Tuesday, 22 September 2020

গল্পের পাতা ১ (দ্বিতীয় পর্ব)

  #শারদীয়া_কিন্নর_দল


আজকের গল্পের পাতা সাজানো হলো সম্পাদক মন্ডলীর তিন সদস্যের গল্প দিয়ে।


ওঃ হাঁটুর ব্যথার কি কষ্ট!
পিং আর ইকাকে বলছিলাম, বয়েসটা যদি না বাড়তো, এসব রোগব্যাধিও থাকতোনা। পিং বলল, বয়েস তো বাড়বেই। ফল পচে। ফেলে দিতে হয়। বীজ থেকে নতুন পাতা, নতুন গাছ, নতুন ফল। এটাই পৃথিবীর নিয়ম।
ইকাও সায় দিল।
রেগে গেলাম আমি। উঁ...........!! নিজেরা তো দিব্যি আছে। পিং তো থাকে টাইটানে। মানে শনিগ্রহের একটা চাঁদে। শ্বাস নেয় হাইড্রোজেনে। আর ইকারা মঙ্গলগ্রহে মাটির নিচে। বরফ থেকে বানায় হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন। ওদের তো বয়েস বাড়ার ব্যাপারই নেই। ওরা কি করে বুঝবে বুড়োবয়েসে ব্যথাবেদনার কষ্ট?
অন্যসময়, ওদের কাছে আমার অফুরন্ত সব জিজ্ঞাসা।
'তোমরা কি খাও? তোমাদের মাবাবা ভাইবোন ছেলেপুলে আছে?'
ওরা হাসে। হাসিটা অবশ্য বুঝে নিতে হয়। কখনও দেখিনি তো ওদেরকে! কু...উক্ কু...উক্ আর টু... ইট্ টু... ইট্ পাখিদের শিসের ডাকে ওরা আমার মনটার মধ্যে ঢুকে পড়ে। আর দিব্যি কথাবার্তা চালিয়ে যায়। মনেমনেই। তবে সেদিন যেই না বলেছি - বয়েস বাড়া তো থামাতেই পারো না। এদিকে বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলে তো দিব্যি এলিয়েনদের ঘাঁটি বানিয়েছো।জাহাজ, এরোপ্লেন - এসবও তো তোমরাই ধ্বংস করে দিচ্ছো।
শুনেই পিং তো রেগেমেগে চলে গেল। ইকাও!
যাকগে! রাগ পড়লে আবার আসবে।
দিব্যি কাটে সকালবেলাটা। রিক্সা, সাইকেল, মানুষজন - গমগম্ করে অন্যদিন। কিন্তু আজ এত চুপচাপ কেন? চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে থেমে গেলাম। আরে.......? চা বানালাম কখন আমি? বারান্দায় পাখিগুলো আসেনি। কুলজিৎ মুলজিৎদের ট্যাক্সিটাও বেরোয়নি। হলোটা কি?
যাকগে! আজ একটু ফুলকপি রান্না করলে হয়। অমনি দেখি দেউড়ির পাশটায় সারি সারি ফুলকপি। কি করে হলো? আচ্ছা, খাবারের কথা ভাবলেই দেখছি খাবার এসে যাচ্ছে। গুপী গাইন বাঘা বাইনের সেই ভূতের রাজাটা এসেছে নাকি?
- আমরা এসেছি।
- আমরা? আমরা কারা?
তক্ষুনি ফুলকপিগুলোর রঙ পাল্টে হলো তামাটে। দুটো করে অ্যান্টেনাও বেরোলো তাতে।
- একি? তোমরা এলিয়েন নাকি?
- হ্যাঁ। আমরা তোমাদের বয়েস বাড়া বন্ধ করতে এসেছি।
- এত নিস্তব্ধ কেন চারিদিক?
- আমরা শব্দ পছন্দ করি না।
- কেন? শব্দই তো ব্রহ্ম। বাতাসের শনশন্, নদীর কুলকুল, বৃষ্টির রিমঝিম্ -
- না....!! ওসব বোলোনা। তোমাদের হৃদয়ের ঐ ধকধক্ আওয়াজ, ঐ রক্তপ্রবাহের শব্দ, আমরা সহ্য করতে পারছি না! বন্ধ করতে চাই চিরতরে।
- পারবেনা! জগন্ময়ী জগন্মাতার অমৃতনাড়ীর সাথে আমাদের নাড়ী অচ্ছেদ্য। ফিরে যাও তোমরা!
চেঁচিয়ে উঠি আমি।
অমনি, আবার চারদিক হয়ে গেল আগের মতো। বাসনমাজার আওয়াজ, পাখিদের বিস্কুট ঠোকার ঠুকঠুক্। কুলজিৎ ট্যাক্সি ঠেলছে আর মুলজিৎ স্টিয়ারিংএ।
কু....উক্ কু....উক্! টু....ইট্ টু....ইট্! এসে গেছে পিং আর ইকা! হাঁপাচ্ছে দুজনেই।
আগুপিছু করে বলল -
- তাড়িয়েছি!
- কাকে?
- ঐ যে,অ্যাণ্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির প্রক্সিমিটি টোয়েন্টিটোয়েন্টির পাজিগুলোকে।
- পৃথিবীকে ধ্বংস করতে এসেছিল ওরা।
- দেখলে তো? বয়েস বাড়া থামানো যায় না! সব ভাঁওতা!
বলে টলে দুজনেই ধাঁ।
আমিও উঠে পড়ি। গুটিগুটি হাঁটতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি থমকে। একি! আমি..... এরকম হাঁটছি কি করে? হাঁটুর ব্যথাটা..... গেল কোথায়?
কু....উক্ কু... উক্! টু... ইট্ টু... ইট্!
দেখেছো? দুষ্টুমুখে উঁকি দিচ্ছে পিং আর ইকা!


