Saturday, 26 September 2020

শারদীয়া কিন্নর দল দ্বিতীয় পর্ব দশম পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল

আজ দ্বিতীয় পর্বের শেষ দিন। দশম পাতায় আমরা দুটি গল্প প্রকাশ করতে চলেছি। এতদিন ধরে এত লেখকের লেখা আপনাদের সামনে আনতে পেরেছি আমরা, এইই আনন্দ। এমন অদ্ভুত সময়ে এই প্রাপ্তি আনন্দ দিক।
কাল থেকে একটি সপ্তাহ জুড়ে পাঠকের দরবারে। আপনাদের মতামত আমাদের একমাত্র চালিকা শক্তি।
আগামী পাঁচই অক্টোবর থেকে প্রকাশ হবে আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ। স্বক্ষেত্রে কৃতী এই আত্মজনেরা তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের ঋদ্ধ করবেন। আপনাদের অখণ্ড মনোযোগ আশা করা অন্যায় হবেনা বলেই মনে করি।

গল্পটা শুরু হতে পারে একদম শেষদিন থেকে।
শেষ ফ্লাইটটা থেকে নেমে শ'য়ে শ'য়ে পায়ের ছাপ রেখে পায়েরা হেঁটে চলে গেলে, শ্রান্ত ক্লান্ত এয়ারপোর্ট চত্বর সাফসুতরো করে চলল কামেশ্বর। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, পায়ে গাম-বুট পরে লম্বা মপ দিয়ে চারপাশ স্যানিটাইজ করে চলেছে সে।
কাছেই সিঁড়ির রেলিং ও দরজার কাঁচ স্যানিটাইজ করছে বাজু। ঝুমরিতিলাইয়া থেকে ফোন এসেছিল মেয়ের। মেয়ে কেঁদেকেটে বাবাকে গ্রামে ফিরতে বলেছে। কামেশ্বর মেয়ের ফোনের গল্প, গ্রামে পরিযায়ীদের ফেরার গল্প করছিল, ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে ব্যস্ত আনোয়ারকে ও বাজুকে।
স্তব্ধ জনহীন রাত। করোনার জন্য ফ্লাইট ওঠা-নামা আপাতত বন্ধ থাকবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য। প্রত্যহ এমন স্যানিটাইজেশনের পর পরই অবশ্য আবার অগুনতি পায়ের ছাপে ভরে যায় এয়ারপোর্ট চত্বর।
আজ অন্য দৃশ্য। শহরের সর্বত্রই এখন কেবল করোনা হাওয়া। একটা ভ্রমের মতো কামেশ্বর বারে বারে মপটা পিছনে টানতে টানতে ভাবছে এই বোধহয় কারো সাথে ধাক্কা লাগলো। পরমুহূর্তেই আবার ভ্রমটা ভেঙে যাচ্ছে। এই ফুরফুরে স্যানিটাইজারের গন্ধ সমৃদ্ধ শূন্যতার রাত পেরোলেই কামেশ্বরের যাত্রা শুরু হবে ঝুমরিতিলাইয়ার উদ্দেশ্যে। আজ কামেশ্বর মেঝেতে নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছে, যে মেঝে এত বছর লক্ষ্য মানুষের পায়ের ছাপ রেখে চলেছে। জীবনেরও। অর্থনৈতিক সচ্ছলতারও বটে।
ক্রমশ নিভে যাচ্ছে উজ্জ্বল বাতিগুলো। যাদের ফেরার কথা ছিল তারা সবাই যদিও ফেরেনি। প্রতিদিনের কিয়স্কের বাইরের লম্বা লাইন আজ ফাঁকা। সর্বত্র মানুষের ছায়া পড়ে আছে কেবল। ছায়াগুলোর মাঝেও যোজন ফাঁক। সময়ের। দূরত্বের। ভয় মিশ্রিত নিষেধাজ্ঞারও বটে।
কামেশ্বর সেদিনের স্যানিটাইজেশনের কাজ শেষ করে
নিজের বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে মাথায় চাপিয়ে হাঁটা শুরু করল নো ম্যানস ল্যান্ড দিয়ে। ভোর হবার আগেই নিজেরই স্যানিটাইজড করা চত্বরে নিজেরই পায়ের ছাপ রেখে তার যাত্রা শুরু হল ঝুমরিতিলাইয়ার উদ্দেশ্যে। গেটের বাইরে দাঁড়ানো বাজু আর আনোয়ার তাকে পিছু ডাকলো, সে পিছন ফিরল। কিন্তু বুক কাঁপানো এম্বুলেন্সের শব্দ শহরের ভোর কাঁপিয়ে এক দিক থেকে আর এক দিকে যাওয়ায়, সে তাদের কথা কিছুই শুনতে পেল না। সামনে ফিরে এগিয়ে চলল গন্তব্যের টানে।
মহানগর ছেড়ে রাজপথ ধরে কামেশ্বর দুই রাজ্যের সীমানার দিকে এগিয়ে চলেছে পায়ে হেঁটে। পথে পরে থাকা চিপসের, বিস্কুটের প্যাকেট, কোল্ড ড্রিংক্সের বোতল তুলে তুলে সে ডাস্টবিন খুঁজে খুঁজে ফেলার জন্য উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে চলেছে ঝুমরিতিলাইয়ার পানে। সব ব্যস্ত জনপদের দোকান-পাট বন্ধ। কাঁধের ব্যাগে থাকা বোতলের শেষ জল টুকু ঢেলে নিল শুকনো গলায়। শুধু জলটুকু থেকে পাওয়া চলচ্ছক্তি নিয়ে আবার সে এগিয়ে চলল।
কেবল যাওয়াটুকু, কেবল কামেশ্বরের যাওয়াটুকুই আজ খবর খবরের কাগজে। যদিও তার পথ ঝুমরিতিলাইয়ার আগেই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বোঝাই দশ চাকা ট্রাকের তলায় লালে লাল হয়ে গেছে -- এয়ারপোর্টের সমস্ত কর্মী ভিজে চোখে কাগজে ছাপার অক্ষরে পড়ছে, কামেশ্বর দিগন্ত বিস্তারী প্রান্ত বরাবর হেঁটে চলেছে অনন্তের পথে। সে পথ আর যে দিকেই যাক ঝুমরিতিলাইয়ার দিকে যাবে না কখনো।
খবরের দুনিয়ায় অবশ্য এটা কোনো কামেশ্বরের খবর নয়, শুধুই একটা সংখ্যার খবর যে সংখ্যা তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে নি।

বেণুদির জন্য ই বুঝি এতদিন যেন অপেক্ষা করে ছিল। মাত্র দু'বছরের ছোট্ট তাতাই,শ্যামল, পিসিমা আর বেণু-এই নিয়ে তাদের ছোট্ট সংসার।অবসরক্ষণে মাঝে মাঝে মনে পড়ে রাশভারী বাবার তৈরি করে দেওয়া সংসার কারাগারের কথা। বাবা বেকার শ্যামলের কাছ থেকে বেণুকে ছিনিয়ে নিয়ে অফিসার ছেলের হাতে সঁপে দেওয়া। সেই থেকে শুরু হয় বেণুর বন্দী জীবন। সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম স্বামীর পরিবারের কাছে বাঁজা তকমা নেওয়া এইসব মনে পড়ে বেণুর। এইসব লজ্জা হীনতার কথা কখনো কাউকে বলতে না পারার যণ্ত্রণা বয়ে বেড়ানো।
শারীরিক অসুস্থ স্বামী যখন রেল দুর্ঘটনায় মারা গেলে বাপের বাড়ি প্রত্যাবর্তন। ততদিনে বাবার মৃত্যু হয়েছিল। মায়ের ইচ্ছায় শ্যামলের সাথে আবার বিয়ে হয় বেণুর।বেণুর আবার নতুন জীবন শুরু হয়। শ্যামল একটি স্হানীয় কলেজের অধ্যাপক। শ্যামল মেয়েদের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হোক। কখনোই চায় না। তাই বেণুকে স্হানীয় এক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকার পদের জন্য সুপারিশ করে।তাতাই সারাদিন পিসি ঠাম্মার কাছে থাকে।তাতাই একটু বড় হলে স্কুলে ভর্তি করে। বাড়ি ফেরার সময় মা ও ছেলে একসাথে বাড়ি ফেরে। রান্না বান্না বেণু নিজেই করে।আর বাকি টুকুতে পিসিই হাত লাগায়। একদিন শ্যামলকে বেণু বললো-সে আর চাকরি করবে না। স্বামী সন্তান ও সংসারের প্রতি নজর দেওয়া তার একান্ত কর্তব্য।বেণু বললো-আমি সুখী গৃহকোণে লক্ষ্মীশ্রী হয়ে থাকতে চাই। শ্যামল আপত্তি করেনি। কারণ শ্যামল বুঝেছিল বেণুর কথর মধ্যে যুক্তি আছে। বর্তমানে বেণুদের উঠোনে ফুলের বাগান তার ই তৈরি। বাড়ি টা সুন্দর সাজানো গোছানো। পিসিমা কে রামায়ণ মহাভারত পড়ে শোনায় সময়মতো। বাড়ি তে টি ভি রাখেনা। এমন কি মোবাইল এর ব্যবহার করে না।পাছে তাতাই এসবের মধ্যে থাকলে পড়াশুনা র ক্ষতি হয়। একদিন শ্যামলের সহকর্মী বন্ধু বেণুর সাথে আলাপ করতে এলো। বন্ধু টি আলাপ শেষে শ্যামলকে বললো-শ্যামল ভগ্যবান।
অবসরে বেণু ভাবে-এক ই মানুষ কার ও কাছে অবজ্ঞার আবার কারও কাছে মহার্ঘ। জীবনের পালাবদল এভাবেই হয়।সব ই বিধির নির্বন্ধ!



Friday, 25 September 2020

শারদীয়া কিন্নর দল দ্বিতীয় পর্ব নবম পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#দ্বিতীয়_পর্ব


#নবম_পাতা


আজ তিনটি নিবন্ধ প্রকাশিত হলো। প্রথম নিবন্ধটি পূর্বে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের দ্বিতীয় ও শেষ অংশ। 



#ঠাকুরবাড়ির_পাগলকথা


দ্বিতীয় পর্ব


#অমূল্যরঞ্জন_ভট্টাচার্য


রবীন্দ্রনাথের  দুই দাদা  বীরেন্দ্রনাথ ও সোমেন্দ্রনাথও  ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন।


 


মহর্ষি  দেবেন্দ্রনাথের  চতুর্থ  পুত্র   যাঁকে রবীন্দ্রনাথ    ন'দাদা  বলে  ডাকতেন  , বীরেন্দ্রনাথ (১৮৪৫ ~ ১৯১৫),  অতীব সুদর্শন  ছিলেন।  ছিলেন এক প্রতিভাবান  গণিতবিদ ।  তাঁর দিন কাটত   অঙ্কশাস্ত্রের   জটিল চর্চায়। 


 


দেবেন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন  বিয়ে দিলে   বীরেন্দ্রনাথের মানসিক   অবস্থা  স্বাভাবিক  হবে।  তাই  বন্ধুর কন্যা  প্রফুল্লময়ীর  সাথে  বিয়ে দিলেন  ১৮৬৬  সালে।


প্রফুল্লময়ীর দিদি  নীপময়ীর সাথে     দেবেন্দ্রনাথের   তৃতীয় পুত্র   হেমেন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিল।   প্রফুল্লময়ীকে পছন্দ করেন ননদ   স্ব্রর্ণকুমারী  ও    শরৎকুমারী  ।


 


 বিয়ের পর বছর না ঘুরতেই বীরেন্দ্রনাথের মধ্যে দেখা গেল উন্মাদরোগ ।   পাঠানো হল আলিপুরে লুনাটিক এসাইলামে ।   অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ফিরিয়ে আনা হল ১৮৭০ সালে।  সেই  বছরেই  জন্ম নিল একমাত্র  পুত্রসন্তান  বলেন্দ্রনাথ  রুগ্ন শরীর নিয়ে ।


   স্বল্পায়ু   বলেন্দ্রনাথের  মৃত্যু হয় মাত্র ২৯ বছর বয়সে ।


বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী  বলেন্দ্রনাথ  ছিলেন রবীন্দ্রনাথের  সাহিত্যচর্চা , জমিদারি  দেখাশোনার  সহযাত্রী ।   শিলাইদহ জীবনের ছায়া সঙ্গী  ।


পুত্রের অন্নপ্রাশনের সময়েই বীরেন্দনাথের    উন্মাদ  অবস্থা   তীব্র


 হয় । পুনরায়  দেওয়া  হল পাগলা গারদে  ।  কয়েক মাস পরেই নিয়ে আসা হয় । বাকি জীবন কাটে জোড়াসাঁকোর  বাড়িতেই ।


চার দেওয়ালের    বন্ধ ঘরে   তাঁর প্রিয় বিনোদন  জটিল অঙ্ক  কষার মধ্যে ডুবে থাকতেন ।  তাঁর প্রিয় রবির ভাষায়  ~


