#শারদীয়া_কিন্নর_দল
#তৃতীয়_পাতা
আজ তিনটি গল্প। ভিন্ন স্বাদের। আপনাদের পাঠপ্রতিক্রিয়া জানাতে ভুলবেন না। সমস্ত সযত্ন সৃষ্টিই মনোযোগের দাবি রাখে।
#রিটেক
#বিশ্বদীপ_দে
মেট্রোর অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সিটে বসে মেয়েটা কাঁদছে। নিঃশব্দে কুঁকড়ে যাচ্ছে ফরসা মিষ্টি মুখটা।
স্টেশনে পায়চারি করছিলাম। চোখ টেনে নিয়েছিল দৃশ্যটা। দুপুর আড়াইটের ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম। ওড়নাটাকে সামান্য টেনে কান্নাটাকে গোপন করতে চাইছে মেয়েটা। কোলের ওপরে রাখা স্মার্টফোনে টপটপ করে চোখের জল পড়ছে। আমি দুটো সিট ছেড়ে বসলাম। মেয়েটাকে হয়তো আর কেউ খেয়াল করেনি। ইতিউতি লোকজন নিজেদের ফোন আর ইনকোডা টিভিতে ব্যস্ত।
মেয়েটারও কোনওদিকে খেয়াল নেই। একটা বিয়াল্লিশ বছরের আধদামড়া লোক যে আড়চোখে তাকে দেখছে, মাঝে মাঝে সোজাসুজি তার শরীরে চোখ বোলাচ্ছে, সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপও নেই।
বারেবারে নিজেকে ধমকেও মেয়েটার থেকে আলাদা করতে পারছি না। ট্রেন আসতে আর তিন মিনিট। তারপরই ট্রেনের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাবে মেয়েটা। ওর কান্নার কারণ আমার কোনওদিনই জানা হবে না। যত সেকথা মনে হচ্ছে তত কৌতূহলটা চরমে উঠছে। মেয়েটার পরনের দামি সালোয়ার, ফোন আর মেনিকিওর চর্চিত নরম আঙুলগুলো চোখে পড়ে যাচ্ছে। সুডৌল শরীরটা কান্নার দমকে ওঠানামা করছে। অবাক হলাম। আমি কি একধরনের স্যাডিস্টিক প্লেজার পাচ্ছি?
অভাবের কান্না এ নয়। হয় খুব কাছের কেউ অসুস্থ। কিংবা প্রেম। আজকালকার ছেলেমেয়েরা কি প্রেম-ট্রেমে ব্যথা পেয়ে কাঁদে? তারা তো শুনি ব্রেকআপ পার্টি দেয়। মেয়ের কাছেই শোনা। মুন্নির থেকে বড়জোর তিন-চার বছরের বড় হবে মেয়েটা। মনে হতেই লজ্জা লাগল।
ট্রেন আসতে আর দু মিনিট। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। কিন্তু মনটাকে সরাতে পারলাম না। একেই কি মিডল এজ ক্রাইসিস বলে? নাকি অন্য কোনও কারণ আছে?
