Wednesday, 23 September 2020

অনুবাদ গল্প ১ (দ্বিতীয় পর্ব)

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


(এই লোককথাটির মূল কথাকার জেমস ঐনাম ( James Oinam)। বেশ কয়েকটি লোককথার একটি সংকলন 'New Folktales of Manipur' থেকে এই গল্পটি নেওয়া হয়েছে। মণিপুরে প্রচলিত লোককথাগুলি সংগৃহীত হয়েছে এই বইতে। লেখকের স্বীকারোক্তিতে, মনিপুরের গ্রামের পথে ঘাটে, উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা গল্পগুলি অনেকাংশেই মূল ঘটনা থেকে ভিন্ন হয়। লেখক তাঁর কল্পনা দিয়ে এই ফাঁকগুলিকে পূরণ করেছেন। প্রকাশনা সংস্থার সাথে বহুদিন ধরে কাজ করে চলা জেমস এখনো খুঁজে চলেছেন মনিপুরের বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যকে।)
এই যে সুন্দর পৃথিবীটা, এর ধারক কে জানো? এমা। এমা হলেন এক অবিনশ্বর আত্মা। এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। তাই আমাদের পূর্বসূরিদের গণনা শুরুর নাম এমা। ওঁরা বিশ্বাস করতেন, সৃষ্টির শুরু শূন্যতায় হয়নি। এমা রূপ নিয়েছিলেন সর্বশক্তিমান প্রভু সিতাপা মাপুর। তিনিই তো আকাশ। মেইতেই ভাষায় আকাশকে বলে সরারেল। সিতাপা মাপু ভালবাসলেন ইমা লেইমালেল সিতাপি কে, আমাদের ধরিত্রী মাতাকে। আকাশ আর ধরিত্রীর মিলনে জন্ম নিলেন সনামাহি। সীতাপা মাপু তাঁর সন্তানকে আদেশ করলেন, মানব সৃষ্টি করতে। সনামাহি তাঁর নির্দেশে একের পর এক জীবসৃষ্টি করে চললেন। ইঙ্গামু (মাছ) থেকে ওঙ্গ (বাঁদর)পর্যন্ত। কিন্তু সিতাপা মাপু কিছুতেই খুশি হতে পারছেন না। শেষপর্যন্ত তিনি পুত্রের কাছে আত্মরূপ প্রকাশ করলেন। সনামাহি সেই আশ্চর্য রূপের সংজ্ঞায় চালিত হয়ে মানুষকে গড়লেন।
দেবতা এবং মানুষদের উত্তরসূরীরা ক্রমে পবিত্র কব্রু পর্বত থেকে নীচের উপত্যকা ভূমিতে নেমে এল। সনামাহি পাখাংবা কে নরজাতির অধিপতি হিসেবে নির্বাচন করলেন। লেইস অর্থাৎ দেবতারা রাজন্য হিসেবে পেল সনামাহিকে আর নর জাতি অর্থাৎ মিসরা পাখাংবা কে।
প্রথম প্রথম দেবতা এবং মানুষরা বেশ মিলেমিশেই বাস করছিল এই সুন্দর উপত্যকা ভূমিতে। দেবকুমার রা অনায়াসেই কুমারী মানব কন্যার সাথে প্রণয় ও পরিণয়ে আবদ্ধ হত। কিন্তু পাখাংবা ও তার উত্তরসূরিরা ধীরে ধীরে এর বিরোধীতা করতে থাকেন। সনামাহিও বুঝেছিলেন, এই মানবজাতি দেবতা সৃষ্ট হলেও দেবগুনের অভাব আছে তাদের মধ্যে। এই মিশ্র বিবাহের ফলে যে সন্তানরা জন্মাবে তারা মানুষদের থেকে কিছুটা উন্নত হলেও দেবপদবাচ্য বলে বিবেচিত হবে না।
গাছ বড় হতে থাকলে দুটি শাখা যেমন পরস্পর থেকে ক্রমশ দূরে চলে যায়, তেমনি দেবতা ও মানুষদের মধ্যেও বিভেদ ক্রমশ প্রশস্ত হল। দেবতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষরা নৈতিক দিক থেকে আরো পিছিয়ে পড়ল। সিতাপা মাপু তখন সম্পূর্ণ আলাদা এক দেবভূমি তৈরি করে দেবতাদের সেখানেই চলে যেতে নির্দেশ দিলেন।
