Tuesday, 22 September 2020

গল্পের পাতা ৩

  #শারদীয়া_কিন্নর_দল




#অষ্টম_পাতা


#গল্পমালা_২




#স্মৃতির_পুজো


#তপন_কুমার_গোস্বামী 


জানলার ধারের এই জায়গাটা সরমার বরাবরই খুব পছন্দের। এখানে বসলে সামনেই পুজোর দালানটা বেশ ভালভাবে দেখা যায়। পুজোর কদিন যখন মা মহামায়া সপরিবারে পুজোর দালান আলো করে থাকেন, তখন যখনই ইচ্ছে হয় তখনই এই জানলা দিয়ে সরমা মা মহামায়াকে দর্শন করে। অবশ্য শুধু পুজোর সময়ই নয়, সারাবছর পুজোর দালান পরিষ্কার রাখা এবং মায়ের কাঠামোতে ফুল জল দেওয়া এ বাড়ির রেওয়াজ। আসলে এ বাড়িতে পুজো প্রায় শুরু হয়ে যায় কাঠামো পুজোর দিন থেকেই। তারপর কুমোর এসে পুজোর দালানেই প্রতিমা তৈরি করে। কাঠামোয় নতুন খড় লাগানো থেকে প্রতিমার চোখ আঁকা সবই সরমা লক্ষ্য করে এই জানলার ধারে বসেই। 


পুরোনো অভ্যাস মত আজও অশক্ত শরীরটাকে কোনওরকমে টেনে এনে জানলার ধারের নড়বড়ে চেয়ারটায় ছেড়ে দিয়ে সরমা জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগল। খোলা জানলা দিয়ে একঝলক ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে লাগল। ঘোলাটে চোখ তুলে পুজোর দালানের দিকে তাকাল সরমা। স্মৃতিরা একে একে ভিড় করে এল। মনে হল মা মহামায়া সপরিবারে পুজোর দালান আলো করে দাঁড়িয়ে আছেন। আশপাশ থেকে কিছু শব্দ কানে আসতে মনে হল যেন ঢাক বাজছে। চোখের সামনে ভেসে উঠল অষ্টমি পুজোর ব্যস্ততা। সকাল দশটার মধ্যে অষ্টমি পুজো শেষ করে সন্ধিপুজো। এদিকে অষ্টমি পুজো, ওদিকে সন্ধিপুজোর প্রস্তুতি। অষ্টমিতে কল্যাণীপুজো, ধুনোপোড়া, কুমারীপুজো ; আর সে সব শেষ হতে না হতেই সন্ধিপুজোর আয়োজন। একশো আট পদ্ম, একশো আট প্রদীপ , আলাদা নৈবেদ্য আরও কত কী! 


আনন্দের মাঝে হঠাৎ বিষাদের ছায়া। বহুকাল আগের সেই ঘটনা আজ এই বেলাশেষেও বড় পীড়া দেয়। সরমা তখন সবে বৌ হয়ে এ বাড়িতে এসেছে। এ বাড়ির আদব কায়দায় তখনও ঠিক রপ্ত হয়নি। অষ্টমি পুজোর প্রসাদ বিতরণের সময় একটা নিম্নবর্গের মেয়ের হাতে প্রসাদ দিতেই বাড়ির কর্ত্রী এক বাড়ি লোকের সামনে চেঁচিয়ে উঠলেন ---" নতুন বৌ, তুমি ওই বাগদির মেয়েটাকে ছুঁলে! " সরমা খুব ভয় পেয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা গলায় কোনওরকমে বলল---" না মা, আমি ওকে ছুঁইনি। আলগোছে দিয়েছি। "এ কথা শুনে কর্ত্রী আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন ----" আমি নিজের চোখে দেখলাম, আর তুমি অস্বীকার করছ! তার মানে পুজোর দালানে দাঁড়িয়ে আমি কী মিথ্যে বলছি! " কর্ত্রী যত চেঁচান সরমা তত ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সকলের চোখের সামনে সরমাকে গোবর মুখে দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হল। "

