। তিনি জানালাটা আঁকড়ে ধরলেন। দেখলেন, দাস বাবু ছুটে আসছেন। আর কিছু মনে ছিল না। 


তারপরে কেটে গেছে বেশ কয়েক দিন। হঠাৎ বিকল হৃদযন্ত্র সচল হয়েছে। হাসপাতাল তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে। 


কিন্তু ছাড় পেলেন না দাস বাবু। 


আজ অষ্টমীর সকাল। মাইকে অঞ্জলির মন্ত্রের সাথে মিশে যাচ্ছে প্রেতায় নমহ, প্রেতায় নমহ, সর্ব মঙ্গলে মঙ্গল্যে...


শ্রাদ্ধে বসেছে সাদা থান


পুরোনো জামা গায়ে বিল্টুর বাচ্চাদের অসহায়  চোখগুলো মন্ডপে মন্ডপে দেবীর  চক্ষু দান করেছে। 


দাস বাবু দিনরাত এক করে হাসপাতালে ছুটোছুটি করেছেন, কোথায় খেয়েছেন কোথায় ঘুমিয়েছেন, কেউ জানে না। জামা কাপড়ের ছিরিছাদ ছিল না। কোভিড- সুরক্ষার লক্ষণ রেখা তাঁকে দমাতে পারে নি। তিনি তাঁর দেবীকে ফিরিয়ে এনেছেন ঘরে। 


শুধু কোভিড তাকে ছাড়ল না। কখন যেন অক্সিজেনের অভাবে তাঁর পৃথিবী চুপিচুপি হারিয়ে গেল।  


এই প্রথম আজ অঞ্জলির মন্ত্রকে দাস গিন্নির এত কদর্য লাগল।

🌹🌹

চতুর্থ পর্ব দ্বিতীয় পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#চতুর্থ_পর্ব


#দ্বিতীয়_পাতা


আজ এনেছি একটি অণুগল্প, একটি গল্প, ও একটি স্মৃতি কথা


🌹🌹


✍️


#পুরুষোত্তম


#রামকিশোর_ভট্টাচার্য


পুরুষোত্তমপুরের ৫০০ বছরের প্রাচীন জীর্ণ জয়লক্ষ্মীর মন্দির ৷ সবাই বলে 'মায়ের থান' খুবই জাগ্রত ৷ আজ দেখলাম মন্দির নতুন হয়ে উঠছে ৷ নিখুঁত প্রাচীন নক্সা কাটছে বুড়ো মনসুর আর ফটিক বাগদী , মশলা মাখছে যুবক আফজল ৷ 

৯০ বছরের পন্ডিত তারক ভট্টাচার্য হাতে লাঠি ঘুরে ঘুরে দেখছেন নতুন ভাবে সেজে ওঠা মন্দিরের কাজ ঠিক হচ্ছে কিনা ৷


🌹🌹


✍️


#বেষ্টন 


#মানস_সরকার


 এত রাতে আগে কোনওদিনই বাড়ি ফিরিনি। লাষ্ট ট্রেন থেকে নামতেই বেশ ভয় হল। শীতের রাত। যে-তিনজন এ-ওদিক থেকে নামল, তারা হঠাৎই যেন কোথায় গায়েব। প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে বাইরে আসতেই ভয়ের ছোঁয়া আরও ঘন। যানবাহনের কোনও চিহ্নই নেই। এত রাতে এতটা পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হবে ভেবে জানুয়ারির শীতেও কপালে চলে এল ঘেমো ভাব। হাতঘড়ি দেখলাম। একটা পাঁচ। মোবাইল দিন দুই হল খারাপ। সারাতে দিয়েছি। বাড়ির লোক অপেক্ষা করতে করতে নিশ্চই এতক্ষণে গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে। বাড়ির লোক মানে অবশ্য বাবা, মা। 

কী ভেবে ঘুমিয়ে পড়ল! আজকে ফিরব না ভেবে! আমার রোজগারেই চলে গোটা সংসার। শেষ কয়েক বছরে নিশ্চিন্তি ভাবটা যেন পরিবারের অনেকটাই বেড়ে গেছে।  ভেবে লাভ নেই। অগত্যা রাস্তায় পা বাড়ানো। শুনশান। গ্রীষ্মকাল হলে কি এতটা নিশুতি হত! এল ই ডি’র ঝাপসা আলো নিস্তব্ধতা মেখে যেন আর একটু মৃদু। বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ি, নানা আকারের বাড়ি আর মলের ছায়ারা মিলে মিশে অজানা পরিবেশকে উসকে দিচ্ছে। হাঁটা দ্রুত করার চেষ্টা করি। 

 এ সব থেকে বাঁচতে, সব কিছুকে পিছনে ফেলে দিচ্ছিলাম। এমন সময় নজরে এল। মানে প্রথমে কানে এল, তারপর এক ঝলক পিছনে তাকিয়ে যা বুঝলাম আর কী। ঢলা প্যান্ট, জামায় মাঝারি উচ্চতার একজন মানুষ বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে আমার পিছনেই আসছে। হতেই পারে। প্রথমটায় কিছু ভাবতেই চাইনি। কিন্তু দু’দুটো মোড় ঘোরার পরই একটা কথা ভেবে বুকটা ধক করে উঠল। এ লোকটা তো আসলে আমাকে অনুসরণ করছে....