দেবতারা বেশিরভাগই নিচের উপত্যকা ছেড়ে চলে গেলেও এক তরুণ দেবকন্যা, ঐশিকী মেঘ পাহাড়ের দেশ মৈরাং রাজ্য ছেড়ে যেতে পারলেন না। তার জন্ম এখানেই। এখানেই তার শিশু ও কিশোরী বেলা কেটেছে। এই মায়াভরা উপত্যকার মায়ায় সে তার স্বজাতির অনুসরণ করতে পারল না। অথচ মানুষেরা তখন দেবতাদের থেকে আচার-আচরণে এতটাই আলাদা হয়ে গেছিল যে, সে তাদের সাথে মিশতে পারে না। লুকিয়ে ঘুরে বেড়ায় নদীর ধারে, গাছপালার অন্দরে। এই গোপনচারীতার জন্য মানুষরাও তাকে ভয় পায় এবং লোকমুখে ছড়াতে থাকে তার সম্পর্কে নানা কল্পকাহিনী।
একদিন কথা উঠল রাজার কানে।
পিউরেনবা মৈরাং রাজ্যের বীর সেনাপতি। সবচেয়ে প্রভাবশালী খুলাকপাস তিনি। স্বয়ং মৈরাংরাজও তাকে সমীহ করে চলেন। রাজা একদিন পিউরেনবাকে ঐশিকীর বিষয়ে প্রশ্ন করলেন।
- রাজ্যবাসী এই ঐশিকীর ওপর ক্ষুব্ধ, পিউরেনবা। সে আমার সন্তানসম প্রজাদের দুঃখের কারণ হয়ে উঠেছে। তুমি কি জানতে না পিউরেনবা? আমায় আগে জানানো হয় নি কেন?
- রাজন! পিউরেনবা বলেন, ঐশিকী স্বভাবতই কখনো কারোর দুঃখের কারণ হতে পারেন না। একথা আপনিও জানেন মহামতি। হ্যাঁ, আমি শুনেছি তার কথা। তার উদ্বাস্তু, ভ্রাম্যমান জীবনের কথা। আমার মনে হয়, আমাদের দিক থেকে একটু সহানুভূতি প্রাপ্য ছিল তাঁর। সামান্য একটু বাসযোগ্য স্থান এই বিশাল উপত্যকা ভূমিতে কি এতই দুর্লভ, অন্তত যতদিন না ঐশিকী দেবভূমিতে ফিরে যাবার জন্য তৈরি হতে পারছেন।
- যাই বলো পিউরেনবা, আমার প্রজারা সন্তুষ্ট নয় তার প্রতি। দেবতা আর মানবজাতির একসাথে থাকা উচিত নয়। সিতাপা মাপুর তাই নির্দেশ। তুমি যেভাবে পারো ঐশিকীকে এখানে নিয়ে এসো।
- যথার্থ রাজন! আপনার ইচ্ছাই আমার ধর্ম।
- পিউরেনবা, রাজা চিন্তিত সুরে বলেন, তোমার বিচক্ষনতার উপর আমার আস্থা আছে। দৈবশক্তির সাথে কোন রকম অশুভ আচরণ আমাদের উপর অভিশাপ ডেকে আনতে পারে। জানোইতো, দেবতারা কেমন মায়াবী হন। যা করণীয়, সবই খুব সাবধানে করবে যাতে ঐশিকীর কোন ক্ষতি না হয়; যেন সে কোন কারণে ক্ষুব্ধ না হয়।
- মহারাজ, সব জেনেশুনেই এই ঝুঁকি আমি নিচ্ছি। সিতাপা মাপুর নামে শপথ করছি, ঐশিকীকে খুঁজে বের করার সব দায়িত্ব একলা আমার। কিন্তু রাজন, আপনাকেও কথা দিতে হবে যে যদি ঐশিকীকে খুঁজে পাই এবং তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন তবে তার সম্পর্কে যা করণীয় সে ভারও আমাকেই দিতে হবে।
মৈরাং রাজ সম্মতি দিলেন। পিউরেনবা তার বাহিনীর সবচেয়ে সাহসী এবং বুদ্ধিমান চারজন যোদ্ধাকে বেছে নিলেন। এই চারজনকে তিনি চতুর্দিকে প্রেরণ করলেন।
দিনের বেলা ঐশিকী নিজেকে লুকিয়ে রাখে। রাতেই তার ভ্রমণবিলাস। পিউরেনবা খুব যত্ন করে এই চার সেনাকে কিছু উপদেশ দিলেন।