নিজের অজান্তেই কখন যেন দুফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে এসেছে। নাতি সুহাস হঠাৎ ঘরে ঢুকেই বলল----" ঠাম্মি! তুমি আবার একা একা উঠে এসেছ! " তারপর সরমার কাছে এসে বলল---" এ কী ঠাম্মি, তোমার চোখে জল!" সরমা গালের জল মুছতে মুছতে বলল---" না দাদুভাই, এ চোখের জল নয়। এ আমার অন্তরের জ্বালা। "




#অজানা_সম্পর্ক


#সোমা_গুপ্ত


" পারবি না বাবু আমায় মা বলে ডাকতে একবার। তাহলে শান্তিতে মরতে পারব।" মনামীর আর্তনাদ ভরা অনুরোধ শুনে কোন উত্তর না দিয়ে একদৃষ্টে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল শিবম। শিবম গুপ্ত। বাবা বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক ডঃ অনিকেত গুপ্ত। 


মনামীকে প্রথম দিন দেখার পরেই শিবম একদৌড়ে ডঃ গুপ্তর চেম্বারের আয়নায় নিজের মনে বলতে থাকে কেন সামনে এলে এত বছর পর? কেন আমার ছবির মত জীবনে ঝড় নিয়ে এলে? হঠাৎ সেই ভরসা দেওয়া হাতটা আঁকড়ে ধরে শিবমের কাঁধ বলে ওঠেন," বাবু মাতৃমুখী ছেলে সন্তানরা সুখী হয় রে।" শিবম ডঃগুপ্ত কে জড়িয়ে আস্তে বলে উঠল,"হ্যাঁ বাবা আমি সত্যিই সুখী তোমার কাছে। তুমিই আমার বাবা, তুমিই আমার মা।"


মনে পরে মনামীর কত কথা। অনিকেত তখনো হয়ে ওঠেন নী বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক ডঃ অনিকেত। তখন থেকেই দুজনের মনের মিলন হয়। সত্যিকারের ভালবাসায় মনের ভালবাসা অনেক সময় যুগল দের অনেক দূরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। জন্ম হয় শিবমের। ফুটফুটে বাচ্ছাটির একটা হাত ছিলনা। পারেনি মনামীসেদিন শিবমকে কোলে নিতে। হেরে গিয়েছিল মাতৃত্ব। অনিকেত শিবমকে কোলে নিয়ে বলেছিল," বাবু আর একটা বছর পর আমি ডাক্তার হব। তোর হাত চিরদিন আমি ধরব।"

হারিয়ে গিয়েছিল মনামীঅনেক দূর। কদিন আগে হার্ট এটাকে ডান হাত প্যারালাইজড হওয়ায় বৃদ্ধাশ্রম তাকে এখানে ভর্তি করে দেয়।

শিবম আস্তে করে বলে ওঠে," ডঃ গুপ্ত আমার মা। আপনি আমার আন্টি। কিছু সম্পর্ক না হয় অজানাই থাক।"




#ফিরে_দেখা


#সুনেত্রা_সাধু


সোনালি রোদ্দুর ছুঁয়ে ফেলেছে ঠাকুর দালানের সিঁড়ি। ধুনো আর কর্পূরের গন্ধ এখনো বাড়িময় পাক খাচ্ছে, তার সাথে মিশছে মিষ্টি একটা গন্ধ। ভিতর বাড়ির উঠোনে ভিয়েন বসেছে, এক কড়াই রসে পান্তুয়া ফুটছে টগবগ করে। ঠাকুর দালানের চওড়া থামে হেলান দিয়ে বসে উসখুস করছে ছোট্ট বিন্নি, এখানটায় বসলে সদর দরজাটা পরিস্কার দেখা যায়, দু চোখ ভরা অপেক্ষা নিয়ে সে তাকিয়ে আছে সেইদিকে। ষষ্ঠীর সকাল হয়ে গেল তাও বড়পিসির দেখা নেই। 


“মা বড়পিসি কখন আসবে?”


