Tuesday, 22 September 2020

গল্পের পাতা ৪

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#নবম_পাতা






,#শিল্পী


#দেবাশিস_দে


অন্যান্য দিনের মতো অতটা ভিড় না থাকলেও ভালোই ভিড় আছে বাসে। এর মধ্যে ষাট উর্ধ মানুষটি বাসে গেট দিয়ে উঠে সামনে দাঁড়ান।তারপর ভিতরে যাবার চেষ্টা করে কিন্তু যেতে গিয়ে বাঁদিকে ডানদিকে এর ওর গায়ে পড়ে যাচ্ছেন। সবাই দেখছে তা। একজন বলল, দাদা আপনার কী শরীর খারাপ লাগছে ? ভদ্রলোক ক্ষীণ স্বরে বলেন, হ্যাঁ, শরীরটা ভালো নেই। সামনের একজন বলে দাদা, আপনি কি বসবেন ?

 বসলে হয়ত ভালো লাগত। ভদ্রলোক আবার ক্ষীণ স্বরে বলেন - না, না,ঠিক আছে, ও একটু পরে ঠিক হয়ে যাবে। 


এর মধ্যে কন্ডাকটার তার কাছে টিকিট চায়, ভদ্রলোক বলে তার কাছে টাকা পয়সা নেই। কন্ডাক্টর নাছোড় বান্দা টিকিট দিতেই হবে। সবাই তখন কন্ডাক্টরের ওপর চিৎকার করে ওঠে - দেখছ না উনি বলছেন ওনার টাকা নেই, শরীর খারাপ, কেন ওনাকে জোরাজুরি করছ ? একটা টিকিট না পেলে তোমার কী ক্ষতি হবে। 


গেটে দাড়ানো আর এক ভদ্রলোক বলেন - কত লোক তো টিকিট না কেটে নেমে যাচ্ছে তোমরা কিছু বলনা আর ওনার শরীর খারাপ বলেই তো বাসে উঠেছেন, তোমাদের কী মায়াদয়া নেই ? ঠিক আছে ওনার পয়সা আমি দিয়ে দিচ্ছি, বলে টাকা বার করে কন্ডাকটর কে দেন। কন্ডাকটর টিকিট কেটে টিকিট আর ফেরৎ পয়সা তাকে দেয়। 


বাসের ভিতরে ঐ ভদ্রলোক ঐ একই ভাবে এর ওর গায়ে পড়তে পড়তে এগিয়ে চলে ভিতরের দিকে। সিটে বসা দুই ভদ্রমহিলা আলোচনা করতে থাকে এই অসুস্থ বয়স্ক মানুষকে বাড়ির লোকে কি ভাবে ছেড়ে দেয়, এদের কোনো আক্কেল জ্ঞান নেই। যদি কোথাও পড়ে যান কে দেখবে বলত। 


ক্রমশঃ বাসে ভিড় বাড়তে থাকে।যে যার মত অন্তর গহবরে প্রবেশ করে অথবা জানলার বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে থাকে বা দিবানিদ্রায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কন্ডাকটর আবার সবার কাছে টিকিট চাইতে চাইতে ভিতরে ঢুকতে থাকে। টিকিট চায়। সবাই পকেটে হাত চালায়। 


এর মধ্যে একজন বলে ওঠে আমার পার্স পাচ্ছি না, কোথায় গেল! দুইজন বলে আমার মোবাইল পাচ্ছি না। বাসের ওই কষ্ট করে এগিয়ে যাওয়া মানুষটি আর গেটে দাড়ানো সেই মানবিক ভদ্রলোককে বাসের মধ্যে পাওয়া গেল না।




#দুর্গতিনাশিনী


#কমল_ঘোষ


সরিতা দি, সকলেরই দিদি, লোকের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে দিন গুজরান হয়। একমাত্র সন্তান অর্ণব কলেজে পড়ে। অর্ণবের বয়স যখন চার তখনই দুরারোগ্য ব্যাধিতে তার বাবা মারা যায়। সেই থেকেই অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম শুরু। কেউ পাশে দাঁড়ায় নি। বরঞ্চ উনি বস্তির ছেলে - মেয়েদেরকে যথাসাধ্য সাহায্য করেন। সেই সরিতা দি, দেবেন বাবুর অনুরোধে একটা সংগঠনের প্রতিবাদ সভায় পরিশীলিত অথচ তীব্র ভাষায় ভাষণ দিয়ে হৈচৈ ফেলে দিলেন। এমন হৃদয় ছোঁয়া ভাষণ শোনা যায় না বললেই চলে। কিন্তু সামান্য চাকরাণীর এমন প্রতিবাদী কণ্ঠ সহ্য না হওয়ায় দু-একটা বাড়ির কাজ থেকে তাকে ছাঁটাই হতে হল।