একটা মেয়ে কাঁদছে আর আমি হাঁ করে দেখছি। কেন যে দৃশ্যটা এত চেনা চেনা লাগছে! আস্তে আস্তে অতীতের গভীর থেকে ভেসে উঠল একটা ছবি। মনে পড়ল, পাশের পাড়ার পলিকে এভাবেই কাঁদতে দেখেছিলাম। অন্তত কুড়ি বছর আগে। মাধ্যমিকের পলিকে সপ্তাহে তিনদিন ভুগোল আর বাংলা পড়াতে যেতাম, ওদের প্রাসাদোপম বাড়িতে। পাশের ঘরে ওর রাশভারী সফল ব্যবসায়ী বাবা বসে টিভি দেখতেন। একদিন পলির ঘরে ঢুকতেই নজরে পড়ল পলি কাঁদছে। খুব অস্বস্তিতে পড়ছিলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে বিচ্ছিরি লাগছিল।
কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে এলে ওর বাবা জানতে চাইবে কারণ। তাই ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়েই ছিলাম। খুব জোর এক মিনিট। মনে হচ্ছিল অনন্ত সময়। হঠাৎই পলির নজর পড়ল আমার দিকে। চূড়ান্ত অপ্রস্তুত হয়ে ও ঢুকে গেছিল বাথরুমে। খানিক পরে চোখ-মুখ ধুয়ে এসে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খুলে বসেছিল বইখাতা। এতদিন পরেও দৃশ্যটা পরিষ্কার মনে আছে দেখে অবাক হলাম।
উঠে দাঁড়ালাম। ট্রেন আসার হলদে আলো দেখা যাচ্ছে। পলির কান্নাটা ঠিক কেমন ছিল, সেটা আজ আর মনে নেই। তবে এটা মনে আছে, ওর বাবা তার আগের দিনই জানিয়ে দিয়েছিলেন ভবানীপুরের একটা নামি কোচিং-এ ভরতি হয়েছে পলি। তাই আমার ছুটি। সেদিনই ছিল আমার পলিকে পড়ানোর শেষ দিন। পলির কান্না আর আমার টিউশনি চলে যাওয়ার মধ্যে আদৌ কোনও সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রশ্নটা থেকে গেছিল। পলিকে কিছু জিজ্ঞেস করার মতো সাহস ছিল না।
রাস্তায় যতবার দেখা হয়েছে, অচেনার ভান করে হেঁটে চলে গেছে পলি। যেতে যেতে সত্যিই একদিন অচেনা হয়ে গেল।
কুড়ি বছর আগের প্রশ্নটা মনের মধ্যে বুজকুড়ি কেটে ভেসে উঠল। এক আঁচড়ের একটা ভালো লাগা, সেটাও যে একটা দাগ হয়ে থেকে যায় আচমকাই বুঝতে পারলাম। এদিকে ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটা এই ট্রেনে যাবে না। হয়তো একা থাকতেই বেছে নিয়েছে প্ল্যাটফর্মের কোণ।
ট্রেনের দরজা খুলে যেতেই পা বাড়ালাম। শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে, কাঁদছিস কেন পলি?’
**
#সাক্ষাৎকার
#তাপস_মুখোপাধ্যায়
-তিস্তাকে নিয়ে আমার গল্পটা পড়ে পাঠক-মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। বেশিরভাগ ই বলেছিল তিস্তাকে এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত হয়নি।
এটুকু বলে কফির কাপে চুমুক দিলেন রঞ্জন গোস্বামী-- এ সময়ের নামকরা গল্পকার। তারপর সিগারেটে সুখটান দিয়ে শুরু করতে যাবেন , আমি থামালাম প্রশ্ন করে।
- ওই গল্পটাই কি আপনার জীবনে টার্নিং পয়েন্ট? টেবিলের উল্টো দিকে আমি -অমিতেশ সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি।
-বলতে পার। তারপর অনেক চেষ্টা করেও তিস্তার মত চরিত্র সৃষ্টি করতে পারিনি।নাও সিগারেট নাও।প্যাকেট এগিয়ে দিলেন রঞ্জন।
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবলাম লোকটার মধ্যে কি আছে ?দেখতে তেমন সাহিত্যিকের মত নয় , মানে লেখকদের চোখেমুখে যেমন একটা ছাপ থাকে আর কি ।
তবে আড়াই তলার একটা ব ই ঠাসা ঘরে কেমন একটা সুন্দর পরিবেশ আছে। পরিপাটি করে গোছানো একটা সুদৃশ্য গোল টেবিল , একপাশে কাগজের দিস্তা, সুদৃশ্য একগুচ্ছ কলম, দেয়াল আলমারিতে প্রচুর স্মারক আর শংসাপত্র।
এবারের একাডেমি পেতে চলেছেন বলে বাজারে খবর , অত:পর কাল রাতে সম্পাদকের ফোন -এ্যপয়েন্টমেন্ট হয়ে গেছে ...২১,গলফ্ ক্লাব রোডে বাড়ি।সাতসকালে চলে এসেছি , কিন্তু কেন জানিনা কোথায় একটা খটকা লাগছে। সিগারেট ধরালাম ,যদি মাথাটা খোলে। সিনেমার দৃশ্য হলে আবার নীচে লেখা থাকবে ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। বললাম -এ পর্যন্ত কত ব ই লিখেছেন?
