Tuesday, 22 September 2020

গল্পের পাতা ৫

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল




#দশম_পাতা


#গল্প 


#গোত্র_হতে_পরিত্যক্ত


 #সুরশ্রী_ঘোষ_সাহা


 


হাসপাতালে বাবাকে দেখে ক্লান্ত শরীরে দৌড়ে এসে হাওড়াগামী মিনিবাসে উঠলাম। সারাদিন হাসপাতালের ঘরে বসে থেকে রোগীদের ওষুধ, পেচ্ছাপ, ফিনাইলের মিশ্রিত গন্ধে বুক ভরে থাকে। মাঝে মধ্যে গা গুলিয়ে ওঠে তাই সেখান থেকে বেরিয়ে খুব ইচ্ছা করে বাসের জানালার ধারের সিটটাতে বসে বুকের পুতিগন্ধময় বাতাস সরিয়ে বিশুদ্ধ ঠান্ডা বাতাস ভরে নিয়ে ঘরে ফিরতে। কিন্তু কেউ না কেউ রোজদিন সকল জানলার ধারের সিটই দখল করে বসে থাকে। শেষ পাদানিতে পা রেখে চারিদিক এক নিমেষে চোখ বোলাতে দেখলাম আজও কোন ব্যতিক্রম নেই। অন্য দিনের তুলনায় আজ মিনিবাসটায় ভিড়টাও যেন বেশি। ভিড় সামলে ঠ্যালাঠেলি করে হেঁটে গভীরে ঢুকে যেতে দেখি একটা সিট তো ফাঁকা আছে। যদিও গোটা সিট বলা ভুল হবে। জানলার ধারের সিটে যিনি বসে আছেন তিনি প্রায় দেড়খানা সিট দখল করে নিয়েছেন। তার আগের বাকি অর্ধেকটাতেই ধপাস করে বসে পড়লাম। কেউ কেউ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল, ও'টুকুতে কীভাবে এঁটেছি দেখার জন্য।


 


রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে ব্যাগ থেকে বোতল বের করে জল খেয়ে আড়চোখে দেখলাম পাশে বসে থাকা মানুষটাকে। গায়ে খুব বড় বড় লোম। ঠোঁটের উপর হাল্কা গোঁফের রেখা। টিকিট চাইলেন ভারী পুরুষ কন্ঠে। চেহারাটাও পুরুষালি অথচ পরনে শাড়ি। বেমানান গাঢ় লাল রঙের লিপস্টিক পরেছেন। শাড়ির সাথে ম্যাচিং কপালে ব্লু টিপ। আরো যথাসাধ্য সাজবার চেষ্টা করেছেন নিজেকে সুন্দরী দেখানোর অভিপ্রায়ে। আমি তাকে পেরিয়ে আসলে যেন জানলার বাইরের প্রকৃতিই দেখছি এমন ভান করে আসলে তাকেই খুব কাছ থেকে দেখতে থাকলাম।


 


আচমকাই তিনি আমাকে বললেন 'ভাই, নে জানলার ধারে বস্, আমি উঠি'। উঠে গেলেন সিট থেকে কিন্তু দেখতে পেলাম গন্তব্য না আসার জন্য তিনি নামলেন না বাস থেকে। দাঁড়িয়ে থাকলেন ভিড়ে। আর আমি জানলার ধারে সরে আসায় অন্য লোক এসে আমার আগের জায়গায় বসল....


 


ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা অল্পবয়সী মেয়েকে বিরক্ত করছিল এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ। যেমনটা আমরা প্রায়ই বাসে-ট্রেনের ভিড়ে দেখতে অভ্যস্ত আর কী! আমার মতো আরো অনেকেই হয়ত দেখেছে দৃশ্যটা। মেয়েটা অস্বস্তিতে ছটফট করতে থাকে। খুবই অল্পবয়সী কলেজ পড়ুয়া এক মেয়ে, এখনও ঠিক প্রতিবাদী হয়ে ওঠেনি। বড় পাখি যেভাবে খড়কুটোর বাসার মধ্যে থাকা ছানাগুলোকে প্রকান্ড ঝড়ের হাত থেকে রক্ষা করে ঠিক তেমনি ভাবে আমার পাশে বসে থাকা আগের সেই মানুষটি মেয়েটাকে আগলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ভেসে আসতে থাকল 'একটু সরে দাঁড়া। ঐ এত ঝুঁকছিস কেন? তোর হাতটা সরাবি?'..... এমন সব টুকরো টুকরো কথা। মেয়েটার মুখের প্রশান্তিটাও বাসে ছড়িয়ে পড়ল।


 


হাওড়ায় এসে বাস থামল। আমি ও বহু লোক একে একে নামলাম। সবার শেষে ধীর পায়ে সেই মানুষটি নেমে হাঁটতে থাকলেন হাওড়া স্টেশনের দিকে। হঠাৎ কী মনে হতে আমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকা 'হিজরা' শব্দটাকে গুগলে সার্চ করতে শুরু করলাম। জানতে পারলাম 'হিজরা' এই উর্দু শব্দটি এসেছে আরবি সেমেটিক ধাতুমূল 'হিজর' থেকে। যার অর্থ হল 'গোত্র হতে পরিত্যক্ত'।


 


আমার তখন নিজেকে ঠিক তাই মনে হল...


