Thursday, 24 September 2020

শারদীয়া কিন্নর দল দ্বিতীয় পর্ব ষষ্ঠ পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#দ্বিতীয়_পর্ব


#ষষ্ঠ_পাতা


আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ। আজ লিখেছেন তৃষ্ণা বসাক। সাহিত্য নিয়ে সিরিয়াস কাজ তাঁর। পড়ে ঋদ্ধ হবো আমরা। তাঁকে কিন্নর দলের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। 

🙏


✍️✍️


#সন্ত্রাস_ও_সাহিত্য


#ভারতীয়_ভাষায়_নারীর_কলমে_সন্ত্রাস


#তৃষ্ণা_বসাক


‘স্ত্রীর পত্র’-র মৃণাল সাতাশ নম্বর মাখন বড়ালের গলিতে আর ফিরবে না কোনদিন। সংসারে মেয়েমানুষের জায়গাটা যে কোথায় তা তার বিন্দুকে দেখে বোঝা হয়ে গেছে। বড়জার বোন বিন্দু,  যে সবার কাছেই ছিল বোঝা। বিন্দু সেটা জেনে সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকত, চাইত তার উপস্থিতিটা একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে।


 ‘বিন্দু বড়ো ভয়ে ভয়ে আমার কাছে এল। যেন আমার গায়ে তার ছোঁয়াচ লাগলে আমি সইতে পারব না। বিশ্বসংসারে তার যেন জন্মাবার কোনো শর্ত ছিল না; তাই সে কেবলই পাশ কাটিয়ে, চোখ এড়িয়ে চলত। তার বাপের বাড়িতে তার খুড়ততো ভাইরা তাকে এমন একটি কোণও ছেড়ে দিতে চায় নি যে কোণে একটা অনাবশ্যক জিনিস পড়ে থাকতে পারে। অনাবশ্যক আবর্জনা ঘরের আশে-পাশে অনায়াসে স্থান পায়, কেননা মানুষ তাকে ভুলে যায়, কিন্তু অনাবশ্যক মেয়েমানুষ যে একে অনাবশ্যক আবার তার উপরে তাকে ভোলাও শক্ত, সেইজন্যে আঁস্তাকুড়েও তার স্থান নেই। অথচ বিন্দুর খুড়তুতো ভাইরা যে জগতে পরমাবশ্যক পদার্থ তা বলবার জো নেই। কিন্তু, তারা বেশ আছে।’


তবু মৃণালের প্রশ্রয়ে বিন্দু ভালবাসার স্বাদ পেল, বুঝল মানুষের মতো বাঁচা কাকে বলে। কিন্তু সেটা সহ্য হল না কারো, তাই জোর করে পাগল স্বামীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হল, সেখান থেকে পালাতে চাইলেও পালাতে পারে না সে, তার মুখের ওপর বন্ধ করে দেওয়া হয় সব দরজা। এর পরিণতি তার আত্মহত্যা।

এই ঘটনা যখনকার, তখন স্বদেশী আন্দোলন চলছে, স্ত্রী শিক্ষা নিয়ে জোর হইচই চারদিকে। সেইসময় বিন্দু মারা যাচ্ছে এইভাবে। তার জীবন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দ্যায় সন্ত্রাস কাকে বলে। হ্যাঁ, সন্ত্রাস।সন্ত্রাস যেমন একটা ম্যাক্রো ইস্যু, তেমনি এটা একটা মাইক্রো ইস্যুও। আমরা বড় বড় সন্ত্রাস নিয়ে  চিৎকার করি, মিছিল করি, কিন্তু গৃহহিংসার আড়ালের সন্ত্রাসবাদকে চিনতে পারি না, আমাদের ঘরের মেঝের নিচে যে ঘাতক ল্যান্ডমাইন তাকে বুঝতে পারি না। সারা পৃথিবী জুড়ে তো বটেই, এই উপমহাদেশের মেয়েদের জীবন তো জন্মের আগে থেকেই সন্ত্রাসের শিকার। 

