Sunday, 25 October 2020

বিশেষ কিন্নর ৬

 আজ দশমী।


আমাদের শারদীয়া কিন্নর দলের উৎসব শেষ হলো। 

আজ প্রধান সম্পাদকের কলমে আমাদের শেষ অঞ্জলি।


🙏


❤️


✍️


#চাঁদ 


#শতদ্রু_মজুমদার 


একটা লিটল ম্যাগাজিনের নাম সিঁড়ি l এর প্রতিটি সংখ্যাই বিশেষ সংখ্যা l মেলা -দিঘি -শ্মশান এর পর এবারের বিষয় চাঁদ !সম্পাদক জানিয়েছেন :কবিতা লিখতে হবে --ছড়া নয় !অবিশ্যি আগের সংখ্যায় ছড়া লিখেছিলাম !কিন্তু মাস খানেক হলো চাঁদ নিয়ে কোনো কবিতা লিখতে পারছি না !কবি সুকান্ত চাঁদকে ঝলসানো রুটির সঙ্গে তুলনা করেছেন l দীনেশ দাস বলেছেন :এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে !সাম্প্রতি সুবোধ সরকারের চাঁদ পড়লাম !দুর্দান্ত l মুশকিল হল আমার কলম দিয়ে একটা লাইনও বের হচ্ছে না l অথচ ছোটো বেলা থেকেই তো চাঁদ দেখে আসছি !আমাদের ভাড়া বাড়ির পিছন দিকে ছিল বাঁশবন !সেখানে চাঁদ দেখে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বিখ্যাত লাইন মনে পড়ত :বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই ---

গরমকালে রাতের দিকে রাজ মাঠে শুতে যেতাম !মাথার ওপর চাঁদ !মনে হত সরে সরে যাচ্ছে !কিন্ত চাঁদ স্থির l আসলে মেঘ সরে যেত বলে ওই রকম মনে হত !সে যাই হোক গিয়ে !

ডিউটিতে এলে আমার পকেটে একটা নোট বুক থাকে l কিছু মনে পড়লেই লিখে রাখবো !আমি 'মেঘমল্লার 'এপার্টমেন্ট এর কেয়ার টেকার !12ঘন্টা ডিউটি !চার হাজার দেয় !আগে একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করতাম l করোনার কোপে সেটা গেছে !একটা মাত্র ছেলে পালিয়ে বিয়ে করে আমাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না !আমার বউ ঘরে বসে ঠোঙা গড়ে !যেনতেন চলে যায় l 

#

তিন তলার একটা মেয়ে কবিতা লেখে !আমার সঙ্গে আলাপ আছে l আমাকে অনেক কবিতার বই দেয় পড়তে l ওর নাম রীতি l একদিন রীতিকে নিজের সমস্যার কথা বললাম !সে বললো একটু গভীর ভাবে ভাবুন ঠিক মনে আসবে !মাঝে মাঝে ছাদেও উঠতে পারেন l খুব ভালো চাঁদ দেখা যায় !একদিন উঠলাম !সেদিন ছিল পূর্ণিমা l নিটোল চাঁদ দেখলাম l আর সেটা দেখতে গিয়েই বিপত্তি !একটা নতুন স্কুটি চুরি গেল !দত্তবাবু রীতি মত চার্জ করলেন :আপনি ছাদে উঠেছিলেন কী করতে ?বলুন --আনসার মি !

আমি আস্তে করে বলি :চাঁদ দেখতে !

---হোয়াট ?বুড়ো বয়সে ভীমরতি !

#

কাজটা চলেই গেল !রীতি অনেক চেষ্টা করেছিল !কোনো ফল হলো না !আসার সময় সে আমার হাতে একটা চিরকুট দিয়েছিল !কবিতার লাইন ---মানে আমার কবিতার গাইড লাইন :

ছোটবেলায় মায়ের দেখানো চাঁদ 

মুছিয়ে দিয়েছে চোখের জল কত 

হায় !

সেই আমি আজ একই চাঁদের আলোয় মুছতে পারি না বুকের গভীর ক্ষত !


(কাব্যপংক্তি তানিয়া ব্যানার্জী )

বিশেষ কিন্নর ৫

 আজ মহানবমী। 

আজ রইল তৃষ্ণা বসাকের অনুবাদ গল্প। 


✍️


#আলোকবর্ষ


(ই সন্তোষ কুমার

মূল মালয়ালম থেকে  ইংরেজি অনুবাদ- পি এন  বেণুগোপাল)


ইংরেজি থেকে অনুবাদ- #তৃষ্ণা_বসাক 


‘জেমস, আমি আগে এখানে এসেছি। এখানে, এই রেলিংগুলো ধরে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম’ কমলা উচ্ছসিত গলায় বলল, ঝুলন্ত ব্রিজের রেলিংগুলো শক্ত  করে আঁকড়িয়ে, জলের  কলকল আওয়াজ শুনতে শুনতে।

‘যাত্রা শুরুর সময় তুমি বলেছিলে এটা’ জেমস হেসে বলল।

‘ও, তাই ? কিন্তু সত্যি, ঠিক এই জায়গাটাই। ঠিক এই জায়গাটাই। জাস্ট একটা ছোঁয়া, ব্যস সব মনে পড়ে যাবে। এটাই আশ্চর্য।’

‘সত্যি!’