রক্তাক্ত মাংসপিন্ডগুলি বাতাসে ছুঁড়ে দিয়ে শয়তানটা হা হা করে হাসছে আর বীভৎস স্বরে বলছে
- এই হল ওভারি । হু-শ্ ! যা-হ্ ! ওইযে উড়ে যাচ্ছে ফেলোপিয়ান টিউব। খড়গ দিয়ে সব কুচি কুচি করে দিয়েছি -- সারভিক্স, ইউটেরাস , সব , সব ।
শয়তানটার দুহাত দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে ।
কে যেন কাঁদছে-- আমাকে বাঁচাও! মা, মা! আমাকে বাঁচাও!
--ওহ্ না! না! মেরোনা ! ওকে বাঁচতে দাও ! দেবী ঘুমের মধ্যে গোঁঙায় ।
-- কী হলো দেবী ? স্বপ্ন দেখেছো? ওঠো । উঠে পড়ো। লাঞ্চ টাইম হয়ে গেছে । খাবার এসে যাবে এখুনি । মহীন দেবীকে নাড়া দিয়ে বলে ।
কম্বল সরিয়ে দেবী উঠে বসে । এসি কম্পার্টমেন্টেও ঘেমে উঠেছে । কী বীভৎস স্বপ্ন ! ঘোর কাটাতে চোখে মুখে জল দিতে যায় ।
-- তাহলে ডাক্তার বাবু, আর কি কোনো আশা নেই? দেবীর এ কথার উত্তরে চেন্নাইয়ের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের বড়ো ডাক্তার বাবু বলে দিয়েছেন -- অপারেশন ছাড়া কার্সিনোমার সম্ভাবনা দূর করা সম্ভব নয় ।
মহীন কোলকাতার নার্সিংহোমেই হিসটেরেকটমিটা করাতে চায় । তাই এখন ঘরে ফেরা । আর সেই থেকে তার মাতৃসত্ত্বার অন্ধকার ভবিষ্যত দেবীকে শয়নে জাগরণে তাড়া করে ফিরছে ।
অন লাইনে খাবার অর্ডার দেওয়া হয়েছিল । এসে গেছে । ট্রেনের একঘেয়ে খাবার আর ভালো লাগছিল না । আর বিষাদগ্রস্ত দেবীকে একটু চাঙ্গা করতে তার প্রিয় খাবার ফ্রায়েড রাইস-চিলি চিকেন দিতে বলেছিল মহীন।
টু টায়ারের অন্য দুই সহযাত্রী ওদের নিভৃতে খাবার সুযোগ করে দিতে বাইরে গেছে। মহীন সাইড টেবিলে দেবীর ট্রেটা রেখে এল্যুমিনিয়াম ফয়েল খুলে দিয়ে বলল , নাও খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি । আমাদের হলে ওরা খেতে আসবে ।
দেবী সীটে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে কোলে তোয়ালে বিছিয়ে সবে খাওয়া শুরু করবে , একটা বিশাল হৈহৈ রব ছুটে এল তাদের দিকে ।
সবার অবিরত যাতায়াতে ওদের প্যাসেজের পর্দাটা হাটখোলা হয়েগিয়েছিল । সেই ফাঁক পেয়ে দুটো বাচ্চা ঢুকে পড়েছে তাদের ক্যুপে। একটি বছর পাঁচেকের ছেলে , অন্যটি বছর তিনেকের মেয়ে । পরণে ময়লা জামা । ততোধিক মলিন তাদের চেহারা ।
ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে । সুখাদ্যের লোভনীয় গন্ধে ক্যুপের ভেতরটা তখন ম' ম ' করছে । ওরা নির্নিমেষ লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে সেই দিকে ।
দেখতে দেখতেই ছুটে এসেছে তাদের মা ।জট বাঁধা চুল । পরণে নোংরা সালোয়ার-কামিজ। উড়নচন্ডী ভাব। কোলে বছর দেড়েকের আর একটি পুত্র সন্তান । বেশ নাদুস নুদুস চেহারা তার। মুখে আঙ্গুল গুঁজে আছে । নাল গড়িয়ে পড়ছে হাত বেয়ে । চোখে মুখে খুশির আভা। জীবনে বেঁচে থাকার যুদ্ধের কোনো আঁচ লাগেনি তার গায়ে । তাই হয়তো এতো সুখী ভাব।
ভারি সুন্দর দেখতে বাচ্চাটা !
দেবী ভাবে । আর বহু প্রসবিনী মা ও তার সন্তানদের দিকে বুভুক্ষুর মতো তাকিয়ে থাকে বিদ্যুত ঝলকের মতো মাত্র সেই কয়েকটি মুহূর্ত যতক্ষণ না পেছন পেছন রেল পুলিশ এসে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যায় ।


