Tuesday, 22 September 2020

নিবন্ধের পাতা ১

  #শারদীয়া_কিন্নর_দল




#দ্বিতীয়_পাতা   


আজ তিনটি নিবন্ধঃ


#আমাদের_সেই_হেমন্ত


#সব্যসাচী_বন্দ্যোপাধ্যায়


লতা মঙ্গেশকার এই মানুষটি সম্বন্ধে বলেছিলেন যে হেমন্তদা যখন গান গাইতেন মনে হতো মন্দিরে কোন সাধু বসে গান গাইছেন। তিনি হতে পারতেন ইঞ্জিনিয়ার কিংবা একজন সাহিত্যিক কিন্তু তা হলোনা।ভাগ্যিস হলোনা। তাহলে আমরা পেতাম না ৫৪ বছরের একটা ঝকঝকে সাঙ্গীতিক জীবন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে রেডিওতে গান গেয়ে যে অধ্যায়ের শুরু ১৯৮৯ সালে তার অবসান। তিনি বাঙালির নয়নের মনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি কন্ঠ শিল্পী, সুরকার, চিত্র পরিচালক, প্রযোজক- কি নন তিনি। কিন্তু তার থেকেও বড় পরিচয় তিনি একজন বড় মাপের মানুষ। দীর্ঘদেহী চেহারার সঙ্গে উন্নত ও বড়োমাপের এক মানসিকতার মেলবন্ধনের আরেক নাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।


যখন গানের জগতে হেমন্ত প্রবেশ করলেন তখন সেখানেসুধীরলাল চক্রবর্তী, পঙ্কজ কুমার মল্লিক শচীন দেব বর্মন এইরকম কয়েকজনের আধিপত্য। হেমন্ত প্রথম থেকেই পঙ্কজ কুমার মল্লিককে তাঁর অনুপ্রেরণা বলে মনে করতেন। প্রথাগত শিক্ষা পঙ্কজকুমারের কাছে হেমন্ত করেননি কিন্তু চলনে-বলনে হাবেভাবে হেমন্তকে সবাই সেই সময় থেকে ছোট পঙ্কজ বলে ডাকতে শুরু করেছিল। প্রথমে একটি খুব মজার গল্প বলা যেতে পারে। একটি অনুষ্ঠানে নবাগত হেমন্ত গান গাইতে গিয়েছেন। সেই আসরের প্রধান আকর্ষণ পঙ্কজ কুমার মল্লিক। হেমন্ত বসে আছেন কখন ডাক আসবে। কিন্তু ডাক আর আসেনা। ওদিকে পঙ্কজকুমার মল্লিক এসে গেছেন।।সকলে তাঁকে নিয়েই ব্যস্ত। হেমন্ত বারবার বলছেন, 

-একটু এবারবআমার গানটা দিন। আমি গাইতে চাই। 

উদ্যোক্তারা বললেন,- এখন আর হবে না কারণ পঙ্কজ মল্লিক এসে গেছেন।


সেদিন আক্ষেপ করেননি হেমন্ত। পরবর্তীকালে বলেছেন যে আমার লাভ হয়েছিল সামনে বসে পঙ্কজদার গান শুনতে পেয়েছিলাম। ১৯৬৬ সালে যখন মণিহার ছবিটি হলো।ছবির সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পঙ্কজ মল্লিককে দিয়ে একটু গান গাইয়েছিলেন সেই ছবিতে।সেই প্রসঙ্গে হেমন্ত বলেছিলেন যে আমার সুরে পঙ্কজ দা একটু হলেও কণ্ঠ দিয়েছেন এটাই আমার বড় পাওয়া। ১৯৭২ সালে হেমন্ত পরিচালিত একমাত্র ছবি 'অনিন্দিতা' মুক্তি পায়। এই ছবিতে হেমন্ত গাইলেন তাঁর পঙ্কজদার গলায় ইতিহাস হয়ে যাওয়া গান ' দিনের শেষে ঘুমের দেশে'।বারবার পঙ্কজকুমারের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন গানটি ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা তা জানবার জন্য।