‘হ্যাঁ জেমস। কিন্তু সেইসময় অনেক বেশি জল ছিল। দূর থেকেই শব্দ শোনা যেত। আমরা ঠিক বর্ষার পরেই এসেছিলাম।সেসময়ে আমরা ব্যঙ্গালোর থাকতাম, জানো। কেন, আমি যা বলছি, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?’

‘ওহ, এটা আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয় কমলা। তুমি অন্তত পাঁচ বছর আগে এসেছিলে, তাই না? তাহলে তুমি কী করে এত জোর দিয়ে বলতে পারো, তুমি ঠিক এই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে ছিলে?’

‘আমি পারি জেমস। আমি কিছু জিনিস দেখতে পাই, যা তুমি পাও না, যদিও তোমার চোখ বড় বড় করে খোলা।‘

‘তুমি সবসময় চোখের কথা বল’ জেমস বলল

কমলা জোরে হেসে উঠল। ‘আর কিছু না হোক, আমি অন্তত চোখ নিয়ে বলতে পারি, না জেমস?’

তারপর সে চুপ করে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জলস্রোতের শব্দ শোনার চেষ্টা করছিল।

একজন পর্যটক তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। ঝুলন্ত ব্রিজের রেলিংগুলো ক্যাঁচকোঁচ করে উঠল। 

‘হ্যাঁ আমি এখানে এমনি করেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ কমলা মনে করার চেষ্টা করল। সেটা সিজন টাইম ছিল, খুব ভিড়। লোকজন আমাদের গা ঘেঁষে ঠেলে চলে যাচ্ছিল। আর ব্রিজটা সাংঘাতিক দুলছিল। লোকের ধাক্কায় আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। ভাগ্যিস নন্দন আমায় ধরে ফেলেছিল। এইরকমই ছিল ও। সবসময় আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকত। নন্দন সবসময় আমার খেয়াল রাখত।’

‘আমার কথায় তুমি কি আপসেট হয়ে পড়লে?’ জেমস ওর ক্যামেরা শীর্ণ জলস্রোতের ওপর জুম করতে করতে জিগ্যেস করল।

‘এই, আপসেট হবার মতো কী আছে?’

‘কিছু না। কিন্তু আমি তোমাকে তোমার চোখ নিয়ে বলছিলাম’

‘তুমি আমার চোখ নিয়ে কথা বলোনি।ওটা আমার সমস্যা। চোখের দৃষ্টি নেই বলে তাকে কেন দোষ দিতে হবে, জেমস? আমি তোমায় একটা কথা বলব জেমস? নন্দন আমার চোখদুটোকে পুজো করত। ও বলত, আমার চোখ দুটো বড় বড়। সে এমনকি একবার আমার চোখে কাজলও টেনে দিয়েছিল’


‘তাই?’

‘হ্যাঁ’

‘ওহ, তাহলে সে তো নিশ্চয় দারুণ রোম্যান্টিক’

‘এটা কী, মাই ডিয়ার জেমস? ভালবাসার মানুষের চোখে কাজল পরানোর মধ্যে কিছু দোষ আছে?’

‘কে জানে? এটা কিন্তু কোনদিন আমার কাছে আশা করো না কমলা।’

‘জেমস, প্লিজ তুলনা করো না। প্রত্যেকে আলাদা, তাই না?’

যদিও তারা দুজনেই ঝর্নার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, তবু খুব গরম লাগছিল। 

চারটের ম্লান সূর্য বালির ওপর পাতার ছায়াচ্ছন্ন ছবি আঁকছিল। 

রাস্তার ধারের ফেরিওলার কাছ থেকে ওরা শশা কিনল। শসাগুলো সত্যি ঠান্ডা ছিল। এক কামড় দিয়ে, কমলা তার শসাটা ফালি ফালি করে দিতে বলল আর ফেরিওলাকে বলল তার ফালিগুলোয় লংকা গুঁড়ো আর নুন লাগিয়ে দিতে। কিন্তু জেমসের চা খেতে ইচ্ছে করছিল।

কমলা জিগ্যেস করল ‘তুমি ঝর্নার ছবি তুলেছ?’

‘হুঁ,’ অলসভাবে বলল জেমস। কিন্তু তার ক্যামেরা তার কাঁধে প্রিয় পোষ্যের মতো জিরোচ্ছিল। 

কমলা নিজের শসাটা শেষ করে বলল ‘বেড়াতে বেরিয়ে এইসব ছোট ছোট জিনিস নিয়ে খুশি থাকত নন্দন। কখনো কেউ ভাবতে পারে নন্দন খুব কিপ্টে, কিন্তু ঘটনা সেটা নয়। আসলে বাইরের খাবার থেকে সমস্যা হবে এই দুশ্চিন্তা করত। প্রায়ই বলত ‘পেট গড়বড় করবে’ কিন্তু যাই কারণ হোক, বেড়ানোর দুদিনের মধ্যেই সে একটা কাঠির মতো রোগা হয়ে যেত।

জেমস ওকে একটা কিছু জিগ্যেস করতে গিয়েও করল না

কমলা হাসল ‘ কাঠির মতো! তুমি কী করে দেখলে? তোমার জিভে এই প্রশ্নটাই উশখুশ করছে, না জেমস?’

‘এই, না’ জেমস নিজের লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করল। 

‘হ্যাঁ সোনা, আমি মন পড়তে পারি। আমরা যখন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরি, তখন তো নিজেদের চেহারা বুঝতে পারি, পারি না, জেমস?’