...


 


#পাঁচ_টাকার_কয়েন


 


#কৃষ্ণা_সরকার


 


শরত তোমার অরূন আলোর অঞ্জলি। আবার বাজলো


রে ভুবন। কবি কতো না ভাবে মায়ের আগমনী গান


গেয়েছেন ।হ্যাঁ মা আসছেন দীর্ঘ একবছর প্রতিক্ষার


পর।বাঙালির শ্রেষ্ঠ পূজা দূর্গা উৎসব।মায়ের আগমনীর সুর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে শুভ্র মেঘের


মধ্যে দিয়ে, কাশফুলের সমারোহে, শিউলির গন্ধে মা


ধরায় অবতীর্ণ হন।কিন্তু চারিদিকে আজ অরাজকতা, কান্নার রোল মা নিজেই দিশাহারা ।মানুষের এই দুঃখ


কষ্ট ঘুচবে কি করে?এসব নিয়েই পুজোর তোড়জোড়


শুরু ।পাড়ায় পাড়ায় চাঁদা তোলা।পাড়ার দাদারা


চাঁদা তুলতে বেরিয়েছে আগে যে হারে টাকা উঠতো


এবার সে হারে উঠবেনা।কারন কারো চাকরি নেই, কেহ অর্ধেক মাহিনা পায়,কারো ব্যবসা মন্দ চলছে।


শ্যামদা,বিরূবাবু,চন্দন খুড়ো সবাই চাঁদা তুলতে


বেরিয়েছে।হাতে একটা বিল বই আর খুচরো পয়সা রাখার কৌটো।আরে কতো হলোরে, চন্দনখুড়ো জিজ্ঞাসা করলো,  বিলু হিসাব করে দেখলো  বললো


কাকু দুহাজার মতো হয়েছে ।হিসাবটা বিলুই রাখে


দাঁড়াও কৌটোর খুচরো গুলো দেখি শ্যামদা বললো


আর এক রাউন্ড মেরে বাড়ি যাব।


ওদের পিছু পিছু কতগুলি ন্যাড়া নেংটা ছেলে


ঘুরছিল ।অনেক বার তাড়িয়েছে আবার পিছু


ধরেছে।কারো গায়ে জামা নেই ময়লা মাখা শরীর জরাজীর্ণ কতোদিন


ভালো করে খেতে পায়নি ,কঙ্কালসার ছেলেগুলি


কি উদ্যামে ছুটছে ওদের পিছনে চোখগুলি জ্বলছে


হয়তো বা প্রতিবাদের আগুনে। বোধহয় ওরা উৎসবের বাইরে।


হঠাৎ বিলু খুচরো পয়সাগুলি গুনতে গিয়ে একটি


পাঁচ টাকার কয়েন তার অজান্তে ছিটকে পড়লো


ছেলেগুলোর মধ্যে সিধু কয়েনটা নিয়ে দে ছুট


ছুট,  ছুট ,ভয়ে পিছন ফিরে চায় আর ছুট লাগায়


মুখ শুকিয়ে যায় হাঁপরের মতো বুক ওঠা নামা করে


এই বুঝি ওরা ধরে ফেলে।


ছোটার তালে তালে মনটা ছুটে যায় ভাঙাচোরা


টিনের ঘরে যেখানে বারো মাস জলে ভেসে থাকে।


যেখানে মা তার ছোট দুই ভাই বোনকে নিয়ে অপেক্ষা


করছে তার জন্য। সে ছুটছে তার ভাবনা ছুটছে


আর সাথে বুকের হৃৎপিণড টগবগ করে ছুটছে


এ পয়সায় মুড়ি বাতাসা তো হবেই। সে ছোটে তার ভাবনা ছোটে।


বাড়ির সামনে এসে আছড়ে পড়লো।


উপোসী জীর্ণ শরীরটা দু একবার নড়ে স্থির


হয়ে গেল ।মা ভাই বোনদুটি দৌড়ে হুমড়ি খেয়ে


পড়লো সিধুর দেহের উপর। সিধু বহু কষ্টে তার হাতটি মেলে ধরে। ওদের চোখ গুলি চকচক করে


উঠলো, দেখে সিধুর হাতে সযত্নে ধরা  একটি পাঁচ টাকার কয়েন।




#আকাশে_বৃষ্টি


#মালা_মুখোপাধ্যায়


আচ্ছা আমি সেদিন মাঠে বৃষ্টি পড়া দেখছিলাম ট্রেন থেকে আর তুই সঙ্গে সঙ্গে একটা কবিতা লিখে ফেললি? কেমন ভাবে ভাবিস বলতো? বৃষ্টি পড়ছে মাঠে আর তুই ভিজছিস মনে।কি করে কবি? আমি তো ভাবতে পারি না। আমি তো বৃষ্টি পড়া দেখি। বৃষ্টির শব্দ শুনি। বৃষ্টির ছাট দেখি।


--হা হা হা হা


শুধু কি বৃষ্টি দেখি বৃষ্টি? দেখি পৃথিবী ফসলে ভরে উঠবে। পৃথিবী গর্ভবতী হবে।


--হ্যাঁ,হ্যাঁ, আজকাল অনেকেই লিখছে, এই গর্ববতীর কথা। পাগল হলি আকাশ?