"   হেলা ফেলা সারাবেলা,


একি খেলা আপন মনে .... "


উন্মাদ  অবস্থায়  গান শুনলে   শান্ত  হয়ে   যেতেন ।  পরবর্তী কালে পুত্রবধূ   সাহানাদেবীর  সুমিষ্ট কন্ঠের  গান শুনে   ঘুমিয়ে পড়তেন।


১৮৯৯ সালের  ১৯ আগষ্ট  বলেন্দ্রনাথের   মৃত্যু হয় । প্রফুল্লময়ীদেবী তাঁর লেখায়  জানালেন   ~"  যদিও তখন তিনি উন্মাদ অবস্থায়  ছিলেন কিন্ত ভগবান তাঁর   ভিতরেও  পুত্রশোকের দারুণ  যন্ত্রণা  অনুভব করিবার  শক্তি দিয়াছিলেন । "


বলেন্দ্রনাথের  মৃত্যুকালে  স্ত্রী  সাহানাদেবীর বয়স  সতের  বছর মাত্র। তিনি   এলাহাবাদে  পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে  তাঁর     পুনরায়  বিবাহের  ব্যবস্থা  হয়  । পিতার আদেশে  রবীন্দ্রনাথ   এলাহাবাদে গিয়ে  সেই বিবাহ ভেঙ্গে  সাহানাকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে নিেয়ে  আসেন ।


প্রশ্ন  উঠেছিল  যে রবীন্দ্রনাথ    পূনরায় বিবাহ  থেকে বঞ্চিত করে  সাহানাদেবীকে  চির বৈধব্যের মধ্যে ঠেলে দিলেন তিনিই  পরবর্তীকালে নিজ পুত্র  রথীন্দ্রনাথের সাথে   গগনেন্দ্রনাথের ভগ্নি    বিনয়িনীদেবীর  বালবিধবা  কন্যা প্রতিমাদেবীর বিয়ে দিলেন   কোন যুক্তিতে ?


১৯১৫  সালে  বীরেন্দ্রনাথের মৃত্যু  হয় ।


অকাল মৃত্যু হয়  সাহানাদেবীর ।


নিঃসঙ্গ  প্রফুল্লময়ীদেবী বেছে  নিলেন  অধ্যাত্ম সাধনার পথ ।


এই দুই বিধবা রমনীর কাহিনি     ঠাকুরবাড়ির   ইতিহাসে    অন্যতম স্মরণীয়  অধ্যায় ।


যৌবনের  প্রারম্ভে উন্মাদ   রোগগ্রস্থ   হলেন  দেবেন্দ্রনাথের সপ্তম পুত্র   সোমেন্দ্রনাথ ( ১৮৫৯ ~ ১৯২২) ।


  বছর দুয়েকের  বড়  এই দাদার সাথে    রবীন্দ্রনাথের  নিবিড় সখ্যতা।


জোড়াসাঁকো পরিবারে  প্রতিভা ও পাগলামির  অন্যতম নজির  সোমেন্দ্রনাথ ছিলেন অতুলনীয়    কন্ঠস্বরের  অধিকারী ।


প্রথমে  ছোট ভাইয়ের কবি প্রতিভায় বিমুগ্ধ  সোমেন্দ্রনাথ  প্রচারকের ভূমিকায় নামেন।


জীবনস্মৃতিতে   কবি  লেখেন ~  "  আমার দাদা এই সকল রচনায়  গর্ব অনুভব  করিয়া  শ্রোতা সংগ্রহের  উৎসাহে সংসার অতিষ্ঠ করিয়া  তুলিলেন । "


ছোটবেলায় এই দুই ভাইয়ের,  রবি  ও  সোম , সবকিছুই ছিল একসাথে । উপনয়নও  একসাথে ।


কারো কারো মতে তিনি  রবীন্দ্রনাথের  থেকেও  সংগীতে  অধিকতর পারদর্শী  ছিলেন । সোমেন্দ্রনাথ  বলতেন ~  রবি ভাল  কবিতা লেখে  বটে । কিন্তু  তার গান লেখা ভাল  না।


সোমেন্দ্রনাথের মানসিক ভারসাম্যহীনতা তীব্র আকার নেয়  ১৮৭৯  সালের  মাঝামাঝি৷। সোমেন্দ্রনাথকে   বিয়ে দিয়ে   রোগ সারানোর সহজ  উপায় নিলেন না  মহর্ষি, যেমন করেছিলেন    বীরেন্দ্রনাথের  জন্য ।


অকৃতদার   সোমেন্দ্রনাথ  মাঝে মাঝে   উন্মত্ত অবস্থায়   ছুটে যেতেন   চিৎকার করতে করতে  ~ আমাকে বিয়ে দিল না , বিয়ে দিল না । 


পূর্বপুরুষদের   তৈলচিত্র  ছিঁড়ে ফেলার  চেষ্টা করতেন ।


রবীন্দ্রনাথের  প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল  চিরকাল ।


ছিলেন   সুরসিক ।  কেউ এলে  ধরে নিয়ে যেতেন  তিনতলার  ঘরে,


 যেখানে রবীন্দ্রনাথ   লিখছেন । তাঁকে দেখিয়ে বলতেন  ~   ঐ দেখ  এক কেরানি ।  লিখছে আর লিখছে ।

সুধীন্দ্রনাথের পুত্র   সৌমেন্দ্রনাথ   " যাত্রী "  গ্রন্থে স্মৃতিচারণায়  লিখেছেন  ~  আমাদের  সোমদাদা  পুরানো  কত যে গান গাইতেন তার  অন্ত নেই ।


রবীন্দ্রনাথের  প্রথম  কাব্যগ্রন্থ  ", কবি কাহিনী "  তাঁর   উৎসাহেই  মুদ্রিত  হয় ।


জোড়াসাঁকোর  পরিবারে   সর্বাপেক্ষা রূপবতী  ও গুনবতী  বধূটির ভরা  যৌবনে   মাত্র চব্বিশ  বছর   বয়সে  জীবন  শেষ হল ।


রবীন্দ্রনাথ শোকে  বেদনায়  ছিন্নভিন্ন     নুতন বৌঠান  কাদম্বরী  দেবীর  অকাল  প্রয়ানে ।


শবযাত্রীদের   সাথে  পায়ে  পায়ে   নিমতলা শ্মশানে  চলেছেন   এক দীর্ঘকায়  গৌর কান্তি  সুপুরুষ  । উসকোখুশকো চুল, পোশাক । ইনিই  সোমেন্দ্রনাথ  ।


সমাজের   সাথে ক্ষীণতর হতে থাকে  তাঁর   সম্পর্ক  ।


প্রায়ই  মুখে মুখে   অসংলগ্ন  গান রচনা  করে গাইতেন । এরকম একটি হল ~


"   মানিকপীর ভবনদীর


    পারে যাবার  না,


    জয়নাল ফকিরি নিলে


    পানি খেলে  না ।  "


চার দেওয়ালের মাঝে  প্রায় বন্দি  হয়েই   লোকচক্ষুর   অন্তরালে  চিরতরে হারিয়ে  যান  ১৯২২ সালের   ৮ জানুয়ারি  ।


শেষ  জীবনে  ফ্রিস্কি নামে    কুকুরটি  ছাড়া   আর কেউ  সঙ্গী    ছিল  না  তাঁর ।


 


সমাপ্ত


***


#যাপন_কথা


#অরিন্দম_গোস্বামী


   কখনও একা বসে থাকতে থাকতে সেই ছোট্ট ছেলেটার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায় - যার সঙ্গে আমার একসময় খুব চেনাজানা ছিলো । আমরা তো সেই একই কলোনি এলাকায় মানুষ হয়েছি - বাংলা-বিহারের সীমান্ত থেকে একটু বিহারের দিকে ঢুকে এসে । চারিদিকে অনেক কোয়ার্টার , সেখানেই তো সে তার বাবা-মার সঙ্গে থাকে ।

   স্কুলের বইতে আবার লেখা থাকে - বাড়ি ! সেখানে বাড়ির একটা ছবিও দেওয়া । তার তলায় যে গল্প - তাতে লেখা - বাড়িতে অনেক গুলো ঘর আছে । আমার বন্ধুরা তো থাকে তাদের নিজেদের কোয়ার্টার-এ । খেলতে গিয়ে জল তেষ্টা পেলে বলে - চল , ঘর থেকে জলদি একটু জল খেয়ে আসি ।

   সুদেশ এই কথা শুনে হাসে । বলে - বংগালি লোগ জল ভি খাতা হ‍্যায় । ঘর নিয়ে কিন্তু কিছু বলে না ।


   এরমধ্যেই ছেলেটা জল খেয়ে ফিরে আসে , হাতে একটা পাতলা চটি বই । মলাটে ছবি একটা হাতের , যে হাতের ওপর একটা ছুরি গাঁথা , রক্ত পড়ছে টপটপ করে । তার নিচে লেখা - অপরাধী কে ?

   দেখিয়েই জামার ভেতরে লুকিয়ে ফেললো ছেলেটা । বললো - এখন দেবো না , আগে পড়ে নিই । আমি বললাম তাহলে ঐটা দে - কালনাগিনীর মরণকামড় ! ও বললো , ওটা তো দাদার বই । ওটা ওর বাক্সে আছে ।

   আমি বললাম , আমিও একটা বই পেয়েছি গতমাসে - ভোঁদড় বাহাদুর । ও ঠোঁট উল্টে বললো - আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি , ওসব বই আমি এখন পড়ি না ।


   আমি ভাবি , আমি যদি ওর আগে সাইকেল চালানোটা শিখে নিতে পারি , তাহলে ওকে দারুণ টেক্কা দেওয়া যাবে ।

   বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু গিয়েই স্কুল । সেখানে ছেলে-মেয়ে সবাই একসাথেই পড়ে । মেয়েদের পড়া না পারলেও ততো কেউ মারে না  , কিন্তু ছেলেদের মারতে মারতে ছড়িই ভেঙে যায় এক-একদিন । সকালে স্কুলে পৌঁছে লাইন করে একটা প্রার্থনা হয় । তবে , তারও আগে যারা পৌঁছে যায় - তারা স্কুলের মাঠে গুলি-ডান্ডা খেলে ।


   একদিন দেরি হয়ে গেছে বলে ছুটে আসছি মাঠ পেরিয়ে , অমনি সেও মেরেছে গুলিটাকে ডান্ডা দিয়ে সজোরে । আর , লাগবি তো লাগ , সোজা আমার চোখে । আর , তাকাতেই পারিনা , খুব যন্ত্রণা ।

   তখন ওরাও ভয় পেয়ে গেছে । নিয়ে গেলো হেডস‍্যারের ঘরে , সেখান থেকে ডাক্তারখানা । সেখানে লাল ওষুধ দিয়ে পরিস্কার করে ডাক্তারবাবু বললেন - নাঃ , ভয় নেই । ওরা তাও আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেলো । মা তো ঐ রূপ দেখে চেঁচামেচি করে আকুল - আমিই তখন বললাম যে , কিছুই হয়নি , এটা ওষুধ ।


   সকালে উঠে হাত মুখ ধুয়ে ওর সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম । হাতে থাকতো একটা ফুলের সাজি । ফুলের গাছ তখন সব কোয়ার্টার-এই । তিন-চার জনের বাড়ি ঘুরলেই সাজি ভর্তি হয়ে যায় । তাই সেদিকে আমরা যেতাম না , স্রেফ ঘুরে বেড়াতাম এদিক-ওদিক । একটা বিশাল বড়ো মহুয়া গাছ ছিলো , ফুল পড়ে থাকতো ছড়িয়ে । আর পলাশ গাছ যে কতো ছিলো , তার হিসাব নেই । কিন্তু , এসব ফুলে তো ভালো গন্ধ নেই । পলাশের পাতা মুড়িয়ে অবশ্য সত‍্যনারায়ণ পুজোয় সিন্নি দেওয়া হতো ।


   দুর্গাপুজোর পর কালিপুজো পর্যন্ত বিজয়া । রোজই এর-ওর বাড়িতে গিয়ে একটা প্রণাম করলেই নিমকি , শেওভাজা , বোঁদে , নারকেল নাড়ু বা কখনও কখনও ঘুগনি । মাঝে একদিন লক্ষ্মীপুজো - সেদিন শুধু খিচুড়ি, লাবড়া আর কপির তরকারি । একবার ভৌমিক জেঠুদের ঘুগনিটা যা ঝাল হয়েছিলো না ! বেরিয়ে এসে ওই পকেট থেকে একটা নারকেল নাড়ু বের করে দিয়েছিলো ।