‘আমার এক কাপ চা চাই’ জেমস বলল।

তার সেলফোন বেজে উঠল, কিন্তু সে উপেক্ষা করল। ঝর্না থেকে সরু পথ ধরে বেরনোর জায়গাটা বেশ খানিকটা দূরে। ক্লান্ত কমলা ফুটপাথের ধারে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে পড়ল। 

‘অনেকদিন পরে এতটা হাঁটলাম আমি।’ ‘আমার পা ব্যথা করছে’ জেমস বলল। কমলা তার শাড়ির নিচটা তুলে পায়ের ডিমে মাসাজ করল। তার গা দিয়ে ঘামের গন্ধ বেরোচ্ছিল। কয়েকটা মেয়ে তাদের পাশ দিয়ে জোরে জোরে কথা বলতে বলতে ঝর্নার দিকে হেঁটে গেল।কমলা মাথা নিচু করে তার পা মাসাজ করতে থাকল যতক্ষণ না ওদের গলার স্বর দূরে মিলিয়ে গেল। 

‘তুমি কি ওদের দিকে তাকালে?’ কমলা জিজ্ঞেস করল

‘কাদের দিকে?’

‘এক্ষুনি আমাদের পাশ দিয়ে গেল, ওই মেয়েগুলো’

‘না তো, কেন?’

‘মিথ্যুক, তুমি  মেয়েদের দেখো না, নাকি?’

‘ওহ ওরা!’

‘ওরা কি সুন্দর ছিল?’

‘হবে হয়তো’

‘ লুকোচ্ছ কেন? সৌন্দর্য তো দেখার জন্যেই তাই না?’

‘ওহ, তোমার সঙ্গে থেকে কী করে আমি অন্য মহিলাদের দিকে তাকাব?’ জেমস হাসল

‘মহিলা নয়, মেয়ে। এরা কমবয়সী। ওদের কথা শুনলেই বোঝা যায়’

‘ওকে কমলা। হোক না’

‘নন্দনের সঙ্গে যখন থাকতাম, এই একটা দারুণ জিনিস ছিল। ও আমার জন্যে সবকিছু বর্ণনা করত।’

‘তুমি নিশ্চয় হিংসেয়  জ্বলে পুড়ে মরতে’

‘কেন? আমি তো আর বাচ্চা ছিলাম না’ কমলা হাসল

‘শুনবে জেমস। ব্যাঙ্গালোরে থাকতে প্রতি সন্ধেয় আমরা কোন না কোন মলে যেতাম আর ছেলেমেয়েদের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা ওদের কথা আলোচনা করতাম। দারুণ মজা হত। তুমি যদি টিটকিরি না করো, তবে তোমায় একটা দুষ্টুমির কথা বলি’

‘আমি তোমায় ঠাট্টা করি না। তুমি এর মাস্টার’

‘ধন্যবাদ জেমস’

‘বেশ। কিন্তু কী যেন আমায় বলতে যাচ্ছিলে তুমি?’

‘হাহা, মজার কথা একটা। কোথায় যেন থামলাম? হ্যাঁ, আমরা মলের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম তরুণ তরুণীরা ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। নন্দন আমায় বলেছিল, ছেলেমেয়েগুলোর লো ওয়েস্ট জিনসের ওপর দিয়ে ওদের অন্তর্বাস দেখা যাচ্ছে। সে সময় ওটাই চলছিল’

‘তো?’

‘তো কী? আমি নন্দন কে বলতাম আমাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানাতে। সারা সন্ধে ওই অন্তর্বাসগুলো নিয়ে আমরা মজা করতাম’

কমলা হাসতে শুরু করল, হেসেই চলল, যতক্ষণ না কাশতে শুরু করল।

‘তুমি একটু খেপি আছো কমলা’ জেমস বলল ‘তুমি একা নও, তোমরা দুজনেই। ও কেন তোমায় ছেড়ে চলে গেল আমি বুঝতে পারি না। তোমরা সত্যিই মেড ফর ইচ আদার’

কমলা কোন সাড়া করল না। সে তার শাড়ি ঠিক করল আর হাত জোড় করে ওখানেই অলসভাবে বসে রইল।তারপর সে তার চোখ বুজল। জেমস ওর চোখের পাতার পাণ্ডুর নগ্নতার দিকে তাকাল না। সে ক্যামেরা বার করে একটা পাতা ঝরানো গাছের ছবি তোলার চেষ্টা করল। পত্রহীন শাখায় তিনটে পাখি কিচিরমিচির করছিল। 

আবার তার সেলফোন বাজল। কিন্তু সে আগের মতোই কয়েকবার বাজার পর থামিয়ে দিল।

‘চলো যাওয়া যাক’ কমলা বলল। ‘ড্রাইভার নিশ্চয় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে’ 

‘এটা ওর কাজেরই মধ্যে পড়ে। এর জন্যে কি আমরা ওকে টাকা দিই না?’

‘ফোনটা ধরলে না কেন?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘ভাবলাম পরে ধরব’

‘এলিজাবেথ ছিল, তাই না?’

‘হ্যাঁ কেন?’

‘আন্দাজ করলাম। ও  এখনও তোমাকে ফোন করে যায়?’

‘ওর গরজ। আবার ফোন করবে’

‘কী সেই মহা দরকার?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘ওহ, কিছু না’

‘কিন্তু তবু... নাকি আমাকে বললে কোন সমস্যা হবে?’

