Friday, 25 September 2020

শারদীয়া কিন্নর দল দ্বিতীয় পর্ব নবম পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#দ্বিতীয়_পর্ব


#নবম_পাতা


আজ তিনটি নিবন্ধ প্রকাশিত হলো। প্রথম নিবন্ধটি পূর্বে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের দ্বিতীয় ও শেষ অংশ। 



#ঠাকুরবাড়ির_পাগলকথা


দ্বিতীয় পর্ব


#অমূল্যরঞ্জন_ভট্টাচার্য


রবীন্দ্রনাথের  দুই দাদা  বীরেন্দ্রনাথ ও সোমেন্দ্রনাথও  ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন।


 


মহর্ষি  দেবেন্দ্রনাথের  চতুর্থ  পুত্র   যাঁকে রবীন্দ্রনাথ    ন'দাদা  বলে  ডাকতেন  , বীরেন্দ্রনাথ (১৮৪৫ ~ ১৯১৫),  অতীব সুদর্শন  ছিলেন।  ছিলেন এক প্রতিভাবান  গণিতবিদ ।  তাঁর দিন কাটত   অঙ্কশাস্ত্রের   জটিল চর্চায়। 


 


দেবেন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন  বিয়ে দিলে   বীরেন্দ্রনাথের মানসিক   অবস্থা  স্বাভাবিক  হবে।  তাই  বন্ধুর কন্যা  প্রফুল্লময়ীর  সাথে  বিয়ে দিলেন  ১৮৬৬  সালে।


প্রফুল্লময়ীর দিদি  নীপময়ীর সাথে     দেবেন্দ্রনাথের   তৃতীয় পুত্র   হেমেন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিল।   প্রফুল্লময়ীকে পছন্দ করেন ননদ   স্ব্রর্ণকুমারী  ও    শরৎকুমারী  ।


 


 বিয়ের পর বছর না ঘুরতেই বীরেন্দ্রনাথের মধ্যে দেখা গেল উন্মাদরোগ ।   পাঠানো হল আলিপুরে লুনাটিক এসাইলামে ।   অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ফিরিয়ে আনা হল ১৮৭০ সালে।  সেই  বছরেই  জন্ম নিল একমাত্র  পুত্রসন্তান  বলেন্দ্রনাথ  রুগ্ন শরীর নিয়ে ।


   স্বল্পায়ু   বলেন্দ্রনাথের  মৃত্যু হয় মাত্র ২৯ বছর বয়সে ।


বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী  বলেন্দ্রনাথ  ছিলেন রবীন্দ্রনাথের  সাহিত্যচর্চা , জমিদারি  দেখাশোনার  সহযাত্রী ।   শিলাইদহ জীবনের ছায়া সঙ্গী  ।


পুত্রের অন্নপ্রাশনের সময়েই বীরেন্দনাথের    উন্মাদ  অবস্থা   তীব্র


 হয় । পুনরায়  দেওয়া  হল পাগলা গারদে  ।  কয়েক মাস পরেই নিয়ে আসা হয় । বাকি জীবন কাটে জোড়াসাঁকোর  বাড়িতেই ।


চার দেওয়ালের    বন্ধ ঘরে   তাঁর প্রিয় বিনোদন  জটিল অঙ্ক  কষার মধ্যে ডুবে থাকতেন ।  তাঁর প্রিয় রবির ভাষায়  ~


"   হেলা ফেলা সারাবেলা,


একি খেলা আপন মনে .... "


উন্মাদ  অবস্থায়  গান শুনলে   শান্ত  হয়ে   যেতেন ।  পরবর্তী কালে পুত্রবধূ   সাহানাদেবীর  সুমিষ্ট কন্ঠের  গান শুনে   ঘুমিয়ে পড়তেন।