   কালিপুজোর পর বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে যখনই ক্লাস ফাইভে উঠলাম - ওমনি স্কুল থেকে আমাদের চারজনকে পাঠানো হলো ধানবাদে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে । পরপর চারদিন দুবেলার পরীক্ষা । পরপর তিনদিন যেমন-তেমন কাটিয়ে শেষদিন দুপুরের পরীক্ষা - ললিতকলা । বাড়ি থেকে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত আর দুটো কবিতা আবৃত্তি শিখিয়ে পাঠিয়ে ছিলো । কিন্তু , পরীক্ষার হল-এ হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো তকলি আর তুলো - সুতো কাটতে হবে । একটু নেড়েচেড়ে বললাম - চল , উঠে পড়ি । বাড়িতে পৌঁছে দেখি স্কুলের বুকলিস্ট অনুযায়ি আনা হয়েছে পরের ক্লাসের বই , তারমধ্যে একটার নাম - সমাজ অধ‍্যয়ন আর একটার নাম - ভৌতিকী । পড়ে অবশ্য দেখলাম ভয়াবহ কিছু নয় - একটা সোশ্যাল সায়েন্স আর একটা ফিজিক্যাল সায়েন্স-এর বই ।


   স্কুলের পেছনেই খানিকটা জঙ্গল আর তার পরেই নদী । আমি আর সেই ছেলেটা এক-একদিন একটা ক্লাসে বাইরে যাবো বলে বেরিয়ে চলে গেলাম সেই নদীর পাড়ে । সুন্দর বালির তীরভূমি , টলটলে জল । আরও দুটো ছেলে চলে এলো - এরা স্কুলে পড়ে না । তাদের মুখ চিনি কিন্তু নাম জানি না । ঠিক হলো - এতোটা এসেই পড়েছি যখন - স্নান করেই যাই । সবাই লাফালাফি করছে নিজেদের মতো । হঠাৎই দেখি মুখচেনা একটা ছেলে হাত উঁচু করে একবার ডুবছে , একবার উঠছে । সর্বনাশ , ভয়ে কথাটাও আর বলতে পারছি না । এইসময়েই বাঁচাতে এগিয়ে এলো সেই ছেলেটাই ।


 আমাদের ছেড়ে রাখা জামায় ওদের গামছা দিয়ে গিঁট বেঁধে ছুড়লো ওর দিকে । তারপর টেনে তুললো ডাঙায় । ভিজে একাকার হয়ে স্কুলে গিয়ে সেদিন নানান মিথ্যা বলতে হয়েছিলো , কিন্তু আরও হেনস্থার ভয়ে সত্যিটা আমরা তখনই বলিনি ।


   ওখান থেকে চলে আসার পর ঐ বন্ধুর কথা আমি অনেককেই বলেছি , কিন্তু ঐ বন্ধুর সঙ্গে আমার আর সাক্ষাৎ হয়নি । যে আমাকে নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়েছিলো - মানুষের মধ্যে আছে এক অপার সম্ভাবনা । যে শিখিয়েছিলো - মানুষ সম্পর্কে কখনোই আগাম ভবিষ্যত-বাণী করা যায় না ।

***


#রবীন্দ্রনাথ_ঠাকুরের_একটি_গল্প


 


#রাণু_মজুমদার


 


গল্পগুচ্ছ  ( প্রথম খণ্ড) এর অন্তর্গত একটি গল্প :পোস্টমাস্টার। 


নাম পোস্টমাস্টার হলেও প্রধান একটি ছোটো প্রাণ।  এক বালিকা । তার নাম রতন। সে হত দরিদ্র। সর্বহারা। তার  চাওয়া - পাওয়াই কেন্দ্রীভূত হয়েছে এই গল্পে।


পোস্টমাস্টার কলিকাতার ছেলে। তার প্রথম পোস্টিং উলাপুর গ্রামে। কলিকাতার ছেলে  জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যে রকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ‍্যে আসিয়া পোস্টমাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ‍্যে তাঁর অফিস।


        বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে।


         পোস্টমাস্টারের বেতন অতি সামান‍্য। নিজে রাঁধিয়া খাইতে হয়। গ্রামের একটি পিতৃমাতৃহীন অনাথা বালিকা   তাঁহার কাজকর্ম করিয়া দেয়, এর বিনিময়ে সে দুবেলা খাইতে পায়। মেয়েটির নাম রতন। বয়স বারো- তেরো।


     গ্রামের সন্ধ‍্যা মানেই ঝিল্লির ডাক, শিয়ালের ডাক শুনলেই পোস্টমাস্টার ক্ষীণশিখা প্রদীপ জ্বালিয়া রতনকে ডাকিতেন তামাক দেবার জন‍্য। রতন যখন তামাক সাজিয়া আগুন দিয়া ফুঁ দিতে দিতে কলিকাটা দাদাবাবুর হাতে দিতেই দাদাবাবু তখন রতনের বাবা মার কথা জানিতে চাহিল।


আবার এক-এক দিন সন্ধ‍্যাবেলায় বৃহৎ আটচালার অফিসে কাঠের টেবিলের উপর বসিয়া পোস্টমাস্টার নিজের  বাড়ির  কথা অর্থাৎ মা, দিদি এবং ছোটো ভাইয়ের কথা রতনের  কাছে বলতেন কিন্তু কোনো দিন নীলকুঠির গোমস্তাদের কাছে কোনোমতেই উত্থাপন করিতেন না।


      আবার দীর্ঘ দুপুরবেলায় একাকীত্ব দূর করার জন‍্য রতনকে পড়াতে শুরু করলেন। এই ভাবেই অল্পদিনের মধ‍্যে যুক্তাক্ষর উত্তীর্ণ হলেন।


     বর্ষাকালে বৃষ্টির আর শেষ নেই। পথ-ঘাট সব জলে জলাকার। পোস্টমাস্টার রতনকে ডেকে বললেন," শরীরটা ভালো  লাগছে না- দেখতো আমার কপালে হাত দিয়ে। "


এই নি:সঙ্গ প‍্রবাসে ঘন বর্ষায় রোগ কাতর শরীরে নিজের  লোকের অর্থাৎ জননী বা দিদির সেবা পাইতে ইচ্ছা করে। তখন বালিকা রতন আর বালিকা রহিল না। তখন সে জননীর পদ  অধিকার করিয়া বসিল,


বৈদ‍্য ডাকিয়া আনিল, যথা সময়ে ঔষধ খাওয়াইল, সারা রাত্রি শিয়রে শিয়রে জাগিয়া রহিল।


আপনি পথ‍্য রাঁধিয়া দিল এবং শতবার করিয়া জিজ্ঞাসা করিল," দাদাবাবু একটু ভালো বোধ হচ্ছে কি?"


এইখানে রতন জননী রূপে সেবা করছে।


বহুদিন পর পোস্টমাস্টার রোগ সজ্জা থেকে উঠে বদলির জন‍্য দরখাস্ত করিলেন। রোগ সেবা থেকে নিস্কৃতি পাইয়া রতন আবার নিজের জায়গা অর্থাৎ দ্বারের বাইরে বসিয়া থাকে। রতন দাদাবাবুর ডাকের অপেক্ষায় করে


আর দাদাবাবু তখন অধীর চিত্তে তাঁর দরখাস্তের উত্তর প্রতীক্ষা করিতেছেন।


 


অবশেষে সপ্তাহ খানেক পরে একদিন সন্ধ্যাবেলা রতনের ডাক পড়ল l রতন গৃহের মধ্যে প্রবেশ করে বলল :দাদাবাবু আমায় ডাকছিলে ?


পোস্টমাষ্টার বললেন :রতন কালই আমি যাচ্ছি l 


---কোথায় যাচ্ছো দাদাবাবু ?


---বাড়ি যাচ্ছি l 


---আবার কবে আসবে ?


---আর আসবো না !


রতন রান্নাঘরে রুটি করতে গেল !


পোষ্টমাস্টারের খাওয়া শেষ হলে রতন সহসা বলল :দাদাবাবু আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে ?


পোষ্টমাষ্টার হেসে জবাব দিলেন :সে কি করে হবে ?


"সারারাত স্বপ্নে এবং জাগরণে বালিকার কানে পোষ্টমাস্টারের নিষ্ঠুরতম হাস্যধ্বনি কন্ঠস্বর বাজিতে লাগিল !"


---সে কি করে হবে :এর চেয়ে নিষ্ঠুরতম আঘাত আর কী হতে পারে !


এই আঘাত পাওয়ার পরেও রতন অত রাতে নদী থেকে দাদাবাবুর জন্য জল তুলে এনেছে !কারণ খুব সকালে রতনের দাদাবাবুটি স্নান করে বাড়ি যাবেন !


স্নান শেষ হলে তিনি রতনকে ডাকলেন !রতন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল !


দাদাবাবু বললেন :রতন আমার জায়গায় যিনি আসবেন তাকে বলে দিয়ে যাবো ---তিনি তোকে আমারই মত যত্ন করবে !আমি চলে যাচ্ছি বলে তোকে কিছু ভাবতে হবে না !


"কিন্তু নারীর হৃদ্য় কে বুঝিবে !"


রতন অনেক দিন এহেন প্রভুর তিরস্কার নীরবে সহ্য করেছে !কিন্তু পোষ্টমাস্টারের এই কথাগুলো সে সহ্য করতে পারল না !


সে কেঁদে বলল :না না তোমার কাউকে কিছু বলতে হবে না ---আমি থাকতে চাইনে !"


যাবার সময় নিজের পথখরচাটুকু রেখে বাকি টাকা রতনকে দেবার জন্য বের করলেন দাদা বাবু !


কিন্তু রতন দাদাবাবুর পা জড়িয়ে বলল :দাদা বাবু তোমার দুটি পায়ে পড়ি আমাকে কিছু দিতে হবে না ---আমার জন্য কাউকে কিছু ভাবতে হবে না !


বলেই ছুটে সেখান থেকে চলে গেল রতন !


পালিয়েও সে পোষ্টঅফিস গৃহের চার দিকে কেঁদে কেঁদে ঘুরছিল :যদি দাদাবাবু ফিরে আসে !


রতনের দাদাবাবু যখন নৌকায় উঠলেন ও নৌকা ছেড়ে দিল তখন তখন হৃদয়ের মধ্যে একটা বেদনা অনুভব করতে লাগলেন !এবং তখনই পালে হাওয়া লেগে প্রবল স্রোতে নৌকা তীর বেগে চলে গেল !


এখানেই গল্প শেষ! কিন্তু "শেষ হইয়াও হইল না শেষ !"


পরের গল্প পাঠকমনে অনুরণন তোলে !তাই আজও ঘুরে ফিরে পড়তে হয় এই গল্পটি l বাংলা কথা সাহিত্যের অজস্র ছোটগল্পের মধ্যে এক চিরকালীন সম্পদ পোষ্টমাষ্টার !


***




Thursday, 24 September 2020

শারদীয়া কিন্নর দল দ্বিতীয় পর্ব ষষ্ঠ পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#দ্বিতীয়_পর্ব


#ষষ্ঠ_পাতা


আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ। আজ লিখেছেন তৃষ্ণা বসাক। সাহিত্য নিয়ে সিরিয়াস কাজ তাঁর। পড়ে ঋদ্ধ হবো আমরা। তাঁকে কিন্নর দলের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। 

🙏


✍️✍️


#সন্ত্রাস_ও_সাহিত্য


#ভারতীয়_ভাষায়_নারীর_কলমে_সন্ত্রাস


#তৃষ্ণা_বসাক


‘স্ত্রীর পত্র’-র মৃণাল সাতাশ নম্বর মাখন বড়ালের গলিতে আর ফিরবে না কোনদিন। সংসারে মেয়েমানুষের জায়গাটা যে কোথায় তা তার বিন্দুকে দেখে বোঝা হয়ে গেছে। বড়জার বোন বিন্দু,  যে সবার কাছেই ছিল বোঝা। বিন্দু সেটা জেনে সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকত, চাইত তার উপস্থিতিটা একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে।


 ‘বিন্দু বড়ো ভয়ে ভয়ে আমার কাছে এল। যেন আমার গায়ে তার ছোঁয়াচ লাগলে আমি সইতে পারব না। বিশ্বসংসারে তার যেন জন্মাবার কোনো শর্ত ছিল না; তাই সে কেবলই পাশ কাটিয়ে, চোখ এড়িয়ে চলত। তার বাপের বাড়িতে তার খুড়ততো ভাইরা তাকে এমন একটি কোণও ছেড়ে দিতে চায় নি যে কোণে একটা অনাবশ্যক জিনিস পড়ে থাকতে পারে। অনাবশ্যক আবর্জনা ঘরের আশে-পাশে অনায়াসে স্থান পায়, কেননা মানুষ তাকে ভুলে যায়, কিন্তু অনাবশ্যক মেয়েমানুষ যে একে অনাবশ্যক আবার তার উপরে তাকে ভোলাও শক্ত, সেইজন্যে আঁস্তাকুড়েও তার স্থান নেই। অথচ বিন্দুর খুড়তুতো ভাইরা যে জগতে পরমাবশ্যক পদার্থ তা বলবার জো নেই। কিন্তু, তারা বেশ আছে।’


