Saturday, 10 October 2020

আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ ৬

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#তৃতীয়_পর্ব


#আমন্ত্রিত_লেখাগুচ্ছ


প্রথম ভাগ


#সাক্ষাৎকার


#নাটকের_জীবন_জীবনের_নাটক


 


#সৌম্যদেব_বসু


কিন্নর দল সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য – আপনি আপনার স্মৃতি থেকে বাংলা নাট্যজগতের কথা বলুন সৌম্যদা, সেই সব কথা যা আমরা কেউ জানিনা। সেটা ব্যক্তিগত হতে পারে বা গ্রুপ থিয়েটার নিয়ে হতে পারে। ক্রমশ বিস্মৃতিতে চলে যাচ্ছে সেসময়ের নাট্যজগত। তাই আপনার কাছে এসেছি।


সৌম্যদেব বসু – তুমি যা বলছ সেটা একটা ব্রড ব্যাপার। এই নিয়ে বলতে গেলে তো ভীষণ একটা বিশাল ব্যাপার হয়। মোটা বই হয়ে যায়। তার চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে বলতে শুরু করলে সেটা ছুঁয়ে যেটুকু আসে আর কি।


কিন্নর দল – হ্যাঁ, ওইটুকুই।


সৌম্যদা – যদিও আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারটা তত গুরুত্বপূর্ণ হবে কি? তবু বলছ যখন চেষ্টা করে দেখি। আসলে অনলাইন তো আমি দেখিনা। এটা ঠিক বুঝতে পারছি বলে মনে হচ্ছেনা।


কিন্নর দল – না না। আপনার স্মৃতি থেকেই বলুন। নিশ্চয় লেখাটা আপনাকে দেখাবো।


সৌম্যদা – না না। সে ঠিক আছে। এখন আমি তো সোজাসুজি নাটকে আসিনি। মূলত  কবিতার লোক। আবৃত্তি। পার্থদা গৌরীদির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মানে পার্থ ঘোষ গৌরী ঘোষ আর কি। মনে আছে ‘রাজা সাজা’তে প্রথম অভিনয় করি। তখন প্রবীর মুখোপাধ্যায় বলে একজন গ্রুপ করতেন। পরবর্তী কালে রবীন্দ্রসদন ও শিশির মঞ্চের তিনি এডমিনিস্ট্রেটর হয়েছিলেন। তাঁর একটা নাটকের দল ছিল। সেই দলে আমি নাটক করতাম। ক্রেমব্রাউন মঞ্চ আর আর একটা কি বলো? ওদিকে ঐ শেয়ালদার দিকে আর একটি মঞ্চ…


কিন্নর দল – ওদিকে তখন কি ছিল কিছুই তো জানিনা।


সৌম্যদা – হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। নেতাজী সুভাষ ইন্সটিটিউট। কাইজার স্ট্রিটের ওদিকে। সেইখানে তখন রিহার্সাল করতে যাই। তখন নাটক হচ্ছিল ‘গিরিশচন্দ্র’। সেখানে মুখ্য ভূমিকাটা ছিল অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির। রোলটা আমি করতাম। গান গেয়ে গেয়ে অভিনয় করতাম,  জানো। তো তখন খবর পেলুম নেতাজী সুভাষ ইন্সটিটিউটে অল বেঙ্গল আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হচ্ছে। আমি তখন আবৃত্তি প্রতিযোগিতা প্রচুর করি। গিয়ে নাম দিয়ে এলাম। পরের দিন আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হলো। দেখলাম আকাশবাণীর সব বড় বড় লোকেরা প্রতিযোগিতার বিচারক। প্রচুর প্রতিযোগী। পরের দিন গেলাম খোঁজ নিতে -দাদা, আমি কাল এসেছিলাম। আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিলাম। -ও হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। বলুন বলুন। কী যেন আপনার নামটা? তো আমি নাম বললুম। সে তো আমার দিকে প্রায় চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। ভয় পেয়ে গেলাম। কী হল রে বাবা। ভদ্রলোক বললেন, আপনি ফার্স্ট হয়েছেন। কিন্তু সেটা কথা নয়। কথা হল, পার্থ ঘোষ বলেছে আপনাকে একটু দেখা করতে। আমি তো হতভম্ব, বললাম, -ধ্যাত, কি বলছেন (হেসে)! ভদ্রলোক বললেন -আমি আপনাকে মিথ্যে কথা বলব কেন? আপনি চলে যান আপনার সময় মতন। এখন কী ব্যাপার জানো? আমি মফস্বলের ছেলে। আকাশবাণী দেখিনি। বাইরে থেকে দেখেছি। ভেতরে তো ঢুকিনি। তখন চাকরি করি। সেই কলকাতায় এসে পঙ্কজ ঘোষ নামে এক ভদ্রলোকের নাটকের দলে ভিড়ি। সেই দিয়ে শুরু। তারপর গেলাম আকাশবাণীতে। গিয়ে খোঁজ করতে জানলাম উনি এখন স্টুডিওতে। অপেক্ষা করতে লাগলাম। তখন পার্থদা ভীষণ স্মোক করতেন। স্মোক করার জন্য উনি বাইরে এসে আমাকে দেখতে পেলেন। চারমিনার খেতেন খুব। আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন -আরে সৌম্য! তুমি এসে গেছ? আমি তো চমকে গেছি। উনি আমার নাম মনে রেখেছেন? বুঝতেই পারছ, পার্থ ঘোষ আমার নাম মনে রেখেছেন! আমি গলে যাই আর কি! সত্তরের দশকের প্রথম দিক তখন। কাজ সেরে এসে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, রেজাল্ট কি হল? বললাম। উত্তরে বললেন, হ্যাঁ সে তো হবারই কথা। আমি তখন ‘বাঁশি’ খুব আবৃত্তি করতাম। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথা থেকে ‘বাঁশি’ শিখলে? এখন আমি তো কারুর কাছে আবৃত্তি শিখিনি। সেলফ টট যাকে বলে। শুনে বললেন, গৌরীও তাই বলছিল। আসলে আমরা তো অনেক জায়গায় আবৃত্তি করতে যাই। রবীন্দ্রসদন অমুক টমুক। যদি আমাদের সঙ্গে করতে বলি, রাজি আছো কি? আসবে? আমি আর একবার মরে গেলাম। কী বলছেন! আমি ওনাদের সঙ্গে আবৃত্তির সুযোগ পাবো? এখন বলো, এই লোকটার কি দরকার ছিল সৌম্যদেব বসুকে তুলে আনার? আসলে এরা এমনই ছিলেন।


এঁর সূত্রেই আমি মেঘনাদবধ কাব্য যে করতে পেরেছিলাম। একটা আবৃত্তির আসর হলো খুব বড় করে যেখানে অজিতেশ রাবণ করতেন। তো সেখানে পার্থদা নিয়ে গেলো।


কিন্নর দলঃ আমরা কিন্তু এগুলো খুব মিস করি। আচ্ছা, এই অনুষ্ঠানগুলো একটা কি রেকর্ড করা যেত না? বলুন তো?


সৌম্যদাঃ সত্যিই তাই। খুব বড় জিনিস হারিয়েছি। আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু এটার কোনো রেকর্ড নেই সত্যি। কাজী সব্যসাচী সূত্রধর করেছিলেন। দু একবার অজিতেশ রাবণ করেছিলেন। সে এক বিশাল ব্যপার। সেই সময়তেই, আমি থিয়েটারের লোক, আগে আগে গিয়ে বসতুম, গিয়ে দেখতাম চুপ করে বসে আছেন। একা অজিতেশ। এত সময়ানুবর্তিতা! গিয়ে পাশে বসতুম। বললেন, ও, তুমি নাটক করো। একথা সেকথা হতে হতে বললেন, নাটক করার জন্য চাকরিটা ছাড়তে পারবে? একেবারে ডায়রেক্ট। আমি বললুম, না। বললেন, তাহলে হবেনা। সোজা একদম। নাটক করতে গেলে হোল টাইমার হতে হবে। আমি তখন কী বলব? সবে একটা চাকরি পেয়েছি। কাঠ বেকার ছিলুম। বাবা রিটায়ার করে গেছেন। কলসীর জল শেষ। টিউশানি করি প্রচুর। ঐ করে একটা সরকারি ক্লার্কের সমান রোজগার করি। বাবা বহুকাল রিটায়ার করেছেন। একেবারে সাধারণ একটা রাজ্য সরকারের চাকরি ছিল বাবার। কী মাইনে বলো না! পাঁচ টাকা কাটাত পিএফে।


কিন্নরদলঃ অথচ দেখুন সেই সময় এমন বাবা মায়েদের আমরা কত শ্রদ্ধা করেছি ভালো বেসেছি…


সৌম্যদাঃ শুধু তাই নয়, এখন আমার মনে হয় যে আমি তাঁদের কত কষ্ট দিয়েছি। আমি আমার বউ আমার ছেলে, তিনজনে মিলে বেরিয়ে যেতাম নাটক করতে। যতটা সম্ভব রান্নাবান্না গুছিয়ে রেখে যেত আমার বউ। আমরা তখন তৃপ্তি মিত্রর কাছে আছি। নাটক শেষে এক একদিন এমন রাত হয়ে যেত যে কারোর না কারোর বাড়ি রয়ে গেছি। বাবা মা তো একা! এখন মনে হয় আমি যদি আবার জন্মাই আর উনি যদি আবার বলেন, আবার নাটক করবি? আমি বলব, দিদি, না। ও যা করেছি আর হবেনা। আমি বাবা মায়ের এক ছেলে। তাঁদের সাপোর্ট না থাকলে এতটা হয়ে উঠত না।


কিন্নরদলঃ বাবা মায়ের সাপোর্ট আর বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটা না থাকলে হয়না, এও ঠিক।


সৌম্যদাঃ সেই অর্থে কিন্তু আমার বাবা মা যে নাটকের লোক ছিলেন তা নয়। তবে আমাকে কখনও বাধা দেননি সেটা ঠিক। বরং উৎসাহ দিয়েছেন। আমার এলাকা থেকে বেরিয়ে এসে এভাবে কলকাতাকেন্দ্রিক নাটকে ঢুকে পড়া আর কারোর সেভাবে হয়েছে বলে জানিনা। তৃপ্তি মিত্রর ওখান থেকে তারপর রাজা সাজা। সেখান থেকে একজন বহুরূপী ভেঙে দল করেছিলেন, নামটা স্মরণে আসছেনা, সেখানে গেলাম…


কিন্নরদলঃ আচ্ছা, এই যে দল ভেঙে ভেঙে যাওয়া, এটা কেন? এতে তো সার্বিকভাবে ক্ষতিই হয়েছে নাটকের?