সিটি কলেজের একটি অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রধান আকর্ষণ এবং তার সঙ্গে পঙ্কজ কুমার মল্লিক কে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। হেমন্ত গান গাইছেন। অডিটোরিয়ামে ঢুকলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক। হেমন্ত দেখতে পেয়ে গান থামিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।পঙ্কজকুমার বসলেন সামনের চেয়ারে। হেমন্তকে আবার গান শুরু করতে বললেন।মঞ্চ থেকে প্রণাম জানিয়ে হেমন্ত শুরু করলেন গান।


সবসময় নিজের নীতি থেকে বিচ্যুত হতেন না।কোন গান কোন শিল্পীর গলায় ভালো খুলবে সেই বুঝে গানে সুর করতেন।যখন 'হারানো সুর'ছবির কাজ চলছে, হেমন্ত চাইলেন যে নায়িকা সুচিত্রা সেনের লিপে গীতা দত্তের গলা ব্যবহার করতে। পরিচালক অজয় কর কিছুটা রাজি হলেও প্রযোজক উত্তম কুমার নারাজ। তিনি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ছাড়া আর কারো গান রাখতে রাজি নন। 


কিন্তু দৃঢ়চেতা হেমন্ত কিছুতেই আপোষ করবেন না। করলেনও না। হারানো সুর' ছবিতে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখাগীতা দত্তের কন্ঠে 'তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার' গানটি আজ ৬৩ বছর পরেও রসিক শ্রোতার মন নাড়িয়ে দিয়ে যায়।


সব সময় নতুনদের সুযোগ দিতেন বিশেষ করে নতুন যারা গান লিখছেন তাদের প্রতি হেমন্তের প্রশ্রয়ের হাত ছিল বাড়ানো। মুম্বাইতে যখন গুলজার প্রথম গানের জগতে এলেন তখন হেমন্ত তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হেমন্তের সুর করা পরপর বেশ কয়েকটি ছবি যেমন 'খামোশি,' 'সান্নাটা', 'বিবি ওউর মকান', 'রাহগির প্রভৃতি ছবিতে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন গুলজার। মুকুল দত্ত তখন একদম নতুন।


 হেমন্তর অনুরোধে এই নবীন গীতিকারকে যাত্রিক গোষ্ঠীর পলাতক ছবিতে সুযোগ দেওয়া হলো।মুকুল দত্ত গান লিখলেন। এবং তারপর হেমন্ত যখনই ছবির গানে বা নিজের গাওয়া বেসিক গানে সুর করেছেন, ডেকে নিয়েছেন মুকুল দত্তকে। মুকুল দত্তের পারিবারিক বিপর্যয়ে হেমন্ত অভিভাবকের মতন দাঁড়িয়েছেন।মুকুল দত্ত যতদিন জীবিত ছিলেন স্বীকার করেছেন তাঁর হেমন্তদার কাছে এই ঋণের কথা।গুলজার আজও সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেন যদি সেদিন হেমন্তদা না থাকতে তাহলে গুলজার আজকের গুলজার হয়ে উঠতে পারতেন না।


সেবার ভি বালসারার মা খুব অসুস্থ। যতটা সম্ভব দেখাশোনা চলছে। এর মাঝে ভি বালসারার রেকর্ডিং। কিন্তু তাঁর মন পড়ে রয়েছে মায়ের দিকে। একদিন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বিষয়টি বুঝলেন। তিনি স্টুডিওতে বালসারাজীকে ডাকলেন।বালসারাকে তিনি বালু বলে সম্বোধন করতেন।তিনি বললেন,

- তোমার মাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি তোমার মাকে দেখছি। তুমি মন দিয়ে কাজ করে যাও। মাকে নিয়ে কোনোরকম টেনশন করবেনা।এইভাবে বড় ভাইয়ের মতন ভি বালসারার মায়ের চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলেন হেমন্ত।