‘কীসের সমস্যা? ও নিজেই তো একটা সমস্যা’

কমলা হাসে ‘ দাঁড়াও আমাকে আন্দাজ করতে দাও। ওয়াইল্ড গেস।তোমার কাছে এমন কিছু আছে যাতে ওর ক্ষতি হতে পারে। একটা চিঠি, কিছু তথ্য...। এইরকম কিছু, তাই না?’

‘এটা তো তোমার গেস, তাই না? আমি কেন বলব এটা ঠিক না ভুল?’

‘ইয়েস। এটাই আমার প্রশ্নের একদম সঠিক উত্তর’ কমলা হাসল। তারপর সে চুপ হয়ে গেল। 

‘এরকম করো না জেমস’ কমলা বলল ‘ওকে  ছেড়ে দাও’

জেমস সাড়া করল না।

‘জাস্ট ছেড়ে দাও’ কমলা বলল মাথা তুলে। ‘তুমি যদি রাগের মাথায় র‍্যাশ  কিছু করো তো পরে পস্তাবে। ঘৃণা জিনিসটা ভালবাসার মতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একঘেয়ে হয়ে যায়’

এবারেও জেমস কোন উত্তর দিল না। সে তাকিয়ে দেখল ডাল থেকে পাখিগুলো উড়ে গেছে। 

‘তোমার এক্স-র নামটা যেন কী? ওহ,হ্যাঁ, নন্দন। তুমি কি নন্দন বলে ডাকো?’ হঠাত জিগ্যেস করল সে।

‘আমার স্বপ্নে’ এই কথা বলে কমলা ওর হাত ধরল। কমলার হাত  অস্বাভাবিক রকমের  ঠান্ডা, জেমস ভাবল।

‘আচ্ছা, এই জায়গাটা কি ভালো জেমস?’

‘হ্যাঁ, কেন একথা জিগ্যেস করছ?’

‘আমি জানি না। কিন্তু কেন জানি গতবারের মতো লাগছে না’

‘কমলা উঠে এই বেঞ্চের একদম ধারে গিয়ে দাঁড়াও, হাতদুটো নামাও। এইতো, এবার আমি একটা ছবি নেব’

‘ঠিক আছে?’

‘একদম। আর একটা’

‘এই দিনের আলোয় তুমি ফ্ল্যাশ ব্যবহার করলে কেন?’

‘তুমি কি করে বুঝলে?’

‘আমি বুঝি। এটাই। নন্দন কখন ফ্ল্যাশ ইউজ করত না। ও স্বাভাবিক আলো পছন্দ করত।’

ওরা যখন গেট পেরিয়ে পার্কিং লটে গিয়ে দাঁড়াল, ক্যাব ড্রাইভার ওদের কাছে গাড়ি নিয়ে এল। সকালে হোটেলেই গাড়ি ঠিক হয়ে গেছিল। ড্রাইভার এক মাঝ বয়সী লোক। ও বলেছিল ওর বউ মালয়ালি। বোধহয় এই জন্যই কি  সে এদের প্রতি কন্সিডারেট ছিল? বুদ্ধ মন্দিরে পৌঁছতে এক ঘন্টার বেশি লাগল। ততক্ষণে গোধূলি হয়ে গেছে। কমলা নন্দনের সঙ্গে তার স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছিল। 

সেবার তারা মদিরের সামনে একটা হোটেলে উঠেছিল। সেটা চালাত লামারা। সন্ধেবেলা ওরা মন্দিরের রাস্তা ধরে অনেক ভেতরের গ্রামে চলে গিয়েছিল। রাস্তাটা ছিল নির্জন, পরিত্যক্ত। অন্ধকার হয়ে গেলেও নন্দন হাঁটা থামায়নি। সেটা ছিল উদবাস্তুদের গ্রাম, তাদের বাড়ি, মন্দির, ইস্কুল, দোকান আর তারপর ভুট্টা খেত। নন্দন তাকে সব খুঁটিয়ে বলেছিল। ফেরার পথে রাস্তার ধারের ঝুপড়ি থেকে ওরা চা খেয়েছিল। এটা চালাত একজন তরুণ উদ্বাস্তু। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা এই জায়গাতেই। তার মাতৃভূমি তার কাছে ছিল কানে শোনা এক দেশ।নন্দন সবসময়েই এইসব খুঁটিনাটি জানতে আগ্রহী ছিল। 

‘আমরা লামাদের হোটেলে থাকতে পারতাম’ কমলা বলল

‘ওই হোটেলে হয়তো বিদ্যুৎ জল কিছুই নেই’ ভাঙ্গা ভাঙ্গা মালয়ালমে ড্রাইভার বলল

‘কিন্তু বিদ্যুৎ দিয়ে কমলা কী করবে, তাই না?’জেমস বলতে বলতে থেমে গেল 

‘সত্যি।’ কমলা হাসল। ‘সবসময় আমরা কেন বিদ্যুৎ চাই? আমাদের আগেকার দিনের  লোক কি এটা ছাড়া বাঁচেনি?’

একজন ভিখারি তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইল, সে চেঁচিয়ে বলছিল সে অন্ধ। জেমস তার পার্স থেকে কিছু খুচরো বার করে তাকে দিল। 

‘একি জেমস, তুমি ওকে ভিক্ষা দিলে?’