১৮৯৯ সালের  ১৯ আগষ্ট  বলেন্দ্রনাথের   মৃত্যু হয় । প্রফুল্লময়ীদেবী তাঁর লেখায়  জানালেন   ~"  যদিও তখন তিনি উন্মাদ অবস্থায়  ছিলেন কিন্ত ভগবান তাঁর   ভিতরেও  পুত্রশোকের দারুণ  যন্ত্রণা  অনুভব করিবার  শক্তি দিয়াছিলেন । "


বলেন্দ্রনাথের  মৃত্যুকালে  স্ত্রী  সাহানাদেবীর বয়স  সতের  বছর মাত্র। তিনি   এলাহাবাদে  পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে  তাঁর     পুনরায়  বিবাহের  ব্যবস্থা  হয়  । পিতার আদেশে  রবীন্দ্রনাথ   এলাহাবাদে গিয়ে  সেই বিবাহ ভেঙ্গে  সাহানাকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে নিেয়ে  আসেন ।


প্রশ্ন  উঠেছিল  যে রবীন্দ্রনাথ    পূনরায় বিবাহ  থেকে বঞ্চিত করে  সাহানাদেবীকে  চির বৈধব্যের মধ্যে ঠেলে দিলেন তিনিই  পরবর্তীকালে নিজ পুত্র  রথীন্দ্রনাথের সাথে   গগনেন্দ্রনাথের ভগ্নি    বিনয়িনীদেবীর  বালবিধবা  কন্যা প্রতিমাদেবীর বিয়ে দিলেন   কোন যুক্তিতে ?


১৯১৫  সালে  বীরেন্দ্রনাথের মৃত্যু  হয় ।


অকাল মৃত্যু হয়  সাহানাদেবীর ।


নিঃসঙ্গ  প্রফুল্লময়ীদেবী বেছে  নিলেন  অধ্যাত্ম সাধনার পথ ।


এই দুই বিধবা রমনীর কাহিনি     ঠাকুরবাড়ির   ইতিহাসে    অন্যতম স্মরণীয়  অধ্যায় ।


যৌবনের  প্রারম্ভে উন্মাদ   রোগগ্রস্থ   হলেন  দেবেন্দ্রনাথের সপ্তম পুত্র   সোমেন্দ্রনাথ ( ১৮৫৯ ~ ১৯২২) ।


  বছর দুয়েকের  বড়  এই দাদার সাথে    রবীন্দ্রনাথের  নিবিড় সখ্যতা।


জোড়াসাঁকো পরিবারে  প্রতিভা ও পাগলামির  অন্যতম নজির  সোমেন্দ্রনাথ ছিলেন অতুলনীয়    কন্ঠস্বরের  অধিকারী ।


প্রথমে  ছোট ভাইয়ের কবি প্রতিভায় বিমুগ্ধ  সোমেন্দ্রনাথ  প্রচারকের ভূমিকায় নামেন।


জীবনস্মৃতিতে   কবি  লেখেন ~  "  আমার দাদা এই সকল রচনায়  গর্ব অনুভব  করিয়া  শ্রোতা সংগ্রহের  উৎসাহে সংসার অতিষ্ঠ করিয়া  তুলিলেন । "


ছোটবেলায় এই দুই ভাইয়ের,  রবি  ও  সোম , সবকিছুই ছিল একসাথে । উপনয়নও  একসাথে ।


কারো কারো মতে তিনি  রবীন্দ্রনাথের  থেকেও  সংগীতে  অধিকতর পারদর্শী  ছিলেন । সোমেন্দ্রনাথ  বলতেন ~  রবি ভাল  কবিতা লেখে  বটে । কিন্তু  তার গান লেখা ভাল  না।


সোমেন্দ্রনাথের মানসিক ভারসাম্যহীনতা তীব্র আকার নেয়  ১৮৭৯  সালের  মাঝামাঝি৷। সোমেন্দ্রনাথকে   বিয়ে দিয়ে   রোগ সারানোর সহজ  উপায় নিলেন না  মহর্ষি, যেমন করেছিলেন    বীরেন্দ্রনাথের  জন্য ।


