Tuesday, 22 September 2020

নিবন্ধের পাতা দ্বিতীয় পর্ব ২

  #শারদীয়া_কিন্নর_দল

আজ তিনটি তিন বিষয়ের নিবন্ধ এনেছি আমরা। আশা করি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে।


" All the world's a stage , and all the men and women are merely players ; they have their exits and their entrances"
-- Shakespeare
কেউ বলে জীবনটাই নাটক , তবে নাটক নিয়ে নিশ্চয়ই জীবন প্রস্তুত করা যায়না । কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় রঙ্গমঞ্চে কতো নট-নটীর প্রবেশ ও প্রস্থান, কতো ভাঙাগড়া , কতো হাসি-অশ্রু , কতো দীর্ঘশ্বাস। রঙ্গমঞ্চের পাদপ্রদীপের আলো একদিন সরে যায় । হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসের গর্ভ থেকে কখনো সেইসব কাহিনী উদ্ধার করে অথবা করেনা ।
কলকাতার এজরা ষ্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমার ভাবতে রোমাঞ্চ হয় একদিন এখানেই ছিল লেবেডফের বড়ো সাধের নাট্যশালা যেখানে ১৭৯৫ সালে ২৭শে নভেম্বর অভিনীত হয়েছিল প্রথম বাংলা নাটক ' কাল্পনিক সংবদল'। এই ব্যাপারে পথিকৃৎ কোনো বাঙালি নয় এমনকি কোনো ভারতীয় নয় , একজন নাটকপাগল রাশিয়ান ।
আমরা জানি রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের সংলাপ লিখে দেওয়া থাকে আর দর্শক তার আসনে বসে সেই সংলাপে মহড়া দিয়ে শিল্পী যে অভিনয় করবে সেটাই দেখবে এটাই নিয়ম। কিন্তু মাঝে মাঝে সেই সীমারেখা ভেঙে সব একাকার হয়ে গেছে তেমন ঘটনাও বিরল নয় ।
অনেকেই ছোটবেলায় শুনেছিলাম " নীলদর্পণ" নাটকে অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির অসাধারণ অভিনয় দেখতে দেখতে প্রচণ্ড রাগে স্থান কাল ভুলে দর্শকাসন থেকে তাকে চটি ছুঁড়ে মারেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই ঘটনার কোনো ভিত্তি নেই, মনে হয় এটা নেহাত গল্প । তবে এটা ঠিক যে সেইসময় যাত্রা আর হাফ্-আখড়াইকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পন' নাটক জনসাধারণের স্বদেশভাবনা ও রাজনৈতিক চেতনাকে আশ্রয় করে রঙ্গমঞ্চে আলোড়ন তুলেছিল। আপার চিৎপুর রোডে মধুসূদন সান্যালের বাড়িতে ১৮৭২ সালের ৭ই ডিসেম্বর ' নীলদর্পণ' নাটকের অভিনয় দিয়ে সাধারণ রঙ্গালয়ের সূচনা ।
সেখানে অর্ধেন্দুশেখর একাই 'উড সাহেব' সমেত চারটে ভূমিকায় দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে দর্শকদের মাতিয়ে দিয়েছিলেন । এরপর ১৮৭৫ সালে 'নীলদর্পন' অভিনিত হলো লখনৌ শহরে । সেখানে মতিলাল সুর 'তোরাপ' আর অবিনাশ কর 'রোগসাহেব'এর ভূমিকায় এতো অসাধারণ প্রাণবন্ত অভিনয় করেছিলেন যে দর্শকাসন থেকে এক সাহেব দৌড়ে রঙ্গমঞ্চে উঠে 'তোরাপ'রূপি মতিলালকে মারতে শুরু করেছিলো ।
এর আগে ১৮৭৩ সালে কলকাতায় মেয়ো হাসপাতালের সাহায্যার্থে এই নাটকের অভিনয় চলাকালীন এক দর্শক ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে 'রোগসাহেব'রূপি অবিনাশ করকে বেধড়ক পিটিয়েছিলো । এইসব আঘাত একজন অভিনেতার জীবনে নিশ্চয়ই পুরস্কার ।