তবু মৃণালের প্রশ্রয়ে বিন্দু ভালবাসার স্বাদ পেল, বুঝল মানুষের মতো বাঁচা কাকে বলে। কিন্তু সেটা সহ্য হল না কারো, তাই জোর করে পাগল স্বামীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হল, সেখান থেকে পালাতে চাইলেও পালাতে পারে না সে, তার মুখের ওপর বন্ধ করে দেওয়া হয় সব দরজা। এর পরিণতি তার আত্মহত্যা।

এই ঘটনা যখনকার, তখন স্বদেশী আন্দোলন চলছে, স্ত্রী শিক্ষা নিয়ে জোর হইচই চারদিকে। সেইসময় বিন্দু মারা যাচ্ছে এইভাবে। তার জীবন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দ্যায় সন্ত্রাস কাকে বলে। হ্যাঁ, সন্ত্রাস।সন্ত্রাস যেমন একটা ম্যাক্রো ইস্যু, তেমনি এটা একটা মাইক্রো ইস্যুও। আমরা বড় বড় সন্ত্রাস নিয়ে  চিৎকার করি, মিছিল করি, কিন্তু গৃহহিংসার আড়ালের সন্ত্রাসবাদকে চিনতে পারি না, আমাদের ঘরের মেঝের নিচে যে ঘাতক ল্যান্ডমাইন তাকে বুঝতে পারি না। সারা পৃথিবী জুড়ে তো বটেই, এই উপমহাদেশের মেয়েদের জীবন তো জন্মের আগে থেকেই সন্ত্রাসের শিকার। 

মায়ের গর্ভে থাকা কন্যাভ্রূণ জেনে যায়  সেই সন্ত্রাসের মানে। 

‘আমি ভ্রূণ না ভ্রূণা/ জন্ম দিও না মা/ যত গর্ভবতী ভাঙো শোক/ নিশ্চিন্ত হোক সর্বলোক/ হলুদ বসন্ত পাখি ডাকুক নির্ভীক স্বরে, হোক/ গেরস্তের ঘরে ঘরে/ খোকা হোক! খোকা হোক!/ শুধু খোকা হোক!’

(কবিতা সিংহ) 


শুধু কবিতা সিংহ নয়, সারা ভারতবর্ষ জুড়েই মেয়েদের কবিতায় এই সন্ত্রাসের ছবি। কখনো বালিকাবেলায় লিংগবৈষম্য, কখনো রাষ্ট্রের নিপীড়ন, কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির আতঙ্ক, কখন গার্হস্থ্য হিংসায় আকীর্ণ প্রতিটি মুহূর্ত। এই সময়ের ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার নারী কবির কবিতায় উঠে আসে সেইসব খণ্ড ছবি।


‘কোথাও জায়গা জোটে না

উৎস থেকে উচ্ছিন্ন

চুল, নারী আর নখের-

সংস্কৃত শ্লোক থেকে শোনাতেন পণ্ডিতমশাই-

আর নিজেদের জায়গায় বসে,

আমরা, মেয়েরা ভয়ে হিম হয়ে যেতাম।


জায়গা? জায়গা আসলে কী?

প্রথম থেকেই কীভাবে যেন জেনে গেছিলাম আমরা,

টেক্সট বইয়ের প্রত্যেকটা অক্ষর গেঁথে গেছিল মনে-

‘রাম, পাঠশালা যা।

রাধা রান্না কর।

রাম আয় বাতাসা খা।

রাধা ঝাঁট দে।

ভাই এবার শোবে,

যা, গিয়ে বিছানা কর।

আহা নতুন ঘর!

রাম দ্যাখ তোর ঘর।

আর আমার ঘর?

আরে পাগলি,

মেয়েরা হচ্ছে হাওয়া, রোদ আর মাটির মতো, 

তাদের নিজস্ব কোন ঘর হয় না’

যাদের কোন ঘর নেই, 

কোথায় তাদের অস্তিত্ব?

কেমন সেই জায়গা

যেখান থেকে নির্বাসিত হলে

মেয়েরা হয়ে যায়

কাটা নখ,

আর কাঁচি দিয়ে কচাৎ করে কাটা চুলের মতো

ঝেঁটিয়ে বিদায় করা জঞ্জাল?


ঘর পড়ে থাকে, পথ পড়ে থাকে, মানুষ পড়ে থাকে পেছনে

কিছু প্রশ্ন নাছোড়, তারাও পড়ে থাকে।

পরম্পরাকে পেছনে ফেলে রেখে,

যেন মনে হয়,

মহান কোন ধ্রুপদী রচনা থেকে

খামচে তুলে নেওয়া পাস কোর্স বি.এ.-র প্রশ্নের মতো

আমিও অপ্রাসঙ্গিক।


কিন্তু আমি চাই না,

কেউ বসে বসে আমাকে সবিস্তার ব্যাখ্যা করুক,

করুক আমায় কাটাছেঁড়া,

অবশেষে, বহু কষ্টে-

সমস্ত প্রসঙ্গের অতীত,

এইখানে এসে পৌঁছেছি,


আমাকে বরং গুঞ্জরিত হতে দাও

তুকারামের একটি অভঙ্গের মতো,

অসমাপ্ত একটি অভঙ্গের মতো।’

(নির্বাস, হিন্দি কবি অনামিকা, অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক)


‘...

এর মধ্যে ঋতুপর্ণা আর আসেনি,

ফোনে পাওয়া যায় না

চিঠির জবাব নেই-

গেলবার যখন সে বাপেরবাড়ি এসেছিল, 

মেয়ে হবার সময়,

বলেছিল, মেয়েকে পাখি করবে নিজের মতো,

মুক্ত উড়ন্ত বিহঙ্গ।


মেয়েকে পাখি করবে কি,

হয়তো তার ডানা দুটিই

ছিঁড়ে গেছে অকাল ঝড়ে,

কিংবা তার ডানাজোড়া কেটে দেওয়া হয়েছে-

পরম্পরার হাতল লাগানো ছুরিতে

যা সে বলি বলি করেও

কাউকে বলতে পারেনি ভয়ে।’

(নারী, ওড়িয়া কবি গায়ত্রীবালা পণ্ডা, অনুবাদ- ভারতী নন্দী)


‘সুলেখা ও বিমলা মাহাতো

পুলিশের হাতে ধরা পড়ল

ব্যাধের জালে খরগোশের মতো।


দুই কিশোরীর ছাগলের মতো চোখ

মোটা ঠোঁট, ঝুলে পড়া থুতনি দেখে

গৃহিণিরা হল সন্ত্রস্ত

বাসনমাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া

পা টিপতে টিপতে

লাথি-কিল খুন্তির ছেঁকা খাওয়া মেয়েদের

এরা আত্মীয় নয়তো!


সাংবাদিক সম্মেলনে দুজনে

হরিণশিশুর মতো দিশেহারা,

বুদ্ধিদীপ্ত চশমার জটিল প্রশ্নের 

উত্তরে বলল ‘খুব খিদে পায়,

মার কাছে চাইলে বলে, কিছু তো নেই

আমায় খা।

জঙ্গলের ওপার থেকে ডাকল

কাজ দেব, খেতে দেব’

সরকার বলল সহানুভূতি নিয়ে ভাবব

নাবালিকা বয়সের কথা।

‘খুব অত্যাচার করবে এদের ওপর’

কার স্বর কে জানে

ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল ঘরে।

ভাত বাড়তে বাড়তে 

টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে

মা বললেন ‘বাড়ন্ত বাচ্চা দুটি,

এই বয়সে বাঘের মতো খিদে-

এই সামান্য কথাটা কি 

বুঝতে পারবে না রাষ্ট্র?’

(মাওবাদিনী, ওড়িয়া কবি বীণাপাণি মোহান্তি, অনুবাদ-অরূপ সাহা)

কখনো হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে সন্ত্রাস, যা হয়তো স্মৃতির কান্না।

‘জানো না কি

জীবনে এমন অনেক কিছু আছে

জীবন নিজেই যার সঙ্গে যুঝতে পারে না?

আমার কবিতা আমাকে টেনে নিয়ে যায়

এক অনন্ত শূন্যতার মধ্যে,

টানে, টানতেই থাকে রক্তের নদীর ওপর দিয়ে

টেনে নিয়ে চলে এবড়োখেবড়ো কর্কশ পাথুরে জমি দিয়ে

আমার শরীর থেকে ঝরা রক্ত পান করতে করতে

নিঃশেষিত, ঝলসানো, ফিরে যেতে অক্ষম

আমি চলতেই থাকি কোন শেষ বা গন্তব্য ছাড়াই

আমাকে টেনে নিয়ে চলে এক অজানা স্বাদ

একটা কবিতার, যা এখনও লেখা হয়নি।’

(অজানা স্বাদ, মণিপুরি কবি আরাম্বাম ওংবি মেমচৌবি, অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক)

এই অনুভূতি থেকে নিস্তার নেই  এমনকি দেবীরও। রজস্বলা অবস্থাতেও তার ওপর দখল ছাড়ে না দেবতা।

‘...রক্তস্রাবে

আজ বড় ক্লান্ত দেবী

শিবকে বলেন      

একটু সরে দাঁড়াতে

যাতে তিনি একটু আরাম পান।

তাঁর অন্য অর্ধ পুরুষটি এ কথায় আহত

‘কেমনভাবে  এই অর্ধেক শরীর নিয়ে

টিকে থাকব পুরো তিন দিন?’

মুখে বলেন ‘ আমাদের চুক্তি ভঙ্গ করা যাবে না,

তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব নেই’

বলেন, আর তাঁর ডান হাত দিয়ে

দেবীকে টেনে নেন দৃঢ় আলিঙ্গনে।’

(অর্ধনারীশ্বর, তামিল কবি মালতী মৈত্রী, অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক)


বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সন্ত্রাস গ্রাস করে মিজোরাম থেকে কাশ্মীরের কবির কলম। আবার গুজরাটের দাঙ্গার ছাপ পড়ে কবিতায়।


‘এবার যে কোনদিন

বোমা পড়বে আমাদের ওপর

যারা গাছের আশেপাশে 

ঘরবাড়িতে কলোনিতে রয়েছে।

গাছ বললে মনে পড়ে 

এক গ্রীষ্মের মাস

ভরে আছে, গাড়ির শব্দে

চাবি হারানো, কথা হারানো

সেদিন হঠাৎ একসারি পাইন,

সবুজ, নতুন, ঢুকে পড়েছিল

আলোমাখা, আকাশি পর্দায়।

কিছু কাটা চিহ্ন, আমাদের ভুল

পুরনো মৃত্যুর ওপর নাচের পাগুলো

অথবা জীবন’

(যে কোনদিন, মিজো কবি মোনা জোটে, অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক)


‘তুমি মানুষকে হত্যা করো আমার সামনে, আমি শোক করি,

 মানুষেরা হত্যা করে তোমাকে আমার সামনে, আমি তখনো শোক করি।


তুমি মানুষকে হত্যা করো তাদের জন্য, তারা উল্লাস করে,

এবং মানুষেরা তোমাকে হত্যা করে তাদের জন্য, তারা উল্লাস করে;


এই ‘আমি’গুলো সংখ্যায় অতি অল্প,বিধ্বস্ত  , ক্লান্ত এবং ক্রমেই সঙ্কুচিত,


এই ‘ওরা’রা অনেকঃ ঐক্যবদ্ধ, প্রাণবন্ত   এদের সংখ্যা  ক্রমশ বাড়ছে।’


(একটি শান্তির কবিতা, কাশ্মীরি কবি নিঘাত সাহিবা, অনুবাদ বিতস্তা ঘোষাল) 


‘ওরা চায় আমরা লিখি, নিজেদের রক্ত দিয়ে লিখি

শুধু শান্তির কথা।

ওরা আমাদের জায়গা দখল করেছে। মৃত্যু দিয়েছে।

মেয়েদের সম্মান কেড়েছে। বলেছে অবোধ শিশুর মতো

আমরাই অকৃতজ্ঞ, যে জানে না কোনটা তার জন্য ভালো।

জায়গা হারিয়ে ওদের বন্দুকের নলে ঘিরে রয়েছি আমরা।

কাশ্মীরের নামে, মানুষের রক্ত দিয়ে ওরা পৃথিবীকে ভেংচি কাটছে মাত্র।

ওরা পেন বিক্রি করে, আমরা নিজেদের রক্ত দিয়ে কিনি। ওরা অনেকে নিজেদের পৈতৃক জায়গা ছেড়ে এখানে এসেছে, গঙ্গাস্নাত স্বচ্ছ হতে। ওদের স্থির দৃষ্টি আমাদের নিয়ে গেছে অন্য কোথাও। মাথার ভেতর চলেছে অন্য এক চাকা, সাদৃশ্য অনেকটা সুইস ঘড়ির মতো।