অকৃতদার   সোমেন্দ্রনাথ  মাঝে মাঝে   উন্মত্ত অবস্থায়   ছুটে যেতেন   চিৎকার করতে করতে  ~ আমাকে বিয়ে দিল না , বিয়ে দিল না । 


পূর্বপুরুষদের   তৈলচিত্র  ছিঁড়ে ফেলার  চেষ্টা করতেন ।


রবীন্দ্রনাথের  প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল  চিরকাল ।


ছিলেন   সুরসিক ।  কেউ এলে  ধরে নিয়ে যেতেন  তিনতলার  ঘরে,


 যেখানে রবীন্দ্রনাথ   লিখছেন । তাঁকে দেখিয়ে বলতেন  ~   ঐ দেখ  এক কেরানি ।  লিখছে আর লিখছে ।

সুধীন্দ্রনাথের পুত্র   সৌমেন্দ্রনাথ   " যাত্রী "  গ্রন্থে স্মৃতিচারণায়  লিখেছেন  ~  আমাদের  সোমদাদা  পুরানো  কত যে গান গাইতেন তার  অন্ত নেই ।


রবীন্দ্রনাথের  প্রথম  কাব্যগ্রন্থ  ", কবি কাহিনী "  তাঁর   উৎসাহেই  মুদ্রিত  হয় ।


জোড়াসাঁকোর  পরিবারে   সর্বাপেক্ষা রূপবতী  ও গুনবতী  বধূটির ভরা  যৌবনে   মাত্র চব্বিশ  বছর   বয়সে  জীবন  শেষ হল ।


রবীন্দ্রনাথ শোকে  বেদনায়  ছিন্নভিন্ন     নুতন বৌঠান  কাদম্বরী  দেবীর  অকাল  প্রয়ানে ।


শবযাত্রীদের   সাথে  পায়ে  পায়ে   নিমতলা শ্মশানে  চলেছেন   এক দীর্ঘকায়  গৌর কান্তি  সুপুরুষ  । উসকোখুশকো চুল, পোশাক । ইনিই  সোমেন্দ্রনাথ  ।


সমাজের   সাথে ক্ষীণতর হতে থাকে  তাঁর   সম্পর্ক  ।


প্রায়ই  মুখে মুখে   অসংলগ্ন  গান রচনা  করে গাইতেন । এরকম একটি হল ~


"   মানিকপীর ভবনদীর


    পারে যাবার  না,


    জয়নাল ফকিরি নিলে


    পানি খেলে  না ।  "


চার দেওয়ালের মাঝে  প্রায় বন্দি  হয়েই   লোকচক্ষুর   অন্তরালে  চিরতরে হারিয়ে  যান  ১৯২২ সালের   ৮ জানুয়ারি  ।


শেষ  জীবনে  ফ্রিস্কি নামে    কুকুরটি  ছাড়া   আর কেউ  সঙ্গী    ছিল  না  তাঁর ।


 


সমাপ্ত


***


#যাপন_কথা


#অরিন্দম_গোস্বামী


   কখনও একা বসে থাকতে থাকতে সেই ছোট্ট ছেলেটার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায় - যার সঙ্গে আমার একসময় খুব চেনাজানা ছিলো । আমরা তো সেই একই কলোনি এলাকায় মানুষ হয়েছি - বাংলা-বিহারের সীমান্ত থেকে একটু বিহারের দিকে ঢুকে এসে । চারিদিকে অনেক কোয়ার্টার , সেখানেই তো সে তার বাবা-মার সঙ্গে থাকে ।

   স্কুলের বইতে আবার লেখা থাকে - বাড়ি ! সেখানে বাড়ির একটা ছবিও দেওয়া । তার তলায় যে গল্প - তাতে লেখা - বাড়িতে অনেক গুলো ঘর আছে । আমার বন্ধুরা তো থাকে তাদের নিজেদের কোয়ার্টার-এ । খেলতে গিয়ে জল তেষ্টা পেলে বলে - চল , ঘর থেকে জলদি একটু জল খেয়ে আসি ।