(২)

 কথাটা ভাবতেই ভয়, উত্তেজনা অনেকগুণ বেড়ে গেল। কায়দা করে পিছন ফিরে তাকালাম।একটু সময় নিয়ে। সঙ্গে কিছু টাকা আর হাত ঘড়িটা আছে। সে রকম বুঝলে ছুটতে শুরু করব।  


আর একবার তাকাতে একটু অবাকই লাগল। এ হাঁটায় তো বাবার মিল খুঁজে পাচ্ছি। বাবাও অনেকটা এ রকমই পা’টা টেনে হাঁটে। দূর থেকেও বুঝতে পারছি, লোকটার চেবানো। আর আমার বাবা পান খায়। বেশ সময় নিয়ে চেবায়। মাথাটা টুপি আর মাফলার দিয়ে প্রায় ঢাকা হলেও অবিকল বাবাকেই মনে হচ্ছে। এক পলক থামি। কী আশ্চর্য! পেছনের বাবার মতো অবিকল লোকটাও দাঁড়িয়ে গেছে। আর ভাবতে পারি না। অন্য একটা রাস্তা ধরে খুব তাড়াতাড়ি আর একটা রাস্তায় চলে যাই। বাড়ির পথটা এতে ঘুর হয়ে গেল। কিন্তু লোকটাকে নিশ্চিত এড়ানো যাবে।  


এ রাস্তায় পড়তেই অন্যরকম ভয় গ্রাস করে। সার সার দোকানের চালা। তার পরেই একটা মস্ত বড় মোবাইল ফোনের টাওয়ার বসেছে। দূর থেকে দেখছি, আর কেবলি মনে হচ্ছে, চার পা’ ওলা একটা লোহার ঢ্যাঙা লোক দাঁড়িয়ে আছে। অনেক উঁচু থেকে তার দৃষ্টিটা যেন পড়ছে আমারই উপর।  


আর ঠিক তখনই দৃষ্টিটা চলে গেল আড়াআড়ি। নাঃ! আগের লোকটা নয়। এবার এক ভদ্রমহিলা। এক ঝলকেই অন্যরকম লেগেছে। এতটা দূর থেকেও চিনতে পেরেছি শাড়ির রংটা। অবিকল মায়ের এই রঙের একটা শাড়ি আছে। দ্বিতীয় বারের ট্যারচা দৃষ্টি দিই। এবার ভীষণ, ভীষণ অবাক লাগছে। এত রাতে এ তো অবিকল আমার মা। কী হচ্ছে এটা। মায়ের মতো বাঁধা চুল, ঐ উচ্চতা। ভাবতে পারছি না একদম। ভয় ঠেলে রেখে এবার অবাক হচ্ছি বেশি।  


প্রায় দৌড়তে দৌড়তেই পিছনে আসা সে ভদ্রমহিলাকে আরও পিছনে রেখে ঘুর পথে আর একটা রাস্তায় চলে আসি। বুঝতে পারছি। শর্টকার্টের পথ এখন লংকার্ট।  এ রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে আগের থেকে ভয় বেড়ে গেল শতগুণে। যে-দিক দিয়ে হাঁটছি তার উল্টো দিকটায় আছে লম্বা পাঁচিল। আর পাঁচিলের ওপারে আছে বহু প্রাচীন কবরখানা। কেন যে মরতে এ পথে এলাম!  


 হাঁটার গতি বাড়িয়েই দিয়েছিলাম। অনুভূতি বশেই পিছনে তাকিয়ে দেখি, আমাকে আবার কেউ অনুসরণ করতে শুরু করেছে। তাকালাম পিছনে। না, এবার আর কারোর সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছি না। অনেকটা লম্বা। সুঠাম চেহারা। জ্যাকেট পড়ে থাকলেও নিচে যে পাঞ্জাবি আছে, তা বুঝতে পারছি। নেমে আসা কুয়াশা ধাঁধা বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। তবে মাথায় টুপি থাকলেও চোখে চশমা আছে বোঝা যাচ্ছে। এ রকম মানুষ কি ক্ষতিকারক হতে পারে! রাতের বেলার কবরস্থানের পাশে কারোর অনুসরণ কতটা নিরাপদ! 

 আগের দু’বার ছুটে অন্য রাস্তা ধরেছিলাম। এবারেও কি তাই করব? সত্যিই কি এই লোকটা আমাকেই অনুসরণ করছে?  


দাঁড়িয়ে পড়ি। না। পেছনের ব্যক্তি দাঁড়ায় না। হেঁটে এগিয়ে আসতে থাকে আমার দিকে। আমাকে পেরনোর মুহূর্তে লক্ষ্য করি তার সাথে কারোর মিলকে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে এ চেহারাকেই অনেকবার দেখেছি। আমাকে অতিক্রম করে সে এগিয়ে যায়।  


খেয়াল হয়, আমি আমার বাড়ির কাছাকাছি। সে বাড়ির ঝুলবারান্দায় অপেক্ষা করছে এই মধ্যরাত্রিতে যারা, তারা আর কেউ নয়, নিশ্চিতভাবে আমার বাবা আর মা। স্বস্তির শ্বাস ফেলে, নির্ভয়ে এবার এগিয়ে যাই...... 