তারপর কি ঘটেছিল সে কথা থাক। অর্ণব সাম্মানিক স্নাতক হল। সরিতা দি দেবেন বাবুকে কল-কারখানায় একটা চাকরি দেখে দিতে বললেন। কিন্তু দেবেন বাবু আলবত জানতেন যোগ্যতা থাকলেই চাকরি হয় না, হলেই বা বেসরকারি। তাই তিনি শ্রমিক সংগঠনের সম্পাদককে সবিস্তারে জানালেন। শুনে ফোঁস করে উঠলেন - না, না, হবে না। দলের কাজ করতে বলুন। পরে দেখব।


বাধ্য হয়েই অফিসারদেরকে বলে কয়ে চাকরি একটা হল। চাকরি পেয়েই প্রতিবেশী সুশান্ত বাবুর মেয়ের সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়ল। ক'টা মাস যেতে না যেতেই শ্বাশুড়ী-বৌমার বিরোধ চরমে পৌঁছল। 


শ্বাশুড়ী নাস্তিক, পূজোপাঠের তোয়াক্কা করেন না। বাড়িতে সন্ধ্যাদীপও জ্বলে না। তার ওপর আবার লোকের বাড়ির ঝি। তাই বৌমা বাপের বাড়ি চলে গেল, সঙ্গে ছেলেও। ভিটে আগলে পড়ে রইলেন মা। ছেলে অবশ্য প্রতিদিনই মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে। মাকে বলে - চাকরিটা না করলে পরাধীনতা কি জিনিস জানতে পারতাম না।


 উচ্চ পদস্থ কর্মীদের আজ্ঞাবহ দাস এবং শ্রমিক সংগঠনের অনুগত না হলে কোন না কোন মিথ্যা অভিযোগে বরখাস্ত নিশ্চিত।


হলও তাই। ছেলের নিষেধ সত্ত্বেও দেবেন বাবু মাকে সে কথা জানিয়ে দিলেন। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি টেরও পেল না। চাকরির নাম করে খানিকটা দূরে একটা কোচিং সেন্টারে পড়াতে যায়, আর নিজে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করে। মাসের শেষে মা ছেলেকে কিছু টাকা দেন, ছেলে নিতে চায় না, কিন্তু তিনি দেবেনই। মা যে জানেন এটা ছেলের দুঃসময়।


দৃঢ় সংকল্প আর মেধার জোরে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগ দিল। প্রতিবেশীরা খুশি হয়ে মহালয়ার দিন তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। মা উপস্থিত দর্শকদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বক্তব্য রাখার জন্য উঠে দাঁড়াতেই ছেলের কানে এল - আরে মা যে অনেক দূরে রয়ে গেলেন। ছেলে বলতে শুরু করল-কাছে, না দূরে, সেটা বড় ব্যাপার নয়। সূর্য দূরে থাকলেও তার আলো থেকে আমরা বঞ্চিত হই না। 


কিন্তু কাছের প্রদীপগুলো সামান্য ঝঞ্ঝায় নিভে যায়। তাই দূরে থাকলেও যে আমার হৃদয় জুড়ে আছে সে তো আমার মা, সাক্ষাৎ মা দুর্গা, যে সমস্ত অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি যোগিয়েছে। শুধু মা কেন! এমন দুর্গতিনাশিনীদের জয় হোক।




 #ভাঙচি


#তিস্তা_বেজ


আনলক্ থ্রি-র শেষ দিনটা সাদামাটা ছুটির মতোই বাড়িতে বসে। সৌনাভর ভাতঘুমের অভ্যেস নেই। দুপুরটা তাই Netflix - এ ডুবে রইলো। অনেক আগের একটা ফিল্ম। আজ নতুন করে আবার দেখতে দেখতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিলো।


 অন্ধসংস্কার কী ভয়ঙ্কর ভাবে সমাজকে গ্রাস করে! বিশ্বাসের শিরদাঁড়া দুমড়ে মুচড়ে দেয়!


মাথাটা এখনো ঝিমঝিম করছে । ভারাক্রান্ত মনে পশ্চিমের জানালাটায় গিয়ে দাঁড়ালো। অপরাহ্নের আকাশটা আজ অদ্ভুত এক গোলাপি আলোয় মাখামাখি হয়ে আছে। দূরের দিকে তাকিয়ে থাকলে আরো মন খারাপ লাগে। অস্থির হাতে ব্র্যাকেট থেকে পাঞ্জাবিটা নিয়ে গলাতে গলাতেই দ্রুত নীচে নামলো। সন্তপর্ণে দরজা খুলে হ্যাণ্ডলক্ লাগিয়ে রাস্তায় বেরোলো। কিছু ভালো না লাগলে সৌনাভ গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসে । বাড়ি থেকে হাঁটা পথে তিন মিনিট। রাস্তায় আজ একটা লোকও নেই। নিঃসঙ্গ নদীর ঘাটটা একাই বসে প্রহর গুনছে। বাঁধানো চাতালে বসে ওপারের দিকে চোখ ছড়িয়ে দিলো সৌনাভ। ওপারে ব্যারাকপুরের একই অবস্থা।