   সুদেশ এই কথা শুনে হাসে । বলে - বংগালি লোগ জল ভি খাতা হ‍্যায় । ঘর নিয়ে কিন্তু কিছু বলে না ।


   এরমধ্যেই ছেলেটা জল খেয়ে ফিরে আসে , হাতে একটা পাতলা চটি বই । মলাটে ছবি একটা হাতের , যে হাতের ওপর একটা ছুরি গাঁথা , রক্ত পড়ছে টপটপ করে । তার নিচে লেখা - অপরাধী কে ?

   দেখিয়েই জামার ভেতরে লুকিয়ে ফেললো ছেলেটা । বললো - এখন দেবো না , আগে পড়ে নিই । আমি বললাম তাহলে ঐটা দে - কালনাগিনীর মরণকামড় ! ও বললো , ওটা তো দাদার বই । ওটা ওর বাক্সে আছে ।

   আমি বললাম , আমিও একটা বই পেয়েছি গতমাসে - ভোঁদড় বাহাদুর । ও ঠোঁট উল্টে বললো - আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি , ওসব বই আমি এখন পড়ি না ।


   আমি ভাবি , আমি যদি ওর আগে সাইকেল চালানোটা শিখে নিতে পারি , তাহলে ওকে দারুণ টেক্কা দেওয়া যাবে ।

   বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু গিয়েই স্কুল । সেখানে ছেলে-মেয়ে সবাই একসাথেই পড়ে । মেয়েদের পড়া না পারলেও ততো কেউ মারে না  , কিন্তু ছেলেদের মারতে মারতে ছড়িই ভেঙে যায় এক-একদিন । সকালে স্কুলে পৌঁছে লাইন করে একটা প্রার্থনা হয় । তবে , তারও আগে যারা পৌঁছে যায় - তারা স্কুলের মাঠে গুলি-ডান্ডা খেলে ।


   একদিন দেরি হয়ে গেছে বলে ছুটে আসছি মাঠ পেরিয়ে , অমনি সেও মেরেছে গুলিটাকে ডান্ডা দিয়ে সজোরে । আর , লাগবি তো লাগ , সোজা আমার চোখে । আর , তাকাতেই পারিনা , খুব যন্ত্রণা ।

   তখন ওরাও ভয় পেয়ে গেছে । নিয়ে গেলো হেডস‍্যারের ঘরে , সেখান থেকে ডাক্তারখানা । সেখানে লাল ওষুধ দিয়ে পরিস্কার করে ডাক্তারবাবু বললেন - নাঃ , ভয় নেই । ওরা তাও আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেলো । মা তো ঐ রূপ দেখে চেঁচামেচি করে আকুল - আমিই তখন বললাম যে , কিছুই হয়নি , এটা ওষুধ ।


   সকালে উঠে হাত মুখ ধুয়ে ওর সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম । হাতে থাকতো একটা ফুলের সাজি । ফুলের গাছ তখন সব কোয়ার্টার-এই । তিন-চার জনের বাড়ি ঘুরলেই সাজি ভর্তি হয়ে যায় । তাই সেদিকে আমরা যেতাম না , স্রেফ ঘুরে বেড়াতাম এদিক-ওদিক । একটা বিশাল বড়ো মহুয়া গাছ ছিলো , ফুল পড়ে থাকতো ছড়িয়ে । আর পলাশ গাছ যে কতো ছিলো , তার হিসাব নেই । কিন্তু , এসব ফুলে তো ভালো গন্ধ নেই । পলাশের পাতা মুড়িয়ে অবশ্য সত‍্যনারায়ণ পুজোয় সিন্নি দেওয়া হতো ।