🌹🌹


✍️


#স্মৃতি_কথা 


#মীনা_রায় 


আমার সব থেকে ভালো লাগে স্মৃতি চারণ করতে।

জীবনটা নেহাত কম হলো না। স্মৃতি কথা জমা হলো অনেক। যা আমাকে সততই প্রীতি দিয়ে ভরিয়ে তোলে। অনেক কিছুই দেখলাম জীবন ভরে।

জন্মের সময় থেকে যে গ্রামের পরিবেশে বড় হয়েছি তা আমার ভালোবাসার ভালোলাগার গ্রাম। উজ্জ্বল হীরক দ্যুতির মতো অনুভূতিতে ভরিয়ে রেখেছে আমাকে জীবনের মাঝ বয়স পর্যন্ত। 


বর্তমানের শহর জীবনের বন্ধুতা সম্পর্কের টানাপোড়েন গুলো থেকে সর্বদা রক্ষা করে আমার শৈশব কৈশোর যৌবনেতে পাওয়া সেই সুখময় সুন্দর সুসম্পর্ক গুলোর আনন্দঘন আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ সহজ সরল মানুষ জনের ভালোবাসার স্মৃতিরূপ।


মনে মনে ভ্রমণ করি সেই বারোমাস তের পার্বণের গ্রাম বাংলাতে। আমি ক্লাস ফাইভে পড়েছি, সে ১৯৭৫ সালে। তখন আমার হাতে মেয়েদের ব্রতকথা বই পেয়ে আনন্দ আর ধরে না ! গল্প গুলো পড়তাম আর ভাবে ভক্তিতে পরিপূর্ণ হতাম।

বৈশাখ মাসে নববর্ষ বরণের দিনটিতে আমরা আমাদের গৃহ তথা এলাকার প্রসিদ্ধ দেবতা শ্রী শ্রী কালারুদ্র দেবের সঙ্গে ঢাকের বাদ্যি বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে গঙ্গা স্নান করতাম। বাটা হলুদ ও সর্ষের তেল ঠাকুর কে মাখিয়ে সেই প্রসাদি হলুদ সমস্ত ভক্ত সম্প্রদায় সানন্দে মাখতাম । আমাদের বয়সী মেয়েদের চলতো সারা মাসব্যাপী ভোরবেলা উঠে যে ব্রত পালন , সেটি ছিল পুণ্যিপুকুর। তুলসী মঞ্চের নিচে গর্ত করে সেখানে শুশুনি - কলমি শাক,ধান গাছ লাগিয়ে নানা মন্ত্রে পুজো।সঙ্গে বেল কাঁটা দিয়ে সেই পুণ্যি পুকুর পাড়ে দশ পুতুল এঁকে পুজো করতাম।


জ্যোষ্ঠ্যমাসে অরণ্য বা জামাই ষষ্ঠী পুজো তো গ্রামের সবাই একই বট নিম তমাল খেজুরের মিলিত ঝোপের নিচে পাথরে পুজো করতো। তবে ব্রাহ্মণ শূদ্রদের পাথর দেবতা এবং পুরোহিত ভিন্ন ছিল। 


গ্রামটি ভাগীরথীর তীরে তাই এই মাসে দশহরা গঙ্গা পূজো হতো বেশ সমারোহে।


গঙ্গার পশ্চিম তীর রাঢ় বঙ্গের বোলপুর, কীর্ণাহার,কেতুগ্রাম প্রভৃতি বহু গ্রামের মানুষ জন আমাদের নৈহাটির পাশের গ্রাম উদ্ধারণপুরে আসতেন ; খোল করতাল ঝাঁঝি বাজিয়ে কীর্তন দল নিয়ে গঙ্গাস্নানের পুণ্যসঞ্চয় উদ্দেশে। 


আষাঢ় মাসে রথযাত্রা।আমাদের বাড়ির একটা বড়ো রথ টানা হোত। আর ছোটরা নিজেরা সবাই রথ বানাতাম। পাঁচটি পিটুলি ফল আর আট টুকরো নারকেল কাঠি দিয়ে আমিও রথের চুড়া বানিয়ে খেলতাম। 


শ্রাবণ মাসে ঝুলনযাত্রা ছিল কাছাকাছি শহর কাটোয়ার বিখ্যাত উৎসব। মানুষের ঝুলন এবং কিছু ভক্তি মুলক নাটক বিদ্যুতের আলো মাইক্রোফোন সহযোগে মনোগ্রাহী করে তোলা হতো এবং আজও হয় । বিভিন্ন সংঘ গুলোর মধ্যে সুন্দর করবার প্রতিযোগিতাতে আনন্দ অন্য মাত্রা পেতো।

আমাদের ছিল ঘাস মাটির পুতুল ইট গুঁড়ো ইত্যাদি দিয়ে ঝুলন সাজিয়ে আনন্দ। 


ভাদ্র মাসে নৈহাটির পার্শ্বর্বর্তী নলিয়াপুর গ্রামের ভ্রমর পুকুরের পাড়ে বসতো ভাদু মেলা। লক্ষ্মীপুজো, ভাদ্রের সংক্রান্তির দিনে ওই অঞ্চলে মনসা পুজো , ভাদুগান ও ঝাঁপান গানের প্রচলন আছে।


আশ্বিন মাসের বড়ো উৎসব দুর্গা পুজো। আমাদের গ্রামে বারোয়ারি পুজো একটাই হতো ।আর তা হতো আমাদের বাড়ির সামনে। ব্রাহ্মণ ভট্টাচার্য বাড়ির ফড়িংদা।মহালয়ার পর থেকে গঙ্গার তীরে বসে বীজ মন্ত্র --অং নম,বঃ নম, চং নম মুখস্ত করতেন। ভট্টাচার্য জ্যাঠ্যাইমা মা দুর্গাকে আলতির সময় চামর দুলিয়ে বাতাস করতেন। নবমীর আরতির পর কাঁদতেন।


আমাদের বাড়িতে মহাসমারোহে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো হতো।