প্রশ্ন শুনে মুখ তুলে তাকায় বিন্নির মা, 

বলে, “এই তো এসে পড়বে, বেরিয়েছে ভোরবেলা।”


“ ধুর ভাল্লাগেনা”,বিন্নি দরজা থেকে চোখ সরিয়ে ভিতরে তাকায়। চালবাটা, তুলোর দলা আর মায়ের আঙুলের যাদুতে পদ্ম লতায় ভরে উঠছে ঠাকুর দালান। 


সে একমনে মাকে দেখতে থাকে। মায়ের খোলা চুল কাঁধের পাশ দিয়ে নেমে এসেছে, মাথায় ঘোমটা, কপালে সিঁদুরের টিপ।বিন্নি একবার দুগগা ঠাকুরের দিকে তাকায় আর একবার মায়ের দিকে, অবিকল এক দেখতে যেন। 


সে উঠে গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। 


ঠাকুর দালান লাগোয়া একটি ঘরে তখন পা ছড়িয়ে বসে পুজোর কাজের তদারকি করছেন বিন্নির ঠাকমা। কাঠের সিন্দুক খুলে বার করা হয়েছে বড় বড় পেতলের থালা, গামলা, প্রদীপ, চামর, কাঠের বারকোষ। পুজোর দিন পনেরো আগেই এসে পড়ে মদন কাকা, সাথে দুজন সহকারী।


 পুজোর যোগাড় তারাই করে, ঠাকুমা থাকে কড়া পাহারায়। মা জোগাড়ে হাত লাগায়, পুরোহিত মশাইকে এগিয়ে দেয় এটা সেটা। বড়মা থাকে রান্না নিয়ে, যদিও ঠাকুর চাকর থাকে তবুও ভাঁড়ারের দায়িত্ব কি কম!


 মেজমা ঘর সামলায়, কে গেল কে এল তারা কি খাবে কোথায় থাকবে এসব। ছোট পিসিমণি হস্টেল থেকে ফিরে সেই যে নিজের ঘরে ঢোকে বেরোনোর নামটি নেই, নাকে চশমা এঁটে বই পড়ে শুয়ে থাকে। বড় পিসি এসে বকাবকি করলে সাজগোজ করবে। বড়দা মেজদা সব্বাই ব্যস্ত, বিন্নি কার সাথে খেলবে? তিন্নি দিদি আর রাজা দাদা এলে বেশ জমে। 


বড়পিসি এখনো এলো না ঠিকই কিন্তু সদর দিয়ে পিঠে ঢাক নিয়ে সিদ্ধেশ্বর আর বিশ্বেশ্বর কাকা ঢুকল আর পিছন পিছন এল হৃদে। সে কাঁসর বাজায়। হৃদেকে দেখে হরিণ পায়ে নাচতে নাচতে দালান থেকে নেমে এল বিন্নি, যাক একটা খেলার সাথী অন্তত এল। বিন্নিকে দেখে কালো-কুলো রোগা চেহারার ছেলেটা এক মুখ হেসে উঠল। 


হিজলতলীর মাঠে সেই সকাল থেকে মাটি খুঁড়ে কাঠের নাগরদোলা বসছিল, তা নিশ্চয় এতক্ষণে তৈরি, চল হৃদে ক'পাক খেয়ে আসি। এই বলে পালানোর চেষ্টায় ছিল বিন্নি কিন্তু কেউ না খেয়ে এ বাড়ি থেকে বেরোতে পারে না, ঠিক মেজমার নজরে পড়ে যায়। “মেয়েটা বড্ড বারমুখো হয়েছে ছেলেটা এল দুটো খেতে দিবি তো! সিদ্ধেশ্বর বিশ্বেশ্বর তোমরাও এসো।” 


মেজোমা যখন বলে দিয়েছে তখন সেকথার নড়চড় করা যায় না। সিদ্ধেশ্বর কাকা এতক্ষণ বসে বসে বিন্নির বাবাকে বন্যার কথা শোনাচ্ছিল। নদীর ধারে ঘর তাদের। ফি বছর বন্যায় ঘর ডোবে, এক এক বছর তারা ভাবে এ পুজো বুঝি জলে জলেই কাটবে, তেমনটা হয় না। জল নামে সোনা সোনা রোদ উঠলে ঘর বাড়ি শুকোয়, নতুন করে খড়ের চাল ছাওয়া হয় নিকোনো ঘরে আলপনা পড়ে। আর তারাও নিশ্চিন্তে ঢাক কাঁধে রওনা দিতে পারে।


 এ গল্প বিন্নি জানে, হৃদে শোনায়, কেমন করে জল থই থই ঘরে একটা চৌকির উপর গুটিসুটি মেরে থাকে তারা,শুনে বিন্নির সাধ হয় মাটির বাড়িতে হৃদের পাশে ওই চৌকিতে বসতে, এতো কাছ থেকে সে কখনো জল দেখেনি। 