রঙ্গমঞ্চ নিয়ে অনেক মজার ঘটনাও আগের দিনে শোনা যেতো । কুর্সি নিয়ে কিস্যা তাকে বলা যায় কিনা জানিনা তবে ঘটনাগুলো বেশ মজার। বাংলার রঙ্গমঞ্চ তখন দানীবাবু , অর্ধেন্দুশেখর, অমর দত্তের মতো দিকপাল অভিনেতারা মাতিয়ে দিচ্ছেন । সেইসময় থিয়েটারে কোনো দৃশ্য দেখে দর্শকরা 'এনকোর , এনকোর' বলে চিৎকার করে উঠলে সত্যিই সে দৃশ্য সঙ্গে সঙ্গে আবার অভিনিত হতো ।
সেইরকমই অনেকসময় ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে কারো সংলাপের পরেই হল ফাটিয়ে ক্ল্যাপ পড়তো । দর্শকদের কাছ থেকে এই সোচ্চার তারিফ পাবার জন্যে অভিনেতাদের মধ্যে চাপা রেষারেষি থাকতো। শুনেছি এমন ঘটনা বিরল ছিলোনা যেখানে সংলাপ বলেই অদূরে একটি চেয়ারে বসলেই অভিনেতা ক্ল্যাপ পাবেনই ঠিক তখন তার সহ-অভিনেতা কায়দা করে সেই বিশেষ চেয়ারটিকে স্থানচ্যুত করে দিতেন যাতে সেই অভিনেতা বিপদে পড়ে যান এবং ক্ল্যাপ না জোটে ।
মাইকেল মধুসূদনের আগ্রহেই রঙ্গমঞ্চে নারীদের প্রবেশ আর সেই কারণেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে সংশ্রব ত্যাগ করেন। সবাই জানে তখনকার দিনে বেশিরভাগ অভিনেত্রী আসতো নিষিদ্ধ পল্লী থেকে। তাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে বিখ্যাত হতে পেরেছিল । শ্রীরামপুর মাহেশের নিষিদ্ধপল্লীর গোলাপসুন্দরী তাদের মধ্যে একজন। গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে 'শরৎ-সরোজিনী' নাটকে সুকুমারীর ভূমিকায় অসামান্য অভিনয়ের জন্য তার নামটাই হয়ে যায় ' সুকুমারী' ।
দর্শকরা টিকিট কেটে হলে বসে তাদের অভিনয়প্রতীভা দেখে ধন্য ধন্য করতো বটে কিন্তু মঞ্চের বাইরে তাদের সঙ্গে কোনোরকম ব্যক্তিগত সম্পর্কে তারা ছিলো ব্রাত্য । তাই আর এক সহ-অভিনেতা গোষ্ঠবিহারী দত্ত যখন সুকুমারীর প্রেমে পড়ে ভালোবেসে তাকে বিয়ে করলো তখন চারিদিকে 'গেলো গেলো' রব । শেষপর্যন্ত কিছুদিন পরে গোষ্ঠবিহারীকে দেশ ছেড়ে বিলেতে চলে যেতে হয়েছিল।
বাংলা রঙ্গমঞ্চে শিশির ভাদুড়ীর যোগদান একটি ঐতিহাসিক ঘটনা । তিনি চেষ্টা করেছিলেন এখানে সুস্থ সংস্কৃতির হাওয়া আনতে । তিনি জানতেন , " A nation is known by its stage" । কিন্তু প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ফর্ম ও কন্টেন্টের বিশেষ পরিবর্তন করতে পারেননি। মূলত ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কাহিনীর বৃত্তেই থেকে গেলেন । তবে থিয়েটারের জগতে বিপ্লব ঘটে গেলো ১৯৪৪ সালে আইপিটিএর হাত ধরে। বিজন ভট্টাচার্যের বিখ্যাত নাটক "নবান্ন" আমুল বদলে দিলো বাংলা নাটকের প্রবহমান ধারা । নাটক বলতে শুরু করলো মানুষের সংগ্রামের কথা, তার লড়াই করে বেঁচে থাকার কথা।
দেহপট সনে নট একদিন মিলিয়ে গেলেও পাদপ্রদীপের আলোয় তাদের প্রতীভার বর্ণচ্ছটা চিরকালের সম্পদ হয়ে বাঁচিয়ে রাখে রঙ্গমঞ্চকে।

কলকাতার বাবু সম্পর্কে জনৈক বাবু মহামহিম বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় ,যাহা লিখিয়া গিয়াছেন, তাহার পর আমার মতন মুরুক্ষু লেখকের অনধিকার চর্চা মাত্র !