কার্তিক মাসে আমার ছিল সকালে যম পুকুর পুজো । সন্ধ্যায় ফুল সাজিয়ে প্রদীপ জ্বেলে সন্ধ্যা রতি। "আতা আতা আতা/ দুধ কলমির পাতা/সূর্য্যি গেল মায়ের কোলে দীপ্তি এলো ভেসে " ...ইত্যাদি মন্ত্রে ।কাটোয়ার কার্তিক লড়াই এক আঞ্চলিক বিশাল উৎসব।অনেকটা চন্দন নগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর মতোই বাজনা আলোক সজ্জা।


অগ্রহায়ণ আমার সাঁঝ পুজনী ব্রত আর গ্রাম বাংলার নবান্ন উৎসব ,ইতুপুজো বিখ্যাত। আমাদের কালারুদ্র ওরফে কালাচাঁদ ঠাকুরকে নবান্ন পুজো দিয়েই সবাই আশপাশের গ্রামের মানুষও নতুন অন্ন প্রসাদ মুখে তোলে আজও। 


পৌষ মাসে লক্ষ্মীপুজো পিঠেপুলি উদ্ধারণপুরে পৌষমেলা বেশ সপ্তাহ ব্যাপী মানুষ জনের আনন্দের সীমা থাকে না।ম্যাজিক, পুতুল নাচ ,যাত্রা , হরিনাম সংকীর্তনে ভরে থাকে আজও এলাকা।এখানেই কালিকা প্রসাদ অবধূত শ্মশানে বসবাস করে উদ্ধারনপুরের ঘাট হাসি কান্নার হাট লেখেন।তারাশঙ্করের উপন্যাসেও বহুবার অজয়ও ভাগীরথীর মিলন স্হল শাঁখাই তে -মণি ঘাটের উল্লেখ আছে।


নিকটেই কাটোয়া। গৌরাঙ্গ দেবের কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস নেওয়ার বৈষ্ণব তীর্থ ভূমি। নৈহাটির অনতি দূরে জ্ঞানদাসের জন্ম। আশেপাশে বৈষ্ণব পদকর্তা অনেকেই চন্ডীদাস, গোবিন্দদাস।মহাভারত রচয়িতা কাশীরাম দাস,কবি কঙ্কন মুকুন্দ রাম বহু গুণীজন জন্মেছেন।


মাঘ মাসে বাড়িতে সরস্বতী পুজো হতো বড় প্রতিমা। পরের দিন শীতল ষষ্ঠী। ঠান্ডা গোটা সিদ্ধ খাওয়ার চল।

ফাল্গুনে দোল ।রঙের উৎসব।শিবরাত্রি। 


চৈত্র মাসে লক্ষ্মী,নীলপুজো,কালারুদ্রদেবের গাজন মেলা, সে তো মাস ব্যাপী বিশাল বড় উৎসব।বোলান গান,শ্মশান নাচ ওই এলাকায় প্রসিদ্ধ। বিস্তারিত বলবার পরিসর আজ নেই। যার সমাপ্তি পয়লা বৈশাখে নববর্ষের শুরুতে গঙ্গা জলে ডুবে মাথায় কালাচাঁদ স্পর্শের স্নানে । বলেছি স্মৃতি কথার সূচনায়। 


🌹🌹

___________________

চতুর্থ পর্ব প্রথম পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


শুরু হলো #চতুর্থ_পর্ব 


#প্রথম_পাতা 


আজ দুই নারীর কলমে দেবীকে স্মরণ। প্রথম কলম মাননীয়া অধ্যাপিকার মননে উঠে আসা এক বোধ। 

দ্বিতীয় কলম এক মরমী সমাজ সচেতন নারীর। তিনি একটি এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত যা আক্ষরিক অর্থেই দশভূজা। তাঁর থেকে আমরা জেনে নেবো মানুষের মানবিক মুখ। 


🙏


#মৃত্যুরূপেন_সংস্থিতা'


 


#সুস্মিতা_সাহা।


 


'জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন'


 


খুব সহজেই এই কথা বলে দিতে পেরেছেন কবি -কিন্তু সে মৃত্যু যখন সামনে এসে দাঁড়ায় ! আমাদের কোন প্রস্তুতি না থাকা সত্বেও চলে যেতে হয় সেই হিমশীতল অন্ধকারে। আগে থেকে কোনো অভিজ্ঞতা থাকার কোন রকম সুযোগই নেই।তাই 'মৃত্যু রূপেন সংস্থিতা' - এই বিষয়টি শুনলেই কিরকম জীবন বিমুখ একটি ভাবনা মনে হয়। তবে কি মা দুর্গা মৃত্যু রূপেন সংস্থিতা!  কিন্তু তিনি যে তাঁর কমলকলি সম হস্তে সদা সর্বদা বরাভয় দান করেন। সে কি তাঁর


 


জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার আশীর্বাদ নয়? খুব দ্বিধাগ্রস্ত মনে থম মেরে বসে থাকি খানিক ক্ষণ।


 


হঠাৎ ঘোর কেটে যায়, চোখ বন্ধ করে মায়ের কাঞ্চন বর্ণা ঘামতেলে জ্বল জ্বলে মুখটি মনে করতে চেষ্টা করি - মিনিট খানেক বা তার বেশি অমনি কোথা থেকে হুড়মুড় করে ঝড়ের প্রবল হুংকার শোনা যায়। 


 


নাহ্ আটচালাটা আর এ বছর না সারালেই নয়, ছেলে মেয়ে নিয়ে ব্রাহ্মণ পরিবারের সোমত্ত বৌ দাঁড়াবে কোথায়? কালো দুর্যোগের রাত নেমে এসেছে - অপুষ্টির শিকার মেয়েটি মারা যায় ম্যালেরিয়ায়। আকাশও  বোধকরি কেঁদে ওঠে সর্বজয়ার কান্নার শব্দে।