--একদম না। কবিদের নিয়ে ঠাট্টা করলে ,বিপ্লব শুরু হয়ে যাবে।


---কোথায় রে?


--ফেসবুকে।


--ফেসবুকে? 


---হ্যাঁ,নাই নাই করে অনেক কবি আছি। আমরা সমস্ত কবিদের নাম নথিভুক্ত করছি। 


--দুনিয়ার কবি এক হও। স্লোগান দিবি তো?


--সিওর। আর হ্যাঁ,ওটা গর্ববতী নয়। গর্ভবতী।


--তোদের এতো ভাবনা কোথা থেকে আসে রে? খুব জানতে ইচ্ছে করে। আবার বলছিস, আকাশ কাঁদছে? কোথায় কাঁদছে রে?


--ওটা কান্না নয়!


--ওটা বৃষ্টি। ভালো করে দ্যাখ। পাগল হলি নাকি?


 


বৃষ্টি আর আকাশ চন্দননগর স্টেশনে উঠেছে। জিরাটে নামবে। কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছাত্রী। এক বিষয়।


বাংলা অনার্স। ছোটো বেলার বন্ধু।


বৃষ্টি কিছু লিখতে পারে না।  কিছু মানে এই কবিতা,গল্প , প্রবন্ধ আর কি।এমনকি রচনাও মুখস্ত করে লেখে। বানাবার ক্ষমতা একটুও নেই।তেমন ভালো না লাগলে  কোনো লেখা পড়ে না। সিলেবাসের পড়া বাধ্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে আকাশ যা পাই তাই পড়ে। পাগলের মতো পড়ে। বাংলা ভালোবেসে নিয়েছে। কিছু না পেয়ে শেষে বাংলা নিয়েছে বৃষ্টি।


 


হঠাৎ বৃষ্টির পিঠে পড়ে থাকা লম্বা বিনুনি টেনে দিয়ে আকাশ বলে,দেখবি আজকের কবিতা। কেমন হলো বলবি। প্রথম লাইক আর কমেন্ট কিন্তু তোকে দিতে হবে। 


--আমি তো শুধু তোর কবিতাটায় পড়ি। বুঝলে ভালো বলি। না বুঝলে অনবদ্য বলি।কি করবো? সবতো মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। অত বুঝতে পারি না। তোদের কেমন পাগল মনে হয়। 


--এই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? জীবনানন্দ, নজরুল, সুকান্ত,শক্তি চট্টোপাধ্যায়,সুনিল গাঙ্গুলি। পড়বি।পড়বি। তবেই তো বুঝতে পারবি। আগে পড়ার নেশাটা কর।


--জ্ঞান দিচ্ছিস?


--তোকে?


--হ্যাঁ তো


--পাগল নাকি?


--সন্দেহ আছে?


 


একটি জানলার মুখোমুখি সিটে দু'জনে বসেছে। বাইরে বৃষ্টি। জানালার কাঁচ জোর করে নামালো বৃষ্টি। নামাতে নামাতে বলে,পাগলের পাগলামী। বৃষ্টিতে মাঠের কৃষক ভিজছে ,আর হায়রে! আকাশ রেলকামরার ভিতরে  ভিজছে। তোদেরকে না মাঠে নামিয়ে কাদা ঘাঁটিয়ে ,জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে 


ঘন্টা খানেক। তারপর কবিতা লিখিস, আকাশ বৃষ্টি হয়ে কাঁদছে।


--আমি লিখি, আমার ভালো লাগে। তোর অসুবিধা কোথায়?


--না, কোনো অসুবিধা নেই তো। শুধু বন্ধু তো। তাই বলি। একটু শক্ত হতে হয়। কোনদিন দেখবো , কোনো মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলি। আর সে তো  ল্যাঙ মেরে চলে গেল। ওরে তখন তোর চোখে বৃষ্টি নামবে তো?


--অলরেডি , আকাশে বৃষ্টি নেমে গেছে।


 


বৃষ্টি দু'ভ্রু হালকা তুলে চোখে মিষ্টি ঝিলিক তুলে তুলতুলে নরম ঠোঁট কাঁপিয়ে মৃদুস্বরে মুচকি হেসে বলে ,কি? কি বললি?


--যা শুনলি তাই। বলতে বলতে আকাশ হালকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে সারা মুখে শরৎএর সোনালী আভা ছড়িয়ে বাইরের জানলার দিকে তাকিয়ে দেখে চলে বৃষ্টিকে।




No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...