সৌম্যদাঃ পারসোনালিটি ক্ল্যাশ! মুখ্য জায়গাটা তো তাই। তারপরে আরও অনেক ব্যাপার থাকে। মুখ্য হলো, লাইম লাইটে কে থাকবে। ধরো আমরা যে তৃপ্তি মিত্রর গ্রুপে যে রক্তকরবী করতাম, সেখানে সতীনাথ করত রাজা, আমার বউ অঙ্গনা করত নন্দিনী, আমি করতাম বিশু। তুমি জানো তো? অঙ্গনা তামিল। সে কিন্তু বেসিক্যালি নাটকের মেয়ে নয়। নাচের। আমার পাল্লায় পড়ে সে এলো নাটকে। যা হয় আর কি (হাসি)। এই সময় আমার অফিসে বিসর্জন হচ্ছে, অভিনেত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। অপর্ণা কে হবে? তখন রানিকে (আমার বউ) নিয়ে গেলাম। সবে বিয়ে করেছি। তখন বাড়িতে বেশ একটা গোলমাল শুরু হল। হ্যাঁ? নতুন বউ কিনা অফিসের ক্লাবে নাটক করবে? এটা একটু হয়েছিল। বোঝাতে হল, অন্য কোথাও তো নয়। নিজেদের ক্লাবে।


কিন্নরদলঃ সে সময় একটা ইনহিবিশান ছিল। ভাড়াটে অভিনেত্রী। স্টার থিয়েটারে রবিবারের সকালে অফিস রিক্রিয়েশান ক্লাবের নাটক, বৈকুণ্ঠের উইল, অভিনয় করছেন মলিনা দেবী। আমরা দেখেছি। তখন ওরকম হলে ঢুকে পড়া যেত। বাচ্চার দল বসে পড়তাম নাটক দেখতে। সরযু দেবীকেও দেখেছি।


সৌম্যদাঃ হ্যাঁ। মলিনা দেবীর দুই নাতি তো আমাদের সঙ্গে নাটক করত তৃপ্তি মিত্রর গ্রুপে। আমরা ওনার বাড়িতে গিয়ে থেকেছি। নাটকের শেষে রাত হয়ে গেলে থেকে যাওয়া হতো। এখন মনে হয় বাড়ির লোকগুলোকে অত্যাচারও করেছি।


কিন্নরদলঃ না। তা কেন? সেসময় আমরা এভাবেই অভ্যস্ত ছিলাম। এখন একে অত্যাচার মনে করা হয়।


সৌম্যদাঃ এখন তো থিয়েটারের জায়গাগুলোও তো বদলে গেছে। এরকম পাল্টে পাল্টে যাবেই।


কিন্নরদলঃ থিয়েটারও আর মধ্যবিত্তর নেই, এটা মনে হয় সব দেখে।


সৌম্যদাঃ না নেই। একদম নেই। আর মধ্যবিত্ত তো নিজেই পাল্টে গেছে। সে তো এখন উচ্চ মধ্যবিত্ত। গণ্ডগোল এখানেই। মানুষের পকেটে এখন প্রচুর ডিসপোজেবল মানি। খুব মুশকিল। অপব্যায় করার প্রচুর সুযোগ। তারা এখন ভোগে চলে গেছে। আগে যত আন্দোলন অমুক তসুক, সব তো মধ্যবিত্ত থেকেই। এখন যখন তার পকেটে পয়সা এসে গেছে সে আর ঐ আন্দোলনে যায়না। সে এখন স্কচের বোতল খুলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে বসে পড়ে। নাটকের জায়গাতেও তো এই ছবি, কোনো সন্দেহ নেই! এখন তো থিয়েটারের কত লোকজন দেখি গাড়ি করে গ্রুপে আসছে। এটাকে খারাপ বলছিনা। দেখো এরা স্টেজ করছে, পাশাপাশি সিরিয়ালও করছে। এটার ভালো দিকও আছে। আবার খারাপ দিকও অনেক। স্টার তৈরি হচ্ছে। দেবশঙ্কর আছে, একটা ঝুল নাটক দেখতে চলে গেলো। হাউজফুল! অত্যন্ত ভালো নাটক করেন সীমা মুখোপাধ্যায়। অসম্ভব ভালো। কেউ তাঁর নাটক দেখতে যায়না। কারণ বক্স নেই। ভাবতে পারো? কাকে দেখতে যাচ্ছে? কৌশিক সেন। স্টার।


কিন্নরদলঃ আপনি শেষ নাটকটা কবে করলেন সেটা বলুন সৌম্যদা।


সৌম্যদাঃ সম্ভবত রক্তকরবী, ধরো পঁচাশি ছিয়াশি সাল। তার একটু আগেই আমি আকাশবাণীতে নাটকে পাশ করেছি। জগন্নাথদা ঊর্মিদি এদের সঙ্গে বাইরে বাইরে শ্রুতি নাটকের অনুষ্ঠান করছি। এরপরে তৃপ্তি মিত্রর কাছে এলে ব্যাপারটা এরকম হল, যে অন্য আর কিছু করতে পারবেনা। যেটা বলতে ভুল করছি, থিয়েটার সেন্টারের সঙ্গে আমরা খুব ভালোভাবে যুক্ত হয়েছিলাম। যে নাটকের কথা কেউ বলেনা আজকাল, সেটা হল অভিজ্ঞান শকুন্তলম। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের মাঠে। সেখানে পুরো কণ্ব মুনির আশ্রম তৈরি করা হয়েছিল। মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন তরুণ রায় দীপান্বিতা রায়। দেবরাজ এবং অনুরাধা। অনসূয়া ও প্রিয়ম্বদার একটিতে আমার গিন্নী করত। এটা কিন্তু একটা দারুণ ব্যাপার হয়েছিল। কিন্তু এটাকে একদম গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।


কিন্নরদলঃ কেন?


সৌম্যদাঃ কারণ তরুণ রায়কেই গুরুত্ব দেওয়া হতো না।


কিন্নরদলঃ কী অন্যায়!


সৌম্যদাঃ হ্যাঁ, অন্যায় তো বটেই! কারণ রাজনৈতিক। উনি ছিলেন বেসিক্যালি কংগ্রেস। যেমন তপন সিংহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী তপন সিংহকে দাদাসাহেব ফালকে দেওয়াতে তবে গুরুত্ব পেলেন। শুধু তো সত্যজিত ঋত্বিক আর মৃণাল! আজকে একাঙ্ক নাটক যে প্রতিযোগিতা হয়, কেউ জানেনা এর শুরু তরুণ রায়ের হাতে, নিজের বাড়িতে একটি ছোট্ট মঞ্চ করে। একশোটি সিট ছিল। প্রথম সেখানেই সারা ভারত একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতা হয়। শম্ভু মিত্র তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্রেরা বিচারক হিসেবে থাকতেন। কেউ জানেনা।


কিন্নরদলঃ লজ্জার কথা। আমাদের সমস্ত ঐতিহ্য আমরা গুলে খেয়ে ফেলেছি।


সৌম্যদাঃ সব নাটকের মধ্যে আমি অভিজ্ঞান শকুন্তলম নিয়েই কথা বলছি। কারণ ওর গুরুত্ব আছে। দেবরাজ এই নাটকে তিনটে ভাষারীতি ব্যবহার করেছে। সংস্কৃত প্রাকৃতগন্ধী বাংলা ও একেবারে কলকিয়াল বাংলা, তিনটেই ব্যবহার করেছে। প্রচুর নাচ ছিল। গানের ডিরেকশান দিয়েছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। ফোক ডান্স ছিল। আমি নেচে নেচে গান গেয়ে পার্ট করেছি। এই ডান্সের ডিরেকশান দিয়েছিলেন শম্ভু ভট্টাচার্য। আবার ক্লাসিকাল যে নাচ, অনসূয়া প্রিয়ম্বদার নৃত্য পরিকল্পনা করেছিলেন মুরলীধর মাঝি ও এইচ মুনরো। মুরলীধর মাঝি তো ওড়িশি আর মুনরো ছিলেন কুচিপুরিতে বিখ্যাত। তিনজন বিখ্যাত ডান্সার নাচের পরিকল্পনা করেছিলেন। এবং বাঁকুড়া থেকে এসেছিল ছউ নাচের শিল্পীরা। যখন মাছের পেট কেটে আংটিটা বের করা হচ্ছে তখন নাচ গান করে পার্ট করেছি। একটা কথাও কেউ বলেনা। আমি বিভাস চক্রবর্তীকে বলেছিলাম, তার কারণ তো একটাই বিভাসদা? উনি কংগ্রেস করতেন। বিভাসদা বললেন, হ্যাঁ, ইউ আর রাইট। চৌত্রিশ বছরের শাসন তো! খাতায় নাম লেখানো নেই! তাই! এদের স্থান নেই।


 এই নাটকের একটি মাত্র শো করা গিয়েছিল ঐ সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের মাঠে। এবং আমরা এইটাতেই আমন্ত্রিত হলাম সারা ভারতবর্ষের উজ্জয়িনীতে সংস্কৃত নাট্য সমারোহ হয়, সেখানে আমরা অভিনয় করলাম। বম্বেতেও শো করি। তখন অমল পালেকর এসেছিলেন খবর নিতে যে, কলকাতা থেকে একটি দল অভিজ্ঞান শকুন্তলম করছে। দেবরাজ সহ আমাদের সঙ্গেও কথা হল। তরুণ রায়ও ছিলেন। এই যে এখন দেবশঙ্কর হালদারের মতো অভিনেতারা কোনো নির্দিষ্ট দলে আটকে নেই, এই ব্যাপারটা কতকাল আগে মেসোমশাই মানে তরুণ রায়, করেছিলেন। দিবারাত্র ওখানে পড়ে থাকতুম তো! ঐ যে মঞ্চ, থিয়েটার সেন্টার, আজ তার চিহ্নমাত্র নেই। একটা ছোট্ট ফলকে কেবল লেখা আছে এখানে থিয়েটার সেন্টার ছিল। এখন সেখানে আবাসন। সে বাড়ি ভাঙা পড়ে গেছে।