 


সে মেয়েটির নাম দুর্গা - আমাদের প্রিয় সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের  'পথের পাঁচালী' র দুর্গা। শুধু দুর্গা নয়, মারা যায় তাঁর 'মৌরীফুলে'র সরলা অসহায় গ্রামের বধূটি ,মারা যায় ক্ষেন্তি - সেই লোভী কিশোরী মেয়েটা। মুশকিলটা হোলো কি জানেন - মারা যাচ্ছে সন্তান - ক ' দিন বেশ খানিকটা কান্নার পরিবেশ বাড়িতে, তারপর সব খুব স্বাভাবিক। পিতা মাছ ধরতে বসে পড়ে, মা ঐ গরীবের সংসারে রান্নাবান্না করে, খুব যেন ক্যাজুয়াল একটা বাতাবরণ তৈরি করলেন লেখক বিভূতিভূষণ। দেখিয়ে দিলেন জীবনের বাস্তব চিত্র - বিশেষ করে মেয়েদের মৃত্যু বাংলাদেশের কোন আশ্চর্য ঘটনা নয়। ও তো আকছার হচ্ছে আবার জন্মাচ্ছে আবার মরছে।মেয়ে কি কম পড়িয়াছে নাকি এ পোড়া দেশে।


 


ঠিকই মেয়েদের মৃত্যু আবার একটা ঘটনা।তবে লেখক বিভূতিভূষণ ক্ষেন্তির হাতে লাগানো পুইঁ  চারাটিকে একেবারে শাঁসে জলে বড়ো করে দিয়েছেন গল্পের শেষে।মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী তাও বাড়ুক না কেন ঐ রুগ্ন তুচ্ছ গাছটা।


 


 


বড়ো বেদনার মতো বেজেছিল বড়ো কন্যার অকাল মৃত্যু- চেষ্টা করেছিলেন জামাতাকে সন্তুষ্ট করতে - পারেন নি। আটকানো যায় নি আদরের মাধুরীলতার একরাশ কষ্ট বুকে নিয়ে চলে যাওয়া। শুধু মৃত্যুপথযাত্রী কন্যার শিয়রে বসে উপনিষদের অপূর্ব স্তোত্র পাঠ করতে ভোলেন নি স্থিতধী এক সাধক-তিনি রবীন্দ্রনাথ। সেই সব দুঃখ জল হয়ে ঝরে পড়েছে কি 'দেনাপাওনা' গল্পের নিরুপমার মৃত্যু আঁকতে আঁকতে। অসম্ভব শান্ত স্বভাবের মানুষ রবীন্দ্রনাথ এই গল্পের শেষে শেষ কথাটি বলেন বিদ্রুপের হাসি মাখিয়ে - ''বাড়ির বড়ো বউ মরিয়াছে,...এমন চন্দন কাষ্ঠের চিতা এ মুলুকে কেহ কখনো দেখে নাই।'' কি নিদারুণ মৃত্যু - কি শান্ত ভাবে সাদামাটা কয়েকটি কথায় এঁকে দিলেন রবীন্দ্রনাথ।নারী শক্তি রূপে যদি মা দুর্গাকে বুঝি তাহলে নিরুপমা- র মৃত্যু শয্যার প্রান্তে তিনিও তো ছিলেন - তখনো এমনি বরাভয় দান করেছিলেন তিনি! কি জানি!


 


 


অথবা সেই বয়ঃসন্ধির দামাল ছেলেটি শৈশবের গ্রাম ছেড়ে - মায়ের কোল ছেড়ে শহরে চলে যেতে বাধ্য হয়। তারপর একদিন তুমুল ঝড় - আকাশ যেন কাঁদছে আকুল হয়ে - ডুব জলে ভেসে ভেসে ফটিক এক বাও / দো বাও খুঁজে বেড়ায়। অবশেষে জননীর স্নেহের পরশ পেয়ে রওনা দেয় নিরুদ্দেশের পানে। ছুটি শেষে আরেক ছুটি কাটাতে বিশ্বপ্রকৃতি তাকে কোলে তুলে নেয়। বিশ্ব প্রকৃতি নিজেই তো অভয়া - জননী।


 


ওপার বাংলার এক মা ও তার অসুস্থ সন্তানের চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করি এইবার। রুগ্ন ছেলের শিয়রে মা একা রাত জাগছে।ভনভন করা বুনো মশা - এঁদো ডোবা - পচা পুকুরের সঙ্গে রাত জাগছে এক অসহায় মা। কালরাত্রি কাটিয়ে ছেলেটি কি জীবনের মুখ দেখতে পারবে? ওষুধের বদলে ঘরের চালে এসে হাজির মরণের দূত। মা তবুও আকুল প্রার্থনায় মাথা কুটে মরে আল্লার দরগায় - 


 


''নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে দরগায় মানে দান/ 


 


ছেলেরে তাহার ভাল কোরে দাও, কাঁদে জননীর প্রাণ।'' এক অভয়া জননী ভিক্ষা মাগে আরেক অভয়া জননী'র চরণে। 


 


খুব প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 


 


'কালো বস্তির পাঁচালি' কবিতাটি।


 


''ক্ষুধার আগুন দাউ দাউ দাউ


 


কান্না ভাজা ঘরে;


 


মায়ের কোলে দুধের শিশু 


 


দুধ ছাড়া আজ মরে।' 


 


বানভাসি বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে ঘর উঠান সব কিছু- 


 


''বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ..