- যাও তোমরা ঐশিকীর সন্ধান করো। কিন্তু তোমাদের ছায়া রইল আমার কাছেই ।তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ঐশিকীর মায়াজালে আবদ্ধ হও, তোমাদের ছায়া সঙ্গে সঙ্গেই তা জানিয়ে দেবে আমাকে। নিশ্চিত থেকো, আমি খুব অল্প সময়ে সেখানে পৌঁছে যাব আর উদ্ধার করব তোমাদের।
মনিপুর রাজ্যে প্রচলিত গোপন কালোজাদু গুলি সম্পর্কে ভালোই ওয়াকিবহাল ছিলেন পিউরেনবা। বিশাল একটি চামড়ার খন্ডকে গুটিয়ে একটি শস্যদানার রূপ দেওয়া হয়। তারপর আসল শস্যের সাথে ওটিকেও মিশিয়ে দেওয়া হয়। খাদ্য হিসেবে যে এই শস্য গ্রহণ করে, সে তা জানতেও পারেনা। পাকস্থলীতে যাবার পর ওই চামড়ার থলি স্ফীত হতে হতে একসময় ফেটে যায় আর হতভাগ্য মানুষটি মারা পড়ে । এই জন্যই বয়স্করা তাদের বাচ্চাদের সব সময় সাবধান করে দেন যেন তারা কোনো অপরিচিতের দেওয়া খাবার না খায়। পিউরেনবা তার সৈনিকদের পাকস্থলীতে এরকম চামড়ার থলিকে এমন ভাবে স্থাপন করলেন যাতে তারা অনেকটা খাবার একসাথে খেয়ে নিতে পারে। অনেক দূরের পাহাড় জঙ্গলের পথে হয়তো বেশ কিছুদিন তাদের খাদ্য ছাড়াই চলতে হবে।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় ঘন মেঘ আর বৃষ্টিতে চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। যে সৈনিকটি পূর্বদিকে গিয়েছিল তার ছায়ার মধ্যে ভীষণ অস্থিরতা লক্ষ্য করলেন পিউরেনবা।তিনি বুঝলেন, নিশ্চয়ই ঐশিকী সন্ধান পাওয়া গেছে অথবা সৈনিকটি বিপদে পড়েছে কোন।দুর্যোগের মধ্যেই তিনি ঐ সৈনিকের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পিউরেনবা স্থান ত্যাগ করা মাত্র অন্য এক দুর্বৃত্ত সৈনিক আরেকটি ছায়াকে তার অনুপস্থিতির সুযোগে নষ্ট করে ফেলল। এই ছায়ার যে দেহধারী, তার প্রতি বহুদিনের বিদ্বেষ ছিল এই দুষ্টু সৈনিকটির। পরের দিন ওই সৈনিক মারা গেল।
পিউরেনবা ঐশিকীকে নিয়ে ফিরে এলেন এক দুর্লভ ঐশ্বর্য্যের মত। রাজ্যবাসী ঐশিকীর দেবসুলভ কান্তি দেখে আনন্দে অভিনন্দন জানাল পিউরেনবাকে এবং দুঃখ প্রকাশ করল ওই মৃত সৈনিকের জন্য।
ঐশিকীর সৌন্দর্য্যে মৈরাংরাজ বিস্ময়ে অভিভূত। রাজা ভাবেন, এই অসম্ভব কোমল প্রাণ কি কখনো কারোর ক্ষতি করতে পারে !প্রজারাও ঐশিকীকে দেখার পর তাদের ভুল বুঝতে পারল। তারা এই দৈবীশক্তিকে রাজ্যের অতিথি হিসাবে প্রার্থনা করল। একটি কথাও না বলে ঐশিকী সকলের হৃদয় জয় করে নিলেন।
পিউরেনবা ঠিক এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলেন। রাজাকে তিনি মনে করিয়ে দিলেন তার প্রতিশ্রুতির কথা।
- রাজন, ঐশিকী নির্দোষ প্রমাণিত। এবারে তার দায়িত্ব আমি নেব। আমি বিবাহ করতে চাই এই ঐশিকীকে।
রাজসভার প্রত্যেকে চমকে ওঠেন। এ কেমন কথা বলছেন পিউরেনবা!
