Tuesday, 22 September 2020

গল্পের পাতা ২

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল




#চতুর্থ_পাতা


আজ আরও তিনটি গল্প 


#অস্তিত্ব

            


#সিক্তা_গোস্বামী  


  

কি অসভ্য মেয়ে রে বাবা ! একটা হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে নাচছে! যতই নিজের ঘর হোক । জানলাটা যে খোলা, পর্দাটা সরানো আছে নজরে পড়বে না ? 


      আজকাল এই এক উৎপাত জুটেছে সুবিমলের। এতদিন ওই ঘরের জানলাটা বন্ধ ই থাকত । বাড়িটায় কেউ থাকত না। এই কয়েকদিন হল নতুন লোক এসেছে। আর ওই ধিঙ্গি মেয়েটা ঠিক সুবিমলের ঘরের সামনেই থাকে।


সুবিমল অফিস থেকে অবসর নিয়েছে বছর পাঁচেক। গত বছর হঠাৎ স্ট্রোক হয়ে প্যারালাইসিস। জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিক এখন। শুয়েই দিন কাটে। নিজের শরীরটা নিজের ক্ষমতায় নাড়তে পারে না। তাই ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী এই বিছানা আর ভরসা আয়া। এই জনলাটুকুই ওর জগৎ। শুয়ে শুয়ে আকাশের রঙ পরিবর্তন দেখে, দেখে প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনও। পাশের রাস্তা দিয়ে মানুষের টুকরো কথা, চলাচলের শব্দ কানে আসে। গাড়ির হর্ন আর চাকার ঘষটানির শব্দে খুঁজে নেয় জীবনের গতিময়তা। এই স্থবির জীবন মেনেই নিয়েছে সুবিমল। 


সুবিমল একজন পুরুষ মানুষ। অসুস্থ হোক বা বয়স হোক। মেয়েটার আক্কেলটাই বা কি! মনে হয় না একবারও ?  বাবা-মার শাসন নেই? অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ নেই। এযুগে মা বাবার কথা কটা ছেলেমেয়ে শোনে? নিজের ঘরেও তো দেখেছেন। তা বলে এই বেলেল্লাপনা ! সুবিমলের জীবনের ছন্দটা কেমন কেটে গেছে। বারবার চোখ চলে যায় ওই মেয়েটার দিকে। চোখ না গিয়েও তো উপায় নেই একেবারে মুখোমুখি জানলা দুটো। ওর বেহায়াপনা দেখতে বাধ্য হয়। মোবাইল নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কী যে করে ! অদ্ভুত অদ্ভুত ভঙ্গিমায় সেলফি তোলে। পোশাকের তো কোন ছিরি ছাঁদ নেই। পরা না পরা দুইই সমান। 


মেয়েটা কি সুবিমলকে দেখতে পায় না ? তা কি করে সম্ভব ! সব সময় সুবিমল তো এখানেই শুয়ে থাকে। তাছাড়া আয়া মাঝে মাঝে বসাবার চেষ্টাও করে। শরীরটা অচল হলেও দৃষ্টি শক্তি  ক্ষীণ হয়নি। আর মন তো এখনো তরতাজা ।  জানলা খুলে পর্দা সরিয়ে এরকম অঙ্গ ভঙ্গী করার মানে কি ? ওই মেয়েটা কি ওকে জড় পদার্থ ভাবে? মনটা হু হু করে ওঠে। 

বাড়িতেও তো এককোনে পড়ে থাকে। ওকে জিজ্ঞেস না করেই সব সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। নিজের সংসারেও কোন ভূমিকা নেই। ভগবানকে ডাকতেও ইচ্ছা করে না এই জড়পিন্ড করে কেন যে তিনি বাঁচিয়ে রাখলেন? সারাদিন আয়ার ভরসায় ঘরের এই কোনে পড়ে থাকা। ওই মেয়েটা কি সুবিমলকে মৃত মানুষ মনে করে? ও যে বেঁচে আছে তা কি মানে না ?


 সুবিমলের অনুভূতির কোন মূল্যই নেই ওর কাছে ? তাই কি ওর সামনে লজ্জা ঘেন্নার কোন প্রয়োজন বোধ করে না ? চোখের কোনে জল ভরে আসে। জীবন্মৃত এক অসহায় বৃদ্ধ । হতাশা তাকে গ্রাস করে। 


                  *****************

আজ মেয়েটা একটা ডেনিম ব্লু লো কাট জিন্স পরেছে। ফিরোজা কালারের স্কিন টাইট টপ। চুলে সোনালী স্ট্রাইপ । ঠোঁটে রানী কালারের লিপস্টিক। সামনের জানলায় উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে। হয়তো আজ বিশেষ কেউ আসবে। মাঝে মাঝেই সুবিমলের দিকে তাকাচ্ছে। আজ কেন এতবার তাকাচ্ছে? সুবিমল কি পাথরের মূর্তি ? 