 


আমি কি তোর মা? 


 


চোখের জলে ঘর ভেসে যায় 


 


তাপ তো কমে না।''


 


 


বিশের বিষ এই বছরে - চিনি না জানি না ওদের কাউকে - শুধু দেখেছি একটু শান্তি একটু আশ্রয়ের খোঁজে মরিয়া হয়ে পাড়ি দিয়েছিলো রেল লাইনের ধাতব ধারালো দাঁতের সারি ধরে। তারপর, না তারপর আর কিছু নেই।শুধু পড়ে আছে রক্তের টাটকা দাগ - হতাশার মুখ আর কিছু তাজা খবর। নিউজ পেপারে টিভি চ্যানেলের ফেসবুকে তাদের জন্য হাহুতাশ এবং চটজলদি চায়ের পেয়ালায় তুফান তোলা।কার দোষ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।


 


 


'তারপর কি আর পড়ে থাকে ?


 


পড়ে থাকে মৃত্যু মহিমাময়ী মৃত্যু ! 


 


আর এক মুঠো শিউলি,


 


এক থালা বাড়া ভাতে ছাই! '


 


 


কলকাতা শহরের মানুষ জন ভারি চমৎকার-  বন্ধু বৎসল মানুষ। একে অন্যের বিপদে সব ফেলে দৌড়ে যায়। একে অন্যের হাঁড়ির খবর রাখে। সবাই সবার সুসময়ে  পাশে থাকে - থাকে দুঃসময়ে আরো বেশি করে। তবু তো কলকাতা শহর একজন মানুষের মৃত্যু দেখলো - দেখে পাশ কাটিয়ে চলে গেল পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো।এখনো চোখের সামনে ভাসে সেই অচেনা লোকটির দুই পা ছড়ানো চেহারাটা। ভুলে গেছি সব একটি দিনের মধ্যেই। এও এক মৃত্যু - মানবতার মৃত্যু। সহানুভূতির হাত সরে যাওয়া তো আরেক ধরণের মৃত্যু। 


 


আমার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছে শুনলাম যে মৃত করোনা পজিটিভ চিহ্নিত রোগীদের তো হসপিটাল থেকেই সৎকারের ব্যাবস্থা করা হয়েছে কিন্তু সুস্থ মানুষ গুলিকেও তার আত্মীয় স্বজন বাড়িতে ফেরত নিয়ে যেতে পারছে না।অসহায় তো তারাও - এই ভয়াবহ মারের অথবা মারীর আক্রমণ থেকে কে রক্ষা করবে? কাকে কাকে রক্ষা করবে আর কাকে কাকে মারবে? 


 


 


রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে পরিবেশ বলতে শুধু আকাশ বাতাস নদী জলের দূষণ নয়, মানুষের অন্তরের ঐশ্বর্য দূষণ এক বিরাট অবক্ষয় পৃথিবীর বুকে। আজ ২০২০তে দাঁড়িয়ে এই বিপর্যয় একেবারে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মানুষ জনকে। 


 


'প্রিয় ফুল  খেলবার দিন নয় অদ্য 


 


ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা। '


 


 


পিছিয়ে যাই বরং ১৭৬০-এর মধ্য যুগের শেষ পর্বের কবির কাছে - 


 


'ভুজঙ্গপ্রয়াতে কহে সতী দে 


 


সতী দে সতী দে সতী দে সতী দে।'


 


রাগে প্রলয় নৃত্য শুরু করলেন রুদ্র, প্রিয় পত্নী সতীর বিরহে, রসাতল যায় যায়। বাঁচাও কে কোথায় আছো। দেবতা - মানব- জীবজগতের এই আকুল ক্রন্দনে এগিয়ে এলেন পরিত্রাতা  বিষ্ণু - সুদর্শন চক্রের আঘাতে একান্ন পীঠে ভাগ করে ছড়িয়ে দিলেন সতী মায়ের দেহ।শান্ত হোলো ত্রিভুবন - ধ্যানে মগ্ন হলেন রুদ্র। জন্ম নিলেন সতী উমা রূপে  হিমালয় ও মেনকার ঘরে। মৃত্যু থেকে শেষ নয়, শুরু হোলো পুরাণের আরেক অধ্যায়ের। ফিনিক্স পাখির মতোই-ধ্বংসের থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ওড়ার স্বপ্ন দেখে সে।কারণ সে শিখেছে অভয় মন্ত্র - জীবন তাকে শিখিয়েছে এই মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র।


 


 


অভয়া -অচলা -অপূর্বা যে নামেই ডাকি না কেন তিনি যে মা। প্রকৃতি মা - ধরিত্রী মা। পাপে ধরাতল পূর্ণ হলে তিনি ধরেন সংহার মূর্তি, হয়ে ওঠেন কালিকে পরমেশ্বরী। যাঁর হাতে খড়্গ ও নরমুণ্ড।রক্তে লাল পা ফেলে ফেলে নৃত্য করতে করতে এগিয়ে চলেন পথের সকল অনাচার দু' পায়ে মাড়িয়ে।


 


ঘোর অন্ধকার তমসা রজনীতে তাঁর পুজো হয় - 


 


জাগতিক মোহমায়া, পার্থিব লোভ লালসা বিনাশ করে তাঁকে যে আবার নতুন সৃষ্টির আয়োজন করতে হবে। বিনাশ হবে অন্যায়ের - বিনাশ হবে বৈষম্যের - বিনাশ হবে আগ্রাসী লোভের।তারপর মা কালী করালবদনী নিঃশ্বাস নেবেন - এবং আবার সৃষ্টি করবেন 'অন্নপূর্ণা' রূপে জগত সংসার। ভরিয়ে তুলবেন ফুলে ফলে।