   দুর্গাপুজোর পর কালিপুজো পর্যন্ত বিজয়া । রোজই এর-ওর বাড়িতে গিয়ে একটা প্রণাম করলেই নিমকি , শেওভাজা , বোঁদে , নারকেল নাড়ু বা কখনও কখনও ঘুগনি । মাঝে একদিন লক্ষ্মীপুজো - সেদিন শুধু খিচুড়ি, লাবড়া আর কপির তরকারি । একবার ভৌমিক জেঠুদের ঘুগনিটা যা ঝাল হয়েছিলো না ! বেরিয়ে এসে ওই পকেট থেকে একটা নারকেল নাড়ু বের করে দিয়েছিলো ।


   কালিপুজোর পর বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে যখনই ক্লাস ফাইভে উঠলাম - ওমনি স্কুল থেকে আমাদের চারজনকে পাঠানো হলো ধানবাদে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে । পরপর চারদিন দুবেলার পরীক্ষা । পরপর তিনদিন যেমন-তেমন কাটিয়ে শেষদিন দুপুরের পরীক্ষা - ললিতকলা । বাড়ি থেকে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত আর দুটো কবিতা আবৃত্তি শিখিয়ে পাঠিয়ে ছিলো । কিন্তু , পরীক্ষার হল-এ হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো তকলি আর তুলো - সুতো কাটতে হবে । একটু নেড়েচেড়ে বললাম - চল , উঠে পড়ি । বাড়িতে পৌঁছে দেখি স্কুলের বুকলিস্ট অনুযায়ি আনা হয়েছে পরের ক্লাসের বই , তারমধ্যে একটার নাম - সমাজ অধ‍্যয়ন আর একটার নাম - ভৌতিকী । পড়ে অবশ্য দেখলাম ভয়াবহ কিছু নয় - একটা সোশ্যাল সায়েন্স আর একটা ফিজিক্যাল সায়েন্স-এর বই ।


   স্কুলের পেছনেই খানিকটা জঙ্গল আর তার পরেই নদী । আমি আর সেই ছেলেটা এক-একদিন একটা ক্লাসে বাইরে যাবো বলে বেরিয়ে চলে গেলাম সেই নদীর পাড়ে । সুন্দর বালির তীরভূমি , টলটলে জল । আরও দুটো ছেলে চলে এলো - এরা স্কুলে পড়ে না । তাদের মুখ চিনি কিন্তু নাম জানি না । ঠিক হলো - এতোটা এসেই পড়েছি যখন - স্নান করেই যাই । সবাই লাফালাফি করছে নিজেদের মতো । হঠাৎই দেখি মুখচেনা একটা ছেলে হাত উঁচু করে একবার ডুবছে , একবার উঠছে । সর্বনাশ , ভয়ে কথাটাও আর বলতে পারছি না । এইসময়েই বাঁচাতে এগিয়ে এলো সেই ছেলেটাই ।


 আমাদের ছেড়ে রাখা জামায় ওদের গামছা দিয়ে গিঁট বেঁধে ছুড়লো ওর দিকে । তারপর টেনে তুললো ডাঙায় । ভিজে একাকার হয়ে স্কুলে গিয়ে সেদিন নানান মিথ্যা বলতে হয়েছিলো , কিন্তু আরও হেনস্থার ভয়ে সত্যিটা আমরা তখনই বলিনি ।


   ওখান থেকে চলে আসার পর ঐ বন্ধুর কথা আমি অনেককেই বলেছি , কিন্তু ঐ বন্ধুর সঙ্গে আমার আর সাক্ষাৎ হয়নি । যে আমাকে নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়েছিলো - মানুষের মধ্যে আছে এক অপার সম্ভাবনা । যে শিখিয়েছিলো - মানুষ সম্পর্কে কখনোই আগাম ভবিষ্যত-বাণী করা যায় না ।

***


#রবীন্দ্রনাথ_ঠাকুরের_একটি_গল্প


 


#রাণু_মজুমদার


 