দেবরাজ অনেক অন্যরকমের নাটক করেছে। বিষবৃক্ষ করত। তাতে রানি একটা লিড রোল করত। মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে দিবারাত্রির কাব্যের রিহার্সাল শুরু হয়েছিল। কিন্তু ওটা অভিনয় হল না। বাস্তবিক থিয়েটার সেন্টারের সূত্রে আমরা সারা ভারত ঘুরেছি। পুজোর সময় দিল্লি বম্বে উড়িষ্যা উজ্জয়িনী সব জায়গায় যেতাম। সে যে কী আনন্দ! ট্রেনে করে বাঙালি দল হইহই করতে করতে চলেছি। সে এক অন্য আনন্দ।


তুমি লিখো এটা। তৃপ্তি মিত্র, আফটার শম্ভু মিত্র, রক্তকরবী করেছিলেন। সেটা নিয়েও কিন্তু তথাকথিত মধ্যবিত্ত সমাজ গুরুত্ব দেয়নি। লিখো কিন্তু।


কিন্নরদলঃ আমাদের একটা পুরুষতান্ত্রিকতা আছে না? শম্ভু মিত্রর ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে উনি একক দল করছেন, এর প্রশংসা? মানতে পারে না মানুষ।


সৌম্যদাঃ একটা বই আছে জানো। নাট্য আন্দোলনের তিরিশ বছর। একটা রূপরেখা আছে। কারা করেছে কোথায় তিরিশ বছর যাবত, গ্রুপগুলোর নাম, আশ্চর্য আশ্চর্য রকমের সব গল্প, লেখালিখি আছে। পড়ে বেশ চমকে যেতে হয়। 


এখানে খানিকটা অংশ আছে। যেখানে আমাদের তরুণ  রায়কে নিয়ে থিয়েটার সেন্টার, সেখানে ওরা বলছে যে, আজ একাঙ্ক নাটকের যে জোয়ার এসেছে দিকে দিকে একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, নবতরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে,  তাকে যদি আমরা স্বীকার করি তবে তার মূল খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই,  ১৯৫৫ সালে তরুণ রায়ের থিয়েটার সেন্টারে তার কাজ শুরু।  এবং অমৃতবাজার বলছে ভারতবর্ষে এই ধরনের প্রচেষ্টা এই প্রথম। একটা বাড়িতে এইভাবে হল করে থিয়েটার সেন্টার বলে একটা প্রতিষ্ঠান চালু কতখানি পাশে থাকলে সম্ভব!


 স্টেটসম্যান লিখছে, A well equipped and excellently designed miniature stage and auditorium for the first time to uphold opportunities to the various dramatic groups with meager resources to produce experimental plays regularly.


এঁদের মধ্যে রয়েছেন তারাশঙ্কর, অহীন্দ্র চৌধুরী, শম্ভু মিত্র। উৎকর্ষ বিচারের ভার যাদের ওপর ছিল আর কি। এছাড়া প্রফুল্ল রায় মোহন সাগর, প্রেমেন্দ্র মিত্র কে এম ওলাধা, বি এন  সিংহ প্রমুখ। মানে  থিয়েটার সেন্টার শুধু যে প্রতিযোগিতা করে ক্ষান্ত ছিলেন তা নয়,  ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষাতেও নাট্য উৎসব করেছিলেন চার বছর ধরে।


 এই উৎসবে অংশ নিয়েছিল বহুরূপী, লিটল থিয়েটার, মুখোশ,  অনামিকা,হিন্দি সাঁঝঘর, এমেচার থিয়েটার গ্রুপ, পাঞ্জাবী অন্ধ্র অ্যাসোসিয়েশন, গুজরাট সাহিত্য মন্দির ইত্যাদি।


  এর পর একটা চিঠি দিয়েছেন বইতে, আনন্দবাজার পত্রিকায় পরাজিত নায়ক দেখার পর সন্তোষ কুমার ঘোষ একটা চিঠি লিখেছেন।


লেখক লিখছেন:


 সন্তোষ কুমার ঘোষ একটা খোলা চিঠি লিখেছেন, সেটা আমি এখানে ছেপে দিলুম। লেখকের নাম সুনীল দত্ত। সন্তোষ কুমার ঘোষ লিখছেন, 


“রাজনীতি নিয়ে খোলা চিঠি লিখেছিলাম মনে পড়ছে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী কে।  কিন্তু এবারের চিঠিটা তরুণ বাবু আপনাকে।  অব্যবহিতহেতু আপনি পরাজিত নায়ককে নিয়ে  জয়যাত্রায়  বেরিয়েছেন। থিয়েটার সেন্টার নামের ছোট কেন্দ্রবিন্দুতে ছাড়িয়ে আপনি করেছেন বৃহত্তর পরিধিতে। আগামী শুক্রবার ফাইন আর্ট একাডেমির প্রেক্ষাগৃহে, পরে শুনেছি দেশের নানা দিক থেকে বেরিয়ে যাবার বাসনাও আপনার আছে। সাহসের তারিফ করি আপনার সেই সঙ্গে বলিহারিও বলি। সাহসের কথাটা  উঠছে এইজন্যে তরুণবাবু, আপনার পেছনে তো কোন দলগত প্রচার নেই? পৃষ্ঠের  পোষণ যাকে বলে? এতোদিন ধরে এতো নাটক করলেন, কিন্তু কি সোচ্চারে কি কানাকানিতে কাউকে  তো কোনো উচ্চবাচ্য করতে শুনিনি ? হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন যাকে বলে, আপনার বেলায় তো এতোটুকু নেই?  তার কারণ যতদূর জানি আপনি কখনো কোন আখড়ায় নাম লেখাননি। নিজের সাধ্য বিশ্বাস আর আদর্শে স্থিত আছেন। বাংলা মঞ্চের জন্য অনেকে অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু নিজের বসতবাড়িতে প্রতিকূল অবস্থায় একটা থিয়েটার বসিয়েছেন, বহালও রেখেছেন, কে! কজন! এই নিষ্ঠা এই আদর্শ পুড়েও যা পোড়েনি, অথচ তথাকথিত প্রাগতিক হাওয়া পালে লাগালে এর চেয়ে ঢের বেশি আপনার হিল্লে হয়ে যেত। অনেকের হয়েছে। এই দেখুননা, আপনার নাটক তো কম দেখলাম না! কম সে কম দশ বারোটা। কই উপযাচক হয়ে কখনো কিছু লিখেছি? না। আপনার বেলায় যে সংকোচ বোধ করেছি অন্যের বেলায় কিন্তু সেটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু এবারের না লিখে পারছিনা তরুণ বাবু। আপনার পরাজিত নায়ক আমার সমস্ত দ্বিধা প্রতিরোধ কে পরাস্ত করেছে।”  


কিন্নরদলঃ নাটকের বিষয়টা কি?


সৌম্যদাঃ নাটকের বিষয়টা হলো এক প্রবঞ্চকের গল্প। মনে করো পরাজিত এ নাটকের নায়িকাও “জীবনে যে মেয়েটি বারবার কোন প্রতারিত হলো পরাজিত মানুষের হাতে, শেষ ঘটনায় দেখছি আর একবার পরাজিত সে। মাত্র দু'তিনদিনের সাহচর্য্যে সাচ্চা মানুষ বলে যাকে গ্রহণ করতে যাচ্ছিল,  ভালোও বেসে ফেলেছিল কিনা বলা যায়না। দু'ঘণ্টার ঘাত-প্রতিঘাতে অভিনয় দেখা গেল সে মানুষটাও খড় মাটির।  

তার সব রঙ ধুয়ে গলে কাদা হয়ে গেছে। এই ট্রাজেডি প্রধানত ওই মেয়েটিরই যাকে দীপান্বিতা অতি সাবলীল অভিনয়ে অত্যন্ত বিশ্বাসী মর্মগ্রাহী রূপ দিয়েছেন। আপনার অভিনীত চরিত্রটিতে তবু বাচনে আতিশয্য আছে, শেষক্ষণের গদগদ প্রলাপের সংলাপের তো তুলনাই নেই, কিন্তু স্বভাবী ও স্বচ্ছন্দ অভিনয় কতদূর যেতে পারে এই নাটকে দীপান্বিতা ও তার কলাকৌশল তার উদাহরণ।” 

 আরও লিখছেন, “যদি বরদাস্ত করেন তবে বলি বিষয়বস্তু বাহ্যত রাজনৈতিক, আসল কথা মানুষের, যে মানুষ সংগ্রামী, আরোহণকামী, সাপলুডোর খেলা যার ওঠানামার প্রতীক। আর প্রয়োগ প্রকরণ?  এককথায় এমন পরিচ্ছন্ন নিপুণ ঠাসা নাটক বাংলায় অনেকদিন দেখিনি। 

সারাক্ষণ মঞ্চে আপনারা দুজন। মনে করুন যেখানে আপনি জনতাকে পেছনে রেখে বক্তৃতা করে যাচ্ছেন। কী দ্যোতনা! কোন তুলনা হয়না সেই অভিনয়ের!” 


এরপর উনি আরো অনেক কিছুই লিখেছেন। শেষে লিখছেন, “আপনার রুচি ও সাহসের  আমি প্রশংসা করি।” 


অথচ তরুণ রায় লোকটা কিন্তু যে তিনজনের নাম করা হয় বাংলা নাট্যমঞ্চের প্রাণপুরুষ বলে, অন্তত আধুনিক কালের, তাদের পাশাপাশি থাকার মতনই।  দেখো কত লোকের নাম করা হয়, বিভাস চক্রবর্তী ইত্যাদি ইত্যাদি, অথচ তাঁর নামটি সুচতুরভাবে বাদ রাখা হয়েছে। পরবর্তীকালে অরুণদা মানে চেতনা নাট্যগোষ্ঠী, এদের অনেকেরই তো নাম করা হয়েছে। অথচ তরুণ রায় সেভাবে পিকচারেই আসেন না।

 

কিন্নরদলঃ লজ্জার কথা।

 

সৌম্যদাঃ মুখোশ নাট্য সংস্থা কিন্তু প্রচুর নাটক করেছে। ওঁদের গ্রুপটির নাম আর কি।  ওনার নাম কি ছিল জানো তো? ধনঞ্জয় বৈরাগী মানে সাহিত্যিক ধনঞ্জয় বৈরাগী। বহু উপন্যাস গল্প ইত্যাদি লিখেছেন নাট্যরূপ দিয়েছেন। 


কিন্নরদলঃ মানে পেননেম ছিল ধনঞ্জয় বৈরাগী? বিখ্যাত মানুষ তো!