‘বেচারা চোখে দেখতে পায় না’

‘ও কি চোখে দেখতে পায় না বলেই গরিব?’

‘তাই নয় কি?’

‘না। তাহলে তোমার হিসেবে আমিও তো গরিব?’

‘কক্ষনো না’

‘সেক্ষেত্রে তুমি ওকে ভিক্ষা দেবে কেবল সে অন্ধ বলে?’

জেমস উত্তর দিল না। দূরে সে দেখল বৌদ্ধ মন্দিরের সোনালি তোরণ আর সূর্যের আলোক স্নান । সে দৃশ্যটার ছবি নেবে কিনা ভাবল। 

‘একজনের চোখের দৃষ্টি নেই। ব্যস এইটুকুই’ কমলা বলে চল্ল ‘প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা সীমাবদ্ধতা আছে । তুমি কি সবাইকে ভিক্ষা দিয়ে চলবে? অন্ধ বলে ও যে কমা মানুষ তা কিন্তু নয়’

‘ওহ কমলা, তুমি আর তোমার দর্শন! নাকি এটা সেই ভদ্রলোকের থেকে এসেছে?’

‘নন্দন কক্ষনো কাউকে ভিক্ষা দিত না। এটা ছিল ওর নীতি’

‘তুমিও দাও না। এখানেই গল্প শেষ, তাই না?’

কমলা মন্দিরের হলের মেঝেতে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, যেন প্রার্থনা করছে। নৈঃশব্দ্য রহস্যময় মন্ত্রের মতো চারপাশে অনুরণিত হচ্ছে, সে অনুভব করল। 

রাতের জন্যে ওরা একটা হোমস্টেতে গেল। জেমস আগের রাতে ইন্টারনেটে এটা খুঁজে বার করেছিল। দোতলা একটা বাড়ি। অতিথিরা ওপরতলায় আর বয়স্ক দম্পতি নিচতলায়। তাদের ছেলেমেয়ে বাইরে আর তারা অন্য কিছু না, মূলত সঙ্গ পাবার জন্যেই অতিথিদের রাখত। ভাড়াও তুলনামূলকভাবে সস্তা, যেহেতু এটা টুরিস্ট সিজন নয়। 

‘ওরা ভেবেছে আমরা কাপল’ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বলল জেমস।

‘তুমি ওদের শুধরে দিতে পারতে’

‘যদি আমাদের চলে যেতে বলে তখন? এই রাতে আমরা কোথায় যাব? উনি আমাকে বললেন মিসেসের খেয়াল রাখতে। এও বললেন ব্যালকনির রেলিংগুলো নিচু, তোমাকে যেন একা যেতে না দি’

‘চিন্তা করো না। আমি ঘরের বাইরে বেরব না’

‘আমি ওদের কাছে এখন হিরো’

‘হ্যাঁ, তুমি এক বেচারি অন্ধকে নতুন জীবন দিয়েছ?’ কমলা হাসল

বিছানায় যাবার আগে জেমসের আবার একটা ফোন এল। কে ফোন করছে না দেখেই সে ফোনটা কেটে সাইলেন্ট মোডে করে দিল। 

কমলা তখনও বৌদ্ধ মন্দিরের কথা ভাবছিল। গতবার তারা দিনের বেশির ভাগ সময়টাই ওখানে কাটিয়েছিল। মন্দিরের চারপাশে ঘুরে বেড়িয়েছিল। হলে তিব্বতি কারুকাজ, দেওয়ালে পবিত্র মন্ত্রের ক্যালিগ্রাফি... নন্দন তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছিল। মাঝে মাঝেই লামাদের ধর্মচক্রের শব্দ। একটা বোর্ড থেকে নন্দন লামাদের পরম্পরার কথা পড়ে শুনিয়েছিল। তারপর তারা প্রার্থনা ঘরে চুপ করে বসেছিল। কমলা স্মৃতির মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে সে তার চোখ বুজল। 

‘এই ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’ কপালে ওর হাতের স্পর্শে চোখ খুলল কমলা। ছোট খসখসে হাত।

‘তুমি ড্রিংক করেছ, তাই না জেমস?’

‘জাস্ট একটা’ জেমস বলল ‘ফর আ বুস্ট’

‘আমার ভালো লাগে না’ কমলা বলল ‘ তুমি ড্রিংক করলে কিছুই ঠিকঠাক থাকে না’

‘জাস্ট ফ্র দা হেক অফ ইট। এলিজাবেথ কিন্তু এরকম ছিল না। মাঝে মাঝে আমরা একসঙ্গেও ড্রিংক করতাম’

‘ঠিক ড্রিংক নিয়ে কথা না। তুমি ড্রিংক করলে মনে হয় আমি অ্যালকোহলের সঙ্গে শুয়ে আছি। যেন ঘরে অন্য একটা লোক রয়েছে’

‘কিছু এসে যায় না’ জেমস ওকে কাছে টানল

‘এত জোরে ধরো না আমাকে জেমস। আমার লাগে’

সে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। যখন সে তার ঘাড় চাপল, কমলা কাশছিল, যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।  জেমসের ভালো লাগল না।

সে কল্পনা করছিল সে কমলার শরীরে পর্যটন করছে। ঝর্না, সরোবর উঁচু নিচু। ও কমলার গালে চুমু খেতে চাইলে, ও মুখ ঘুরিয়ে নিল। 

‘ তোমার মুখে মদের গন্ধ’ কমলা বলল। জেমস হঠাৎ মুখ সরিয়ে নিল।

‘তুমি সংগত দিচ্ছ না, কমলা’ ও বলল ‘এই জন্যেই কি আমরা এতটা দূরে এলাম?’