মায়ের গর্ভে থাকা কন্যাভ্রূণ জেনে যায়  সেই সন্ত্রাসের মানে। 

‘আমি ভ্রূণ না ভ্রূণা/ জন্ম দিও না মা/ যত গর্ভবতী ভাঙো শোক/ নিশ্চিন্ত হোক সর্বলোক/ হলুদ বসন্ত পাখি ডাকুক নির্ভীক স্বরে, হোক/ গেরস্তের ঘরে ঘরে/ খোকা হোক! খোকা হোক!/ শুধু খোকা হোক!’

(কবিতা সিংহ) 


শুধু কবিতা সিংহ নয়, সারা ভারতবর্ষ জুড়েই মেয়েদের কবিতায় এই সন্ত্রাসের ছবি। কখনো বালিকাবেলায় লিংগবৈষম্য, কখনো রাষ্ট্রের নিপীড়ন, কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির আতঙ্ক, কখন গার্হস্থ্য হিংসায় আকীর্ণ প্রতিটি মুহূর্ত। এই সময়ের ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার নারী কবির কবিতায় উঠে আসে সেইসব খণ্ড ছবি।


‘কোথাও জায়গা জোটে না

উৎস থেকে উচ্ছিন্ন

চুল, নারী আর নখের-

সংস্কৃত শ্লোক থেকে শোনাতেন পণ্ডিতমশাই-

আর নিজেদের জায়গায় বসে,

আমরা, মেয়েরা ভয়ে হিম হয়ে যেতাম।


জায়গা? জায়গা আসলে কী?

প্রথম থেকেই কীভাবে যেন জেনে গেছিলাম আমরা,

টেক্সট বইয়ের প্রত্যেকটা অক্ষর গেঁথে গেছিল মনে-

‘রাম, পাঠশালা যা।

রাধা রান্না কর।

রাম আয় বাতাসা খা।

রাধা ঝাঁট দে।

ভাই এবার শোবে,

যা, গিয়ে বিছানা কর।

আহা নতুন ঘর!

রাম দ্যাখ তোর ঘর।

আর আমার ঘর?

আরে পাগলি,

মেয়েরা হচ্ছে হাওয়া, রোদ আর মাটির মতো, 

তাদের নিজস্ব কোন ঘর হয় না’

যাদের কোন ঘর নেই, 

কোথায় তাদের অস্তিত্ব?

কেমন সেই জায়গা

যেখান থেকে নির্বাসিত হলে

মেয়েরা হয়ে যায়

কাটা নখ,

আর কাঁচি দিয়ে কচাৎ করে কাটা চুলের মতো

ঝেঁটিয়ে বিদায় করা জঞ্জাল?


ঘর পড়ে থাকে, পথ পড়ে থাকে, মানুষ পড়ে থাকে পেছনে

কিছু প্রশ্ন নাছোড়, তারাও পড়ে থাকে।

পরম্পরাকে পেছনে ফেলে রেখে,

যেন মনে হয়,

মহান কোন ধ্রুপদী রচনা থেকে

খামচে তুলে নেওয়া পাস কোর্স বি.এ.-র প্রশ্নের মতো

আমিও অপ্রাসঙ্গিক।


কিন্তু আমি চাই না,

কেউ বসে বসে আমাকে সবিস্তার ব্যাখ্যা করুক,

করুক আমায় কাটাছেঁড়া,

অবশেষে, বহু কষ্টে-

সমস্ত প্রসঙ্গের অতীত,

এইখানে এসে পৌঁছেছি,


আমাকে বরং গুঞ্জরিত হতে দাও

তুকারামের একটি অভঙ্গের মতো,

অসমাপ্ত একটি অভঙ্গের মতো।’

(নির্বাস, হিন্দি কবি অনামিকা, অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক)


‘...