আরো একবার। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সহকারী ও বন্ধু সমরেশ রায় গেয়েছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত- 'সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে'। কোনো রকম যন্ত্রানুষঙ্গ ছাড়াই এই গান রেকর্ডিং হয়েছিল। গান শেষ হল। রেকর্ডিং এরপর হেমন্ত বললেন ওকে।

এর কিছুদিন পর হেমন্তের যন্ত্রশিল্পী টোপাবাবু অর্থাৎ অমর দত্ত সমরেশ রায় কে বললেন যে হেমন্ত সকলের কাছে বলছে যে সমরেশ যেভাবে গানটি উতরে দিলো আমি হলে পারতাম না।


শ্যামল মিত্র তখন জীবিত নেই।একটি অনুষ্ঠানে হেমন্ত গিয়ে একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেন।সচরাচর কোথাও গিয়ে আগে গাইতে চাইতেন না।সেদিন সবাই জিজ্ঞাসা করলো,


-হেমন্তদা কি এমন কাজ যে আপনি আগে গাইছেন?

আজ সৈকতের বিয়ে।শ্যামল নেই।আমার ওপর দায়িত্ব অনেক।সেইজন্যই আমাকে যেতে হবে।


অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা সেদিন চিনেছিলেন আর এক হেমন্তকে।


সারাজীবন যেমন খ্যাতি বা অর্থ উপার্জন করেছেন মানুষের প্রয়োজনে সেই অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধান্বিত হননি। বহু মানুষকে সাহায্য করেছেন অকাতরে।এমনকি মৃত্যুর দিন সকালে একবার যখন অচৈতন্য হেমন্তের সংজ্ঞা ফিরে ছিল তখনও তিনি কোনো এক ব্যক্তিকে অর্থ সাহায্যের কথা বলেছিলেন। ছবি বিশ্বাস থেকে প্রসেনজিৎ যাদের লিপে যখন তিনি গান গেয়েছেন মনে হয়েছে সেই শিল্পীই যেন গাইছেন। মৃত্যুর পর কেটে গিয়েছে ৩১ বছর। এখনো বাঙালির একটা দিনও কাটেনা হেমন্তর গান না শুনে।


 চিরকালীন, চিরসবুজ, চির নতুন এই শিল্পীর প্রতি রইলো আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। জন্মশতবর্ষে তিনি আরও বেশি করে চর্চিত হন এই প্রার্থনা জানাই।

**


#ঠাকুরবাড়ির_পাগল_কথা


#অমূল্যরঞ্জন_ভট্টাচার্য


#প্রথম_পর্ব


পাগল আর জিনিয়াসের সামান্য হেরফের । 

রাণী চন্দ তাঁর "গুরুদেব" গ্রন্থে  উল্লেখ করেছেন  রবীন্দ্রনাথ একদিন তাঁকে বলেছিলেন  ~  জিনিয়াসে জিনিয়াসে  আমাদের বাড়ি ভরা  ছিল । জিনিয়াস হওয়া বড় বিপদের কথা ।  জানিস,  একটুখানির  জন্য বেঁচে গেছি৷।  আর একচুল বেশি  জিনিয়াস  হলেই  বিপদ হত রে । 

অবনীন্দ্রনাথ  অকপটে  স্বীকার করেছেন ~ "রবিকা বলতেন .... অবনটা একটা পাগলা"।(  দ্রষ্টব্য   জোড়াসাঁকোর ধারে) । 


বিশ্বের বহু প্রতিভাবানদের  মধ্যে  বিস্ময়কর  পাগলামি  দেখা যায় । কয়েকজনের নাম   ~  সালভাদর  দালি, আইনষ্টাইন,   বিথোভেন , বায়রন ।  সে এক  আকর্ষণীয়   আখ্যান । 


মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ  ঠাকুর  (১৮১৭ ~১৯০৫)  ও সারদাদেবীর  পঞ্চদশ  সন্তানের  মধ্যে  চার সন্তান ছিলেন  স্বল্পায়ু  । 