ঝির ঝির বৃষ্টি পড়ছে । আমচারাটা গতকাল কিনেছি ১৫০ টাকায় । জায়গাটা আগেই দেখে রেখেছি । পাড়ার শেষে রাস্তার পাশে ঐ জায়গাটা ভালো । রাস্তার ধারে অনেকটা জায়গা । কারো অসুবিধা হবে না । আমগাছটা বাড়লে বেশ হবে । সামনের বাড়ির সুজয়বাবুর সঙ্গে দুদিন আগে কথা বলে নিয়েছি । তিনি রাজি হয়েছেন ।
– হ্যাঁ – হ্যাঁ - লাগান না । ভালোইতো । আম না পাই ছায়া তো পাবো । তাছাড়া ওটাতো আমার জমি নয় ... আমার বাউণ্ডারির বাইরে ।
- না তবুও ...
অনুমতি মেলাতে খুশি হই । ফেন্সিং-এর সরঞ্জামগুলো গতকাল ওই সুজয়বাবুর গেটের ভেতরে এক কোণে গুছিয়ে রেখে এসেছি । আজকে সঙ্গে আমচারাটা আর ফেন্সিংটা লাগাবার টুকটাক জিনিসপত্র নিয়ে বেশ ভোরেই বেরিয়েছি ।
রাস্তা ফাঁকাই । ছাতা নিলে ভালো হতো । ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে এখোনো ।
আমাদের বাড়ির ছোট গলিটা পেরিয়ে বড় রাস্তাটায় উঠে কিছুটা হাঁটতেই মনে হলো - কে যেন পিছনে আসছে । একজন বড় রঙিন ছাতা মাথায় দিয়ে জোরেই হেঁটে আসছে । আমাকে ধরার জন্যই যেন আসছে । অনুমানটা সঠিক । আমার একেবারে ঘাড়ের কাছে এসে গেছে ।
এতো ভোরে চললেন কোথায় গাছ টাছ নিয়ে ?
ছাতার নিচে থাকায় নজরটা জোর করে দেখার চেষ্টা করি । মাঝ বয়েসী । চেনা চেনা । কিন্তু মনে করতে পারি না কোথায় দেখেছি ।
- বলছিলাম এতো ভোরে গাছ-টাছ নিয়ে চললেন কোথায়?
- ইয়ে - এই আমের চারাটা লাগাবো ।
হ্যাঁ , বেশ কয়েক মাস ধরে দেখছি গাছ টাছ লাগাচ্ছেন । ভালো কাজ ...
আসলে রিটায়ার্ডতো ... হঠাৎই এই ভাবে সময় কাটাবার রাস্তাটা মাথায় ক্লিক করে ।
হাঁটতে হাঁটতেই লোকটা ছাতাটা আমার মাথাতে ধরে । দুজনে এবারে পাশাপাশি । লোকটার ভদ্রতায় ভালো লাগে ।
- আসলে বুঝলেন , শুরুতে কয়েকটা গাছকে বাঁচাতে পেরে কাজটায় একটা উৎসাহ পেয়ে গেছি । কিন্তু এখন বুঝছি - কাজটা খুব সোজা নয় ।
- কেনো কঠিন কেন ?
- খুব ভালো ফেন্সিং দিতে পারি না । সব সময় নজরো রাখা যায় না । তাই গাছ বাঁচানো খুব মুসকিল ।
- হুঁ –
- তারপর গাছ লাগানোর মতো মাটিই খুঁজে পাই না । রাস্তার ধারগুলো এমন ভাবে কংক্রিট করে দিচ্ছে ! যে ভাবে কংক্রিটের রাজত্ব শুরু হয়েছে ! তারপর গরু ছাগলতো আছেই ।