এর মধ্যে ঋতুপর্ণা আর আসেনি,

ফোনে পাওয়া যায় না

চিঠির জবাব নেই-

গেলবার যখন সে বাপেরবাড়ি এসেছিল, 

মেয়ে হবার সময়,

বলেছিল, মেয়েকে পাখি করবে নিজের মতো,

মুক্ত উড়ন্ত বিহঙ্গ।


মেয়েকে পাখি করবে কি,

হয়তো তার ডানা দুটিই

ছিঁড়ে গেছে অকাল ঝড়ে,

কিংবা তার ডানাজোড়া কেটে দেওয়া হয়েছে-

পরম্পরার হাতল লাগানো ছুরিতে

যা সে বলি বলি করেও

কাউকে বলতে পারেনি ভয়ে।’

(নারী, ওড়িয়া কবি গায়ত্রীবালা পণ্ডা, অনুবাদ- ভারতী নন্দী)


‘সুলেখা ও বিমলা মাহাতো

পুলিশের হাতে ধরা পড়ল

ব্যাধের জালে খরগোশের মতো।


দুই কিশোরীর ছাগলের মতো চোখ

মোটা ঠোঁট, ঝুলে পড়া থুতনি দেখে

গৃহিণিরা হল সন্ত্রস্ত

বাসনমাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া

পা টিপতে টিপতে

লাথি-কিল খুন্তির ছেঁকা খাওয়া মেয়েদের

এরা আত্মীয় নয়তো!


সাংবাদিক সম্মেলনে দুজনে

হরিণশিশুর মতো দিশেহারা,

বুদ্ধিদীপ্ত চশমার জটিল প্রশ্নের 

উত্তরে বলল ‘খুব খিদে পায়,

মার কাছে চাইলে বলে, কিছু তো নেই

আমায় খা।

জঙ্গলের ওপার থেকে ডাকল

কাজ দেব, খেতে দেব’

সরকার বলল সহানুভূতি নিয়ে ভাবব

নাবালিকা বয়সের কথা।

‘খুব অত্যাচার করবে এদের ওপর’

কার স্বর কে জানে

ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল ঘরে।

ভাত বাড়তে বাড়তে 

টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে

মা বললেন ‘বাড়ন্ত বাচ্চা দুটি,

এই বয়সে বাঘের মতো খিদে-

এই সামান্য কথাটা কি 

বুঝতে পারবে না রাষ্ট্র?’

(মাওবাদিনী, ওড়িয়া কবি বীণাপাণি মোহান্তি, অনুবাদ-অরূপ সাহা)

কখনো হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে সন্ত্রাস, যা হয়তো স্মৃতির কান্না।

‘জানো না কি

জীবনে এমন অনেক কিছু আছে

জীবন নিজেই যার সঙ্গে যুঝতে পারে না?

আমার কবিতা আমাকে টেনে নিয়ে যায়

এক অনন্ত শূন্যতার মধ্যে,

টানে, টানতেই থাকে রক্তের নদীর ওপর দিয়ে

টেনে নিয়ে চলে এবড়োখেবড়ো কর্কশ পাথুরে জমি দিয়ে

আমার শরীর থেকে ঝরা রক্ত পান করতে করতে

নিঃশেষিত, ঝলসানো, ফিরে যেতে অক্ষম

আমি চলতেই থাকি কোন শেষ বা গন্তব্য ছাড়াই

আমাকে টেনে নিয়ে চলে এক অজানা স্বাদ

একটা কবিতার, যা এখনও লেখা হয়নি।’

(অজানা স্বাদ, মণিপুরি কবি আরাম্বাম ওংবি মেমচৌবি, অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক)

এই অনুভূতি থেকে নিস্তার নেই  এমনকি দেবীরও। রজস্বলা অবস্থাতেও তার ওপর দখল ছাড়ে না দেবতা।

‘...রক্তস্রাবে

আজ বড় ক্লান্ত দেবী

শিবকে বলেন      

একটু সরে দাঁড়াতে

যাতে তিনি একটু আরাম পান।

তাঁর অন্য অর্ধ পুরুষটি এ কথায় আহত

‘কেমনভাবে  এই অর্ধেক শরীর নিয়ে

টিকে থাকব পুরো তিন দিন?’