যেন সান্তনা দিচ্ছে এমনভাবে ওকে জড়িয়ে ধরল কমলা।এই আলিঙ্গন ওকে মনে পড়িয়ে দিল যখন বিকেলে ঝার্নার ধারে কমলার হাত ওকে ছুঁয়েছিল, সেই শীতল স্পর্শের কথা। 

‘এলিজাবেথ আবার ফোন করেছিল, তাই না?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘পাগল একটা’

‘এসব ভুলে যাও জেমস। তুমি এত অ্যাডামেন্ট কেন? আফটার অল, সে তোমার সঙ্গে তো অনেকদিন ছিল, তাই না?’


‘শিট!’ জেমস নিজের আলিঙ্গন থেকে কমলাকে সরিয়ে দিল।

‘আমি জানি, ও তোমাকে পছন্দ করত। সেটাই কি যথেষ্ট নয়? এটা কি বাধ্যতামূলক যে সারাজীবন একজনকেই পছন্দ করবে?’

‘ওহ, আমি কক্ষনো ওকে সেভাবে পছন্দ করিনি। ও এমন একটা কুত্তি’

জেমস একটা সিগারেট ধরাল। অর্ধেক খেয়ে সে নিভিয়ে কমলার হাত মাসাজ করতে শুরু করল ,হয়তো আরেকবার চেষ্টা করতেই।

সে অনুভব করল তার ডান বাহুতে কিছু একটা বেরিয়ে আছে, কাঁধের নিচে।

‘এটা কী?’

‘’ওহ ওটা’ কমলা বলল ‘একটা স্টিলের রড’

‘কী করে?’

‘একটা অ্যাক্সিডেন্ট। ঠিক আছে।’ কমলা তার বাঁ হাত দিয়ে ডান হাত ছুঁল। ‘ এই জন্যে তোমাকে বলেছিলাম আস্তে করে জড়াতে। এখনও লাগে এখানে। যদিও অনেক বছর হয়ে গেল’

‘কীভাবে হল?’

‘বেশ অনেকদিন আগে’ কমলা ক্যাজুয়ালি বলল

‘এটা বের করে দেবার সময় হয়নি?’

‘হ্যাঁ, আমার মনে হয়। কিন্তু না, এটা একটা স্মৃতি, তাই না জেমস? ওটা এখানেই থাকতে দাও’

জেমস কমলার রাতপোশাক খুলছিল।আলো জ্বালা রেখেই তারা নগ্ন হল। কমলা ওর কপালে নরম চুমু খেল। তারপর সে বিছানায় উঠে বসল।

‘আমার বুকটা দেখো’ যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, এমনভাবে বলল কমলা ‘এখানে একটা ফিকে লাল আঁচিল আছে না?’

‘কোথায়?’

‘এখানে... বাম বুকের নিচে, হার্টের খুব কাছে’

‘আমি আর বিশ্বাস করব না কমলা যে তুমি দেখতে পাও না’ জেমস আঁচিলটায় ঠোঁট চেপে বলল।

‘আমি জানতাম না’ কমলা হাসল

‘তাহলে? ওহ, নিশ্চয় নন্দন বলেছে, তাই না?’ জেমস বিদ্রূপ করে বলল।

‘আবার একবার তুমি ঠিকই ধরেছ’

যেকোন কারণেই হোক, এই প্রথমবার জেমস তার খুব কাছে নন্দনের উপস্থিতি টের পেল। ও শীতল হয়ে গেল।

‘শুধু তাই নয়, সে এমনকি আমার শরীরের জলবায়ুও জানত। বৃষ্টি, কুয়াশা, উষ্ণতা, একদম সত্যিকারের।

একবার আমার নিপলের দিকে তাকাও জেমস। এখন নিশ্চয় ওগুলো কালো, তাই না?’

‘তো?’ 

‘এর মানে আমার এখন মুড নেই। আমি বললাম না তোমায়? মুড থাকলে নিপলগুলো লাল হয়ে যেত’ কমলা হাসল। 

জেমসের আবার সন্দেহ হল নন্দন কাছেই আছে। তার মনে হল, যদিও নন্দন অদৃশ্য তবু ও তার কাছে হেরে যাচ্ছে। সে  জোর করে ওকে কাছে টানল। প্রায় আক্রমণ। কমলা নিঃশব্দে ওর জোর মেনে নিল। তার মনে হল তার মাথায় মৌমাছি গুনগুন করছে। জেমসের ভয়ঙ্কর খিদে থিতিয়ে গেল , কমলা অনুভব করল জেমস পাশে অবসন্ন হয়ে পড়ে আছে। গর্জমান নৈঃশব্দ্য ওকে ফুঁড়ে চলে যাচ্ছিল, সে ঘুমে তলিয়ে গেল।

ঘুম ভাঙতে কমলা সচেতন হল যে সে নগ্ন, হাতড়ে হাতড়ে সে তার রাতপোষাক পরে নিল। দূর থেকে, বোধহয় ব্যালকনি থেকে জেমসের গলা শোনা গেল। সে ফোনে তর্ক করছিল। তারপর কমলা শুনতে পেল সে ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে।

দুপুর অব্দি সে ঘর থেকে বেরোল না। একটি মেয়ে তার ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসে টেবিলে রাখল, কিন্তু সে ছুঁয়েও দেখল না। 

দুপুরে জেমস এল 

‘তুমি ব্রেকফাস্ট খাওনি?’ জেমস জিগ্যেস করল। 

‘আমার খিদে নেই’

‘স্নান করে নাও। লাঞ্চ করে আমরা বেরিয়ে যাব।’

‘কোথায়?’