ওরা কাগজ বিক্রি করেছে,

অনেক কাগজ, আমরা রক্ত দিয়ে কিনেছি।

ওরা জ্বলন্ত আগুনে কেটলি বসিয়েছে, যেখানে চা-ও ওদের বশ্যতা স্বীকার করেছে। এর চেয়ে ভালো স্বর্গ কোথাও হতে পারে না।

আমাদের কলম অগ্রসর হয়েছে মুক্তির দাবীতে। প্রচণ্ড উত্তেজনার বশে বুঝিয়েছি বিচারের প্রতি হবে আমাদের আগামী প্রতিটি লেখার লাইন।

ইতিমধ্যে আশফাক আর নেই। মকবুল পলাতক। আসিফা, নীলোফার অত্যাচারিত এবং মৃত আফজলের ফাঁসি। তুকেল দুই কবরের মাঝে জ্বলন্ত। লালচকের আতর বিক্রেতা নিখোঁজ, খুঁজে পাওয়া গেছে তার শরীরের হাড় আর কিছু ভাঙ্গা শিশির।

কেটলি আওয়াজ করছে শুধু, চা আর আসবে না কোনদিন।

আমাদের হাড় আজ ক্লান্ত, অপেক্ষা শুধু আদালতে বিচারের। এই অপেক্ষার পরিণাম ওদের তরবারি। সেটাও আমাদের লেখায় জাগ্রত, ওরাই উৎসাহিত করেছে আমাদের রক্ত দিয়ে নিজেদের কথা লিখতে, আরও বেশি করে লিখতে। আমাদের রক্ত মাংসে ভরিয়েছে ওরা টিউলিপের বাগান।

... আমরা লিখেছি। আমরা তখনও লিখেছি, যখন ওরা যুদ্ধ মত্ত আমাদের সঙ্গেই।’ 


(কাশ্মীর- লেখা যেখানে পেশা, কাশ্মীরি কবি অ্যাথার জিয়া, অনুবাদ বিতস্তা ঘোষাল)


‘মুহূর্তেই

শহরটা হয়ে যায় পাথর, ইঁট, ছোরা, খুর

ধ্বংস, স্ফুলিংগ, অগ্নিশিখা ও ছাই।


মুহূর্তের মধ্যে

উন্মত্ত জনতা

হাতুড়ি, কোদাল, শাবল আর হাতবোমা নিয়ে

শহর দাপিয়ে বেড়ায়।


আমার কলম হুমড়ি খেয়ে পড়ে ইতিহাসের কংকালের ওপর,

হাওয়া গরজায়, যেন চিরঘুম থেকে জেগে ওঠা লাশের মৃত্যু

ঝুমঝুমি মৃত্যুর ঘূর্ণি হাওয়া নড়িয়ে দেয় সভ্যতার মূলস্তম্ভগুলো,

জীবনের  বিশ্বাসে ধূলোয়,

সব জায়গায় নখবসানো থাবা, রক্তবমি,

মুহূর্তের মধ্যে চোখ অন্ধ, দিকচিহ্ন মুছে যায়

মানবতার ছালচামড়া উঠে আসে।


আমি একজন কবি,

সাংবাদিকের মতো তো বাঁচতে পারি না,

সভাকবির মতোও  না,

আমি চাই, দাঁতে দাঁতে ঘষে, শব্দকে নরম না করেই

এই ষড়যন্ত্রের কথা বলতে,

কিন্তু তার জন্য

আমার দরকার কলমটাকে উদ্ধার করা,

গভীর অন্ধকার কুয়ো থেকে


আমার বাবার কুয়ো

আমার বংশের কুয়ো

যে কুয়ো নারীর শেষ আশ্রয়,

সেইসব নারী যারা ঝাঁপ দেয় কলঙ্কিত মৃত্যুর মধ্যে।


আমাকে সেই কুয়ো থেকে

তুলে আনতে হবে আমার কলম, একদম নতুন কলমটা,

শুধু আমার দুটো হাত সম্বল করে।

ধ্বংস, হত্যা এসব তো পৃথিবীর শেষ সত্য নয়।

(সমস্তই আমার হাতে, গুজরাটি কবি স্বরূপ ধ্রুব, অনুবাদ- বিপ্লব মাজী)

আর যাদের জন্ম থেকেই আলাদা করে রাখা হয়, জল-অচল, অস্পৃশ্য, এমনকি কখনো কপালে দেগে দেওয়া হয় চোর জাতির অপবাদ, তারা যখন কলম ধরেন তখন ভলকে ভলকে রক্তবমির মতো ক্ষোভ উঠে আসাই স্বাভাবিক, যা দলিত কবিতাকে একটা আলাদা জঁনারে রাখতে বাধ্য করেছে। আর কলম যখন  দলিত নারীর হাতে, তখন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নারীর নিজস্ব প্রান্তিকতা তার সঙ্গে মিশে তাকে আরও অনন্য করে তোলে।   সবার ওপরে থাকে দলিত হবার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা।তাদের কলমে সন্ত্রাসের ছবি আরও তীব্র।


‘ওদের অমানুষিক অত্যাচারই খুলে রেখেছে গুহা

আমার বুকের অন্তঃস্তলে

এই বনবাদাড়ে সাবধানে পা ফেলতে হবে আমাকে

নজর সেঁটে রাখে- বদল হতে থাকা এ সময়ে

পাশা পালটে গেছে,

ফুলকি ফুটছে ঢের প্রতিবাদের

এই এখানে

তো ওই ওখানে,

এইসব দিনগুলোতে মুখ বুজে ছিলাম আমি

ঠিক-বেঠিকের জবানবন্দি শুনেছি কান পেতে

কিন্তু এখন আমি উস্কে দেব উত্তেজনা

মানবাধিকারের জন্য

যে জায়গাটা কখনোই মাতৃভূমি ছিল না আমাদের

এমন এক জায়গায় আমরা এলাম কিভাবে?

যে ভূমি আমাদের এমনকি কুকুর-বেড়ালের 

জীবনও দিতে চায়নি?

ওদের এ অমার্জনীয় অপরাধ

সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করছি

ঘুরে দাঁড়াব, হব বিদ্রোহী

এই মুহূর্তে আর এখানেই’


(গুহা, মারাঠি দলিত কবি জ্যোতি লাঞ্জেয়ার অনুবাদ-  প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়)


 


‘সূর্যের দরজা আমাদের জন্য খুলে রাখার নিয়ম

কখনই আমাদের দেশে ছিল না

বংশ পরম্পরায় মাখানো হয়েছিল

অন্ধকারের কাজল

আমাদের চোখে

প্রতিটি আঁখি পল্লবে বেঁচে থাকার আহত স্বপ্ন বেদনায় উচ্চারিত

এবং পাখির পায়ে শিকল না পরানোর নিয়ম

কখনই আমাদের দেশে ছিল না

আজ চোখ থেকে বেরিয়া এসেছে ঘন কালো স্রোত

কানায় কানায় পূর্ণ ঘটে বিপদসংকেত

দরজার চৌকাঠও হয়তো যাবে ভেসে

বিশাল অট্টালিকার দেওয়াল পড়বে ভেঙে

দেরি হয়েছে ঠিকই-

কিন্তু আমাদের চোখ এবার এগিয়ে আসছে....’

(এবার এগিয়ে আসছে আমাদের চোখ, দলিত কবি প্রতিভা রাজানন্দ)

মনে পড়ে যায় সুকীর্থা রানির দৃপ্ত উচ্চারণ, যা সন্ত্রাসদীর্ণ সময়েও আমাদের আস্থা জাগিয়ে রাখে।

‘You may frame me, like a picture

And hang me on your wall

I will pour down

Away past you

Like a river in sudden flood.

I myself will become

Earth

Fire

Sky

Wind

Water

The more you confine me, the

More I will spill over

Nature’s fountainhead’




শারদীয়া দ্বিতীয় পর্ব কবিতার পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#দ্বিতীয়_পর্ব 


কবিতার পাতা ২

#অষ্টম_পাতা 


আজ পাঁচজন কবির কবিতা প্রকাশিত হলো। আনন্দময়ীর আগমনকাল এগিয়ে আসছে। কবিতায় শুদ্ধ হোক চিত্ত। 




#এত_যে_শূন্যতা


#উৎপল_ত্রিবেদী 


(ট্রিওলেট) 


 গহনে বিপরীত  দহনে মরা শ্বাস

অসাড় পড়ে থাকে গোপন অভিলাষ

তুমিতো চলে গেছ যেদিকে বিশ্বাস

গহনে বিপরীত  দহনে মরাশ্বাস

একলা নদী জানে তোমার পরবাস।

তোমার পরবাস ডাকেনি কাউকেই

গহনে বিপরীত দহনে মরাশ্বাস

অসাড় পড়ে থাকে  গোপন অভিলাষ

গোপনে ছিল সব নিভৃত অবকাশ

সকলে ভাবে তবু তুমি তো দূরভাষ

এতো যে শূণ্যতা এতো যে দূরাকাশ!


#মিনু_মারা_গেছে


#স্বপন_নাগ


মিনু মারা গেছে

মিনু অবনের বৌ

টেলিফোনে জানালো সায়ন।

#

'চিকিৎসার সুযোগও দেয়নি

দু'দিনের জ্বরেই সব শেষ --'

টেলিফোনের ওপারে

সায়নের রুদ্ধ কন্ঠস্বর।

#

ওপার !

টেলিফোনের এপার আর ওপার

ওপারে সায়ন, আমি এপারে।

#

কোন্ পারে এখন মিনু ?

#

মিনু অবনের বৌ

মিনু আমার কেউ নয়

তবু একদিন

মুঠোর পাঁচ আঙুলের

        একটি আঙুল ছিল সে !

#

আমাদের মুঠো

ক্রমশই শিথিল হয়ে আসছে।


#তৃষ্ণার্ত_ক্যানভাস


#চন্দ্রশেখর_ঘোষ 


অবজ্ঞার আল্পনা  এঁকে চলে গেছো 

সন্ধ্যা-প্রদীপহীন খোলা দরজায়


স্তব্ধতার ঝরাপাতা ওড়ে

আমার শব্দহীন নদীতে

ধূ ধূ বালুচর , কাঁটাঝোপ 


বালি খুঁড়তে খুঁড়তে হয়তো

গভীরে পাওয়া যাবে জল


সে জল স্বচ্ছ , পানযোগ্য 


তৃষ্ণা মেটাতে যদি ভুল করে আসো

উড়ে আসা ক্লান্ত পাখির মতো

চঞ্চুতে ফোঁটা ফোঁটা ফেলে দেবো


বুকের তুলিতে জলরঙে

এঁকে নেবো এই তৃষ্ণার্ত ক্যানভাস 


#সাড়া


#অমর_ঘোষ 


ভিতর থেকে সাড়া দিচ্ছে না কেউ

নাম ধরে ডাকছে নাও কেউ


হয়তো শুনতে পাচ্ছি না

কিংবা শোনার অতিরিক্ত কিছু নৈঃশব্দ

অন্ধকারকে ঋদ্ধ করে


একক পাতার নৌকা যাত্রা

বহু প্রাচীন মাত্রাবোধ  টান টান হয়ে ওঠে

ইতিহাসের দাঁড়ি কমা মুখস্থ করে হাওয়ার বেড়ে ওঠা ঔদ্ধত্যকে দিয়েছি কফিনে


তবে কেন নাম জেগে থাকে

ফিতেনদীর মত রাস্তা বেয়ে অমল মানুষ

ভিতর থেকে ডাক দেবে কবে---?


#মরুত্যকার_সন্ধানে


#ছন্দিতা_মল্লিক


অবশেষে তুমি এলে..!

শেষ চিঠি পাঠিয়েছি অনেককাল

মোড়ের মাথায় রোজ দাঁড়িয়ে থাকে আমার অশীতিপর বুড়ো বাপ

তারপর ফিরে আসে

ক্ষয়াটে হাঁটু আর কাঠফাটা পিঠ নিয়ে 

মায়ের অসংলগ্ন হাত দুটো ছুঁতে

মায়ের চোখের তারায় জোনাকীরা লণ্ঠন জ্বেলে দেয়

আর রাতের শয্যায় গা এলানো অপেক্ষারা

সারারাত হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে 

ভোরের আলোর দরবারে


ভেবেছিলাম ঠিকানায় ভুল

ভেবেছিলাম ঘর বদলেছ নতুন পথের বাঁকে

ভাবতে ভাবতেই শুকিয়ে গেছে 

মজা পুকুরের কালচে সবুজ বুক,

প্রজাপতি বাগান,

একটা দুটো জলভরা মেঘ

আর লতানে কুমড়ো চারার আধমরা নতুন কুশিগুলো।

নির্ঘুম রাতে ততদিনে চিরে আধাআধি

আমাদের বাঁশে বাঁধা পুরোনো টালির চালখানা


আজ এতদিন পরে তুমি এলে

মাচা থেকে বেরিয়ে পড়ে বাবার রংচটা ছাতাখানা

তালি দেওয়া মৌরীগন্ধের নীচে মুখ গুঁজে পড়ে থাকি তিনজন

ভেজা মাটির সুখ গড়ায়

ভাঙা চাল বেয়ে

আমাদের মাটির দাওয়ায়

আমাদের অন্ধগলির বুকে!