হিজলতলীর মাঠে জমিয়ে মেলা বসেছে, নাগর দোলা, ঘূর্ণি, খেলনা, জিলিপি আরো কত কি! বিন্নির হাতের মুঠোয় কটা টাকা বড় জেঠু দিয়েছে। তাই দিয়ে দু'জনে নাগর দোলায় চড়ে। উপর নীচে পাক খেতে খেতে বিন্নি খিল খিল করে হাসে, হৃদে তাকিয়ে থাকে, বিন্নি ঠিক যেন মেম পুতুল, মানুষ এত সুন্দর হয়! “


তোর জন্য মা এবার হলুদ রঙের জামা কিনেছে আর জিনসের ফুলপ্যান্ট।” বিন্নি বলে হৃদেকে।


“আমিও তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি।” হৃদে তার ছোট্ট মুঠি খুলে বিন্নিকে দেখায়। 


একটা সবুজ রঙের নুড়ি, তাতে সাদা রঙের আঁকিবুঁকি । বন্যার জল নেমে গেলে উঠোনের এককোনে পাথরটা পেয়েছে সে ,এনেছে বিন্নির জন্য। 


যা কিছু সুন্দর তা রাজকন্যাকেই দেওয়া যায়। পাথরটা পেয়ে বেজায় খুশি বিন্নি। ছোট্ট মুঠোয় পাথর আগলে দুজনে বাড়ি ফিরে দেখে বড় পিসি এসে গিয়েছে, বড় পিসি মানেই সুটকেস ভর্তি বিদেশি গিফট আর হা হা করে বাড়ি মাতিয়ে রাখা। তিন্নি দিদি, রাজা দাদা ছিল তার অপেক্ষায়। এরপর চারদিন শুধু খেলা আর খেলা। তবে সন্ধ্যা আরতির পর হৃদেরা চলে যায় বার-বাড়িতে ওখানেই থাকে এই কদিন।


 সন্ধ্যায় পুজো শেষ হলে ভিতর মহলে বসে পারিবারিক মজলিস। হাসি ঠাট্টা গান গল্পে কিভাবে যেন হুশ করে কেটে যায় কটা দিন। ঠাকুর জলে পড়লে বাড়িটা আস্তে আস্তে ফাঁকা হতে থাকে তখন হিজলতলীর মাঠ আর বাড়িটাকে একই রকম লাগে। কদিন মনখারাপ হয় ঠিকই তারপর আবার সব আগের মতো৷ পুজো আসে পুজো যায় কিন্তু মুশকিল হল চিরকাল ছোট থাকা যায় না। 


ইউনিভার্সিটি অব পেন্সিল্‌ভেনিয়াতে গবেষণারত বিন্নি বছর দুয়েক পুজোয় বাড়ি যেতে পারেনি। বড়দাদার ছেলেটা তাকে ভিডিও কলে পুজো দেখায়। মেজদাদার বউ আজকাল আলপনা দেয়, মায়ের মাটিতে বসা নিষেধ। ঠাকমার জায়গাটা নিয়েছে মা। 


বড়মা ভাঁড়ারের চাবি বড় বৌদিকে দিয়েছে। মেজমার গলা আর আগের মতো নেই। পুজোটা তেমনই আছে শুধু বদলে গিয়েছে মানুষ গুলো। সিদ্ধেশ্বর কাকা আর বিশ্বেশ্বর কাকা এখনো আসে ঢাক কাঁধে, হৃদে আসেনা। গাঁয়ে সে একটা মুদির দোকান দিয়েছে, পুজো এলে বেচাকেনা বাড়ে ।


 আজকাল অন্য একটা বাচ্চা ছেলে আসে কাঁসর হাতে, অনেকটা হৃদেরই মতো৷ ফিলাডেলফিয়া শহরে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন এর একটাই মাত্র পুজো হয় একটা রবিবার দেখে। বিন্নি যায় সেখানে, অঞ্জলি দেয়। সেদিন সবুজ নুড়ি দিয়ে বাঁধানো লকেটটা পর‍তে ভোলেনা সে। দূর্গা পুজো হবে আর তার কাছে হৃদে থাকবে না তা কি হয়!




No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...