- পিউরেনবা! রাজার আর্ত কন্ঠ। তুমি তো জানো আকাশের দেবতা সিতাপা মাপু দেবতা এবং মানুষদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন। তুমি এই কাজ করলে আমরা যে দেবতাদের কোপে পড়ব!
কিন্তু পিউরেনবা দৃঢ়সংকল্প। তার কাছে ঐশিকী একমাত্র জীবনের প্রতিচ্ছবি। বাকি সবকিছুই স্থিরচিত্র।
- রাজন, আমি বরং জীবনভর দুঃখ ভোগ করবো যদি ঐশিকীকে পাশে পাই। যদি কোন ভুল করি, তার জন্য আমি যেন একাই শাস্তি পাই। রাজ্যের কোন ক্ষতি আমি কখনোই হতে দেব না।
ঐশিকীর লজ্জানত মুখেও, রাজা দেখলেন, অনুরাগের ছোঁয়া লেগেছে। নতমুখে সে জানালো,
- হ্যাঁ রাজা, বীরহৃদয় পিউরেনবা কে আমি মনে মনে নিজেকে সমর্পণ করেছি। আমাকে তার ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকতে অনুমতি দিন।পিউরেনবা আমাকে কথা দিয়েছেন তিনি তাঁর ছায়াকে কোথাও কখনো হারাবেন না। কোনদিন তার অবমাননা করবেন না।
রাজ অনুমতিতে পিউরেনবা আর ঐশিকীর বিবাহ হল। তাদের দুই সন্তান জন্মাল। খামবা আর খামনু।
পিউরেনবার বিশেষ বন্ধু ছিলেন থংলেন ।ঐশিকী উদ্ধারের সময় যে সৈনিক নিহত হয়েছিল সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য থংলেন কে অনুরোধ করেছিলেন পিউরেনবা। থংলেন আদতে বদমেজাজি এবং আক্রমণাত্মক। খুব কম সময়েই তিনি ওই সৈনিকের হত্যাকারীকে শনাক্ত করে ফেললেন। সেই সময় থেকেই আততায়ী লোকটি অন্তরীণ ছিল। সে জানতো থংলেন অনেক গুপ্তবিদ্যা জানেন। পিউরেনবাও খুবই জ্ঞানী কিন্তু তিনি এসব বিদ্যা কখনোই অসদউদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন না। সেই ভরসায় ওই সৈনিক পিউরেনবার কাছে একদিন আত্মসমর্পণ করলো এবং আশ্রয় ভিক্ষা করল।
- কিন্তু আমি তো থংলেন কে বলেছি দোষীর শাস্তির ব্যবস্থা করতে। পিউরেনবা বোঝালেন তাকে। তুমি বরং থংলেন এর কাছেই ক্ষমা ভিক্ষা কর।
- না, না, সে সম্ভব নয়। থংলেন আমাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করবে। সেনাপতি, আপনি নিজেও তো নিজের হৃদয়ের বিরুদ্ধে যেতে পারেননি। দৈবী ঐশিকীকে বিবাহ করেছেন, এটা জেনেও যে, প্রভু সনামাহি এই বিবাহের বিপক্ষে। তেমনি, ওই সৈনিকের ওপর আমার তীব্র বিদ্বেষ ছিল। তাই ওর ছায়াকে আমি সরিয়ে দিয়েছি। দয়া করুন আমায়, দয়া করে আমার বিচার করুন আপনি মুক্তমনে। আমি কথা দিচ্ছি, ওই সৈনিকের মা এবং বিধবা স্ত্রীর দায়িত্ব আমি নেব। আমি তাকে বিবাহ করতেও পারি এবং ওর ছেলে মেয়েদের নিজের সন্তানের মতোই দেখব। আমার জীবন রক্ষা করুন সেনাপতি। আমার মা বহুদিন আমার পথ চেয়ে একা রয়েছে ঘরে। আমি মারা গেলে তার কি হবে!