❣️❣️

Wednesday, 23 September 2020

অনুবাদ গল্প ১ (দ্বিতীয় পর্ব)

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


(এই লোককথাটির মূল কথাকার জেমস ঐনাম ( James Oinam)। বেশ কয়েকটি লোককথার একটি সংকলন 'New Folktales of Manipur' থেকে এই গল্পটি নেওয়া হয়েছে। মণিপুরে প্রচলিত লোককথাগুলি সংগৃহীত হয়েছে এই বইতে। লেখকের স্বীকারোক্তিতে, মনিপুরের গ্রামের পথে ঘাটে, উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা গল্পগুলি অনেকাংশেই মূল ঘটনা থেকে ভিন্ন হয়। লেখক তাঁর কল্পনা দিয়ে এই ফাঁকগুলিকে পূরণ করেছেন। প্রকাশনা সংস্থার সাথে বহুদিন ধরে কাজ করে চলা জেমস এখনো খুঁজে চলেছেন মনিপুরের বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যকে।)
এই যে সুন্দর পৃথিবীটা, এর ধারক কে জানো? এমা। এমা হলেন এক অবিনশ্বর আত্মা। এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। তাই আমাদের পূর্বসূরিদের গণনা শুরুর নাম এমা। ওঁরা বিশ্বাস করতেন, সৃষ্টির শুরু শূন্যতায় হয়নি। এমা রূপ নিয়েছিলেন সর্বশক্তিমান প্রভু সিতাপা মাপুর। তিনিই তো আকাশ। মেইতেই ভাষায় আকাশকে বলে সরারেল। সিতাপা মাপু ভালবাসলেন ইমা লেইমালেল সিতাপি কে, আমাদের ধরিত্রী মাতাকে। আকাশ আর ধরিত্রীর মিলনে জন্ম নিলেন সনামাহি। সীতাপা মাপু তাঁর সন্তানকে আদেশ করলেন, মানব সৃষ্টি করতে। সনামাহি তাঁর নির্দেশে একের পর এক জীবসৃষ্টি করে চললেন। ইঙ্গামু (মাছ) থেকে ওঙ্গ (বাঁদর)পর্যন্ত। কিন্তু সিতাপা মাপু কিছুতেই খুশি হতে পারছেন না। শেষপর্যন্ত তিনি পুত্রের কাছে আত্মরূপ প্রকাশ করলেন। সনামাহি সেই আশ্চর্য রূপের সংজ্ঞায় চালিত হয়ে মানুষকে গড়লেন।
দেবতা এবং মানুষদের উত্তরসূরীরা ক্রমে পবিত্র কব্রু পর্বত থেকে নীচের উপত্যকা ভূমিতে নেমে এল। সনামাহি পাখাংবা কে নরজাতির অধিপতি হিসেবে নির্বাচন করলেন। লেইস অর্থাৎ দেবতারা রাজন্য হিসেবে পেল সনামাহিকে আর নর জাতি অর্থাৎ মিসরা পাখাংবা কে।
প্রথম প্রথম দেবতা এবং মানুষরা বেশ মিলেমিশেই বাস করছিল এই সুন্দর উপত্যকা ভূমিতে। দেবকুমার রা অনায়াসেই কুমারী মানব কন্যার সাথে প্রণয় ও পরিণয়ে আবদ্ধ হত। কিন্তু পাখাংবা ও তার উত্তরসূরিরা ধীরে ধীরে এর বিরোধীতা করতে থাকেন। সনামাহিও বুঝেছিলেন, এই মানবজাতি দেবতা সৃষ্ট হলেও দেবগুনের অভাব আছে তাদের মধ্যে। এই মিশ্র বিবাহের ফলে যে সন্তানরা জন্মাবে তারা মানুষদের থেকে কিছুটা উন্নত হলেও দেবপদবাচ্য বলে বিবেচিত হবে না।
গাছ বড় হতে থাকলে দুটি শাখা যেমন পরস্পর থেকে ক্রমশ দূরে চলে যায়, তেমনি দেবতা ও মানুষদের মধ্যেও বিভেদ ক্রমশ প্রশস্ত হল। দেবতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষরা নৈতিক দিক থেকে আরো পিছিয়ে পড়ল। সিতাপা মাপু তখন সম্পূর্ণ আলাদা এক দেবভূমি তৈরি করে দেবতাদের সেখানেই চলে যেতে নির্দেশ দিলেন।
দেবতারা বেশিরভাগই নিচের উপত্যকা ছেড়ে চলে গেলেও এক তরুণ দেবকন্যা, ঐশিকী মেঘ পাহাড়ের দেশ মৈরাং রাজ্য ছেড়ে যেতে পারলেন না। তার জন্ম এখানেই। এখানেই তার শিশু ও কিশোরী বেলা কেটেছে। এই মায়াভরা উপত্যকার মায়ায় সে তার স্বজাতির অনুসরণ করতে পারল না। অথচ মানুষেরা তখন দেবতাদের থেকে আচার-আচরণে এতটাই আলাদা হয়ে গেছিল যে, সে তাদের সাথে মিশতে পারে না। লুকিয়ে ঘুরে বেড়ায় নদীর ধারে, গাছপালার অন্দরে। এই গোপনচারীতার জন্য মানুষরাও তাকে ভয় পায় এবং লোকমুখে ছড়াতে থাকে তার সম্পর্কে নানা কল্পকাহিনী।
একদিন কথা উঠল রাজার কানে।
পিউরেনবা মৈরাং রাজ্যের বীর সেনাপতি। সবচেয়ে প্রভাবশালী খুলাকপাস তিনি। স্বয়ং মৈরাংরাজও তাকে সমীহ করে চলেন। রাজা একদিন পিউরেনবাকে ঐশিকীর বিষয়ে প্রশ্ন করলেন।
- রাজ্যবাসী এই ঐশিকীর ওপর ক্ষুব্ধ, পিউরেনবা। সে আমার সন্তানসম প্রজাদের দুঃখের কারণ হয়ে উঠেছে। তুমি কি জানতে না পিউরেনবা? আমায় আগে জানানো হয় নি কেন?
- রাজন! পিউরেনবা বলেন, ঐশিকী স্বভাবতই কখনো কারোর দুঃখের কারণ হতে পারেন না। একথা আপনিও জানেন মহামতি। হ্যাঁ, আমি শুনেছি তার কথা। তার উদ্বাস্তু, ভ্রাম্যমান জীবনের কথা। আমার মনে হয়, আমাদের দিক থেকে একটু সহানুভূতি প্রাপ্য ছিল তাঁর। সামান্য একটু বাসযোগ্য স্থান এই বিশাল উপত্যকা ভূমিতে কি এতই দুর্লভ, অন্তত যতদিন না ঐশিকী দেবভূমিতে ফিরে যাবার জন্য তৈরি হতে পারছেন।
- যাই বলো পিউরেনবা, আমার প্রজারা সন্তুষ্ট নয় তার প্রতি। দেবতা আর মানবজাতির একসাথে থাকা উচিত নয়। সিতাপা মাপুর তাই নির্দেশ। তুমি যেভাবে পারো ঐশিকীকে এখানে নিয়ে এসো।
- যথার্থ রাজন! আপনার ইচ্ছাই আমার ধর্ম।
- পিউরেনবা, রাজা চিন্তিত সুরে বলেন, তোমার বিচক্ষনতার উপর আমার আস্থা আছে। দৈবশক্তির সাথে কোন রকম অশুভ আচরণ আমাদের উপর অভিশাপ ডেকে আনতে পারে। জানোইতো, দেবতারা কেমন মায়াবী হন। যা করণীয়, সবই খুব সাবধানে করবে যাতে ঐশিকীর কোন ক্ষতি না হয়; যেন সে কোন কারণে ক্ষুব্ধ না হয়।
- মহারাজ, সব জেনেশুনেই এই ঝুঁকি আমি নিচ্ছি। সিতাপা মাপুর নামে শপথ করছি, ঐশিকীকে খুঁজে বের করার সব দায়িত্ব একলা আমার। কিন্তু রাজন, আপনাকেও কথা দিতে হবে যে যদি ঐশিকীকে খুঁজে পাই এবং তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন তবে তার সম্পর্কে যা করণীয় সে ভারও আমাকেই দিতে হবে।
মৈরাং রাজ সম্মতি দিলেন। পিউরেনবা তার বাহিনীর সবচেয়ে সাহসী এবং বুদ্ধিমান চারজন যোদ্ধাকে বেছে নিলেন। এই চারজনকে তিনি চতুর্দিকে প্রেরণ করলেন।
দিনের বেলা ঐশিকী নিজেকে লুকিয়ে রাখে। রাতেই তার ভ্রমণবিলাস। পিউরেনবা খুব যত্ন করে এই চার সেনাকে কিছু উপদেশ দিলেন।
- যাও তোমরা ঐশিকীর সন্ধান করো। কিন্তু তোমাদের ছায়া রইল আমার কাছেই ।তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ঐশিকীর মায়াজালে আবদ্ধ হও, তোমাদের ছায়া সঙ্গে সঙ্গেই তা জানিয়ে দেবে আমাকে। নিশ্চিত থেকো, আমি খুব অল্প সময়ে সেখানে পৌঁছে যাব আর উদ্ধার করব তোমাদের।
মনিপুর রাজ্যে প্রচলিত গোপন কালোজাদু গুলি সম্পর্কে ভালোই ওয়াকিবহাল ছিলেন পিউরেনবা। বিশাল একটি চামড়ার খন্ডকে গুটিয়ে একটি শস্যদানার রূপ দেওয়া হয়। তারপর আসল শস্যের সাথে ওটিকেও মিশিয়ে দেওয়া হয়। খাদ্য হিসেবে যে এই শস্য গ্রহণ করে, সে তা জানতেও পারেনা। পাকস্থলীতে যাবার পর ওই চামড়ার থলি স্ফীত হতে হতে একসময় ফেটে যায় আর হতভাগ্য মানুষটি মারা পড়ে । এই জন্যই বয়স্করা তাদের বাচ্চাদের সব সময় সাবধান করে দেন যেন তারা কোনো অপরিচিতের দেওয়া খাবার না খায়। পিউরেনবা তার সৈনিকদের পাকস্থলীতে এরকম চামড়ার থলিকে এমন ভাবে স্থাপন করলেন যাতে তারা অনেকটা খাবার একসাথে খেয়ে নিতে পারে। অনেক দূরের পাহাড় জঙ্গলের পথে হয়তো বেশ কিছুদিন তাদের খাদ্য ছাড়াই চলতে হবে।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় ঘন মেঘ আর বৃষ্টিতে চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। যে সৈনিকটি পূর্বদিকে গিয়েছিল তার ছায়ার মধ্যে ভীষণ অস্থিরতা লক্ষ্য করলেন পিউরেনবা।তিনি বুঝলেন, নিশ্চয়ই ঐশিকী সন্ধান পাওয়া গেছে অথবা সৈনিকটি বিপদে পড়েছে কোন।দুর্যোগের মধ্যেই তিনি ঐ সৈনিকের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পিউরেনবা স্থান ত্যাগ করা মাত্র অন্য এক দুর্বৃত্ত সৈনিক আরেকটি ছায়াকে তার অনুপস্থিতির সুযোগে নষ্ট করে ফেলল। এই ছায়ার যে দেহধারী, তার প্রতি বহুদিনের বিদ্বেষ ছিল এই দুষ্টু সৈনিকটির। পরের দিন ওই সৈনিক মারা গেল।
পিউরেনবা ঐশিকীকে নিয়ে ফিরে এলেন এক দুর্লভ ঐশ্বর্য্যের মত। রাজ্যবাসী ঐশিকীর দেবসুলভ কান্তি দেখে আনন্দে অভিনন্দন জানাল পিউরেনবাকে এবং দুঃখ প্রকাশ করল ওই মৃত সৈনিকের জন্য।
ঐশিকীর সৌন্দর্য্যে মৈরাংরাজ বিস্ময়ে অভিভূত। রাজা ভাবেন, এই অসম্ভব কোমল প্রাণ কি কখনো কারোর ক্ষতি করতে পারে !প্রজারাও ঐশিকীকে দেখার পর তাদের ভুল বুঝতে পারল। তারা এই দৈবীশক্তিকে রাজ্যের অতিথি হিসাবে প্রার্থনা করল। একটি কথাও না বলে ঐশিকী সকলের হৃদয় জয় করে নিলেন।
পিউরেনবা ঠিক এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলেন। রাজাকে তিনি মনে করিয়ে দিলেন তার প্রতিশ্রুতির কথা।
- রাজন, ঐশিকী নির্দোষ প্রমাণিত। এবারে তার দায়িত্ব আমি নেব। আমি বিবাহ করতে চাই এই ঐশিকীকে।
রাজসভার প্রত্যেকে চমকে ওঠেন। এ কেমন কথা বলছেন পিউরেনবা!
- পিউরেনবা! রাজার আর্ত কন্ঠ। তুমি তো জানো আকাশের দেবতা সিতাপা মাপু দেবতা এবং মানুষদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন। তুমি এই কাজ করলে আমরা যে দেবতাদের কোপে পড়ব!
কিন্তু পিউরেনবা দৃঢ়সংকল্প। তার কাছে ঐশিকী একমাত্র জীবনের প্রতিচ্ছবি। বাকি সবকিছুই স্থিরচিত্র।
- রাজন, আমি বরং জীবনভর দুঃখ ভোগ করবো যদি ঐশিকীকে পাশে পাই। যদি কোন ভুল করি, তার জন্য আমি যেন একাই শাস্তি পাই। রাজ্যের কোন ক্ষতি আমি কখনোই হতে দেব না।
ঐশিকীর লজ্জানত মুখেও, রাজা দেখলেন, অনুরাগের ছোঁয়া লেগেছে। নতমুখে সে জানালো,
- হ্যাঁ রাজা, বীরহৃদয় পিউরেনবা কে আমি মনে মনে নিজেকে সমর্পণ করেছি। আমাকে তার ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকতে অনুমতি দিন।পিউরেনবা আমাকে কথা দিয়েছেন তিনি তাঁর ছায়াকে কোথাও কখনো হারাবেন না। কোনদিন তার অবমাননা করবেন না।
রাজ অনুমতিতে পিউরেনবা আর ঐশিকীর বিবাহ হল। তাদের দুই সন্তান জন্মাল। খামবা আর খামনু।
পিউরেনবার বিশেষ বন্ধু ছিলেন থংলেন ।ঐশিকী উদ্ধারের সময় যে সৈনিক নিহত হয়েছিল সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য থংলেন কে অনুরোধ করেছিলেন পিউরেনবা। থংলেন আদতে বদমেজাজি এবং আক্রমণাত্মক। খুব কম সময়েই তিনি ওই সৈনিকের হত্যাকারীকে শনাক্ত করে ফেললেন। সেই সময় থেকেই আততায়ী লোকটি অন্তরীণ ছিল। সে জানতো থংলেন অনেক গুপ্তবিদ্যা জানেন। পিউরেনবাও খুবই জ্ঞানী কিন্তু তিনি এসব বিদ্যা কখনোই অসদউদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন না। সেই ভরসায় ওই সৈনিক পিউরেনবার কাছে একদিন আত্মসমর্পণ করলো এবং আশ্রয় ভিক্ষা করল।
- কিন্তু আমি তো থংলেন কে বলেছি দোষীর শাস্তির ব্যবস্থা করতে। পিউরেনবা বোঝালেন তাকে। তুমি বরং থংলেন এর কাছেই ক্ষমা ভিক্ষা কর।
- না, না, সে সম্ভব নয়। থংলেন আমাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করবে। সেনাপতি, আপনি নিজেও তো নিজের হৃদয়ের বিরুদ্ধে যেতে পারেননি। দৈবী ঐশিকীকে বিবাহ করেছেন, এটা জেনেও যে, প্রভু সনামাহি এই বিবাহের বিপক্ষে। তেমনি, ওই সৈনিকের ওপর আমার তীব্র বিদ্বেষ ছিল। তাই ওর ছায়াকে আমি সরিয়ে দিয়েছি। দয়া করুন আমায়, দয়া করে আমার বিচার করুন আপনি মুক্তমনে। আমি কথা দিচ্ছি, ওই সৈনিকের মা এবং বিধবা স্ত্রীর দায়িত্ব আমি নেব। আমি তাকে বিবাহ করতেও পারি এবং ওর ছেলে মেয়েদের নিজের সন্তানের মতোই দেখব। আমার জীবন রক্ষা করুন সেনাপতি। আমার মা বহুদিন আমার পথ চেয়ে একা রয়েছে ঘরে। আমি মারা গেলে তার কি হবে!
পিউরেনবা বুঝলেন, এবারে ভাগ্য তার বজ্র বাহু প্রসারিত করতে চলেছে। একটি নিষিদ্ধ পথে তিনি চলেছেন, তার মাশুল এবার তাকে দিতেই হবে। তিনি ওই সৈনিককে আশ্বস্ত করলেন।
থংলেন জানতেন যে, ফেরারি সৈনিকটি কোন না কোন দিন তার মায়ের খোঁজ নিতে আসবে। তিনি তার মায়াজাদু বিছিয়ে রাখলেন সৈনিকটির বাড়ির চারপাশে। পিউরেনবা একদিন গোপনে ওই মহিলার সাথে দেখা করলেন। তাকে জানালেন তার ছেলে নিরাপদে আছে এবং সে আপাতত পিউরেনবার আশ্রয়েই আছে। বহুদিন বাদে ছেলের খবর শুনে বৃদ্ধার চোখ জলে ভরে উঠল। গভীর রাতে যখন পিউরেনবা বিদায় নিলেন থংলেন এর মায়াজাদুতে তার ছায়া সম্মোহিত হল। ছায়া তাকে ত্যাগ করে থংলেন এর বশীভূত হল। পিউরেনবা জানতে পারলেন না যে তার ছায়া তাকে ত্যাগ করেছে, কিন্তু তার দেহমন শিথিল হয়ে এল।
পিউরেনবা যতই নিজের বাড়ির কাছাকাছি হন, এক অশুভ বিষন্নতা তাকে গ্রাস করে।উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢোকার আগেই বেরিয়ে এসেছেন ঐশিকী। দুচোখে তার বর্ষার সিগমাই নদী বাঁধ ভেঙেছে। অন্ধকারেও দৈবী ঐশিকী বুঝতে পারলেন, তার স্বামী আজ নিজের ছায়াকে হারিয়ে এসেছেন।
কান্নায় লুটিয়ে পড়ে ঐশিকী বলেন, পিউরেনবা, তুমি তো জানো, আমি দেবাংশী। আর দেবাংশীরা মিথ্যে বলে না কখনো। আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম চিরকাল। আজ তুমি সেই ছায়াকেই হারিয়ে এসেছ - অন্য কেউ লুঠ করেছে তাকে। এবার আমাকে চলে যেতে হবে। সিতাপা মাপু হয়ত এই - ই চান। দুঃখের ভেতর দিয়ে আমাকে তৈরি করে নেবেন দেবভূমির জন্য। কিন্তু আমার বাচ্চারা অনাথ হয়ে যাবে। দারিদ্র দুর্দশা ওদের সঙ্গী হবে। তবু আমাকে চলে যেতেই হবে। কষ্টকর জীবনের সাথে লড়াই করে আমার সন্তানরা যখন স্বর্গে যাবার জন্য তৈরি হবে তখন ওদের মনে আমার মত এমন আক্ষেপ থাকবে না। আমি যে অনেক পেয়েছি পিউরেনবা। তোমার মত স্বামী, সমস্ত রাজ্যবাসীর ভালোবাসা আর এই স্বর্গের চেয়েও দামি সুন্দর সংসার। আমার আত্মা যে কি ভীষণ কষ্ট সহ্য করছে তা কেউ বুঝবে না।
ঐশীকি চলে যাবার পর পিউরেনবাও জানতেন, তার দিন শেষ হয়ে এসেছে। থংলেন তার মায়াজাদুতে বন্দী ছায়াকে তখনই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। পিউরেনবা একটুও সময় নষ্ট না করে বন্ধুকে সব বুঝিয়ে বললেন। ওই ছায়া যে তারই এবং দুজনের অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য এই ঘটনা ঘটেছে এই কথা বলে থংলেন কে সান্ত্বনা দিলেন। থংলেন বন্ধুর বিচ্ছেদ আশঙ্কায় দুঃখে ভেঙে পড়লেন। পিউরেনবা তাকে অনুরোধ করলেন অনুতপ্ত সৈনিকটি কে ক্ষমা করতে। পিউরেনবা তার সন্তানদের সম্পর্কে ঐশিকী র ভবিষ্যৎবাণীর কথাও বিস্তারিত বললেন বন্ধুকে। থংলেন এর কাছে তার শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন পিউরেনবা। থংলেন যেন খামবা এবং খামনুর নৈতিক অভিভাবক হিসেবে ওদের আগলে রাখেন কিন্তু কোনোরকম বস্তুগত সাহায্য করে ওদের শক্তিকে প্রতিহত না করেন। ওদের শক্ত হতে হবে, লড়তে হবে এই পৃথিবীর সঙ্গে। সীতাপা মাপু ও তেমনটি চান বলে বিশ্বাস ছিল ঐশিকীর।
পিউরেনবার মৃত্যু হল। খামবা আর খামনু দুই ভাইবোন দারিদ্র সঙ্গী করেও এই দুঃখে ভরা পৃথিবী তে দুটি উজ্জ্বল মণির মত বেঁচে রইল বহুদিন।
***