বস্তুতঃ তাহা মূলধন করিয়া আমরা প্রায় দেড় শতক বছর অতিক্রম করিলাম। অধুনা সরকারি কিংবা বাণিজ্যিক অফিসে কনিষ্ঠতম কেরানির বেতন এখন আর আশি টাকা
নহে ,তিরিশ হাজার টাকা অতিক্রম করিয়াছে।
পরম হিতৈষীরা বলেন, বঙ্কিম বাবুর সেই দশম অবতারের সমান্তর প্রগতি অনুসারে, ধীরে ধীরে সহস্র অবতারে বর্ধিত হইয়াছেন।
বর্তমানে এই বাবুদের অন্যরূপ? যাঁদের কর্ম শুধুমাত্র মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে নিমগ্ন।
বাবু ইংরাজি জানেন না,অথচ ব্রাউনবেরীতে আরোহণ করিয়া ইংরাজি সংবাদপত্র বিপরীত পৃষ্ঠা আকর্ষণ করিয়া ভ্রমণে বাহির হন। যাহাতে তাঁহাকে উচ্চ শিক্ষিত বলিয়া ভ্রম হয়।
বিড়ালের বিবাহে এবং কবির লড়াইয়ে আতর মাখা নোট ওড়ান।
দোল উৎসবে মুহূর্তিকাকে হিরের নাকছাপি উপহার প্রদান করেন।
ইনিই সেই বাবু ,যিনি গোখুরী, ঝকমারী ,পক্ষী,হাফ আখরাই দলের মুরব্বি। নদের খেঁউড়েও তাঁর অরুচি নেই।
হারমোনিক টাভার্নে গিয়া হাফ -গেরস্ত ইউরেশিয়ান সঙ্গিনী অন্বেষণ করিতেন?
বাবুদের লক্ষণ, দুই প্রকারের ,এক- লৌকিক ,দুই - শাস্ত্রীয়।
লৌকিক লক্ষণের গায়ের উত্তম না হইলে শ্যাম বর্ন। স্নানের পূর্বে খিদমতগার দ্বারা তৈল মর্দন করা নিত্য অভ্যাস। যাহাতে, দিবা নিদ্রার পর উদরের সঙ্গে পদদ্বয়ের অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়।
শাস্ত্রীয় লক্ষণ হইল,বাবু ফরাসডাঙ্গার অথবা ঢাকাইয়া মিহি ধুতি পরিধান করিবেন। কোঁচা চুনোট করা উড়ো কোছা বর্তমান। জড়ির পাড় যেন তাঁর কোমল ত্বকে পেলব স্পর্শ অনুভিত হয়।
বাবু দিনরাত ঘুড়ি ওড়ান, আখড়া সাজান, গুলি খেয়ে বুলবুলি লড়াইয়ের মকশো করেন।
শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন,
"মুখে ভ্রূপার্শে ও নেত্রকোলে নৈশ অত্যাচারের চিহ্ন সরূপ কালিমা রেখা ,তরঙ্গায়িত বাবরি চুল,দাঁতে মিশি পরিধানে নকশাপাড় ধুতি, মসলিনের বেনিয়ান,গলদেশে চুনোট করা উড়ানি, পায়ে চীনা বাড়ির উৎকৃষ্ট জুতা।"
আহা !জয় মিত্তিরের কাঙালি ভোজনে বামুন ঠাকুরের কি বিষম বিপদ হইয়াছিল?