গল্পগুচ্ছ  ( প্রথম খণ্ড) এর অন্তর্গত একটি গল্প :পোস্টমাস্টার। 


নাম পোস্টমাস্টার হলেও প্রধান একটি ছোটো প্রাণ।  এক বালিকা । তার নাম রতন। সে হত দরিদ্র। সর্বহারা। তার  চাওয়া - পাওয়াই কেন্দ্রীভূত হয়েছে এই গল্পে।


পোস্টমাস্টার কলিকাতার ছেলে। তার প্রথম পোস্টিং উলাপুর গ্রামে। কলিকাতার ছেলে  জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যে রকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ‍্যে আসিয়া পোস্টমাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ‍্যে তাঁর অফিস।


        বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে।


         পোস্টমাস্টারের বেতন অতি সামান‍্য। নিজে রাঁধিয়া খাইতে হয়। গ্রামের একটি পিতৃমাতৃহীন অনাথা বালিকা   তাঁহার কাজকর্ম করিয়া দেয়, এর বিনিময়ে সে দুবেলা খাইতে পায়। মেয়েটির নাম রতন। বয়স বারো- তেরো।


     গ্রামের সন্ধ‍্যা মানেই ঝিল্লির ডাক, শিয়ালের ডাক শুনলেই পোস্টমাস্টার ক্ষীণশিখা প্রদীপ জ্বালিয়া রতনকে ডাকিতেন তামাক দেবার জন‍্য। রতন যখন তামাক সাজিয়া আগুন দিয়া ফুঁ দিতে দিতে কলিকাটা দাদাবাবুর হাতে দিতেই দাদাবাবু তখন রতনের বাবা মার কথা জানিতে চাহিল।


আবার এক-এক দিন সন্ধ‍্যাবেলায় বৃহৎ আটচালার অফিসে কাঠের টেবিলের উপর বসিয়া পোস্টমাস্টার নিজের  বাড়ির  কথা অর্থাৎ মা, দিদি এবং ছোটো ভাইয়ের কথা রতনের  কাছে বলতেন কিন্তু কোনো দিন নীলকুঠির গোমস্তাদের কাছে কোনোমতেই উত্থাপন করিতেন না।


      আবার দীর্ঘ দুপুরবেলায় একাকীত্ব দূর করার জন‍্য রতনকে পড়াতে শুরু করলেন। এই ভাবেই অল্পদিনের মধ‍্যে যুক্তাক্ষর উত্তীর্ণ হলেন।


     বর্ষাকালে বৃষ্টির আর শেষ নেই। পথ-ঘাট সব জলে জলাকার। পোস্টমাস্টার রতনকে ডেকে বললেন," শরীরটা ভালো  লাগছে না- দেখতো আমার কপালে হাত দিয়ে। "


এই নি:সঙ্গ প‍্রবাসে ঘন বর্ষায় রোগ কাতর শরীরে নিজের  লোকের অর্থাৎ জননী বা দিদির সেবা পাইতে ইচ্ছা করে। তখন বালিকা রতন আর বালিকা রহিল না। তখন সে জননীর পদ  অধিকার করিয়া বসিল,


বৈদ‍্য ডাকিয়া আনিল, যথা সময়ে ঔষধ খাওয়াইল, সারা রাত্রি শিয়রে শিয়রে জাগিয়া রহিল।


আপনি পথ‍্য রাঁধিয়া দিল এবং শতবার করিয়া জিজ্ঞাসা করিল," দাদাবাবু একটু ভালো বোধ হচ্ছে কি?"