(ফ্রানজ কাফকা বিশ্ব সাহিত্যের একটি বিখ্যাত নাম। তাঁর একটি অণুগল্প এখানে রইল।)
সম্রাট তাঁর মৃত্যুশয্যা থেকে তোমাকে, হ্যাঁ, মানে এই বেচারা সাধারণ প্রজা তুমি, তোমাকেই একটি চিঠি দিয়েছেন। সরাসরি চিঠি দিয়েছেন! তাঁর সাম্রাজ্যের একপ্রান্তে আশ্রিত তুমি। তাঁর শয্যার পাশে রাজদূত হাঁটু মুড়ে বসে সেই বার্তা শুনেছিল।
তিনি নীচু স্বরে সেই বার্তা তাঁর কানের কাছে উচ্চারণ করেছিলেন। সম্রাট এরপর দূতকে বার্তাটি তাঁকে ফিরে শোনাতে বলেন। দূতের কথা শুনে নিশ্চিন্ত সম্রাট মাথা নাড়েন। তাঁর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে সামনে ভিড় করে থাকা অসংখ্য মানুষের মধ্যে থেকে, মাথা ফুঁড়ে ওঠা সমস্ত প্রাচীরকে ভেঙে, আলোকিত সোপানে বৃত্তাকারে দাঁড়ানো সাম্রাজ্যের তাবৎ মহামান্য সভাসদকে পেছনে ফেলে রাজদূত এগিয়ে গেলেন।
অবশ্যই সম্রাটের নির্দেশ অনুসারে।
রাজদূত তখনই যাত্রা করলেন। শক্তিশালী পুরুষ তিনি। একটি একটি করে বাহু মেলে তিনি প্রতিরোধের দিকে ছুটতে শুরু করলেন। যখনই সূর্যের (সম্রাটের) নিশান প্রয়োজন হল, তিনি নিজের বুকে আঙুল দিলেন। এর ফলে সহজেই তিনি বাধা ভেদ করতে পারছিলেন।
কিন্তু ভিড় বড়ো বেশি। অসীম সেই স্থান জুড়ে অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি। যদি উন্মুক্ত মাঠ হতো তবে সহজেই তিনি পৌঁছে যেতেন। এতক্ষণে তোমার দরজায় তাঁর হাতের কড়া নাড়া শুনতে পেতে। কিন্তু তাঁর সব প্রয়াস নিষ্ফল।
তিনি এখনও রাজার মহলের অন্দরের নিভৃততম ঘরটি থেকেই বার হতে পারেননি। হয়তো পারবেন না। যদি বা কৃতকার্য হন তাতেও কিছু লাভ হবেনা। কারণ এরপর তাঁকে সোপান পেরিয়ে আসতে হবে। তাতেও লাভ নেই। তাঁকে উঠোন পেরোতে হবে। তারপর অন্দরকে ঘিরে রাখা দ্বিতীয় মহল। তারপর আবার সোপান ও উঠোন। আবার আর একটি মহল। এইভাবে হাজার হাজার বছর ধরে তিনি পথ পেরোবেন।
এবং, অবশেষে যদি বা তিনি তোমার দরজায় এসে ঘা দেন, তাহলেও লাভ নেই। তাঁর সামনে তখন রাজার প্রাসাদ, নগর, ও পৃথিবীর যাবতীয় স্তুপাকৃত হয়ে পড়ে থাকবে। ধ্বংসস্তুপ।
কেউ কখনও কোনো মৃতের চিঠি নিয়ে আসেনি। কিন্তু তুমি তোমার জানলায় বসে স্বপ্নে বিভোর হও। ভাবো, সন্ধ্যে হলেই তোমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়বে রাজদূত। তাঁর কাছে আছে রাজার চিঠি।
(ভাবানুবাদ)



Tuesday, 22 September 2020

শারদীয়া দ্বিতীয় পর্ব ৫

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল

🙏


#দ্বিতীয়_পর্ব


#পঞ্চম_পাতা


 