সৌম্যদাঃ হ্যাঁ প্রচুর উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ লিখেছেন। 

ইতিমধ্যে থিয়েটার সেন্টার একবার আগুনে পুড়ে যায়। তাকে আবার সারিয়ে ঠিকঠাক করে ফেলেন। তারপরে আর হলো না। বয়স হয়ে গিয়ে ছিল শেষের দিকটায়। ওই অভিজ্ঞান  শকুন্তলমই ওনার শেষ প্রযোজনা। প্রধানত দেবরাজ রায়, ওনার ছেলে, ওটাকে ধরে রেখেছিল। 


এই নাটকে একটা মজার ঘটনা আছে। দেবরাজ দুস্মন্তের  ভূমিকায়।  একটা সিন ছিল যেখানে সে শকুন্তলার বিরহে কৃশ হয়ে গিয়েছে। সে মঞ্চে এসে বলছে যে, হ্যাঁ আমি কৃশ হয়ে গিয়েছি। নাটকটা হয়ে যাবার খানিক পরে মেসোমশাই মানে তরুণ রায় বলছেন, এই শোনো অনুরাধা, ওকে কাল থেকে এই এইটুকু করে ভাত দেবে। সবাই মিলে তখন খেতে বসেছি খাবার টেবিলে, মেসোমশাই, মানে তরুণ রায়, গল্প করতে করতে বলছেন। আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। আসলে ঘটনা হলো দেবরাজ মঞ্চে যখন ডায়লগটা বলছিল তখন দর্শকের আসনে অনেকেই হেসে উঠে ছিলেন। মেসোমশাই সেটা লক্ষ্য করেছেন। 

বলছেন তাই, হলের লোকজন হেসেছিল। তোমরা খেয়াল করেছিলে?


কিন্নর দল: রক্তকরবীর অভিজ্ঞতা বলুন কিছু দাদা। 


সৌম্যদা: (হেসে) মজার কথা শোনো। একবার মহাজাতি সদনে আমাদের শো হচ্ছে। দিদি, মানে তৃপ্তি মিত্রর রক্তকরবী। 

একদিন আগে এখানে ম্যাজিক শো হচ্ছিল। পি লাল খুব নামকরা, তাঁর শো চলছিল। কোনও কারণে তিনি অনেক জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে একটি সিংহ এনেছিলেন এবং কোনওভাবে সেটি ভেতরে কোথাও রয়ে গিয়েছিল। এবার তার তো গায়ের গন্ধ চারিদিকে ছড়াচ্ছে। কিছু করার নেই।  দিদি বললেন একটা বড় দেখে রুম স্প্রে কিনে নিয়ে আয়। গোটাকয়েক রুম ফ্রেশনার কিনে এনে চারিদিকে বেশ করে ছড়িয়ে টড়িয়ে দিয়ে নাটক শুরু হলো। নাটকে আমি বিশু করি আর রানী নন্দিনী।  নাটকের গান আছে, তরী ছিল চেনার কূলে, (সুর সহযোগে), এই গানটি।  বাঁধন যে তার গেল খুলে। গানটা বুঝতে পারছো তো? ও চাঁদ, চোখের জলের লাগল জোয়ার। তাপস সেন আলো করেছিলেন। আমি তো খুব মন দিয়ে হাত মেলে গান গাইছি, হঠাৎ সিংহটা ডেকে উঠলো, হুম হুম। (অট্টহাসি)  


কিন্নরদলঃ বহু অভিজ্ঞতা আপনার। জীবন ভরে গিয়েছে। 


সৌম্যদাঃ সত্যিই। নাটক করতে গিয়ে যে কত রকম অভিজ্ঞতা মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমার খুব অ্যাজমা ছিল জানো তো। বেশ ভালো মতন। এখন অবশ্য ভালো হয়ে গিয়েছে। যে সময় দিদির ওখানে নাটক করি তখন ভুগতাম বেশ টান উঠত। একদিন একাডেমিতে  শো।  হাউস ফুল হয়ে গিয়েছে।  বেশ ভালোরকম টিকিট বিক্রি হয়েছিল আমাদের। এইবারে মেকাপ টেক আপ নিয়ে আমার হঠাৎ প্রচন্ড টান উঠলো।  দৌড়ে ছেলেরা গেল। হাজরা থেকে সব ডাক্তার কমপাউনডার নিয়ে এলো।  তিনি আমাকে ডেরিফাইলিন ও ডেকাড্রন,  দুটো ইনজেকশন দিলেন। খানিকক্ষণ মরার মত পড়ে থেকে তারপর  স্টেজে উঠলাম।  দিদি বললেন, ও সৌম্য, আজ তোর গানটা অন্য সব দিনের চেয়ে ভালো হয়েছে।  


 কিন্নরদলঃ ভালো টিচারের লক্ষণ।  অদ্ভুত উৎসাহ দিয়ে বেস্টটাকে বার করে আনা। 


  সৌম্যদাঃ ভালো লাগছে। তুমি নাটক বোঝো তো। মানে তোমার নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ডটা তো আছে। সেজন্য এত ভালো লাগছে। আমার বলতেও ভালো লাগছে।  

নাট্য আন্দোলনের তিরিশ বছর বইটা পেয়ে দেখলাম এগুলো নোট করা আছে। আমাদের  প্রথম সেই নাটক 'রাজা সাজা' তার উল্লেখ আছে। ১৯৬২ তে শুরু।  আমি অবশ্য অনেক পড়ে গেছি আশি টাসি নাগাদ। এটা সেই প্রবীর মুখোপাধ্যায় করতেন। তোমায় বলেছি পরবর্তীকালে প্রবীরদা শিশির মঞ্চের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হয়েছিলেন।  আটষট্টি সালে সেকেন্ড টাইম দীপান্বিতা করছে রাজা সাজা।


 ১৯৬৬ সালে শুরু হয় মুক্তাঙ্গনে।  আমি গেছি অনেক পরে।  ক্রেম ব্রাউন মঞ্চের কাছাকাছি একটা ছেলের বাড়িতে রিহার্সাল হত। সে ছেলেগুলো নকশাল ছিল।  রিহার্সাল খাটের তলা থেকে সড়কি টর্কি অমুক তসুক বার করে  চারটি ছেলে বেরিয়ে গেল।  জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার? উত্তর দিলো,  ওই কোনও খবর পেয়েছো হয়ত।  নবারুণ বদে এইসব দু'চারটে নাম মনে আছে।  কিছুক্ষণ পরে সব হাতটাত ধুয়ে চলে এলো। যেন কিছুই হয়নি। আসলে অপারেশন সেরে এলো। এসে বললো চলো চলো রিহার্সাল দিই। 


কিন্নরদলঃ মেরে ফেলতো না? এটাই বড্ড খারাপ লাগে। ঠান্ডা মাথায় কিভাবে এদেরকে খুনি বানিয়ে দিয়েছিল।


সৌম্যদাঃ হ্যাঁ সেটাই। অসীম চট্টোপাধ্যায়। লিখছেন দেশে। পড়ে দেখো। তুমি ওই থিয়েটার সেন্টার আর তৃপ্তি মিত্রর আরব্ধ নাট্য বিদ্যালয়ের কথাটা লিখো, জানো। কেউ এঁদের কথা বলে না তো। আমিও বাহাত্তর পেরিয়ে যাচ্ছি। আর গেলেই হয়। এখন অন্তত বলে যাই। যে কটা মানুষ জানতে পারেন সেটাই লাভ।


🌹🌹


Wednesday, 7 October 2020

আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ ৫

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#তৃতীয়_পর্ব


#আমন্ত্রিত_লেখাগুচ্ছ

বিষয়: কবিতা কেন

(সাক্ষাৎকারধর্মী লেখাটি লিখেছেন কবি উৎপল ত্রিবেদী। কিন্নর দল কয়েকটি প্রশ্ন রেখেছে। তার উত্তরে এই সাক্ষাৎকার বা নিবন্ধ।)


আজ প্রথম ভাগ


#উৎপল_ত্রিবেদী 



#কবিতা_কেন 


১: সাহিত্যের শুরু কবিতা থেকে। কেন মানুষ কবিতাকেই প্রথম আপন করেছে?


উঃ:-      কেবল ভারতবর্ষেই নয়,সম্ভবত গোটা বিশ্বেই প্রথম সাহিত্য বলতে কবিতাকেই বোঝায়।ভাষা মাত্রেরই একটি নিজস্ব গতিময়তা আছে।কিন্তু কবিতায় অতিরিক্ত একটি পরিশীলিত আবেগ আছে,উচ্চারণের মুহূর্তেই এক নতুন উন্মোচন আছে এবং ছন্দোময়তার কারনে একটি ওঠানামা আছে যা সব মিলিয়ে একটি নিগূঢ় রহস্যময়তার জন্ম দেয়।একধরনের "বাউন্স" তৈরি হয় কবিতার প্রাথমিক পাঠক্রিয়াতেই।যে কারনে যে গদ্য বা গদ্যভঙ্গীতে এগুলো একটু বেশি পাই সেই সব গদ্যকে আমরা কাব্যিক গদ্য বা গদ্য কবিতা অভিধায় অভিহিত করে থাকি।


বলে রাখা যাক যে এটা নিতান্তই আমার নিজস্ব মনে হওয়া।এর সাথে কোন তথ্য বা তত্ত্বের মিল বা অমিল খুঁজতে যাবার দরকার নেই।লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে সাধারন ভাবে আমাদের কোন একটি মুহূর্তের অনুভবকে প্রকাশ করতে আমরা কবিতার শরন নিয়ে থাকি।কারন বোধহয় এই যে এখনো অনেক বিতন্ডার পরেও কবিতা আমাদের কাছে তুলনামূলক সহজে ধরা দেয়।


জানি ঠিক এই বিন্দুতে এসে অনেকেই রে-রে করে উঠবেন।অনেকেই বলবেন --মানে কি?কবিতাকি এতই সহজে বোঝা যায়?খুব সহজবোধ্য হলে আমরা তো নাক কুঁচকে তাকে পদ্য বলে ঠেলে সরাই।তবে?