পিউরেনবা বুঝলেন, এবারে ভাগ্য তার বজ্র বাহু প্রসারিত করতে চলেছে। একটি নিষিদ্ধ পথে তিনি চলেছেন, তার মাশুল এবার তাকে দিতেই হবে। তিনি ওই সৈনিককে আশ্বস্ত করলেন।
থংলেন জানতেন যে, ফেরারি সৈনিকটি কোন না কোন দিন তার মায়ের খোঁজ নিতে আসবে। তিনি তার মায়াজাদু বিছিয়ে রাখলেন সৈনিকটির বাড়ির চারপাশে। পিউরেনবা একদিন গোপনে ওই মহিলার সাথে দেখা করলেন। তাকে জানালেন তার ছেলে নিরাপদে আছে এবং সে আপাতত পিউরেনবার আশ্রয়েই আছে। বহুদিন বাদে ছেলের খবর শুনে বৃদ্ধার চোখ জলে ভরে উঠল। গভীর রাতে যখন পিউরেনবা বিদায় নিলেন থংলেন এর মায়াজাদুতে তার ছায়া সম্মোহিত হল। ছায়া তাকে ত্যাগ করে থংলেন এর বশীভূত হল। পিউরেনবা জানতে পারলেন না যে তার ছায়া তাকে ত্যাগ করেছে, কিন্তু তার দেহমন শিথিল হয়ে এল।
পিউরেনবা যতই নিজের বাড়ির কাছাকাছি হন, এক অশুভ বিষন্নতা তাকে গ্রাস করে।উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢোকার আগেই বেরিয়ে এসেছেন ঐশিকী। দুচোখে তার বর্ষার সিগমাই নদী বাঁধ ভেঙেছে। অন্ধকারেও দৈবী ঐশিকী বুঝতে পারলেন, তার স্বামী আজ নিজের ছায়াকে হারিয়ে এসেছেন।
কান্নায় লুটিয়ে পড়ে ঐশিকী বলেন, পিউরেনবা, তুমি তো জানো, আমি দেবাংশী। আর দেবাংশীরা মিথ্যে বলে না কখনো। আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম চিরকাল। আজ তুমি সেই ছায়াকেই হারিয়ে এসেছ - অন্য কেউ লুঠ করেছে তাকে। এবার আমাকে চলে যেতে হবে। সিতাপা মাপু হয়ত এই - ই চান। দুঃখের ভেতর দিয়ে আমাকে তৈরি করে নেবেন দেবভূমির জন্য। কিন্তু আমার বাচ্চারা অনাথ হয়ে যাবে। দারিদ্র দুর্দশা ওদের সঙ্গী হবে। তবু আমাকে চলে যেতেই হবে। কষ্টকর জীবনের সাথে লড়াই করে আমার সন্তানরা যখন স্বর্গে যাবার জন্য তৈরি হবে তখন ওদের মনে আমার মত এমন আক্ষেপ থাকবে না। আমি যে অনেক পেয়েছি পিউরেনবা। তোমার মত স্বামী, সমস্ত রাজ্যবাসীর ভালোবাসা আর এই স্বর্গের চেয়েও দামি সুন্দর সংসার। আমার আত্মা যে কি ভীষণ কষ্ট সহ্য করছে তা কেউ বুঝবে না।
ঐশীকি চলে যাবার পর পিউরেনবাও জানতেন, তার দিন শেষ হয়ে এসেছে। থংলেন তার মায়াজাদুতে বন্দী ছায়াকে তখনই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। পিউরেনবা একটুও সময় নষ্ট না করে বন্ধুকে সব বুঝিয়ে বললেন। ওই ছায়া যে তারই এবং দুজনের অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য এই ঘটনা ঘটেছে এই কথা বলে থংলেন কে সান্ত্বনা দিলেন। থংলেন বন্ধুর বিচ্ছেদ আশঙ্কায় দুঃখে ভেঙে পড়লেন। পিউরেনবা তাকে অনুরোধ করলেন অনুতপ্ত সৈনিকটি কে ক্ষমা করতে। পিউরেনবা তার সন্তানদের সম্পর্কে ঐশিকী র ভবিষ্যৎবাণীর কথাও বিস্তারিত বললেন বন্ধুকে। থংলেন এর কাছে তার শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন পিউরেনবা। থংলেন যেন খামবা এবং খামনুর নৈতিক অভিভাবক হিসেবে ওদের আগলে রাখেন কিন্তু কোনোরকম বস্তুগত সাহায্য করে ওদের শক্তিকে প্রতিহত না করেন। ওদের শক্ত হতে হবে, লড়তে হবে এই পৃথিবীর সঙ্গে। সীতাপা মাপু ও তেমনটি চান বলে বিশ্বাস ছিল ঐশিকীর।