#রম্যরচনা


#কৈকেয়ী_তুমি_না_থাকলে


#কাকলী_দেবনাথ


রামায়ণের এক অন্যতম নারী চরিত্র হল কৈকেয়ী ।ওঁকে বলা হয় এই মহাকাব্যের খল নায়িকা। সত্যি কথা বলতে কি কৈকেয়ী আমার চোখে রামায়ণের প্রধানা নায়িকা ।নিশ্চয়ই ভাবছেন,কৈকেয়ী নায়িকা হলে  সীতা মাতার অবস্থানটা ঠিক কোথায় হবে ? । আরে বাবা ,অর্ধেক রামায়ণ জুড়ে রামের পাশে পাশে ঘুরলেই কি আর নায়িকা হওয়া যায় ? তাকে নায়কের পাশে অমন দুঃখী দুঃখী মুখ করে হাটার সুযোগ কে করে দিল শুনি ? সেই তো রাজমাতা কৈকেয়ী ।


যাই হোক এই  সব কথায় পরে আসব ।তার আগে জেনে নেওয়া যাক কৈকেয়ী আর তার স্বামী  রাজাধিরাজ দশরথ সম্বন্ধে ।এই দশরথ রাজার কতগুলি বউ ছিল জানেন আপনারা ? সাতশ পঞ্চাশ জন । কি তারও বেশি । ভাবুন একবার ।বছরে যদি একটা করেও বিবাহ করতেন তাহলেও সাত ‘শ বছর । আমি বরাবরই অঙ্কে কাঁচা । 


রাজার বয়স ,রানির সংখ্যা কিছুই ঠিকঠাক মেলাতে পারছি না ।তখনকার দিনে নাকি এই সব মহামানবরা বহু বছর বেঁচে থা্কতেন । আপাতত  দশরথের অন্য রানিদের ছেড়ে আমরা একটু কৈকেয়ীর  দিকে দৃষ্টি ফেরাই ।


‘গিরিরাজ নগরেতে কেকয়ের ঘর । ‘

গিরিরাজ মানে এখনকার রাজগীর । এই কেকয় রাজার মেয়েই ছিলেন কৈকেয়ী ।পরমা সুন্দরী।অবশ্য সুন্দরী না হলে কি দশরথ বিয়ে করতেন ? পৃথিবীর সব পুরুষই সুন্দরী মেয়ে পছন্দ করেন ।তারপর তিনি যদি হন রাজপুরুষ তা হলে তো কথাই নেই । আমরা জানি রাক্ষস রাজা রাবণ যার নাকি দশটা মাথা তার রানি মন্দোদরীও ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী।যদিও অনেক পন্ডিতের মতে রাবণের মোটেও দশটা মাথা ছিল না ।  একটি মাথাতেই তিনি দশজনের মত বুদ্ধি রাখতেন। 


কৈকেয়ী্কে বিয়ে করে রাজা দশরথ মণি ,মুক্ত ,অশ্ব তো পেলেনই সঙ্গে যৌতুক হিসেবে পেলেন কুব্জা মন্থরাকে ।এটা কিন্তু আমার মতে কেকয় রাজা বেশ একটা ভালো কাজ করেছিলেন ।তাঁর অত সুন্দরী আদরের রাজকন্যেকে সতীনের সঙ্গে সংসার করতে পাঠানোর সময় একটা দাসী দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছিল ।


সম্বর অসুরকে মারতে গিয়ে রাজা দশরথ জখম হলেন । যেহেতু কৈকেয়ী অস্ত্র-সঞ্জীবনী বিদ্যা জানতেন তাই রাজামশাই তার কাছেই গেলেন।কৈকেয়ী অনেক শ্রুশ্রূষা করে রাজাকে ভালো করে তুললেন । রাজা খুশি হয়ে রানিকে বর দিতে চাইলেন ।আজকালকার স্বামীরা যেমন খুশি হয়ে গিফট দিতে চায় আর কী ! তবে  উনি তো আর যেমন তেমন হেজা পেজা স্বামী ছিলেন না । 


উনি ছিলেন রঘুকুল রাজাধিরাজ । তাই তার গিফটও ছিল সেই রকম । কৈকেয়ী বুদ্ধিমতি ছিলেন এখনকার মেয়েদের মতই । এই আমরা যেমন হাজবেন্ডরা গিফট দিতে চাইলে বলি এখন নয় পুজোর সময় নেব ।সে রকমই কৈকেয়ীও বললেন ,সময় হলে চেয়ে নেবেন । 


আরও একবার,যখন রাজা দশরথের নখের ভিতর  ব্রন হল, তখন দেবগনের চিকিৎসক ধন্বন্তরি (সমুদ্র মন্থনের সময় সমুদ্র থেকে উঠেছিলেন ) বিধান দিলেন- দুটো রাস্তা আছে এই ব্রনর ব্যাথা থেকে মুক্তি পাওয়ার ।এক হল,ঘৃনা না করে রাজাকে শামুখের ঝোল খেতে হবে ।আর দ্বিতীয় হল,কেউ যদি রক্ত,পুঁজ ঝরছে ওই নখে চুমু খায় ।


আপনারাই বলুন, রাজা দশরথ ঘেন্নায় শামুখের ঝোল খতে পারলেন না ।অথচ রানি কৈকেয়ী স্বামীর ব্যাথা লাঘবের জন্য ঘেন্না পিত্তি ভুলে ওই নখে চুমু খেলেন । এটা কি কম কথা ?

আর এত সব কিছুর বিনিময়ে তিনি কিন্তু নিজের জন্য কিছু চাইলেন না ।  চাইলেন তার একমাত্র সন্তানের জন্য।মায়ের মন তো চাইবেই ,নিজের ছেলেকে রাজা হিসেবে দেখতে । এটা কি এমন দোষের হল যে ,যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর মানুষ তাকে কুমাতা বলে গালাগাল দিয়ে আসছে ।


আর বাকি রইল রামের চোদ্দ বছরের বনবাস ।অনেকে হয়ত বলবেন,নিজের ছেলেকে রাজা করতে চেয়েছিস খুব ভালো কথা । তা বলে রাম কে বনবাস ! এটা তো ঠিক নয় । অমন  কচি রাজপুত্তুর ,কোনোদিন খালি পায়ে হাটে নি। সোনার পালঙ্ক ছাড়া ঘুমোয় নি ।রাজভোগ ছাড়া খায় নি ।তাকে কি না বনে পাঠাল ! শরীরে মায়া দয়া বলে কিছু নেই ?


আরে মশাই ,একবার ভেবে দেখেছেন কী ? কৈকেয়ী ওই সময় এই সিদ্ধান্তটা না নিলে যুগ যুগ ধরে আমরা অমন অ্যাডভেঞ্চারাস কাহিনী থেকে বঞ্চিত হতাম । রামায়ণে যা কিছু ঘটেছে তার বেশির ভাগটাই তো রাম বনে যাওয়ার পরে হয়েছে ।রাবণ থেকে লবকুশ ।জটায়ু থেকে হনুমান সবার কীর্তিকলাপই তো আমরা সেই চোদ্দ বছরেই দেখতে পাই আর পড়ে রইল সীতা মাইয়ার কাহিনী ।তাকে যে আমরা চিরকালীন দুখিনী নায়িকা হিসেবে মাথায় তুলে রেখেছি সেটাও তো ওই কৈকেয়ী শাশুড়ি মাতার জন্যই । আরে বোম্বেতে কিছুদিনের জন্য নায়িকার পোস্ট দখল করে থাকার জন্য একে ওপরকে খুন করে দিচ্ছে। সেখানে কৈকেয়ী সকলের চোখে নিজে খারাপ হয়ে সীতাকে নায়িকা বানিয়ে দিলেন ।এটা কি কম কিছু ?


তাই সব শেষে এই কথাটাই বলা চলে, কৈকেয়ী , তুমি না থাকলে রামায়ন হত না।


🌹🌹


#রম্যকথা


#সুব্রত_দেব


 পালপাড়া,চন্দন নগর।আবৃত্তি পরিষদের স্রষ্টা, বিখ্যাত বাচিক শিল্পী ও আমার প্রথম আবৃত্তি শিক্ষক

শ্রদ্ধেয় তাপস চট্টোপাধ্যায়।আমাদের সকলের জ্যেঠু।


 সুরসিক এই মানুষটির কথা আজও মনে পড়ে।

একটি দিনের কথা - মাস্টার মশাই বাজারে গেছেন।

 বাজার মানে পালপাড়া রোডের দুপাশে বসা নিত্য

দিনের অস্থায়ী কিছু দোকান। তা মাস্টার মশাইয়ের

খুব ইচ্ছে হল মৌরলা মাছ কিনবেন।বেশ জমিয়ে

ঝাল আর মৌরলা মাছের টক খাওয়া যাবে।


পকেটে সাকুল্যে পঞ্চাশ টাকা।

ছোট ব্যাগ নিয়ে ঘুরছেন।পালপাড়া বর্ধিষ্ণু এলাকা।

তা পাড়ার পঞ্চুর কাছে মৌরলা মাছ দেখে মাস্টার 

মশাই এগিয়ে গেলেন। পঞ্চু মাস্টার মশাইকে দেখতে

পেয়েই হাঁক দিল --মাস্টার মশাই এদিকে আসুন।


--মৌরলা কত করে দিবি।

- মাস্টমশাই আপনার জন্য একেবারে সস্তায় দিয়ে দেব।

-- কত করে ত বল।

--একেবারে জলের দরে ফলের রস,দানা দেখেছেন।

আ-হা! গা দেখেছেন।একেবারে চিকচিক করছে।

-সত্যি,মাছ্গুলো খুব ভালো এনেছিস,তা তোর 

ফলের রসের দাম কত?

--আপনার জন্য চারশ করে দেব।এক কেজি দিয়ে দি

মাশসাই।

--শোন পঞ্চু তুই একটা মৌরলা ওজন কর।

-একটা!

-হ্যাঁ,একটা।আমি তা থেকে জেরক্স করে নেব।

পঞ্চু থ!


আরেকবার একটা আবৃত্তি পাঠের আসরে রবীন্দ্র কবিতা পাঠ করছেন। জনতার দাবি আধুনিক কবিতা চাই।তা উনি শুরু করলেন - কবি শুভ দাশগুপ্তের- 'বলতে নেই' কবিতা। তাতে একটা পংক্তি ছিল -বাংলা সিনেমা বেদের মেয়ে জোছনার পাল্লায় পড়ে সিঁদুর নিও না মুছে বলে আর্তনাদ করছে।


 এই কবিতা শোনার পর সে কী করতালি! 

মঞ্চ থেকে নেমে মাস্টার মশাই (জ্যেঠু) বললেন-

বুঝলে সুব্রত কী দিনকালই পড়ল, লোকে বলছে এখন আর রবীন্দ্র কবিতা নাকি চলছে না, পাবলিক এখন বেদের মেয়ে জোছনা হেভি খাচ্ছে।কবিতাও খাওয়া যায়!


 আমাদের পাশের বাড়ির ছোট জ্যেঠিমা ছিল মজার মানুষ। সব সময় ঢুলতেন। কোনো সময়েই ভালো ঘুম হত না। একদিন রাতের ঘট্না -জ্যেঠামণি কে রুটি, দুধ দিয়েছেন পাতে,তারপর কলা ছাড়াতে গিয়ে ঢুলতে আরম্ভ করলেন,জ্যেঠামণি বললেন -কী হল দাও। জ্যেঠিমা চটকা ভেঙে বললেন -দিই-

-তারপর ঠপ করে শব্দ।

-জ্যাঠামণি বললেন-একী করলে! পাতে তখন কলার খোসা আর কলা গড়াগড়ি খাচ্ছে উঠোনের ধুলোয়।

আরেকবার। রাত প্রায় বারোটা মত হবে। আমরা যে যার মত শুয়ে পড়েছি।হঠাৎ পাশেই হৈ হৈ শব্দ! কী ব্যাপার? না-জ্যেঠিমা খাট থেকে পড়ে গেছে।ছুটলাম

ঐ রাতে।-জ্যেঠিমা তত্ক্ষ্নে চাদরের আচ্ছাদন ছাড়িয়ে মেঝেতে উঠে বসেছেন।-না,খুব একটা লাগে নি।আমি বললাম -কী হল জ্যেঠিমা ,পড়লেন কি ভাবে?

--আর বলিস না।একটা স্বপ্ন দেখছিলাম -আমি আর তোর জ্যেঠামণি  দার্জিলিংয়ে বেড়াতে গেছি, আনন্দে ঘুরছি।হঠাৎ কে একজন আমাকে ধাক্কা মারল,আর আমি পড়তে থাকলাম খাদে --পড়ছি ত পড়ছি,পড়ছি ত পড়ছি -- তারপর তোর জ্যেঠা মণি আমাকে কোলে লুফে নিল।

-বাব্বা! বা! বা!

জ্যাঠামণি বললেল -অনেক হয়েছে এখন সিনেমা ছেড়ে উঠে পড়ো।

 




বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...