মুখে বলেন ‘ আমাদের চুক্তি ভঙ্গ করা যাবে না,

তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব নেই’

বলেন, আর তাঁর ডান হাত দিয়ে

দেবীকে টেনে নেন দৃঢ় আলিঙ্গনে।’

(অর্ধনারীশ্বর, তামিল কবি মালতী মৈত্রী, অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক)


বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সন্ত্রাস গ্রাস করে মিজোরাম থেকে কাশ্মীরের কবির কলম। আবার গুজরাটের দাঙ্গার ছাপ পড়ে কবিতায়।


‘এবার যে কোনদিন

বোমা পড়বে আমাদের ওপর

যারা গাছের আশেপাশে 

ঘরবাড়িতে কলোনিতে রয়েছে।

গাছ বললে মনে পড়ে 

এক গ্রীষ্মের মাস

ভরে আছে, গাড়ির শব্দে

চাবি হারানো, কথা হারানো

সেদিন হঠাৎ একসারি পাইন,

সবুজ, নতুন, ঢুকে পড়েছিল

আলোমাখা, আকাশি পর্দায়।

কিছু কাটা চিহ্ন, আমাদের ভুল

পুরনো মৃত্যুর ওপর নাচের পাগুলো

অথবা জীবন’

(যে কোনদিন, মিজো কবি মোনা জোটে, অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক)


‘তুমি মানুষকে হত্যা করো আমার সামনে, আমি শোক করি,

 মানুষেরা হত্যা করে তোমাকে আমার সামনে, আমি তখনো শোক করি।


তুমি মানুষকে হত্যা করো তাদের জন্য, তারা উল্লাস করে,

এবং মানুষেরা তোমাকে হত্যা করে তাদের জন্য, তারা উল্লাস করে;


এই ‘আমি’গুলো সংখ্যায় অতি অল্প,বিধ্বস্ত  , ক্লান্ত এবং ক্রমেই সঙ্কুচিত,


এই ‘ওরা’রা অনেকঃ ঐক্যবদ্ধ, প্রাণবন্ত   এদের সংখ্যা  ক্রমশ বাড়ছে।’


(একটি শান্তির কবিতা, কাশ্মীরি কবি নিঘাত সাহিবা, অনুবাদ বিতস্তা ঘোষাল) 


‘ওরা চায় আমরা লিখি, নিজেদের রক্ত দিয়ে লিখি

শুধু শান্তির কথা।

ওরা আমাদের জায়গা দখল করেছে। মৃত্যু দিয়েছে।

মেয়েদের সম্মান কেড়েছে। বলেছে অবোধ শিশুর মতো

আমরাই অকৃতজ্ঞ, যে জানে না কোনটা তার জন্য ভালো।

জায়গা হারিয়ে ওদের বন্দুকের নলে ঘিরে রয়েছি আমরা।

কাশ্মীরের নামে, মানুষের রক্ত দিয়ে ওরা পৃথিবীকে ভেংচি কাটছে মাত্র।

ওরা পেন বিক্রি করে, আমরা নিজেদের রক্ত দিয়ে কিনি। ওরা অনেকে নিজেদের পৈতৃক জায়গা ছেড়ে এখানে এসেছে, গঙ্গাস্নাত স্বচ্ছ হতে। ওদের স্থির দৃষ্টি আমাদের নিয়ে গেছে অন্য কোথাও। মাথার ভেতর চলেছে অন্য এক চাকা, সাদৃশ্য অনেকটা সুইস ঘড়ির মতো।