পিউরেনবার মৃত্যু হল। খামবা আর খামনু দুই ভাইবোন দারিদ্র সঙ্গী করেও এই দুঃখে ভরা পৃথিবী তে দুটি উজ্জ্বল মণির মত বেঁচে রইল বহুদিন।
***




(ফ্রানজ কাফকা বিশ্ব সাহিত্যের একটি বিখ্যাত নাম। তাঁর একটি অণুগল্প এখানে রইল।)
সম্রাট তাঁর মৃত্যুশয্যা থেকে তোমাকে, হ্যাঁ, মানে এই বেচারা সাধারণ প্রজা তুমি, তোমাকেই একটি চিঠি দিয়েছেন। সরাসরি চিঠি দিয়েছেন! তাঁর সাম্রাজ্যের একপ্রান্তে আশ্রিত তুমি। তাঁর শয্যার পাশে রাজদূত হাঁটু মুড়ে বসে সেই বার্তা শুনেছিল।
তিনি নীচু স্বরে সেই বার্তা তাঁর কানের কাছে উচ্চারণ করেছিলেন। সম্রাট এরপর দূতকে বার্তাটি তাঁকে ফিরে শোনাতে বলেন। দূতের কথা শুনে নিশ্চিন্ত সম্রাট মাথা নাড়েন। তাঁর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে সামনে ভিড় করে থাকা অসংখ্য মানুষের মধ্যে থেকে, মাথা ফুঁড়ে ওঠা সমস্ত প্রাচীরকে ভেঙে, আলোকিত সোপানে বৃত্তাকারে দাঁড়ানো সাম্রাজ্যের তাবৎ মহামান্য সভাসদকে পেছনে ফেলে রাজদূত এগিয়ে গেলেন।
অবশ্যই সম্রাটের নির্দেশ অনুসারে।
রাজদূত তখনই যাত্রা করলেন। শক্তিশালী পুরুষ তিনি। একটি একটি করে বাহু মেলে তিনি প্রতিরোধের দিকে ছুটতে শুরু করলেন। যখনই সূর্যের (সম্রাটের) নিশান প্রয়োজন হল, তিনি নিজের বুকে আঙুল দিলেন। এর ফলে সহজেই তিনি বাধা ভেদ করতে পারছিলেন।
কিন্তু ভিড় বড়ো বেশি। অসীম সেই স্থান জুড়ে অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি। যদি উন্মুক্ত মাঠ হতো তবে সহজেই তিনি পৌঁছে যেতেন। এতক্ষণে তোমার দরজায় তাঁর হাতের কড়া নাড়া শুনতে পেতে। কিন্তু তাঁর সব প্রয়াস নিষ্ফল।
তিনি এখনও রাজার মহলের অন্দরের নিভৃততম ঘরটি থেকেই বার হতে পারেননি। হয়তো পারবেন না। যদি বা কৃতকার্য হন তাতেও কিছু লাভ হবেনা। কারণ এরপর তাঁকে সোপান পেরিয়ে আসতে হবে। তাতেও লাভ নেই। তাঁকে উঠোন পেরোতে হবে। তারপর অন্দরকে ঘিরে রাখা দ্বিতীয় মহল। তারপর আবার সোপান ও উঠোন। আবার আর একটি মহল। এইভাবে হাজার হাজার বছর ধরে তিনি পথ পেরোবেন।
এবং, অবশেষে যদি বা তিনি তোমার দরজায় এসে ঘা দেন, তাহলেও লাভ নেই। তাঁর সামনে তখন রাজার প্রাসাদ, নগর, ও পৃথিবীর যাবতীয় স্তুপাকৃত হয়ে পড়ে থাকবে। ধ্বংসস্তুপ।
কেউ কখনও কোনো মৃতের চিঠি নিয়ে আসেনি। কিন্তু তুমি তোমার জানলায় বসে স্বপ্নে বিভোর হও। ভাবো, সন্ধ্যে হলেই তোমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়বে রাজদূত। তাঁর কাছে আছে রাজার চিঠি।
(ভাবানুবাদ)



No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...