‘থালাকাভেরি’ সে বলল ‘ ক্যাব আসবে’

‘না’ কমলা বলল ‘আমার শরীর ভালো লাগছে না’


‘ঠিক আছে, তাহলে গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু এসো কিছু খেয়ে নাও’

‘খিদে নেই’ কমলা বলল

‘জ্বর জ্বর?’

‘না’

‘তাহলে?’

‘তাহলে তাহলে তাহলে কিচ্ছু না। জাস্ট আমাকে একা থাকতে দাও’

‘আশ্চর্য নয় যে ও তোমাকে ডিভোর্স করেছিল’ জেমস ফেটে পড়ল

কমলা চিৎকার করে উঠল।

‘কে?’ কমলা কাঁপছিল। ‘কে আমাকে ডিভোর্স করেছে জেমস? কে তোমাকে এইসব ফালতু  কথা বলেছে?’

‘ওহ, বলব সেটা তোমায়? তুমি কি ওই নামটা সবসময় মন্ত্রের মতো জপছিলে না?’

কমলা কান্নায় ভেঙে পড়ল। দুজনের কেউই কিছুক্ষণ কথা বলল না। 

‘জেমস চলো লাঞ্চ করে আসি’ কমলা একটা তোয়ালে দিয়ে নিজের মুখ মুছে বলল। তারা চুপচাপ লাঞ্চ খেল। 

বিকেলে তারা ট্যাক্সিতে ম্যাঙ্গালোরের দিকে রওনা দিল। ট্যাক্সি অবিরাম শুষ্ক সব গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল।

‘জেমস’ কমলা ডাকল ‘সরি। আমি কি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি?’

‘ওহ না’ জেমস বলল

‘হ্যাঁ জানি কিন্তু... কিন্তু কিছু জিনিস বদলানো যায় না। এই স্টিল রডের মতো, সবসময় আমার মধ্যে থেকে যায়’

‘আমাদের সম্পর্কটা ছিল অনন্য, জেমস, মেড ফর ইচ আদার বলেছিলে তুমি। একদম তাই। আমাদের একটা গোপন চুক্তি হয়েছিল যে যদি আমাদের সম্পর্ক ভেঙ্গেও যায়, কোন আফসোস করব না। সেইকারণেই আমি তোমার সঙ্গে এলাম। এই ট্যুরটা করলাম। কিন্তু আমার মনে হয় আমি এই ভূমিকাটা জাস্ট হ্যান্ডল করতে পারছি না’

‘ছাড়ো’ জেমস বলল 

‘না, এটা অন্য কিছু। তুমি জিগ্যেস করছিলে ও কেন আমাকে ছেড়ে গেল। এতক্ষণ পর্যন্ত সেটা একটা গোপন কথা ছিল। আমি কাউকে বলিনি। এমনকি ম্যাঙ্গালোরের বন্ধুদেরও না। আমি কখনো কারো সহানুভূতি চাইনি। এমনিতেই আমার অন্ধত্বই আছে লোকের আহা উহুর জন্যে। এ নিয়ে আমি ফেড আপ। এর ওপর বিধবা যোগ হলে... না, আমি নিতে পারব না।’ 

‘কী বললে কমলা? বিধবা?’

‘সেটাই সত্যি কথা। নন্দন আর বেঁচে নেই। আমি একজন বিধবা।’

জেমস ওর হাত ধরল। হাতের শীতলতায় সে আবার বিস্মিত হল। 

টিলা আর উপত্যকার মধ্যে দিয়ে গাড়িটা মোটামুটি একই গতিতে চলছিল। 

‘কাবেরীর জন্ম একটা ছোট ঝর্না থেকে, তাই না?’ কমলা নিচু গলায় বলল ‘আর তারপর সে কত গ্রাম শহরে জল নিয়ে যায়, কত  খেতে সেচ দ্যায়। সত্যিই আশ্চর্য জেমস। আমার বোকার মতো গোঁ! আমাদের থলকাবেরি যাওয়া উচিত ছিল’

‘কিছু এসে যায় না। আমরা আবার আসতে পারি’ জেমস বলল

‘গত বার যখন এসেছিলাম, তখন নিচের ঢিপিমতো জায়গাটায় অনেকক্ষণ বসেছিলাম’ কমলা মনে করছিল ‘ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। একটা ছোট্ট মেয়ে এসে আমাদের পাশে বসল। নন্দন ওর ছবি তুলেছিল। আমি ছবিটা বাঁধিয়ে আমার ঘরে রেখেছি। এখনও ওখানেই আছে। তুমি খেয়াল করোনি?’

জেমস উত্তর দিল না। 

‘জেমস, তুমি আমাদের বেড়ানোর ছবি তুলেছ তো, না?’ কমলা জানতে চাইল ‘কার্ডটা কোথায়?’