 জনমানুষ চোখে পড়ছে না। শহর যেন মূক-বধির সেজেছে। মাঝখানে নিঃশব্দে বয়ে চলেছে ভাগীরথীর হালকা সবুজ জলধারা। এখানেও বেশিক্ষণ বসতে ভালো লাগছে না। মনটা অশান্ত অশান্ত লাগছে। জোয়ারের ফেলে যাওয়া পলিস্তুপের দিকে নজর যেতেই পঞ্চানন কাকার মুখটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। এ সময় পঞ্চানন পালের কর্মশালা ব্যস্ততায় ডুবে থাকে। অতগুলো কর্মচারীকে নিয়ে পঞ্চাকাকা হিমশিম খায় কাজ সামলাতে। নাওয়া খাওয়ার ফুরসত থাকে না। সামনে বিশ্বকর্মা। তারপরেই দূর্গা, লক্ষ্মী, কালী, জগদ্ধাত্রী। একেবারে কার্তিক তৈরির পর একটু অবকাশ মেলে ।


 ছেলেবেলায় কত সময় কাটিয়েছে এই পঞ্চাকাকার মূর্তিশালায়। একটা আলাদা ভালোলাগা। একটা আলাদা বিস্ময়।


একতাল পলিমাটি চোখের সামনে রোজ একটু একটু করে নিখুঁত প্রতিমা হয়ে ওঠা কি কম কথা?? সেই মূর্তিশালা আজ চুম্বকের মতো টানছে সৌনাভকে। ঘাট ছেড়ে মন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে চলল কুমোর- পাড়ার দিকে। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। সৌনাভ পঞ্চানন পালের বাঁশের দরজায় এসে অবাক। এতো স্তব্ধতা !! শ্মশানকেও হার মানাবে এই নীরবতা। ভেতরে আলো জ্বলছে না...। একটা মানুষেরও সাড়া নেই! 


বাঁশের দরজার দড়ির বাঁধন খুলে নিজেই 'পঞ্চাকাকা' 'পঞ্চাকাকা' করতে করতে ঢুকে পড়লো। ভেতরে একটা টিমটিমে হলদে আলোর টুনি জ্বলছে। তার অল্প আলোয় সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো কাঠামোগুলো। কোনোটায় মাটির প্রথম প্রলেপও পড়েনি। ঝিম ধরা পরিবেশে মাকড়সারা জাল বুনে চলেছে পরম নিশ্চিন্তে। বুকটা ধক্ করে উঠলো তার। তবে কি পঞ্চাকাকাও....???


মূর্তিশালার ভেতর দিকে আরেকটা বাঁশের বেড়ার ওপারে কাকার বসতবাড়ি। ক্লাবের ঠাকুরের বায়না দিতে আগেও অনেকবার ঢুকেছে ভেতরবাড়িতে। আজও সেভাবেই ঢুকলো। খাঁ খাঁ করছে চারপাশ। সামনের রকে, আবছা অন্ধকারে বসে আছে এক ছায়মূর্তি। তার এলো চুল আগুনের শিখার মতো বিস্রস্ত। কপালে ঘেঁটে যাওয়া সিদুরটিপ। দৃষ্টিতে ঠিকরানো আগুন । ঠিক যেন দুপুরের সিনেমাটার শেষ দৃশ্যের শর্মিলা ঠাকুর। মেনকা কাকিমা!! ভয়ে ভয়ে ডাকলো,- 'কাকিমা...'


ছায়ামূর্তি উঠে দাঁড়ালো।বিরক্ত মেশানো ঝাঁঝালো গলা, - কে ?


তার পিছু পিছু ভ্যাপসা ঘরটায় ঢুকে বিছানায় মিশে থাকা মানুষটার ভেতর থেকে চেনা মানুষটাকে খুঁজে পেতে অনেকটা সময় লেগে গেলো সৌনাভর। কর্মহীন হ'লে ব্যস্ত মানুষের কি শোচনীয় অবস্থা হয়, নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। পাগলপ্রায় মানুষটা কান্না ভেজা গলায় কেবলই বলে চলেছে, ' একটা বায়নাও এলো না?? মেনকা, ......?'


চোখ বাষ্প হয়ে উঠলো সৌনাভর। নিঃসন্তান যে মানুষটা সারা জীবন কাদামাটি, রঙ, তুলিতেই কাটিয়ে দিলো, যার প্রতিমা বিগত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় ক্লাবগুলোকে সেরার সেরা পুরস্কার এনে দিলো , তার এই অবস্থা?


মাথা নীচু করে বেরিয়ে এলো । সোজা ক্লাবে গিয়ে বিকাশকে চেপে ধরলো। সব শুনে তো তাজ্জব। এটাও সম্ভব!


কুমোরপাড়ায় ঢোকার মুখেই নাকি কে বা কারা মিথ্যে রটিয়েছে, যা শুনে কোনো ক্লাবই আর ও-মুখো হতে সাহস পায়নি।


বেগড়া ? হিংসা ? ইগো? কারা করলো এতো বড় মিথ্যাচার!! কেন করলো ?



 

No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...