এই তবের কোন সহজ চওড়া রাজপথ সদৃশ জবাব নেই।এটা অনেকটাই "যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী"গোছের ব্যাপার। কেউ তাঁর উদ্দিষ্টে পৌঁছান আলপথ বেয়ে,কেউ গলিপথ তো কেউ আবার রাজপথ ধরে চলেন।ফারাকটা থাকেই।একটা বিষয়কে কেমনভাবে দেখব তার অনেকটাই নির্ভর করে পাঠকের মানসিকতার উপরে।বোঝা- নাবোঝার আগে অন্য একটি মানসিক ক্রিয়া বেশ তৎপর হয়।


সেটি--পাঠের আকাঙ্খা বা ইচ্ছা।এই প্রাথমিক শর্তটি যদি পালিত না হয় তাহলে কবিতায় কেন কোন সৃষ্টিকর্মেই মাথা গলানো যায়না।সবটাই তখন মাথার উপর দিয়ে চলে যায় মনে হয়।অথচ তেমনটা হবার কথা নয়।কোন পূর্ব নির্ধারিত ভাবনাকে পাশে সরিয়ে রেখে পড়তে না পারলে রসাস্বাদন সম্ভব নয়।


২: ছন্দ কবিতার সেকাল একাল। আপনার পর্যবেক্ষণ কি?


       একটা কথা ইদানীং প্রায় সর্বজনীন।এটাকে অভিযোগও বলতে পারি। অনেকেই বলেন-- "আজকালকার কবিতায় ছন্দ নেই"।আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা কবিতা না পড়ার অজুহাত মাত্র। ছন্দছাড়া যা হয় তা ছন্নছাড়া।আর কবিতার নিজস্ব কিছু অন্তর্লীন বাঁধন আছে যাকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায়না।অনেকে বিশ্বজুড়ে অনেক বার অনেক রকম নিরীক্ষা করে ব্যর্থই হয়েছেন।তার কিছু গেছে ডাস্টবিনে, আর কিছু আছে(সম্ভবত) আর্কাইভে।


আসলে ছন্দ বিষয়ে আমাদের নিজেদের মনে অনেক ধন্দ আছে।ছন্দকে একটু সহজ করে ভাবা যাক।ছন্দ কি?চলিত বাংলার ছিরি ছাঁদ বলতে আমরা আসলে শ্রী এবং ছন্দকে বোঝাই।হাঁটার সময় আপনি বাঁ-পায়ের পর ডানপা বাড়াবেন।এটাই স্বত:সিদ্ধ।


এর ব্যতিক্রম হলে সেটা হাস্যকর মনে হবে।কবিতার ছন্দও মূলত তাই।চলার ধরন বা রকম।এক একটি কবিতায় চলন একেক রকম হয় তার বলার তাগিদের রকমফেরে।যেমন চলায় আছে মন্দগমন, দ্রুতগমন,দৌড় ইত্যাদি।সবটাই পরিস্থিতির রকমফেরে বদলে যায় ।তাই সাধারন অক্ষরবৃত্ত থেকে মন্দাক্রান্তার বা অনুষ্টুপ ছন্দের ভিতরে কবিরা ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হন। 


তবে এই প্রসঙ্গে একটি কথা মাথা পেতে মেনে নেব যে অনেক কবি আছেন যাঁদের ছন্দজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।কোন শব্দের পরে কোন শব্দটি ব্যবহার করলে সেটি একটি গতিময়তাকে ইঙ্গিত করবে বা গভীরতার দিকে নিয়ে যাবে সেটা কিন্তু কবিকে বুঝতেই হবে।এটা অনেকেই পারেন না।বোধকরি তাই জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন-

"সকলেই কবি নয়,কেউ কেউ কবি"।তেমনি সেই সূত্র ধরে বলি-- সকলেই কিন্তু পাঠক নন,কেউ কেউ পাঠক।


কবি তাঁর মেধা-মনন-হৃদয়বৃত্তি এক করে যে নির্মানটি পাঠকের সামনে রাখেন সেটিকে যথোচিত মর্যাদায় কাটা ছেঁড়া করে দেখার জন্যে পাঠককেও কিছু প্রস্তুতি রাখতে হয়। পাঠক কি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই প্রস্তুতি রাখেন?মনে হয় না।সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু,অন্তত বহিরঙ্গে,বদলে গিয়েছে।সেই বদলের সাথে তাল মিলিয়ে কবিতার হাত ধরতে হলে পাঠকের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি অনিবার্য।


৩: প্রতিটি যুগের বাঁকে কবিতার বাহ্যিক ও আঙ্গিকের পরিবর্তন হয়েছে। আপনার মতে তার তাৎপর্য কি?


বাংলা কবিতার কথা ধরা যাক। বলা হয় চর্যাপদ থেকে বাংলা কবিতার চলা শুরু হয়েছিল।তারপর হাজার খানেক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে।আমার ছেলেবেলার সাথেই বহিরঙ্গে এখনকার পৃথিবীর কোন মিল পাই না খুঁজে,তো চর্যাপদের যুগের সাথে কোথায় খুঁজব?কিন্তু একবার একটু চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে যদি উঁকি মেরে দেখা যায় তাহলে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে যে অন্তর্গত স্তরে কবিতা তেমন করে বদলায় নি।আজো কবিতাকে আবিস্কার করতে হয় যেমন করতে হত সেই চর্যাপদের যুগে।সেই প্রবহমানতা আমরা দেখেছি বৈষ্ণব পদকর্তাদের রচনায়,দেখেছি এবং স্তম্ভিত হয়েছি লালন ফকির,হাসন রাজাদের বাঁধা গানের কলিতে।


কিন্তু বহিরঙ্গের গঠনে কবিতা আগের কবিতার চেয়ে কয়েক যোজন দূরে অবস্থান করে।সমাজ পরিবর্তনের সাথে সৃষ্টি এবং স্রষ্টা উভয়েই বদলে যেতে বাধ্য হন।কারন সামাজিক বাধ্যবাধকতার রশিতে আমরা সকলেই কোন না কোন ভাবে বাঁধা পড়ে আছি।এটাকে বাধ্যবাধকতার চেয়ে বেশি করে সামাজিক দায়বদ্ধতাই বলতে চাইব।


আধুনিক কবিতার ভাষা এবং কবিতার/কবির দায়বদ্ধতা নিয়ে দু'-একটা কথা বলা দরকার। সময়ের চলার সাথে ভাষার চলন এবং ব্যবহার বদলাবে এটা তো সর্ববাদীসম্মত সত্য।কারন সময়ের প্রাথমিক শর্তই হল প্রতিটি প্রগ্রেসনের সাথে তাল মিলিয়ে কার্য এবং কারনকে সঙ্গে নিয়ে বদলে যাওয়া।এটা কোন চেষ্টাকৃত বিষয় নয়,শব্দ ব্যবহারের অনায়াস কৌশল বদল।লেখার ভাষাকে প্রকাশ্যের ভাষার সঙ্গী করে তোলার স্বাভাবিক প্রয়াস।অবশ্য বদলে যাবার পর আজ যত সহজে কথাটা বলা গেল ,যাঁরা প্রথম এই পথ দেখিয়েছিলেন তাঁদের কাছে কাজটা ঠিক এতটা সহজ ছিলনা।নিন্দে-মন্দ কিছু কম হয়নি তাঁদের।তবু তাঁরা আমাদের পথবদলের দিশারী।তাঁদের প্রণাম।


৪: কবিতার দায়বদ্ধতা ও পাঠকের দায়বদ্ধতা এ নিয়ে আপনার বিশ্বাস বিশদে যদি বলেন...


এরপরের কথাটি অবশ্যই আধুনিকতা বিষয়ে।প্রসঙ্গ যখন দায়বদ্ধতা এবং আধুনিক কবিতা,তখন আধুনিক শব্দটি জরুরী।দায়বদ্ধতা খায় না মাথায় দেয় সেটা জানা জরুরী।তবে আবারো বলে রাখি এই গদ্যে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দই নেহাতই আমার ব্যক্তিগত মনে হওয়া।পঞ্চাশ বছর ধারাবাহিক কবিতা লিখে আসার পর অন্তত নিজের মনে হওয়াটুকু খোলা মনে লেখার একটা অধিকার জন্মায় বটে।এটা হয়ত উত্তরদায়বদ্ধতা।আমার তো তাই মনে হয়।


আমি কবিতার/কবির দায়বদ্ধতার আগে আধুনিক এই শব্দটাকে একটু নেড়ে দেখতে চাইব।কারন আমরা প্রায়শই আধুনিকতা এবং সাম্প্রতিকতা শব্দ দুটিকে এক অর্থে ব্যবহার করে আধুনিক--এই শব্দটিকে লঘু করে ফেলি।আধুনিকতা কোন ফ্যাশন বা স্টাইল স্টেটমেন্ট নয়।সময়,কাল,যাপিত এবং যাপনযোগ্য যাবতীয় সংক্রমণের অতীত এবং তীব্র রকমে ঘাতসহ একটি অরূপ অস্তিত্বের নাম আধুনিকতা। প্রাথমিক ভাবেই এটি একটি বোধ যার উদ্ভাস প্রকাশিত শব্দে নয়,অনুভূত বোধে।মহাকালের নির্মম মারকে অতিক্রম করে যে সৃষ্টি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়,আমার বিবেচনায় তাই-ই আধুনিক।বাকিসব একেকটি নির্ধারিত সময় পিঞ্জর।


একটা প্রশ্ন নিজের ভেতরেই উঠতে চাইছে--তবে কি যা কিছু আধুনিক কেবল তাদেরই অধিকার সৃষ্টির জয়যাত্রায় অংশ নেবার?অন্যেরা সকলে ব্রাত্য?