‘ক্যামেরার মধ্যে’ জেমস বলল ‘ম্যাঙ্গালোরে গিয়ে প্রিন্ট করাব’

‘প্রিন্ট দিয়ে আমি কী করব? তুমি আমাকে কার্ডটা দেখাও। আমি একটু ছুঁই, অনুভব করি’

সে ক্যামেরা থেকে  কার্ডটা বার করে ওর মুঠোয় রাখল। 

ওকে হতবাক করে কমলা ওটা মুখে পুরে চিবোতে লাগল। তারপর গাড়ির দরজা খুলে থু থু করে ফেলে দিল।

‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি কমলা? সমস্ত ছবি গুলো নষ্ট হয়ে গেল, বুঝেছ?’ জেমস চিৎকার করে বলল

‘যেতে দাও’ ক্যাজুয়ালি বলল কমলা

জেমস বাইরে তাকাল। গাড়ি একটা ছোট শহরে ঢুকছে। ট্রাফিকের ভিড় বাড়ছে।

‘ বেজন্মা কোথাকার! আমি যখন ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ছবি তুলেছ না?’ কমলা জিগ্যেস করল। ‘আমার নগ্ন অবস্থায় তুলেছ। আমি সেটা আন্দাজ করেছিলাম’

জেমস ওর দিকে সতর্কভাবে তাকাল। ওই সাদা চোখের তারা... তার মধ্যে থেকে বিচ্ছুরিত আলো...  যেন তাকে আঘাত করবে, সে ভয় পেল। 

কমলা জোরে হাসল ‘ তুমি একজন অন্ধকে ব্ল্যাকমেল করতে পারবে না। কক্ষনো না! অন্ধের  নগ্নতা থাকে তার মনে। তবু, আমি চাই না ওই ছবিগুলো তোমার জিম্মায় থাকুক। তুমি এগুলো রাখার যোগ্য নও। তুমি জাস্ট একটা বিশাল... বিশাল বেজন্মা’

জেমস হাত দিয়ে মুখ মুছল। তারপর সে বাইরের দিকে তাকাল।

এখন গাড়ি ওয়ান-ওয়ে ট্রাফিক দিয়ে যাচ্ছে। ওদের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, হর্ন আর ভিড়ের আওয়াজ। গাড়িটা থেমে থেমে চলেছে। আরও কিছুক্ষণ এমন গুটিগুটি চলার  পর শেষ পর্যন্ত একটা সিগন্যালে দাঁড়াল।

‘জেমস সিগন্যালটা দেখো’ কমলা বলল

জেমস দেখল

‘ডিজিটগুলো দেখতে পাচ্ছো? পড়ো। আমরা এই সিগন্যালে আর কতক্ষণ দাঁড়াব?’

‘আরও চুরাশি সেকেন্ড’ জেমস লাল সংখ্যাগুলো পড়ে আস্তে আস্তে বলল।


🌹🌹


লেখক পরিচিতি- ই সন্তোষ কুমার মালয়ালম ভাষার এই প্রজন্মের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য লেখক। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা পনেরোর বেশি। সেরা গল্প সংগ্রহের জন্যে এবং উপন্যাস অন্ধাকরানঝি –র জন্যে দুবার পেয়েছেন কেরালা সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার যথাক্রমে ২০০৬ আর ২০১২ সালে। এই উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ- আইল্যান্ড অফ লস্ট শ্যাডোজ  ২০১৫ সালের ক্রসওয়ার্ড পুস্কারের জন্য বাছাই করা হয়েছিল। তাঁর দুটি গল্প থেকে মালয়ালম সিনেমা হয়েছে। তাঁর লেখা অনুবাদ হয়েছে ইংরেজি, তামিল, হিন্দি এবং জার্মান ভাষায়। বাংলায় অনুবাদ এই প্রথম। 


অনুবাদক পরিচিতি-তৃষ্ণা বসাক এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ কবি ও কথাকার। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কল্পবিজ্ঞান, মৈথিলী, হিন্দি ও মালয়ালম অনুবাদকর্মে তিনি প্রতিমুহুর্তে পাঠকের সামনে খুলে দিচ্ছেন অনাস্বাদিত জগৎ। জন্ম কলকাতায়। শৈশবে নাটক দিয়ে লেখালেখির শুরু, প্রথম  প্রকাশিত কবিতা ‘সামগন্ধ রক্তের ভিতরে’, দেশ, ১৯৯২। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘আবার অমল’ রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯৯৫। 


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক তৃষ্ণা পূর্ণসময়ের সাহিত্যকর্মের টানে ছেড়েছেন লোভনীয় অর্থকরী  বহু পেশা। সরকারি মুদ্রণ সংস্থায় প্রশাসনিক পদ, উপদেষ্টা বৃত্তি,বিশ্ববিদ্যালয়ের  পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে আঞ্চলিক ভাষায় অভিধান প্রকল্পের দায়িত্বভার- প্রভৃতি বিচিত্র  অভিজ্ঞতা তাঁর লেখনীকে এক বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। 

প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- পূর্ণেন্দু ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার ২০১২, সম্বিত সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩, কবি অমিতেশ মাইতি স্মৃতি সাহিত্য সম্মান ২০১৩, ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩, ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫, সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮, সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯,  কবি মৃত্যুঞ্জয় সেন স্মৃতি সম্মান ২০২০ ও অন্যান্য আরো পুরস্কার।

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...