- হুঁ –
একাই বকে যাচ্ছি ভেবে - চুপ করে থাকি ।
- হ্যাঁ , কি বলছিলেন ? লোকটি আবার কথা শুরু করে ।
- না ... এই বলছিলাম ... দেখছেন পাড়ার আগের সেই সবুজটা একদমই হারিয়ে গেছে ।
- হুঁ –
ভদ্রলোকের গলায় নিস্পৃহতা । আমি আর কথা বাড়াই না । চুপচাপ দুজনে হাঁটতে থাকি ।
সত্যিইতো এসব কথা ওনাকে বলে কি লাভ ? এখন দেখছি সময় কাটানোর ঝক্কিও কম না ...... কিছু গাছ কোন এক অজ্ঞাত কারণে কেউ বা কারা উপ্‌রে দিচ্ছে - মেরে দিচ্ছে । ওই জায়গায় আবার লাগিয়ে দেখেছি । আবার মেরে দিচ্ছে ! কারণটা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি । গাছটা ভবিষ্যতে কোন অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে - এই আতঙ্কেই হয়তো ... মনটা খারাপ হয় , আবার জেদটাও চেপে বসে । অনেক টাকা গেছে এই ভাবে । যাক । তবু ...
সুজয়বাবুর বাড়ির সামনে এসে গেছি । থামি । যাক বৃষ্টিটাও থেমে গেছে ।
সরঞ্জামগুলো আনার জন্য সুজয়বাবুর গেটের দিকে এগোই ।
- কোথায় লাগাবেন গাছটা ? প্রশ্ন শুনে লোকটার দিকে ঘুরে তাকাই ।
- এইতো এখানে ।
এখানে লাগাবেন না । লোকটার স্বরটা এখন বেশ গম্ভীর ।
- কেন ?
- বলছি লাগাবেন না – লাগাবেন না ।
এমন বলার কারণটা কি - বুঝতেই পারি না ।
কেন ? অস্ফুট ভাবে উচ্চারণ করি ।
আবার প্রশ্ন করছেন ? উনি কঠোর ভাবে তাকায় ।
আমি এই সামনের বাড়ির সুজয়বাবুর সাথে কথা বলেই ...
- আবার কথা !
আমার হাতের আম চারাটা কেঁপে ওঠে ।
...... এখানে কি এমন অসুবিধা থাকতে পারে ওনার । ভাবার চেষ্টা করি ...... উঁ - মেলার সময় কিছু দোকান বসে এখানটায় । তাদের থেকে তখন ভালো তোলা আদায় হয় শুনেছি। ... তার সঙ্গে এই ভদ্রলোকের কি সম্পর্ক ? ... আমি বুঝে উঠতে পারি না ।
- কি হলো কথাটা কানে যায় নি ?
ফটাস করে ছাতাটা বন্ধ করেন ভদ্রলোক ।
আমি বোবা হয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকাই । এবার ভোরের আলোয় লোকটার মুখটা স্পষ্ট চিনতে পারি ।
হ্যাঁ - সেদিন এই লোকটিকেই তো পৌরসভার বৃক্ষরোপণ উৎসবে দেখেছি ! সবুজায়ন নিয়ে বেশ ভালো বলছিল এই লোকটিই ।


No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...