এমন সময় একটা অল্প বয়সী ছেলে এসে ঢুকল মেয়েটার ঘরে। ও ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ছেলেটাকে। আজকাল এই এক ইংরেজী স্টাইল হয়েছে। হাগ , কিস। এইসব ঢং সহ্য হয় না। সুবিমল চোখ বন্ধ করল। অস্বস্তি হচ্ছে খুব। এ দৃশ্য কতদূর গড়াবে কে জানে । কিন্তু চোখ বন্ধ করে কতক্ষন থাকা যায় ! সুবিমল খুলেই ফেলল চোখটা। মেয়েটা জানলার পর্দাটা টেনে দড়াম করে বন্ধ করে দিল জানলাটা। 

আয়া শেফালী কাছেই ছিল । শব্দে চমকে উঠল। - কি অসভ্য মেয়ে রে বাবা ! মুখের ওপর এভাবে কেউ জানলা বন্ধ করে ? ভদ্রতাটুকুও শেখেনি? 

সুবিমলের পক্ষাঘাতগ্রস্ত বেঁকে যাওয়া মুখে তখন ফুটে উঠেছে এক চিলতে হাসির রেখা।


                    **


   #চিকিৎসা


#শিপ্রা_ভৌমিক


                   সকাল দশটা বাজতে তখনও আধঘন্টা দেরি।ব্যাঙ্কের সামনে লম্বা লাইন।আমার আগে একডজন গ্রাহক।এতদিন আমি একটা ভালোমানুষের মুখোশ পরে রাস্তায় বেরোতাম।কত সুবিধা ছিল,ধোওয়া বা স্যানিটাইজ করার ঝক্কি ছিল না।                                  


  এখন মাথায় টুপি আর বদন জুড়ে সামিয়ানা।শুধু কোটর থেকে সাপের মতো চোখ দুটোই দৃশ্যমান।সব অভিব্যক্তি চোখ দিয়ে ফোটাতে গেলে চোখে জল আসে।করোনা নিয়ে এসব আটআঠারো ভাবনার মধ্যেই মোবাইল ঘড়ি দশটার ঘর ছুঁল।ঠিক সেই সময়ই,খালি গা,লুঙ্গির বেড় দেওয়া একটা বছর চল্লিশের সরু বেঁকা কোমর, আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।

            আমি বললাম,'এখানে দাঁড়ালে কেন,লাইনে দাঁড়াও।'লোকটা বলল,'আমার লাইন লাগে না।সবার আগে আমিই টাকা পাব।করোনা আবহেও ওর মুখমন্ডলে কোনো মাস্ক নেই।

আমার ব্যাগে বাড়তি দুটো সার্জিক্যাল মাস্ক রাখাই থাকে।তারই একটা লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলি,' এটা পরে, নাক মুখ ঢেকে নাও।না হলে ব্যাঙ্কে ঢুকতে দেবে না।' লোকটা বলল,'এই মাস্ক পরে আমার কোনো লাভ নেই।খিদে আটকাতে পারে এমন মাস্ক থাকলে, দেন।' এমন শক্ত প্রশ্ন আমি কোনো পরীক্ষাতে পাইনি।সাদা পাতা জমা দেওয়া ছাড়া উপায় কী!আমাকে চুপ করে যেতে দেখে,লোকটা তার জীবনের মুখবন্ধ খাম খুলতে লাগল।                                  'মার্চের শেষে লকডাউন জারি হল।আমার মতো রেলহকারের রোজগারও লক হয়ে গেল! এখন আমার বাঁচা মানে মরা, আর মরা মানেই বাঁচা!আজ টাকা নিয়ে বাড়ি যেতে না পারলে বউ চিবিয়ে খাবে!'একে স্বাস্থ্যসুরক্ষা বোঝানো আর ঝড়ের সঙ্গে কুস্তি লড়া একই ব্যাপার।ভাবি, লোকটার মতলব কী? টাকা তোলার লাইনে দাঁড়িয়েছে কেন?হাতে কোনো পাসবইও নেই।ছদ্মবেশি ছিনতাইকারী নয় তো?     

                              

    হঠাৎ সে সবাইকে চমকে দিয়ে 'দিলীপবাবু, দিলীপবাবু' বলে জোরে ডাকতে থাকে।ব্যাঙ্কের দোতলা থেকে একজন চেঁচিয়ে বলে,'রহমান,একটু বোস,আসছি।' দশ মিনিট পরেই  একজন ব্যাঙ্ককর্মী নীচে নেমে এসে একটা পাঁচশো টাকার নোট তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,'এটা রাখ।চাল,ডাল,তেল,আলু কিনে ঘরে নিয়ে যা।' রহমান টাকাটা মাথায় ঠেকিয়ে একটা কৃতজ্ঞতার হাসি ছড়িয়ে, বাড়ির দিকে রওনা হয়।রহমানের আয়ুরেখা একটু বাড়ে,আমারও অপেক্ষার লাইন কমে।।কাউন্টারের কাছে পৌঁছতে আর পাঁচ মানুষ দেরি।দিলীপবাবুই কাউন্টারে রয়েছেন।উনিই বিশেষ পরিষেবা দিয়ে বোঝালেন,কিছু মানুষের কাছে সার্জিক্যাল কিংবা এন নাইনটি ফাইভের চেয়েও প্রয়োজনীয় 'মাস্ক' কী!এই 'মাস্ক'-এর আড়ালেই তো  জীবিত থাকে, প্রকৃত ইমিউনিটি! এই প্রথম  ব্যাঙ্ক থেকে প্রাপ্য  টাকা ঈশ্বরের হাত ছুঁয়ে স্যানিটাইজড হয়ে আমার ব্যাগে ঢুকবে।।