ওরা কাগজ বিক্রি করেছে,

অনেক কাগজ, আমরা রক্ত দিয়ে কিনেছি।

ওরা জ্বলন্ত আগুনে কেটলি বসিয়েছে, যেখানে চা-ও ওদের বশ্যতা স্বীকার করেছে। এর চেয়ে ভালো স্বর্গ কোথাও হতে পারে না।

আমাদের কলম অগ্রসর হয়েছে মুক্তির দাবীতে। প্রচণ্ড উত্তেজনার বশে বুঝিয়েছি বিচারের প্রতি হবে আমাদের আগামী প্রতিটি লেখার লাইন।

ইতিমধ্যে আশফাক আর নেই। মকবুল পলাতক। আসিফা, নীলোফার অত্যাচারিত এবং মৃত আফজলের ফাঁসি। তুকেল দুই কবরের মাঝে জ্বলন্ত। লালচকের আতর বিক্রেতা নিখোঁজ, খুঁজে পাওয়া গেছে তার শরীরের হাড় আর কিছু ভাঙ্গা শিশির।

কেটলি আওয়াজ করছে শুধু, চা আর আসবে না কোনদিন।

আমাদের হাড় আজ ক্লান্ত, অপেক্ষা শুধু আদালতে বিচারের। এই অপেক্ষার পরিণাম ওদের তরবারি। সেটাও আমাদের লেখায় জাগ্রত, ওরাই উৎসাহিত করেছে আমাদের রক্ত দিয়ে নিজেদের কথা লিখতে, আরও বেশি করে লিখতে। আমাদের রক্ত মাংসে ভরিয়েছে ওরা টিউলিপের বাগান।

... আমরা লিখেছি। আমরা তখনও লিখেছি, যখন ওরা যুদ্ধ মত্ত আমাদের সঙ্গেই।’ 


(কাশ্মীর- লেখা যেখানে পেশা, কাশ্মীরি কবি অ্যাথার জিয়া, অনুবাদ বিতস্তা ঘোষাল)


‘মুহূর্তেই

শহরটা হয়ে যায় পাথর, ইঁট, ছোরা, খুর

ধ্বংস, স্ফুলিংগ, অগ্নিশিখা ও ছাই।


মুহূর্তের মধ্যে

উন্মত্ত জনতা

হাতুড়ি, কোদাল, শাবল আর হাতবোমা নিয়ে

শহর দাপিয়ে বেড়ায়।


আমার কলম হুমড়ি খেয়ে পড়ে ইতিহাসের কংকালের ওপর,

হাওয়া গরজায়, যেন চিরঘুম থেকে জেগে ওঠা লাশের মৃত্যু

ঝুমঝুমি মৃত্যুর ঘূর্ণি হাওয়া নড়িয়ে দেয় সভ্যতার মূলস্তম্ভগুলো,

জীবনের  বিশ্বাসে ধূলোয়,

সব জায়গায় নখবসানো থাবা, রক্তবমি,

মুহূর্তের মধ্যে চোখ অন্ধ, দিকচিহ্ন মুছে যায়

মানবতার ছালচামড়া উঠে আসে।


আমি একজন কবি,

সাংবাদিকের মতো তো বাঁচতে পারি না,

সভাকবির মতোও  না,

আমি চাই, দাঁতে দাঁতে ঘষে, শব্দকে নরম না করেই

এই ষড়যন্ত্রের কথা বলতে,

কিন্তু তার জন্য

আমার দরকার কলমটাকে উদ্ধার করা,

গভীর অন্ধকার কুয়ো থেকে


আমার বাবার কুয়ো

আমার বংশের কুয়ো

যে কুয়ো নারীর শেষ আশ্রয়,

সেইসব নারী যারা ঝাঁপ দেয় কলঙ্কিত মৃত্যুর মধ্যে।


আমাকে সেই কুয়ো থেকে

তুলে আনতে হবে আমার কলম, একদম নতুন কলমটা,

শুধু আমার দুটো হাত সম্বল করে।

ধ্বংস, হত্যা এসব তো পৃথিবীর শেষ সত্য নয়।

(সমস্তই আমার হাতে, গুজরাটি কবি স্বরূপ ধ্রুব, অনুবাদ- বিপ্লব মাজী)