ঠিক তেমন মনে হয়না।দায়বদ্ধতা এবং আধুনিকতা সর্বদা হাতধরাধরি করে চলতে পারেনা।আধুনিকতা সময়কে অতিক্রম করে সময়ান্তরে অনায়াস সঞ্চরমান।


দায়বদ্ধতা,পক্ষান্তরে,বাস করে সময় পিঞ্জরে।সে তার গায়ে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস-ভূগোলের খবরটুকুই রাখে।আর এই সসীম কালখন্ডের যোগফল থেকে সিঞ্চন করে যা উঠে আসে তাকে আধুনিকতার তকমা দিতে চাইব।দায়বদ্ধতা বিষয়টির সাথে খন্ডকালের সম্পর্ক অনেক বেশি।দেশকালের বিচারে আজ যা বর্তমান বলে সত্যের দাবি নিয়ে ধ্বজা তোলে তার তাৎক্ষণিক ফার-অসার নিয়ে প্রকাশিত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সমাহার হল দায়বদ্ধতা।সে নিত্যবর্তমান।তার সাথে আধুনিকতার সম্পর্ক এই যে আধুনিকতা যে প্রবহমানতার চিহ্ন আঁকে সে পথের প্রতিটি বাঁকে আলো ফেলে সময়ের পদছাপগুলিক প্রকট করে দায়বদ্ধতা।সময়কে জয় করার অঙ্কের শুরুটা ঐখান থেকে।


একটা কথা স্পষ্ট করে মাথায় রাখা দরকার --দায়বদ্ধতার কোন নির্ধারিত ধরন নেই।সে নিজেই একটি ধরন যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন হয়ে যায় ব্যক্তির মানসিক বিন্যাসে, বিশ্বাসে এবং নৈমিত্তিক যাপনে।


এই বিন্যাস,বিশ্বাস এবং যাপন থেকেই তৈরি হয় পাঠকের পাঠরুচি ,অভিপ্রায় এবং পাঠক্রিয়া।দীনেশ চন্দ্র সেনের সেই অমর উক্তিটি মনে রাখুন--"কেহ সপ্তকান্ড রামায়ন পড়িয়া অনায়াসে প্রশ্ন করিতে পারেন--ইহাতে কিসের উপপত্তি হইল?"


এই হল সেই বিশ্বাস,বিন্যাস এবং যাপন।তবু আমার নিজস্ব বিশ্বাস যতদূর সম্ভব সব পড়া উচিত।আমরা সবাই জানি মুদ্রার আলোকিত অংটি" সত্য কিন্তু শেষ সত্য নয়"।তার অন্ধকারের অস্তিত্বই  আলোকিত অংশের মহিমা বাড়ায়।তারপর একজন প্রস্তুত পাঠক নিজেই নিজের গতিপথ স্থির করতে পারেন।


পাঠকের শুধু তো নয়,দায়বদ্ধতা প্রধানত কবির উপর বর্তায়। তিনি লেখেন।তাঁর কিছু মনে হওয়াকে শব্দরূপ দেন কবি।আমরা পড়ি।কারো ভাল লাগে,কারো লাগে না।সে তো ব্যক্তিগত রুচির বিষয়।সেখানে কোন কথা চলে না।তবু একটা কথা এখানেও থাকে।পাঠকের উচিত নয় কোন লেখকের লেখা সম্বন্ধে পূর্বনির্ধারিত মানসিক গঠন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়তে শুরু করা।যদিও এমন পাঠকের সংখ্যা খুব কম নয়।তবে লেখার সময়ে নিশ্চই কোন কবি এই বাতুল পাঠকদের কথা মাথায় রেখে লিখবেন না।তিনি তাঁর বিশ্বাসকে সঙ্গী করে শব্দ সাজাবেন এবং সেই শব্দ সমাহার শেষপর্যন্ত কবি এবং পাঠক উভয়কেই একটি সত্যের কাছে পৌঁছে দেবে বা সেই অভিমুখের দিকে এগিয়ে দেবে।তাই শেষ অবধি কবিতা লেখা-পড়া-অনুধাবন একটি যৌথ ক্রিয়া,যেখানে সকলের অংশভাগ,দায়ভাগ প্রায় সমান।


তাই শুধু কবিতা নয়,সংস্কৃতির যে কোন বিভাগেই স্রষ্টার সাথে তাঁর পাঠক,রসিক বোদ্ধা শ্রোতা বা দর্শক সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।



২য় ভাগ


৫: আজকের জীবনে কবিতা, কবির দায়বদ্ধতা, এসব কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? 


আরেকটি কথা প্রসঙ্গত উত্থাপন করি এইখানে।আশা করি তা অসঙ্গত হবে না।অনেকেই এই কথা জিজ্ঞাসা করে থাকেন যে দায়বদ্ধতার ধরনটি কেমন হবে কবির।


আমার মনে হয় কোন নির্দিষ্ট ধরন বা রকম বা প্রকার দিয়ে দায়বদ্ধতাকে গন্ডীবদ্ধ করতে চাওয়াটা সঠিক কাজ নয়। আমি বা আমরা যে সমাজে আছি,যে কালখন্ডে জীবন যাপিত হচ্ছে সেখানকার সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিন্যাস এবং বিভাজন আসলে সচেতন মানুষের দায়বদ্ধতার অভিমুখ স্থির করে দেয়।এটা ঐতিহাসিক সত্য।আমরা কবি হই বা পাঠক,সবার আগে সমাজবদ্ধ জীব যার কিছু অধিকার, কর্তব্য আছে,যে শেষ পর্যন্ত একদলা আকাঙ্খাকে বুকের মধ্যে লালন করে সযত্নে।


আমরা সবাই সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে কিছু হয়ে উঠতে চাই।মানুষ হিসাবে পরিপূর্ণতার প্রতি তার চিরন্তন দৌড় আসলে তার প্রাথমিক অধিকার।এইখানে এসে ম্যাকলীশ লী'র কথা--A poem should not only mean but be" শব্দবন্ধটি ভীষণ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ব্যক্তিজীবনেও ওই poem শব্দটিকে জীবনের সাথে বদলে নিলে দায়বদ্ধতার মূল গুরুত্ব সহজেই নিরূপনযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। মানুষ একা বাঁচে না,কবিতাও সঙ্ঘবদ্ধতায় শ্বাস নেয় বুক ভরে।এই সঙ্ঘবদ্ধতা থেকে জন্মনেয় সংগঠনের,সেখান থেকে দেশ এবং জাতির চৈতন্য নির্মিত হতে থাকে। চেসোয়াভ মিউশ তখন কবিতাকে প্রশ্ন করেন--কাকে বলে কবিতা যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা জাতিকে?


দায়বদ্ধতার প্রশ্ন এইবিন্দুতে তার বর্শাটি গিঁথে দাঁড়ায়।কারন এখান থেকে তার নতুন যাত্রারম্ভ।নতুন কবিরা আসেন এইসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে।কবিতা তখন ন্যায়ের লড়াই লড়তে অগ্রগামী সেনার ভূমিকায় নামে।


৬: আপনার মনে হয় এই বিরোধ, এই কাব্যবিমুখতা, মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তবে একরকম বিকৃতি? একটু বলুন। 


কবিতাকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা  কিছুতেই বন্ধ হয়না। বাঙালি মধ্যবিত্ত পিতা তাঁর সন্তানকে প্রশ্ন করেন--কোবতে লিখছ?তা কি করবে শুনি ওসব ছাইপাঁশ লিখে?চিড়িয়াখানার বাঘের চাকরি করবে?


পন্ডিতপ্রবর দুই নাকে নস্য গুঁজে ভ্রু কুঞ্চন করে জানতে চান--যখন বিশ্বের তাবৎ প্রশ্নের জবাব বিজ্ঞান এবং দর্শন দিয়ে ফেলছে তখন আবার কবিতার বোঝা বওয়া কেন বাপু?


বিরোধিতা করার জন্য বিরোধ আসলে একধরনের মানসিক বিকৃতি।নইলে এঁরা,যাঁরা ভাবেন যে বিশ্বের সমস্ত সঠিক কেবল তাঁদেরই অধিগত, একটু নড়াচড়া বা নাড়াচাড়া করলে দেখতে পেতেন অ্যালডাস্ক হাক্সলী অনেক আগে লিখে রেখে গিয়েছেন যে কবিতা ব্যতীত আমাদের বিজ্ঞান এবং যাবতীয় প্রগতি ভয়াবহ রকমে দরিদ্র।


 যদি নেহাতই অতদূর যেতে ইচ্ছে না হয়,যদি মনে হয় ই এ রবার্টস বা হাক্সলী সাহেব বড্ড পুরনো তাহলে একবার চোখ রাখা যাক না কেন আমাদের ঘরের মানুষ কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথদের দিকে।স্বাধীনতার লড়াইয়ের সেনাদের বুকে আগুন ভরে দিয়েছিলেন তো কবিতা দিয়েই।বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়,দীনেশ দাশদের মতো কবিরা মানবতা এবং সমানাধিকারের স্বপক্ষে যে দলিল রেখে গিয়েছেন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব খুব মূর্খ ব্যতীত অন্য কেউ অস্বীকার করার স্পর্ধা দেখাতে পারেন?


দু'দুটি বিশ্বযুদ্ধের ঝাপটে বিধ্বস্ত ইওরোপকে কি নতুন করে পোপা,হোলুব,মিউশরা সঞ্জীবনী দান করেন নি?


৭: দুরুহ কবিতা বড় মুশকিলে ফেলে দেয়। সে নিয়ে কিছু বলুন। শেষ প্রশ্নে আসি। কবিতা কেন? 