বাবু দাঁড়িয়ে আছেন হাস্যমুখে। বিভিন্ন রন্ধন উপাচার ভক্ষণ করিয়া ঠাকুর মশাইয়ের উদর পরিপূর্ণ! বাবুর খিদমতগারেরা সন্দেশের বারকোষ নিয়ে দন্ডায়মান। আর একজন হাঁক দিতেছেন, আরো এক ডজন ভক্ষণ করিলেই দুটাকা বাড়তি দক্ষিনা মিলিবে।
পেটের মধ্যে কুমড়োর ছক্কা আর লুচি তখন পরম সোহাগে হুটোপুটি খাইতেছে। ..
সম্ভাব্য বিস্ফোরনে আরক্ত বামুন ঠাকুর ক্রমাগত না না করে হাত নেড়ে যাচ্ছেন।......
পুজোর ষষ্ঠীর দিন, যোড়াসাঁকোর সিংহ বাবু মশাই কিঞ্চিৎ গঞ্জিকা সেবন করিয়া সিংহকে বলিলেন,
" তুই বেটা নকল সিংহ!আমিই আসল সিংহ!"
এই বলিয়া সিংহ ভাঙ্গিয়া আপনি হলুদ রেশমি চাদর মুড়ি দিয়া সিংহ হইলেন। প্রভাতে পুরোহিত আসিয়া দেখিলেন, বাবু সিংহ হইয়াছেন।
বাবুর নেশা ছুটিয়া গিয়াছিল। অধোমুখে বৈঠকখানায় নীরবে বসিলেন। বাবু চক্ষু বুজিয়া আছেন! কথা কহিলে যদি নেশা ছুটিয়া যায়?
খিদমতগারেরা বলিল,
"কর্তাবাবু ধ্যানে মগ্ন ! মায়ের পরম ভক্ত । মা তাঁর পিঠে চড়েই মর্তে এলেন।"
পরবর্তী শ্রেণীর বাবুরা সাহেব কুঠিতে কাজ করিয়া দস্তুরী গ্রহণ করিতেন।
এডওয়ার্ড ট্রাভেলিয়ান , লিখিয়াছেন,
"Dastoor is the breath of Hindu's nostrils the mainspring of his actions and the staple of conversations ."..
১৮৫০ সালে ফ্যানি পার্কস বাবু রামমোহন রায়ের দুর্গাপূজার আলোকসজ্জা এবং আতসবাজির প্রদর্শন দেখে মোহিত হয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিকথায় :
"In various rooms of the house, nauch girls were dancing and singing, one of the women was Nickee , the cataloni of the East. "
দশমীতে ,বাবু কর্মকর্তারা প্রতিমা নিরঞ্জন করিয়া নীলকন্ঠ পাখি উড়াইয়া বাজনার সহিত ঘট মস্তকে ধারণ করিয়া গৃহ অভিমুখে যাত্রা করিলেন। .. পরিশেষে, কদলিপত্রে দুর্গা নাম লিখিয়া সিদ্ধি পান করিয়া বিজয়ার উপসংহার হইল।


১৯৭৭ এর ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেলো ঋত্বিক ঘটকের ছবি যুক্তি তক্কো আর গপ্পো।এই ছবিতে ঋত্বিক স্বয়ং অভিনয় করেছিলেন নীলকন্ঠ বাগচির চরিত্রে।পুরুলিয়াতে পঞ্চাননের ভাত ফুটিয়ে খাওয়ার সময় যখন নচিকেতা ভাতের থালা উলটিয়ে ফেলে তখন বঙ্গবালার দিকে তাকিয়ে নীলকন্ঠ গেয়ে ওঠেন,' কেন চেয়ে আছো গো মা'এখানে প্রথম লক্ষ্য নিশ্চয় বঙ্গবালা কিন্তু আসল উদ্দিষ্ট আমাদের দ্বিখন্ডিত, অসহায় বঙ্গভূমি।'এরা দেবে না তোমারে দেবে না যে/ আপন মায়েরে নাহি জানে' - এই কথায় যে ক্ষোভ তা জর্জদার মতো কে আর উচ্চারণ করতে পারবেন।ঋত্বিক তাই তাঁর আদরের জর্জদাকে গিয়ে ধরলেন।
জর্জদা অর্থাৎ দেবব্রত বিশ্বাস ঋত্বিক ঘটককে বেশ স্নেহ করেন।এর আগে ঋত্বিকের মেঘেঢাকা তারা আর কোমল গান্ধারে গানও গেয়েছেন।এমনকি কোমল গান্ধারে বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয়ও করেছেন।কিন্তু এবার আর নয়।অথচ ঋত্বিকও নাছোড়বান্দা। এই গান জর্জদা ছাড়া হবেই না।বারবার অনুরোধ করতে লাগলেন।অবশেষে দেবব্রত বিশ্বাসের মন গললো। ছাত্র সুশীল মল্লিককে নিয়ে গেলেন রেকর্ডিং করতে। গানের শুরুটা নিজে গাইলেও শেষটা করলেন সুশীল মল্লিক।ঋত্বিক তাতেও রাজি হলেন।