আর সকলে হলেন  ~  দ্বিজেন্দ্রনাথ,  সত্যেন্দ্রনাথ,  হেমেন্দ্রনাথ, বীরেন্দ্রনাথ,  সৌদামিনী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ,  শরৎকুমারী,  স্ব্রর্ণকুমারী, বর্ণকুমারী,  সোমেন্দ্রনাথ,  রবীন্দ্রনাথ । 


মহর্ষির   পুত্র, কন্যা, পুত্রবধু, জামাতা,  তাদের সন্তানদের নিয়ে  বিপুলায়তন পরিবার।   সেখানে  প্রায় সকলেই  প্রতিভাবান । এঁদের মধ্যে  অনেকেরই   খামখেয়ালিপনা ,  পাগলামি  ছিল । সেই কাহিনি   অতি   সংক্ষিপ্ত আকারে   উল্লেখ করা  হল । 


দ্বিজেন্দ্রনাথ ( ১৮৪০ ~১৯২৬) । 

একবার তাঁর  মাথায় এল যদি কাপড়ের  জোব্বা  ( যেটা রবীন্দ্রনাথের  প্রিয় পোশাক)  তৈরি  করা যায় তাহলে  কাগজ দিয়েও জোব্বা বানানো যেতেই পারে । যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। 


বিচিত্র রঙের কাগজ কেটে  তৈরি  হল জোব্বা। আর সেটা পরে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঘুরে  এলেন  সারা কলকাতা শহর।  


অবশ্য সেইকালে  ঠাকুরবাড়ি   হয়ে উঠে ছিল  বিভিন্ন সংস্কৃতির  কেন্দ্রবিন্দু যার মধ্যে আহার, পোশাকেও ছিল অনন্যতা । 


পরিণত  বয়সে  দ্বিজেন্দ্রনাথ   পরতেন দুখানা   কোট একসাথে  । একটির  পিঠ  সামনের দিকে যাতে  বোতাম লাগানোর ঝামেলা না থাকে । 


ঘোরাঘুরি করার জন্য রিকশা ব্যবহার করতেন। সেই রিকশা ছাদে তুলে   তাতে ঘুরে আমোদ পেতেন। 


পুত্র   দ্বিপেন্দ্রনাথের  স্ত্রী হেমলতাদেবী এই আপনভোলা মানুষটির অনেক সমস্যার মোকাবেলা  করতেন।  এক বিকেলে   লুচি দেওয়া হল। হাত দিতেই ঘি  চটচট । 

~ একি,  ঘি দিয়ে লুচি ভাজে নাকি ?  লুচিতো জলে ভাজে।  যাও জলে ভেজে আন। 

হেমলতা  ময়দা দিয়ে  আবার ভেজে নিয়ে এসে দিতেই  খুব খুশী । 


~  দেখলে তো। জলে ভাজা লুচি  কেমন ভাল হয় । 

হেমলতার মুখে সেই কথা শুনে সকলের কি হাসাহাসি। 

" গীতা পাঠ ",  " তত্ত্ব বিদ্যা " " অদ্বৈত তত্ত্ব" গ্রন্থের লেখক  ও দার্শনিকের  বাস্তব জ্ঞান ছিল না । নিজের আত্মজীবনীতে  সেকথা লিখেছেন। 


দর্শনশাস্ত্র ছাড়াও তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল   অংক শাস্ত্র  । ভালবাসতেন  বিদেশী সুরে বাঁশি  বাজাতে।  বাংলায়  স্বরলিপি  তিনিই উদ্ভাবন  করেন । 


দ্বিজেন্দ্রনাথের   জ্যেষ্ঠ  পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথ  (১৮৬২ ~১৯২২)   ছিলেন  স্বামী বিবেকানন্দের   কলেজজীবনের  বন্ধু। 

স্ব্রর্ণকুমারী  দেবীর কন্যা সরলা দেবী জানাচ্ছেন   দুজনের  নিবিড় বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু কিছুকাল  পরেই  নরেন্দ্রনাথ  বুঝতে পারলেন  দ্বিপেনের  নানাবিধ ক্ষ্যাপামি  আছে । 