এইখানে রতন জননী রূপে সেবা করছে।


বহুদিন পর পোস্টমাস্টার রোগ সজ্জা থেকে উঠে বদলির জন‍্য দরখাস্ত করিলেন। রোগ সেবা থেকে নিস্কৃতি পাইয়া রতন আবার নিজের জায়গা অর্থাৎ দ্বারের বাইরে বসিয়া থাকে। রতন দাদাবাবুর ডাকের অপেক্ষায় করে


আর দাদাবাবু তখন অধীর চিত্তে তাঁর দরখাস্তের উত্তর প্রতীক্ষা করিতেছেন।


 


অবশেষে সপ্তাহ খানেক পরে একদিন সন্ধ্যাবেলা রতনের ডাক পড়ল l রতন গৃহের মধ্যে প্রবেশ করে বলল :দাদাবাবু আমায় ডাকছিলে ?


পোস্টমাষ্টার বললেন :রতন কালই আমি যাচ্ছি l 


---কোথায় যাচ্ছো দাদাবাবু ?


---বাড়ি যাচ্ছি l 


---আবার কবে আসবে ?


---আর আসবো না !


রতন রান্নাঘরে রুটি করতে গেল !


পোষ্টমাস্টারের খাওয়া শেষ হলে রতন সহসা বলল :দাদাবাবু আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে ?


পোষ্টমাষ্টার হেসে জবাব দিলেন :সে কি করে হবে ?


"সারারাত স্বপ্নে এবং জাগরণে বালিকার কানে পোষ্টমাস্টারের নিষ্ঠুরতম হাস্যধ্বনি কন্ঠস্বর বাজিতে লাগিল !"


---সে কি করে হবে :এর চেয়ে নিষ্ঠুরতম আঘাত আর কী হতে পারে !


এই আঘাত পাওয়ার পরেও রতন অত রাতে নদী থেকে দাদাবাবুর জন্য জল তুলে এনেছে !কারণ খুব সকালে রতনের দাদাবাবুটি স্নান করে বাড়ি যাবেন !


স্নান শেষ হলে তিনি রতনকে ডাকলেন !রতন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল !


দাদাবাবু বললেন :রতন আমার জায়গায় যিনি আসবেন তাকে বলে দিয়ে যাবো ---তিনি তোকে আমারই মত যত্ন করবে !আমি চলে যাচ্ছি বলে তোকে কিছু ভাবতে হবে না !


"কিন্তু নারীর হৃদ্য় কে বুঝিবে !"


রতন অনেক দিন এহেন প্রভুর তিরস্কার নীরবে সহ্য করেছে !কিন্তু পোষ্টমাস্টারের এই কথাগুলো সে সহ্য করতে পারল না !


সে কেঁদে বলল :না না তোমার কাউকে কিছু বলতে হবে না ---আমি থাকতে চাইনে !"


যাবার সময় নিজের পথখরচাটুকু রেখে বাকি টাকা রতনকে দেবার জন্য বের করলেন দাদা বাবু !


কিন্তু রতন দাদাবাবুর পা জড়িয়ে বলল :দাদা বাবু তোমার দুটি পায়ে পড়ি আমাকে কিছু দিতে হবে না ---আমার জন্য কাউকে কিছু ভাবতে হবে না !


বলেই ছুটে সেখান থেকে চলে গেল রতন !


পালিয়েও সে পোষ্টঅফিস গৃহের চার দিকে কেঁদে কেঁদে ঘুরছিল :যদি দাদাবাবু ফিরে আসে !


রতনের দাদাবাবু যখন নৌকায় উঠলেন ও নৌকা ছেড়ে দিল তখন তখন হৃদয়ের মধ্যে একটা বেদনা অনুভব করতে লাগলেন !এবং তখনই পালে হাওয়া লেগে প্রবল স্রোতে নৌকা তীর বেগে চলে গেল !


এখানেই গল্প শেষ! কিন্তু "শেষ হইয়াও হইল না শেষ !"


পরের গল্প পাঠকমনে অনুরণন তোলে !তাই আজও ঘুরে ফিরে পড়তে হয় এই গল্পটি l বাংলা কথা সাহিত্যের অজস্র ছোটগল্পের মধ্যে এক চিরকালীন সম্পদ পোষ্টমাষ্টার !


***




No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...