যে চিন্তা নিয়ে ঋত্বিক এই চরিত্র এঁকেছেন তার গলাকে জর্জদার মতো আর কেই বা ফোটাতে পারবেন।যদি একটুও জর্জদা কন্ঠ দেন সেটাও অনেক।পরবর্তীতে যখন বি এফ জে এ থেকে দেবব্রত বিশ্বাসকে এই গানের জন্য পুরস্কার দেওয়ার কথা বলা হয় তিনি তা সুশীল মল্লিককে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন কারণ গানটি তিনি পুরো গাননি।
এমনই ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। শুধু সুশীল মল্লিক নন তাঁর কাছে যাঁরা গান শিখেছেন বা যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন প্রত্যেকেই তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন প্রশ্রয়,পেয়েছেন উৎসাহ আর সাহায্য।এই প্রসঙ্গে স্বপন গুপ্তর একটি গল্প বলতে ইচ্ছা করছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনন্য এই শিল্পী ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্র।
স্বপন গুপ্ত প্রথমবার যখন আমেরিকা গিয়েছিলেন উনি সেখানে বসবাসরত বেশ কজন পরিচিতকে চিঠি লিখে দিয়েছিলেন যাতে তাঁরা স্বপন গুপ্তকে দেখাশুনা করেন।এতটাই ভাবতেন তিনি ছাত্রদের সম্বন্ধে।
রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুমিত্রা সেনের সুযোগ্যা কন্যা ইন্দ্রাণী সেন ১৯৭৪ সালে হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় সারা রাজ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন।কিশোরী ইন্দ্রাণী ছিল দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্রী।তারপরেই রবীন্দ্রসদনে দেবব্রত র সঙ্গে ইন্দ্রাণীর এক অনুষ্ঠান।তিনি সবাইএর কাছে ইন্দ্রাণীর এই সাফল্যের কথা ঘোষণা করলেন ও সবাইকে হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দিত করতে বললেন।যখন ইন্দ্রাণীর খুব কম বয়সে বিয়ের ঠিক হয়ে যায় দেবব্রত বিশ্বাস ইন্দ্রাণী সেনের বাবা- মার কাছে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন যেন ইন্দ্রাণী গান না ছাড়ে। এভাবে নতুনদের উৎসাহ দিয়ে যেতেন বরাবর।
কখনো কারো থেকে সুবিধা নিতেন না।একবার রাসবিহারী মোড়ের কাছে বসবাস করা এক ভদ্রমহিলা দেবব্রত বিশ্বাসের অনুরোধ মতো একটি ওষুধ পাঠিয়ে দিলেন।কিন্তু যিনি ওষুধ নিয়ে এলেন তিনি কিছুতেই দাম নিতে চাইলেন না।দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে কি দাম চাওয়া যায়? তিনি তো চলে গেলেন।কিছুদিন পর সেই ভদ্রমহিলা আবার তাঁর জর্জ দার কাছে এসেছেন।ওষুধটা ব্যবহার করেছেন কিনা জিজ্ঞাসা করাতে দেবব্রত বিশ্বাস সেই ওষুধের প্যাকেটটা ভদ্রমহিলাকে দিয়ে বললেন যে যদি তিনি দাম না নেন তাহলে কিছুতেই তিনি এই ওষুধ ব্যবহার করবেন না।কারো থেকে কোনো সুবিধা তাঁর প্রয়োজন নেই। অগত্যা সেই মহিলা দাম নিলেন।দেবব্রত এবার নিশ্চিন্ত।