 মহর্ষির  ইচ্ছা ছিল তাঁর  এই  প্রিয় নাতিটি  বিলেত থেকে ব্যারিস্টার  হয়ে  ফিরুক।  সমুদ্রে  ডুবে যাবার  ভয়ে  তিনি গেলেন না। 


 ১৯০১ সাল থেকে  শান্তিনিকেতনে  থাকা শুরু করলেন।  

 সান্ধ্য  ভ্রমনে  যেতেন  জুড়ি গাড়িতে । ঘোড়ার মাথায় জ্বলত

  বালব । খবর পেলেন কোথায় ঘোড়ারগাড়ি    উল্টে গেছে।  ব্যাস , ধরলেন  মোটর ।  মোটরদুর্ঘটনার খবর পেয়ে ধরলেন   গোরুরগাড়ি।  সেই গাড়িরও বিপদের কথা শুনে  ভ্রমন বন্ধ করে দিলেন । 


এই দ্বিপুবাবুর শখ ছিল  পাগল  পোষার । 

তাঁর পাগল আসরে  কোন পাগল ময়ূরের মত পেখম মেলার চেষ্টা  করছে , কেউ টিকটিকির মত দেওয়াল বেয়ে  ওঠার চেষ্টা করছে । 


অনেক পাগলেই আসে  টাকা পাওয়ার লোভে । সমস্যা হল  বিশুদ্ধ  পাগল বাছাই করা। অনেক নকল পাগল ও আছে। এই কাজে এগিয়ে এলেন  মহর্ষির সপ্তম পুত্র  রবীন্দ্রনাথের  অব্যবহিত অগ্রজ  সোমেন্দ্রনাথ। ইনি ছিলেন পাগল ।  পাগল না হলে পাগল যে চেনা যায় না। 


অভিনব সে পরীক্ষা। 


তিনি নিজে   দেওয়ালে নিজের মাথা ঠুকলেন ।  বিশুদ্ধ পাগলেরা   অতি  সহজ সাবলীলভাবে  দেওয়ালে মাথা ঠুকে   পরীক্ষায় উত্তীর্ণ  হয় । নকলেরা পারে না। 


এই ভাবে  দ্বিপুবাবুর আসর বিশুদ্ধ পাগলে ভরে যায়। 

জোডাসাঁকোর বাড়িতে একদিন এক ভদ্রলোক এলেন । ইনি রবীন্দ্রনাথকে চিনতেন না।  


~ কি চাই ?    বললেন রবীন্দ্রনাথ। 

~ আজ্ঞে আমার একটা সমস্যা আছে । 


সুদীর্ঘ দুঃখের কাহিনি শেষে সেই ভদ্রলোক বললেন  ~ দেখুনতো  মশায় কি জ্বালাতন।  দশখানা লুচি খেলে আমার পেট ভরে যায় । আমার স্ত্রী  আমাকে পনেরোখানা লুচি খাওয়াবেই। কি করি বলুনতো । শুনেছি এখানে   সকলের সমস্যার  সমাধান করা হয় । 


রবীন্দ্রনাথ  মুচকি হেসে তাঁকে  দ্বিপেন্দ্রনাথের পাগল আসরে পাঠিয়ে দিলেন।  তারপর কি হয়েছিল জানা নেই । 


রবীন্দ্রনাথ  ১৯০৪ সালে "পাগল"   প্রবন্ধে লেখেন   ~"পাগলও ইঁহারই কীর্তি এবং প্রতিভাবানও ইঁহারই কীর্তি। ইঁহারি টানে  যাহার তার ছিড়িঁয়া যায় সে হয় উন্মাদ। আর যাহার তার অশ্রুতপূর্ব  সুরে বাজিয়া  উঠে সে হয় প্রতিভাবান। পাগল দশের বাহিরে। প্রতিভাবানও তাই। "


মহর্ষির চতুর্থ  ও সপ্তম পুত্র   বীরেন্দ্রনাথ  ও সোমেন্দ্রনাথ । উভয়েই অসাধারণ  প্রতিভার অধিকারী অথচ  মানসিক ভারসাম্যহীন । 