**


#জয় 


#এলিনা_রায় 


আমি মধু বালা । আমি এ বাড়িতে একাই থাকি ।

আমার মেয়ে আর ছেলে বৌমা বাইরে থাকে । 


আমার স্বামীর তৈরী এই দোতলা বাড়িতে উপরের তলা তে আমি আর নিচের তলাতে থাকে আমার ভাড়াটে । 

আমার স্বামী অনেকদিন হল মারা গিয়েছেন ।এখন আমার এই একাকী জীবনে খুব মনে পড়ে তাকে । ভাড়াটের সাথে সম্পর্ক আমার বলার মতো কিছু নয় । অন্তত আমার মনের জানলায় তারা উঁকি দিতে পারে না । মার্চ মাস থেকে আমাদের বাড়ির জানলা দিয়ে রোদ ঢোকে না । যে রোদ শক্তি যোগায় আলো করে ঘর দোর সেই রোদ আর আসে না । ক্রমশ অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে আমার জীবন /টিভি খুললেও ভীষণ মন খারাপ হয় । 


শুধুই মৃত্যু মিছিল এ যন্ত্রনা নেওয়া যায় না /তাই আমি টিভি দেখা বন্ধ করে দিয়েছি /সময় আমার কাটতে চায় না । জানলায় আগের মতো পাখিরাও আর আসে না ।

ফুল ও শুকিয়ে যায় তাই প্রজাপতি দের ও দেখা নেই /জানলা ধরে দাঁড়িয়ে থাকি আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে ।


শারীরিক অবস্থা ক্রমে  আমারও খারাপ হচ্ছে কেন তা বুঝতে পারিনা /নব্বই বছরের এই জীবনে রোগ জ্বালা আমার খুব কম ই হয়েছে /শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে ডাক্তার ডাকলো আমার ভাড়াটে /আমাকে নিয়ে যাওয়া হল এক অন্য রংহীন সাদাটে দেশে /যেখানে সবাই ফ্যাকাশে সাদা রং এর পোশাক পরে থাকে /আমি চোখ বুজি বিরক্তি তে /ছেলে মেয়ে কেও খবর দিতে পারিনি তাড়া হুড়োতে ।


কেউ আমায় দেখতেও আসে না /একদিন স্বপ্নে দেখি চিত্র গুপ্ত আমার মরার ডেট নিয়ে ঝগড়া করছে কার সাথে কিন্তু কিছুতেই স্থির করতে পারছে না মরার তারিখ টা /অবশেষে সেই দিনটা এল যখন সাদার দেশ থেকে আমার মুক্তি হল ।


আজ আমায় দেখি সাদার দেশ থেকে রঙিন দেশে আনা হল /আজ বাইরে বেরিয়ে দেখি আমার ভাড়াটের মেয়েটা হাসি মুখে একটা নতুন টাচ স্ক্রিন ফোন নিয়ে আমার হাতে তুলে দিল /আর বলল দিদা এবার থেকে তুমি আর একা নও /ভেরি হ্যাপি বার্থডে /এটা তোমার জন্ম দিনের উপহার ।


চিন্তা নেই আমি তোমায় সব শিখিয়ে দেব /আমি বললাম ওমা আমার জন্মদিনের কথা মনে আছে তোর ?কি করে রে ?সে বলল আগের বছর তুমি মিষ্টি আর পায়েস খাওয়ালে তোমার মনে নেই !! ক্যালেন্ডার এ দাগ দিয়ে রেখে ছিলাম ভুলে যাতে না যাই ।


আমি বললাম কিন্তু এতো দামী ফোন কিনতে গেলি কেন তুই ?

- ধুর তুমিও না এটা আমার নিজের টিউ শুনি র পয়সায় কেনা এবার তুমি চুপ করো 

এই প্রথম অনেকদিন পর সকালে সোনা গলা রোদ এসে আমার ঘর যেন আলো করে দিল /আজ মহালয়া /আমি এখন বাড়ি ফিরে অনলাইন এ মহালয়া দেখছি/ 

ফোনে তখন গান টা বাজছে 'রূপং দেহী, জয়ং দেহী........ 





No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...