 


প্রকৃতি ও পরিবেশও তো মাদার আর্থ, তাঁর বুকের ভেতর থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে মানুষের লোভের হাত বার করে আনছে শস্য-খনিজ সম্পদ - যা প্রকৃতি মায়ের বুকের রক্ত দুধ।এই দুধে মানবের পুষ্টি ও উন্নয়ন কিন্তু বেশি পেলে যা হয়! তাই তো রবি ঠাকুর বলেছেন - 'প্রকৃতিকে অতিক্রম কিছু দূর পর্যন্ত সয় তারপর আসে বিনাশের পালা।'


 


 


বেশ তাই মানলাম।মা অভয়া এবারে আসছেন মৃত্যু রূপেন সংস্থিতা হয়ে - আসছেন লোভ লালসা কামনা কণ্টকিত পথ পেরিয়ে - আসছেন নারীমেধ যজ্ঞের রক্ত স্পর্শ করে - আসছেন মুখে কষ্টের ছাপ বহন করে, আসছেন তবুও তিনি আসছেন। নাহলে এই অকৃতজ্ঞ মানব জাতির পুনরায় উত্থান হবে কি করে?


 


এই লকডাউনে করোনা কালেও যে ক্ষুদে মানুষ গুলি মা অথবা মেয়ে অথবা বৌমা অথবা বোন অথবা শুধু সহকারিনী হয়ে খেটে যাচ্ছে। কখনো অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে, কখনো শিল্প চর্চা কখনো ব্যাবসা কখনো হাতিবাগানের মোড়ে পাউরুটি বিক্রি করছে বা আরো আরো অনেক কিছু। এই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে পত্রিকা প্রকাশ করছে - চুটিয়ে সংসার করছে।বাড়ির সকলের মন ও শরীর এবং পরিবেশ সুস্থ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সেই তারাও যে একেকজন এক একটি অভয়া। অতকিছু বোঝে না বলে যাদের ক্যাবলা কান্ত বলা হয় তারা দিব্যি মোবাইলে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এই মেয়ে গুলি নিঃশেষ হয়ে যাবে তবু আপনাদের জন্য প্রাণ দেবে,শুনছেন এই যে সমাজের কর্তারা? এরা একা বাঁচবে না - সবাইকে নিয়ে আগামী পৃথিবীর বুকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। এঁদের জন্য মা অভয়া হয়ে উঠবেন 'জীবন রূপেন সংস্থিতা'।


 


এইটুকুই মা দুর্গা অথবা মা কালী অথবা মা অভয়া'র চরণে আমার নিবেদন।


✍️❣️❣️

 


#সত্যভারতী_এক_দেদীপ্যমান_শিখা


#রানু_ভট্টাচার্য


 


      কলকাতা ১৯২৭ ।  সাইমন কমিশন ভারতের সংবিধান পুনর্গঠন করতে এল। অথচ কমিশনের সাতজন সদস্যই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সভ্য। একজন ভারতীয়ও নেই তাতে। শুরু হ'ল প্রতিবাদ,  প্রতিরোধ,  আন্দোলন।  সেই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হলেন উনিশ বছরের তরুণ ছাত্র  শচীন্দ্রনাথ মিত্র। ক্রমশ শচীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন উল্লেখযোগ্য এক স্বাধীনতাসংগ্রামী এবং রাজনৈতিক নেতা।


 


        দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। হয়নি দেশভাগও। আইনজীবীর পেশা আর রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তের পথ থেকে সরে এলেন শচীন্দ্রনাথ। অন্তরে সেবার প্রদীপ জ্বালিয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাহ্য করে আরও কয়েকজন যুবককে সাথী করে দীক্ষা নিলেন মানব সেবাব্রতে। কাজ শুরু করলেন গোয়াবাগান বস্তিতে। গড়ে উঠল নৈশ বিদ্যালয়। শুরু হ'ল আজকের সত্যভারতীর পথ চলা। ১৯৪৫ সালের ২৬শে জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করলেন 'সত্যভারতী'। 'সত্যভারতী' নামটাও তাঁরই দেওয়া। সেদিনকার সত্যভারতীর সেই অঙ্কুরটি আজ ডালপালা মেলে বিরাট এক মহীরুহ। 


 


       ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট।  ভারত স্বাধীন হ'ল। ভাগ হ'ল বাংলা ও পাঞ্জাব। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটে মাটি ছেড়ে এপার বাংলায়। যে যুবকের দল গোয়াবাগানের বস্তিবাসীদের উন্নয়নে নিজেদের নিযুক্ত রেখেছিলেন,  তাঁরা এবার এগিয়ে এলেন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের চেষ্টায়।  ৪৪/১ গ্রে  স্ট্রীটে স্থাপিত হ'ল  সত্যভারতীর অফিস।  কর্মকাণ্ড শুরু হ'ল শিয়ালদহ,  বৌবাজার, বড়বাজার অঞ্চলে।


 


         কিন্তু একই সময়ে শুরু হয়ে গেল সাম্প্রদায়িক হানাহানি। ১৯৪৭ এর তেসরা সেপ্টেম্বর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক শান্তি মিছিল বেরোলো। পুরোভাগে শচীন্দ্রনাথ। কিছুদূর যাবার পর নাখোদা মসজিদের সামনে বিপথগামী এক যুবকের ছুরিকাঘাতে শহীদ হলেন শচীন্দ্রনাথ। মাত্র আঠারো দিন উপভোগ করেছিলেন কষ্টলব্ধ স্বাধীনতার স্বাদ।  আটত্রিশ বছর বয়সে শেষ হয়ে গেল শচীন্দ্রনাথের মানবসেবার স্বপ্ন।