-বেশি নয় ,শ 'দুয়েক হবে।
-আপনার মতে কোনটা শ্রেষ্ঠ লেখা ।
-দেখো, শ্রেষ্ঠ লেখাটা বোধহয় এখনও লিখে উঠতে পারিনি। তবে যে লেখাটা আমায় সবচেয়ে বেশি পাঠকের ভালবাসা দিয়েছে তা হল ঐ যেটা নিয়ে পুরস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে , হ্যা 'রূপ রস গন্ধ ' গল্পটা। এখনো পর্যন্ত বেষ্ট সেলার গত একমাস ধরে। এ পর্যন্ত বলে কেমন একটা ডিপ্লোম্যাটিক হাসি হাসলেন।
জীবনে বেশ কিছু সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি । নামী ,অনামী অনেক মানুষের ও। কিন্তু এ ভদ্রলোক বড্ড কম কথা বলেন । বেশিরভাগ লেখক তো নিজেদের গল্পে ভরিয়ে রাখেন , আমায় আর কিছু বলতে হয় না। কফি শেষ ,সিগারেট ও।আবার প্রশ্নে ফিরে আসি।
প্রশ্ন করতে যাব সেই সময় এক ভদ্রমহিলা পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন। হাতে পকোড়ার প্লেট আর দু কাপ কফি । আমি চোখ ফেরাতে পারছিলাম না।আমার হাত ,পা কেমন অবশ হয়ে আসছে !
-আরে , তুমি আবার আসতে গেলে কেন ? উঠে দাঁড়ান রঞ্জন।এই পরিচয় করিয়ে দিই -এ হল অমিতেশ , নামজাদা দৈনিকের সাংবাদিক, আর এ হল রক্তিমা বা রাকা ,আমার স্ত্রী। অমিত আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছে।বলেই কেমন শব্দ করে হাসলেন ।
আমি রাকার দিকে তাকিয়ে , সেই খটকা টা নিমেষে উধাও হয়ে গেল।কোন রকমে হাতজোড় করে নমস্কার করলাম পাঁচ বছর আগের ইউনিভার্সিটি টপার কে। সে সময় পত্র-পত্রিকায় গল্প লিখে ও ঝড় তুলেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ আজও ওর জন্য গর্ব বোধ করে।
সব সাক্ষাৎকারে র শেষ আছে। বাড়ি থেকে যখন বেরিয়ে যাচ্ছি দোতলার ব্যালকনিতে রাকা, হাসিমুখে হাত নাড়ল। পকেটে ফোন বাজছে সম্পাদকের , কালকের দৈনিকে ছাপতে যাবে।
**
#উপনেত্র
#পারমিতা_মন্ডল
ব্যালকনিতে বসে চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে পেপারে চোখ রাখে সুতনয় । সামনের চেয়ারে বসে মধু।আজ দিনটা বেশ রোদ ঝলমলে। কদিন থেকে অবিরাম বৃষ্টিতে সকালবেলা ব্যালকনিতে বসার সুখ উপভোগ করা যাচ্ছিল না।পেপারে চোখ বোলাতে বোলাতে সুতনয় বলে
- যা দিনকাল পড়েছে তাতে সবকিছু বজায় রেখে চলা খুব কষ্টকর বুঝলে। অবাঞ্ছিত ব্যায় একদম নয়।
- ঠিকই বলেছ। কিন্তু তুমি আমি এটা বুঝতে পারছি।অন্যরা কি বুঝতে পারছে!পারছে না।
- অন্যরা মানে?রনি তো বিদেশে।ও আমাদের ছেলে।ওর প্রতি কোনোরকম অবহেলা করা উচিত নয়।ও ই তো বুড়ো বয়সে আমাদের দেখবে নাকি।
- আমি রনির কথা বলছি না।
- তাহলে?