১৯৭৮ এর ভয়াবহ বন্যার পর তৎকালীন তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রবীন্দ্রসদনে সাতদিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন।সেই অনুষ্ঠানে দুদিন গাইতে হবে দেবব্রত বিশ্বাসকে- এই অনুরোধ নিয়ে বুদ্ধদেব তাঁর কাছে এলেন।তাঁকে বলা হলো যে ওইদুদিন হাউস ফুল হবেই।অন্যদিন কি হবে দেবব্রত জানতে চাইলেন। বুদ্ধদেব বললেন যে নাটকের অনুষ্ঠান হবে।তখন তিনি বললেন যে যদি ওই দিনগুলোতে হাউস ফুল না হয় তাহলে দেবব্রত কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সবকটি দিনে গাইবেন।
প্রাতিষ্ঠানিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে যাচ্ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। ভেঙ্গে যাচ্ছিল শরীর আর মন।আপন মনে বাড়িতে বসে রেকর্ড করতেন গান।চিঠি লিখতেন আপনজনদের। আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এই শিল্পীর অশ্রু কলমের কালি হয়ে বেরিয়ে এলো।সৃষ্টি হলো ' ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত'।শেষের দিকে নিজেকে ব্রাত্যজন বলে উল্লেখ করতেন।
বেশ কিছু অন্যধরনের গান রেকর্ড করেছিলেন যেখানে এই অভিমান স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল। ২১ মার্চ ১৯৮০ রবীন্দ্রসদনে তাঁর আদরের পাত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ও বাণী ঠাকুরের' কিংশুক'-এর ব্যবস্থাপনায় রবীন্দ্রসদনে সংবর্ধনা নিতে রাজী হলেন অসুস্থ দেবব্রত বিশ্বাস। সেদিন সেই হলে তিলধারণের জায়গা নেই।অমিয়া ঠাকুর সুচিত্রা মিত্র, কনক বিশ্বাস, স্নেহাংশু আচার্য, সন্তোষ সেনগুপ্ত, নীহারবিন্দু সেন- কে নেই সেই মঞ্চে।দেবব্রত সংবর্ধনা নিলেন, রস মিশিয়ে বক্তৃতাও করলেন,তারপর নিজের গলার মালাটি পরিয়ে দিলেন তাঁর স্নেহের হেমন্তর গলায়।সবশেষে গাইলেন এ মণিহার আমায় নাহি সাজে আর যেদিন সকল মুকুল গেলো ঝরে। এরপর হেমন্ত তাঁর শ্রদ্ধার ' কাকা' অর্থাৎ দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে গাইলেন ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু। সারা প্রেক্ষাগৃহ করতালিতে ফেটে পড়ছে। সেদিন দেবব্রত আর ব্রাত্য নন।সেদিন যেন তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীতের আকাশে জ্বলন্ত সূর্য।
১৮ আগস্ট ১৯৮০। সেদিন কলকাতা উত্তাল। কারণ দেবব্রত বিশ্বাস আর নেই।ধুতি পাঞ্জাবি চন্দন আর মালায় সজ্জিত হয়ে তিনি শায়িত রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণে। তাঁকে শেষ দেখার জন্য কাতারে কাতারে লোক। চারদিকে চলছে তাঁর গান।জলদমন্দ্র স্বরে উচ্চারণ করছেন' জনমের মত হায় হয়ে গেল হারা'.কিছুদিন পরে তাঁর স্মরণ সভায় দেবব্রত বিশ্বাসের আদরের ' দিদিমণি' তাঁর জর্জকে মনে রেখে গেয়েছিলেন 'আজ কিছুতে যায় না মনের ভার।'শেষ করতে পারেন নি গানটা সুচিত্রা।ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন।
এই লেখাটা লেখার সময় কাঁদছি আমিও সেই রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধকের জন্য যিনি ব্রাত্য নন- 'যিনি আমার প্রাণের গভীর গোপন মহা আপন'।






No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...