খুব প্রাথমিকভাবে কবিতা বাঁচতে শেখায়।পুনরুজ্জীবনের মন্ত্রের উদ্গাতা কবিতাই সব যুগে।জীবনের প্রতিটি অনুভূতিকে একমাত্র কবিতাই তার উচ্চারণে বাঁধতে পারে।এইখানেই দায়বদ্ধতা সম্পর্কিত যাবতীয় তর্কের অবসান হয়।অবসান হয় কবিতার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে যাবতীয় তর্কেরও।

কথা ফুরায় কই?যতবার ভাবি এই তো,আর কি ই বা বলতে বাকি রইল?আমরা সামান্য কবিতা পাঠক এর বেশি আর কিছু বলতে পারিনা।কিন্তু তখনই মনে হয় "আরো কিছু বাকি আছে।বাকি আছে শেষ বজ্রপাত"।


কবিতার দুরূহতা নিয়ে একটি দুটি কথা নিবেদন করার ইচ্ছা জাগছে।অনেকেই অভিযোগ করেন কবিতা অত্যন্ত দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে।কিছুই বোধগম্য হয়না।


অভিযোগটি আজকের নয়।কবিতার সৃষ্টির আদিকাল থেকে এই অভিযোগ কবিতার গায়ে এঁটুলির মত সেঁটে আছে।আমার দৃঢ় বিশ্বাস চর্যাপদ বিশ্লেষণ করতে বললে অনেক বিদগ্ধ মানুষ হিমশিম খাবেন।ঐ ব্যাসকূট ছাড়ানো সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। বিষ্ণু দের কবিতা অনেকেই বোঝেন না বলে তিনি তুলনামূলকভাবে কম পঠিত থেকে গিয়েছেন। এখানে বলা দরকার যে দুর্বোধ্যতার দুটি প্রান্ত আছে এবং দুই প্রান্তে আছেন যথাক্রমে কবি ও পাঠক। কবি এবং পাঠকেরও দুটি করে প্রান্ত আছে।কবিদের দুইপ্রান্তে প্রজ্ঞাবান ঋদ্ধ কবি এবং হাইব্রিড কবি।পাঠকদের দুটিপ্রান্তে ঋদ্ধ প্রাজ্ঞ পাঠক এবং অনিচ্ছুক অপ্রস্তুত পাঠক।একজন প্রজ্ঞাবান ঋদ্ধ কবির কবিতা যখন আমাদের অধিকাংশের মত অর্ধশিক্ষিত পাঠকের হাতে পড়ে তখন তা বোধের অতীত হতে বাধ্য।তাই বিষ্ণু দের শীলভদ্র পঞ্চমুখ বা উর্বশী ও অর্টেমিস পড়ে অনেক 

পাঠকের মনে হয় আখ নয় কাঠ চিবিয়েছেন এতক্ষণ।


আমাদের অজ্ঞানতার দায় তো কবির নয়,পাঠককেও প্রস্তুতি নিতে হয়।নইলে আখের বদলে কাঠই ভবিতব্য।তবে কিছু কবি অবশ্যই আছেন যাঁরা কবিতাকে শব্দের ব্যায়ামের আখড়া করে তুলতে চান। পাঠককে কবিতা থেকে দূরে সরিয়ে দেবার এরচেয়ে সহজ পন্থা আর হয়না। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বর্তমান সময়ের কিছু কবি এই কাজটিই মন দিয়ে করে চলেছেন।আরেকটি বিষয়কে এই কবিরা সযত্নে এড়িয়ে চলতে চান।সেটি কবিতার ছন্দ। যেমন তেমন ভাবে যা কিছু লিখলেই সেটা কবিতা হয়না।কবিতার নিজস্ব কিছু দাবী আছে এই সহজ সত্যটি জোর করে বুঝতে না চাইলে তাঁরা বরং কবিতা থেকে দূরে থাকলেই কবিতার উপকার হয়।

ভিক্ষে দরকার নেই হে মহামান্য কবিবর,আপনার কুকুর সামলান।


🙏

🌹🌹

Monday, 5 October 2020

আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ ৪

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#তৃতীয়_পর্ব


#আমন্ত্রিত_লেখাগুচ্ছ


#বিষয়_অতিমারী



#রাজার_অসুখ


#গার্গী_রায়চৌধুরী


এমন হবে কে ভেবেছিল? এই সুখ, এই প্রাচুর্য্য, এই নিশ্চিন্ত আরামের পাকা ধানে মই দেবে কেউ সেটা কে জানত? মেয়েটা বিদেশে পড়তে গেছে, ওখানেই বিয়ে করে নেবে ওরা, সাদা ছেলে, ভিসা তো আগেই ছিল এবার পাসপোর্টও পাবে। আমরা যাব, নামেই বুড়োবুড়ি , জিভে এখনও লাল টপকায়, বেশ টের পাই, ছমাস থাকবো আরামের দেশে, ওদের সংসার গুছিয়ে দেবো। আমাদের বেশ দুটো ঋতু হবে। পুরোটা ঝাঁ চকচকে হলে ভালো লাগে কারো?


 তাই একটা ছ’মাস কাটিয়ে বাকি ছ’মাস ফিরবো এই ময়লা ময়লা, ঘাম ঘাম দেশে। এতো সব প্ল্যান ভর্তি ঘটি দিব্যি স্টেডি ছিল এতদিন, উল্টায়নি। এই সেদিনও তো, ঠাণ্ডা এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে গরম কফিতে চুমুক। জিম টোন্ড টিশার্টের চোখে চোখ রেখে মুচমুচে কামড় দিতে দিতে ইঙ্গিত হাসি। সেই ঠোঁট ঢেকে দেবে মাস্ক, এতো সাহস জমে ছিল নাগালের মধ্যেই? কে জানত !!!


সর্বশক্তিমান মানুষ, বুদ্ধির জোরে, টেকনোলজির পায়তারা কশে আজ পায়ের তলায় ফেলেছে সমস্ত জীব জগতকে। তাকে কিনা চ্যালেঞ্জ করবে একটা কি এক নাম, গোত্র, আভিজাত্যহীন ভাইরাস। ছ্যাঃ। এতো টি আর পি কোভিড কে দেওয়ার চেয়ে একটা কন্সপিরেসি থিওরির কথা ভাবাও ভালো। মানুষ, হ্যাঁ হ্যাঁ মানুষই কোভিড-কে তৈরি করেছে ল্যাবে, মানুষই এই মহামারীর স্রষ্টা। মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সেতো একমাত্র মানুষই করতে পারে। আর কাউকে সে স্ট্যাটাস দেওয়া যায় না। প্রকৃতিকেও না। মানুষের চেয়ে প্রকৃতি বড় নাকি? সে তো তার রূপ গুণ ঢেলে সাজিয়ে নিয়ে বসে আছে মানুষের দাসত্ব করবে বলে। 


প্রকৃতি হল মানুষের সার্ভিস প্রভাইডার। বাস্তুতন্ত্রের নিয়মকে কাঁচকলা দেখিয়ে জঙ্গল কেটে সাফ করেছি, মানুষ আর জীব জন্তুর মধ্যেকার দুরত্ব কমিয়েছি, জীবজন্তু আর মানুষের মধ্যে ব্যাধির ক্রসওভার ঘটিয়েছি, এমনকি বন কেটে যথেচ্ছ নগরায়ন করে জীবজন্তুদেরও বিপদে ফেলেছি, জঙ্গলের নিয়ম মেনে তারা নিজেদের মধ্যে দুরত্ব বজায় রাখতে পারছে না, ব্যাধির আদানপ্রদান ঘটিয়ে পৃথিবী জুড়ে মহামারী ডেকে এনেছি, বেশ করেছি। সবাই জানে চোরের মা-ই সবচেয়ে বড় দাদা থুরি দিদি হয়ে বড় গলা করে। বন্য প্রাণী মেরে ব্যাবসা চালানোর আগে থোরাই ভাবার সময় ছিল আদুর বাদুর চালতা বাদুরের গোবেচারা ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে এমন সুপার পাওয়ার পেয়ে গিয়ে এই হারে ক্ষমতার অপব্যবহার করা শুরু করবে। এসব ক্ষমতা-টমতা মানুষের একচেটিয়া এরিয়া। 


যদিও কানাঘুসো খবর আছে ছোটো চোখ চিঙ্কিরাই এইসব ছাইপাঁশ খায় আর ওদের থেকেই নাকি যত? আরে না না সাধারণ চিঙ্কিদের অত টাকা কোথায়? বন্য জন্তু মেরে চোরা বাজারের থ্রু তে তারা নাকি ওসব চালান করে সাদা চামড়াদের কাছে। ওরাই তো গরম পকেটের খরিদ্দার।


সে যাই হোক ভালো রকম একটা শিক্ষা হল বলো? এরপর আশা করি প্রকৃতির উপর, জীব জগতের উপর মানুষের এরকম বেপরোয়া মাস্তানিটা একটু কমবে? আশার ছলনায় ভুলে এইসব আবেগরসে চোবানো চিন্তাগুলো কে পাল্টা প্রশ্ন করি, এই যে দাদা সিন্ডিকেটের মাস্তানি কমেছে?


 নাহ। জনগণের উপর রাষ্ট্রের চাপান উতরের মাস্তানি কমেছে? নাহ। ভোট দখলের মাস্তানি? নাহ। এমনকি গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কথা জেনেও ঘরে ঘরে এসি লাগানোর মাস্তানি? কমেছে দাদা? নাহ নাহ। তবে হঠাৎ করে এরকম দুরাশা করে বসলেন কেন ভাই মানুষ প্রকৃতির প্রেমিক সেবক হয়ে উঠে তাকে কোলে বসিয়ে আদর করবে? তবে তো সামনে আরও এরকম বা আরও বেশি ভয়ংকর মহামারী টারি... হ্যাঁ, আসবে, আসতেই পারে। কালকের কথা কে জানে। আপনি ভাই বড্ড ব্যাকডেটেড, কিস্যু খোঁজ খবর রাখেন না।


 আজকের মানুষ শুধু বর্তমান নিয়ে বাঁচে দাদা। তার স্লোগান লিভ লাইফ কিং সাইজ। আর রাজা হতে গেলে কে না জানে আগ্রাশনি অস্ত্র। নইলে জাত থাকে না। তাই ঘুরে ফিরে ওই সংক্রমণের রিস্ক থাকবেই।