- কাল সন্ধেবেলা তোমার অফিস থেকে আসতে দেরি হওয়ায় বলিনি। আনন্দম থেকে ফোন করেছিল। একবার যেতে বলেছে।
- ও,এই হয়েছে এক মুশকিল।মাসে মাসে কি যাওয়া যায়!একটু শান্তি নেই!
এই বলে সুতনয় ঘরে গেল।পোষাক বদলে নিল চটপট।
- যাই বাজারটা করে আনি।আজ ইলিশ নেবো ভাবছি। কদিন বৃষ্টির চোটে বাজার করা হয়নি।ফ্রিজে রাখা রুই খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেল!রমাকে বোলো জমিয়ে ভাপা ইলিশ বানাতে।
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো মধু।বাড়ি থেকে বেরোতে যাবে ,কলিং বেলের আওয়াজ।দরজা খুলে সুতনয় দেখে একদল ছেলে । চাঁদা নিয়ে ছেলেগুলো চলে গেলে মধু জিজ্ঞেস করল
- কত দিলে?
- পাঁচ হাজার।পাড়ায় ইমেজ ধরে রাখতে ওইটুকু তো দিতেই হবে।আর মায়ের কৃপায় সবকিছু তো ভালোই চলছে। মাকে একটু খুশি করতে হবে তো!
ব্যাগ ভর্তি বাজার করে ফেরে সুতনয়।একটু জিরিয়ে নিয়ে টিভি খুলে বসে। এবার ফোনটা বেজে ওঠে।
- হ্যালো।
- আমি আনন্দম থেকে বলছি।কাল ফোন করেছিলাম।আজ আসছেন তো? নতুন চশমা লাগবে। চশমাটা
ভেঙে গেছে।
- আগেই বুঝেছি কিছু একটা হয়েছে।আমি টাকা পাঠিয়ে দেব।
- না,মানে, আপনি একবার এলে....
- আচ্ছা, বিকেলে যাব একবার।
বিকেলবেলা রেডি হয়ে বেরিয়ে গেল সুতনয়।যাবার আগে মধু বলল" বেশি দেরি কোরোনা আবার!কাজ হলেই চলে আসবে।"
- আসব?
- হ্যাঁ আসুন।... বসুন। দেখুন আপনি নমাসে ছমাসে একবার আসেন।উনি মাঝেমাঝেই কান্নাকাটি করেন খুব।
- দেখুন ,আমি ব্যাস্ত মানুষ।আসার সময় হয়ে ওঠে না। আমি তো মাসে মাসে যা দেওয়ার দিয়ে দিই।
- হ্যাঁ কিন্তু, আপনাকে দেখলে....
- চেষ্টা করবো।
একটা ঘরে গেল সুতনয়। একজন বৃদ্ধা বিছানায় বসে। সুতনয় ডেকে উঠলো
- মা।
বৃদ্ধা হাওয়ায় হাতড়াতে হাতড়াতে
- বাবু এসেছিস!আয় আমার কাছে আয় বাবা। কতদিন তোকে দেখিনি।
- আসলে খুব ব্যস্ত থাকি তো।
- হ্যাঁ,বুঝি। বৌমা, দাদুভাই ভালো আছে তো? তুই একটু মোটা হয়ে গেছিস।ছোটোবেলার মতো নাদুস নুদুস।
- হ্যাঁ। তোমার চশমার টাকা দিয়ে গেলাম।একটু সাবধানে ব্যবহার কোরো।
- হ্যাঁ ,করবো।
- আচ্ছা,তুমি নাকি চশমা ছাড়া দেখতেই পাওনা। তাহলে এখন আমাকে কিভাবে দেখতে পাচ্ছ!
মুচকি হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বৃদ্ধা বললেন
- পাগল ছেলে আমার।
**

No comments:
Post a Comment