আর যাদের জন্ম থেকেই আলাদা করে রাখা হয়, জল-অচল, অস্পৃশ্য, এমনকি কখনো কপালে দেগে দেওয়া হয় চোর জাতির অপবাদ, তারা যখন কলম ধরেন তখন ভলকে ভলকে রক্তবমির মতো ক্ষোভ উঠে আসাই স্বাভাবিক, যা দলিত কবিতাকে একটা আলাদা জঁনারে রাখতে বাধ্য করেছে। আর কলম যখন  দলিত নারীর হাতে, তখন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নারীর নিজস্ব প্রান্তিকতা তার সঙ্গে মিশে তাকে আরও অনন্য করে তোলে।   সবার ওপরে থাকে দলিত হবার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা।তাদের কলমে সন্ত্রাসের ছবি আরও তীব্র।


‘ওদের অমানুষিক অত্যাচারই খুলে রেখেছে গুহা

আমার বুকের অন্তঃস্তলে

এই বনবাদাড়ে সাবধানে পা ফেলতে হবে আমাকে

নজর সেঁটে রাখে- বদল হতে থাকা এ সময়ে

পাশা পালটে গেছে,

ফুলকি ফুটছে ঢের প্রতিবাদের

এই এখানে

তো ওই ওখানে,

এইসব দিনগুলোতে মুখ বুজে ছিলাম আমি

ঠিক-বেঠিকের জবানবন্দি শুনেছি কান পেতে

কিন্তু এখন আমি উস্কে দেব উত্তেজনা

মানবাধিকারের জন্য

যে জায়গাটা কখনোই মাতৃভূমি ছিল না আমাদের

এমন এক জায়গায় আমরা এলাম কিভাবে?

যে ভূমি আমাদের এমনকি কুকুর-বেড়ালের 

জীবনও দিতে চায়নি?

ওদের এ অমার্জনীয় অপরাধ

সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করছি

ঘুরে দাঁড়াব, হব বিদ্রোহী

এই মুহূর্তে আর এখানেই’


(গুহা, মারাঠি দলিত কবি জ্যোতি লাঞ্জেয়ার অনুবাদ-  প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়)


 


‘সূর্যের দরজা আমাদের জন্য খুলে রাখার নিয়ম

কখনই আমাদের দেশে ছিল না

বংশ পরম্পরায় মাখানো হয়েছিল

অন্ধকারের কাজল

আমাদের চোখে

প্রতিটি আঁখি পল্লবে বেঁচে থাকার আহত স্বপ্ন বেদনায় উচ্চারিত

এবং পাখির পায়ে শিকল না পরানোর নিয়ম

কখনই আমাদের দেশে ছিল না

আজ চোখ থেকে বেরিয়া এসেছে ঘন কালো স্রোত

কানায় কানায় পূর্ণ ঘটে বিপদসংকেত

দরজার চৌকাঠও হয়তো যাবে ভেসে

বিশাল অট্টালিকার দেওয়াল পড়বে ভেঙে

দেরি হয়েছে ঠিকই-

কিন্তু আমাদের চোখ এবার এগিয়ে আসছে....’

(এবার এগিয়ে আসছে আমাদের চোখ, দলিত কবি প্রতিভা রাজানন্দ)

মনে পড়ে যায় সুকীর্থা রানির দৃপ্ত উচ্চারণ, যা সন্ত্রাসদীর্ণ সময়েও আমাদের আস্থা জাগিয়ে রাখে।

‘You may frame me, like a picture

And hang me on your wall

I will pour down

Away past you

Like a river in sudden flood.

I myself will become

Earth

Fire

Sky

Wind

Water

The more you confine me, the

More I will spill over

Nature’s fountainhead’




No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...