ক্রমশঃ


** 


 #চুরি 


#বিকাশ_চক্রবর্তী


      ভাবছিলাম কি লিখবো ! ভাবনাবর্তে এলো -'চুরি' শব্দটি ।

 

এই চলমান পৃথিবীর একশ্রেণির মানুষ

রকমফেরে প্রাক‍ৃত-অপ্রাকৃত নানাধরণের জিনিস চুরি

করে । হয় স্বভাবে, নয়তো অভাবে । একটা প্রবাদ আছে -'চুরি করা ভালো কাজ যদি না-পড় ধরা '।


এই জীবনের ধরা-বাঁধার জাঁতাকলে পড়ে কবি শঙ্খ ঘোষ প্রেমের কবিতায় লিখেছেন -


"জাল করেছে, জাল করেছে ওরা আমার সই


জাল করেছে বলে যেমন ধরতে গেলাম চোর


ঘুরিয়ে দিয়ে মুখ -


দেখি একী , এতো আমি 


আমি দু:সাহসে জাল করেছি হা-রে আমার সই


জাল করেছি আমি আমার সর্বনাশের চাবি।"


এই চূরির সুবাদে সর্বনাশ বিভিন্ন জনের কাছে ভিন্ন ভিন্নভাবে হাজির হতে পারে ।

 

কারো ধনসম্পত্তি চুরি

হতে পারে, কারো আসবাব চুরি হতে পারে। কারো

মন চুরি হতে পারে। ছেলে-মেয়ে-পত্নী চুরি হতে পারে।

পুলিশের টুপি ছাতা, অধিকাংশ জনের মোবাইল চুরি, গাড়ী চুরি ,গাড়ীর তেল চুরি, গ‍্যাস সিলিন্ডার থেকে গ‍্যাস চুরি,ব‍্যাঙ্কের ক‍্যাশ বা এ.টি.এম থেকে টাকা চুরি।

হসপিটালে পেশেন্ট পার্টির দেওয়া নিয়মিত অসুধ চুরি, কিডন‍্যাপ করে কিডনি চুরি , হালফিল আইডিয়া

চুরিরও অভিযোগ উঠছে। কবি ও লেখকদের লেখা চুরি !


 আগেও চলেছে, এখনো চলছে , ভবিষ্যতেও চলবে । কোথাও মাটি ফেলে পুকুর চুরি ! দেখাযাবে-

করোনার অসুধ বাজারে এলে সেখানেও দুশোর দামে

চারশো চুরি । 


ছাত্রাবস্থায় ক্লাসে যে ভালো টুকতে পারতো,তাকে বলা হতো- তোর হবে। কী হবে ! দ‍্যাখ - হাওড়া ব্রিজটা চুরি

করতে পারবি! এই মহূর্তে যখন চুরি নিয়ে লিখতে বসা , তখন পাঠকবর্গ নিশ্চয় জানেন যে - এর বিষয় , বৈভব , বৈচিত্র্যই আলাদা ! এর কর্মপদ্ধতি , কৃৎকৌশল বিষয়ভাবনায় চৌর্যশিল্পীদের অন্তর্জগতের নিমগ্ন সন্ধান চলতেই থাকে ।


আধুনিক মনোবিজ্ঞানে মনের তিনটি স্তরের কথা বলা হয় (১)Conscious বা চেতন বা সংজ্ঞান (২) Sub-Conscious বা অবচেতন, ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানে

যা Pre-conscious বা আসংজ্ঞান (৩) Un-conscious

বা অবচেতন । মনের যে অবস্থায় কোনো ব‍্যক্তির দেখার, শোনার, অনুভব করার এবং চিন্তা করার পূর্ণ

ক্ষমতা থাকে সেই স্তরকে চেতনার স্তর বলা হয় । আর , কার্যকরী হয় চেতনা প্রবাহ । আলোচনা প্রসঙ্গে