এ তো গেলো বড় মানুষের কথা কিন্তু আমাদের মতো পাতি মধ্যবিত্তের কি হবে দাদা? ধুর ছাই হাওয়া দেখে এটাও বোঝেনা এখন আর মধ্য বলে কিছু থাকবে না। হ্যাভস অ্যান্ড হ্যাভ নটস শুধু ক্রিজে। তবে আমরা তো গিয়ে পড়ব হ্যাভ নটস এর দলে নাকি? হ্যাঁ কি। রোগ হলে চিকিৎসা পাবো? ওষুধ? নাহ। দামে পোষাবে না। হাসপাতালে ভর্তি? বেড পাবে না। পেলেও অনেক টাকা লাগবে। পেনশানের টাকা? পাবে না, উঠে যাবে। মাস মাইনে? গরু খাটা খাটিয়ে কেটে কুটে হাতে যা দেবে তাতে ওসব হবে না। তবে কি করবো? নিজ মাল মানে নিজের শরীর নিজের দায়িত্বে রাখবে, খাটানোর জন্য ওই শরীরটুকু ছাড়া অন্য মূলধন তো আর থাকবে না হাতে। তাই কেউ ললিপপ নাড়ালেই ছুটে গিয়ে সেটা মুখে পোরা যাবে না। দিনরাত লোভ হাটাও প্রাণ বাঁচাও স্লোগান জপতে জপতে শরীরে যা সয় তাই খেয়ে পরে থাকতে হবে আর কি।


তবে যে শুনছিলাম ওষুধ বেরিয়ে যাবে আজ কালের মধ্যে? বেরিয়েছে? একটু সময় নিচ্ছে। কারা সময় নিচ্ছে? ওই রাজা উজির রা। ওষুধ কে বানাচ্ছে? গবেষক। তা সে কি বলছে? সে কিছু বলছে না। তবেই বোঝো। কাক বলল কান নিয়ে যাচ্ছি আর তুমি কানে হাত রেখে দেখলেও না সেটি আছে না নেই ছুটলে কাকের পিছন পিছন। আগে ওষুধ বেরনোর নিয়ম কানুন কম্পিউটারে সুইচ টিপে জেনে নাও নিজ দায়িত্বে। দেখবে গবেষণার পাঁচটি স্তর পেরিয়ে তবে আলো দেখে একটি ওষুধ। সময় লাগে কমপক্ষে দু’বছর। এমনকি ফাইনাল স্তরে পৌঁছেও পরীক্ষায় ফেল করে বাতিল প্রমাণিত হয়ে যেতে পারে নতুন ওষুধ। বক্তৃতা করার আর শোনার আগে চোখ কান খুলে জেনে নাও আসল সত্যি।


বড় চিন্তায় পড়লাম। তবে কি এই মহামারী এই দুর্যোগ...? নিত্য সঙ্গী হবে।  নিজেকে সতর্ক রেখে এর মোকাবিলা করার সিস্টেম নিজের মতো করে নিজের মধ্যে ডেভেলপ করতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য ও কোয়ালিফায়েড ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগে থাকা এই সিস্টেমের একটা জরুরি স্টেপ। আর? আর কি যা চেয়েছিলে তাই করেছ অর্জন। কি চেয়েছিলাম? একলাষেরে জীবন কাটাতে, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে নিজের পিঠ বাঁচাতে। আর এখন প্রাণ বাঁচাতে মুখে ঠুলি এঁটে বোবা হয়ে পরস্পরের থেকে আলাদা, বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাও গে যাও। এটাই চেয়েছিলে না তুমি? হে জীব শ্রেষ্ঠ মহা মানব !!!


(ডক্টর গার্গী রায়চৌধুরী অনেক বছর ক্লিনিকাল রিসার্চের সঙ্গে যুক্ত। তিনি সিরিয়াস সাহিত্য চর্চা করেন। এই নিবন্ধটি কিন্নর দলের জন্য লিখিত। অসুখ এভাবে একশো বছরের আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে স্তব্ধ করেনি। আগামী দিনে নিবন্ধটি আজকের কথা মনে পড়াবে। 🙏)

Sunday, 4 October 2020

আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ ৩

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#তৃতীয়_পর্ব


#আমন্ত্রিত_লেখাগুচ্ছ


          ৩


ধারণ না মারণ?


(#বিষয়ঃ_রাজনীতির_ধর্ম_ধর্মের_রাজনীতি) 


#হাসি_সাহা 


শৈশবের অলিন্দ থেকে সব ধর্মের নদী স্রোত প্রত্যক্ষ করতে করতে কবে যেন মন মানবধর্মের সাগরে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। 


২০১৮ প্রাণের টানে বেড়িয়ে পড়েছিলাম ইউরোপ সফরে। আমার ধারণা ছিল ইওরোপে ভিখারী নেই। সে ধারণা যে কতটা ভুল তা বুঝেছিলাম বিভিন্ন দেশে শরনার্থীদের দেখে। এরা বেশীর ভাগই সিরিয়া যুদ্ধে ভাগ্যহতের দল। গীর্জা, নদীর ধার, দ্রষ্টব্য স্থান, অর্থাৎ যেখানে জনসমাগম হয়, সেখানে ছেলেপুলে, পোষ্য,  ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বসে আছে। কেউ বা কিছু প্রতিভা প্রদর্শনে অর্থ রোজগারের পথের সন্ধান করে নিয়েছে।


ধর্মীয় যুদ্ধই এদের আশ্রয়হীন করেছে। সর্বশেষ গন্তব্যস্থল ইটালী। পৌঁছলাম ইটালীর টুস্কানির পিসা নগরে। বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক গ্যালিলিওর জন্মভূমে। পথে হাঁটছি মনে ভিড় করছে হাজারো প্রশ্ন। এই সেই স্থান যেখানে এক বিজ্ঞানী রাজশক্তি ও ধর্মীয় শক্তির বিপক্ষে লড়াই করে গেছেন। তিনি দূরবীক্ষন যন্ত্রের উন্নত সংস্করনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘুরছে। সূর্য স্থির।


এর পরিণতিতে ধর্মীয় অনুশাসকের দল তাঁকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করেন। তাদের জনপ্রিয়তা হারানোর আশঙ্কায়। তবু বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। গ্যালিলিওর প্রদত্ত তথ্য চিরন্তন প্রমানিত হয়ে গেছে। হার মেনেছে রাজনীতি আর  ধর্মের যৌথ অভিসন্ধি। 


দেশে বিদেশে যুগে যুগে রাজনীতি আর ধর্মের চিরকালই সহাবস্থান। মহাকাব্যিক যুগেও এর ব্যাত্যয় ঘটেনি। 

ভারত তথা ভারতবাসীর আধ্যাত্মিক চেতনা চিরকালই সমাদৃত। এই আধ্যাত্মিক ভূমেই  আগমন ঘটেছে বহু জাতির। অতঃপর শক হুণ মোগল পাঠান এক দেহে লীন হয়ে গেছে। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে নানা ভাষা- নানা মতের- ভারতবর্ষ ধর্ম সম্পর্কে যে উদারতার সাক্ষ্য যুগে যুগে রেখেছে তা হঠাৎ প্রশ্নের সম্মুখীন কেন? 


স্বামী বিবেকানন্দ যিনি তাঁর উচ্চ আদর্শের জন্য ভারতবর্ষের যুবসমাজের প্রতিনিধি হিসাবে পূজ্য ছিলেন হঠাৎই এক হিন্দু ধর্মবিলাসী দল তাঁকে রাজনীতির স্বার্থে নিজ ধর্মের পরাকাষ্ঠা করে তুলতে রীতিমত উঠে পড়ে লেগেছেন। 


তাহলে তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ কে? হিন্দু ধর্মগুরু? না। তিনি মানবতার প্রচারক, যাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল 'যত মত তত পথ' এ। যখনই ভারতবর্ষ ধর্মীয়  সঙ্কটের মুখোমুখি হয়ে বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হয়েছে সেখানেই রাজনীতি হেরে গেছে আর সেই অঙ্গন থেকেই উঠে এসেছে মানবধর্ম। 


চৈতন্য, কবীর, নানক ভক্তিআন্দোলনের মধ্যেই মানবতার জয়গানই গেয়েছেন। হারিয়ে গেছে রাজনীতি। আজও চিরউজ্জ্বল তাদের দর্শন। এইভাবেই যুক্তিবুদ্ধির আলোকে আলোকিত সমাজ সংস্কারকের সহযোগিতায় ও সংগ্রামে সমাজ থেকে দূরীভূত হয়়েছে সতীদাহের মত ঘৃণ্য নৃশংস প্রথা। বিদ্যাসাগরের হাত ধরে নারী এসেছে শিক্ষাঙ্গনে। 


কালস্রোতে ধর্মীয় কুসংস্কারের পঙ্কিল জটাজালছিন্ন করে বিশ্ববাসী বিজ্ঞানকে সাথী করে জীবনকে সহজ করার চেষ্টায় যখন ব্রতী কালের চাকাকে পিছন দিকে ঘুরিয়ে রাষ্ট্রনেতারা তখন থালা বাজিয়ে, অঙ্গে গোবর দলনে, গোমূত্র পান করে দেশবাসীকে করোনা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে গিয়ে পক্ষান্তরে তারাই করোনাক্রান্ত হয়ে দেশের সবচেয়ে দামী হাসপাতালের সেবা গ্রহণ করছেন। 


এ ধর্ম  হল দরিদ্র জনগনের আফিং। অশিক্ষিত  দরিদ্র দেশবাসীর চোখে ধর্মের পট্টি বেঁধে সরকারী অক্ষমতা, যথা লাগাতার দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি. বেকারত্ব, আর্থিক মন্দা, নারী নির্যাতন,  শিক্ষায় গৈরিকীকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে রাজনীতির যুদ্ধ জয়ের সামগ্রিক ক্ষেত্র প্রস্তুত। ধর্ম কথার প্রকৃত অর্থই আজ অপসৃত। আজ এই ধারণের ক্ষমতা মারনের ক্ষমতায় রূপান্তরিত যা মানুষের মধ্য ভেদকে প্রকট করে দূরত্ব বৃদ্ধি করে চলেছে।


বর্তমান বিশ্ব ভাবছে সংকীর্ন ধর্ম আচরন ভিন্ন অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন। কিন্তু সভ্য মানুষ প্রকৃত অর্থে মানব ধর্মের চাতক।


❤️


🌹🌹


{হাসি সাহা হোলি চাইল্ড স্কুল, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তাঁর বিষয় বাংলা সাহিত্য। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষা লাভ করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষাসংক্রান্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকেন।}

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...