 


         সত্যভারতী কিন্তু থেমে গেলনা। এগিয়ে এলেন পুষ্পরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়।  শচীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতির বেদনা ভুলে সত্যভারতীর কর্মযজ্ঞের ঋত্বিক পুষ্পরঞ্জনের সাথী হলেন আত্মত্যাগী আরও কিছু সমাজসেবী।  বয়স হার মেনেছিল পুষ্পরঞ্জনের কাছে।  ৯৬ বছর বয়সেও তিনি ছিলেন কর্মক্ষম যুবক।  স্বাধীনতাসংগ্রামী তাম্রপত্রপ্রাপকদের একজন। গান্ধিজীর লবণ সত্যাগ্রহের সঙ্গী। ভারতসরকারের কাছ থেকে বরিষ্ঠ সমাজসেবী পুরষ্কারও পেয়েছিলেন।


 


       সত্যভারতীর কেন্দ্রীয় কার্যালয় গ্রে ষ্ট্রীট থেকে স্থানান্তরিত হ'ল কোন্নগর নবগ্রাম কেন্দ্রে। পুষ্পরঞ্জন সহযোগী হিসেবে পেলেন নিবেদিতপ্রাণ  প্রমথরঞ্জন সরকারকে। শুরু হ'ল সত্যভারতীর তহবিল গঠনের কাজ।  তহবিল গড়ে না উঠলে সেবাকাজ এগোবে কি করে? খাদি গ্রামোদ্যোগ থেকে ঘি কিনে নবগ্রামে বিক্রি শুরু করলেন পুষ্পরঞ্জন। লভ্যাংশ জমা হতে লাগলো সত্যভারতীর তহবিলে। জমি কেনা হ'ল সত্যভারতীর। তৈরী হ'ল তাঁতশালা। কাপড় গামছা তৈরী করে বিক্রী করে তার লভ্যাংশও রাখা হ'ল সেই তহবিলে। এছাড়া হ'ল দস্তানা তৈরীর কেন্দ্র। গরীব দুঃস্থ মহিলাদের কর্মসংস্থান করে দস্তানা তৈরী করিয়ে সত্যভারতীর তহবিল বাড়ানো হ'ল। 


 


        ততদিনে পূর্ববঙ্গের লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল  মানুষ এপার বাংলায়। বাস্তুহারা এই মানুষরা ওপার বাংলা থেকে আর কিছু আনতে না পারলেও নিজেদের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে আসতে ভোলেননি। নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি  -   যাঁরা উপবাস করতে হলেও মর্যাদাবোধের কারণে ভিক্ষা করবেন না, এমন পরিবারকে সকলের অলক্ষ্যে সত্যভারতীর তরফে সাহায্য দেওয়া হ'তো। গরীব বাচ্চাদের দেওয়া হ'তো গুঁড়ো দুধের প্যাকেট আর হোমিওপ্যাথিক ওষুধ।  সপ্তাহান্তে সত্যভারতীর কর্মীরা বেরোতেন মুষ্টিভিক্ষার ঝোলা নিয়ে। গ্রীষ্মে, বর্ষায়, শীতে   -   অক্লান্ত  পরিশ্রম করে কর্মীরা সেই মুষ্টিভিক্ষালব্ধ চাল বিলি করতেন  সর্বহারা পরিবারগুলিকে।


        বারাসাতের নবপল্লীতে, শ্রীরামপুরের রাজ্যধরপুরে সত্যভারতীর আরও দুটি শাখা হ'ল।  উদ্বাস্তু পরিবারগুলির শিশুদের শিক্ষার জন্য এই তিন কেন্দ্রেই প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হ'ল।  ক্রমশঃ উচ্চ বিদ্যালয়ও। উদ্বাস্ত পরিবারের কন্যার বিবাহ, গৃহনির্মান ইত্যাদি কারণে ঋণের প্রয়োজনে বারাসাতে হ'ল নবপল্লী কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক, পল্লবিত হয়ে যার মূলধন এখন আটশো টাকা থেকে বেড়ে একশো সাত কোটি টাকা।


 


        স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ভারতে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা বিতরণ না হলে কিছু হবার জো নেই। সত্যভারতী মান্যতা দিল মহানপুরুষের সেই বানীটিকে।


 


       শিশু আর মহিলাদের জন্য এখন আছে ক্রেশ, চাইল্ড স্পনসরশিপ প্রোগ্রাম, চিল্ড্রেন কটেজ, স্ব-আধার আবাসন, হোষ্টেল, কর্মরতা মহিলা আবাসন, বৃদ্ধাবাস, চাইল্ডলাইন আর বিশেষ দত্তক প্রদান সংস্থা প্রকল্প। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার,বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও শুভানুধ্যায়ী অনেকে। আশার কথা, বহু স্বার্থত্যাগী তরুণ ও যুবকও সত্যভারতীর কর্মকাণ্ডে উৎসাহী হয়ে আজ এর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।


 


        সেই পঁচাত্তর বছর আগে শচীন্দ্রনাথ মিত্র সেবাব্রতের যে প্রদীপটি জ্বালিয়ে ছিলেন, পুষ্পরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের হাত ঘুরে সেই প্রদীপটি তাঁর সহযোগীদের হাতে আজও সমানভাবে দেদীপ্যমান।


✍️🌹🌹

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...