সাহিত‍্যে চেতনা প্রবাহের প্রয়োগের কথা উঠে আসে ।

বাংলা সাহিত‍্যেও এর প্রয়োগ হয়েছে । 


গোপাল হালদারের 'একদা' এবং ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ‍্যায়ের 'অন্ত:শীলা' উপন‍্যাসে চেতনা প্রবাহের কিছুটা প্রয়োগ হয়েছে।


এই চেতনাপ্রবাহের স্রোতধারায় দেশের টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে । কেউ আঙ্গুলফুলে কলাগাছ হচ্ছে, আর

কেউবা অর্থাভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেনা ; অনাহারে জীবন ত‍্যাগ করছে ! 


যাহোক , আমরা যে দেশে বাস করি, জন্ম নিই, বড় হই, সে দেশের সঙ্গে পরিচয় সাধন মানুষের একটা অবশ‍্যকর্তব‍্য । ভারতবর্ষ নদীমাতৃক দেশ । সে নদীপথকেও নাকি বৈদেশিকশক্তি ডোকলামে চুরি করেছে ! দেশের কোনো কোনো অংশে মাতব্বরেরা নালা , পুকুর বুজিয়ে খাসজমিতে

পরিণত করছে একেই বলে - পুকুরচুরি !


মূর্তিচুরির ক্ষেত্রে 'ভ‍্যান্ডারিজম্' একটা শব্দ ! গৃহস্থের ঘরেই সাধারণত: চোর আসে , কিন্তু ক'জন আর যায়

চোরের ঘরে চুরি করতে !কিন্তু মহান চিত্রপরিচালক শ্রদ্ধেয় সত‍্যজিৎ রায়ের সুপুত্র শ্রদ্ধেয় সন্দীপ রায় "কৈলাশে কেলেঙ্কারী"-তে দেখিয়েছেন - তাঁর সৃষ্টিতে চোরের ঘরেও চুরি করা যায় । কৈলাশে কেলেঙ্করীতে র‍্যাকশিট যক্ষীর কাটামাথাটা নিয়ে হোটেল কৈলাশের ঘরে রেখেছিল ,

সেখান থেকে মি: মল্লিক ভার্গভ এজেন্সীর প্রাইভেট

ডিটেকটিভ সেটি হস্তগত করেছিল ।


ব‍্যোমকেশ সিরিজে, "সিমান্ত হীরা"য় লেখক শরদিন্দু বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় দেখিয়েছেন - কুমার বাহাদুরের হেফাজত 

থেকে তার কাকা দিগীন রায় পারিবারিক হীরাটি হস্তগত করার পরে ব‍্যোমকেশ বক্সী কিভাবে সেটা অপহরণ করেছিল!


উপরের দুটি ক্ষেত্রে কী বলা ভুল হবে - 'চুরি করা ভালো কাজ যদি না-পড় ধরা !'(তবে কী! আইন যদি

সাথে থাকে )।


চোরের শাস্ত্রে আছে - "চুরি করিয়া হইলেও ঘি খাও"।

কারণ - চোরে না-শোনে ধর্মের কাহিনী। এরকম বহু প্রবাদও আছে - চোর চোর খেলা, চোরে চোরে মাসতুতো

ভাই, চোরের উপর বাটপাড়ি, চোরেরধন বাটপাড়ে খায়,

চোরের মায়ের কান্না, চোরের মায়ের বড় গলা। যেটা বর্তমান সমাজে প্রকট থেকে প্রকটতর । 


বহুযুগ আগে থেকেই অনেকেরই সেই চানক‍্যশ্লোকটি জানা -

"তস্করস‍্য কুতো ধর্ম্মো দুর্জ্জনস‍্য কুত: ক্ষমা।

কৃপণস‍্য কুতো দানং শৌনিকস‍্য কুতো দয়া "।।

(চোরের ধর্ম আচরণ কোথায়? দুর্জ্জনমানুষের ক্ষমা কোথায়? কৃপণের দান কোথায়? এবং কষাইয়েরই বা দয়া কোথায়? )।




No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...