Tuesday, 22 September 2020

স্মৃতি কথা ১

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#পঞ্চম_পাতা


#স্মৃতিকথা


#সোমা_গুপ্ত


#পাহাড়ের_বর্ষা


কত কথা, কত স্বপ্ন, কত ঘটনা নিয়ে একটা জীবন। মনে পরে কত কথা। সমতলের মেয়ে। বিয়ের পর চলে গেলাম পাহাড়ে। সম্পূর্ণ আলাদা আবহাওয়া, আলাদা পরিবেশ।


 অনেক কিছু নতুন শিখেছিলাম। অভিজ্ঞতাও হয়েছে অনেক কিছু। পাহাড়ে বর্ষা একটু ভয়ংকর। একনাগাড়ে একসপ্তাহ বৃষ্টি পরেই চলে, বজ্র-বিদ্যুৎ, দুদিন টানা লোডশেডিং , কোথাও বা ধস নামে। তারই সাথে চলে কাজকর্ম। যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধা সমতলের মত অতটা ভাল নয়। বিয়ের প্রথম প্রথম বর্ষাকালে একদিন বাজার থেকে ফিরে ঘরের চাবি খুলতে যাব। হঠাৎ দেখি কি সুন্দর কালো ভেলভেট রঙের একটা বেশ বড় মাকড়সা। তেনার রূপ দেখছিলাম একমনে।


 আমার সঙ্গী চেঁচিয়ে বলে উঠল, " হাঁ করে দেখছ কি? মারো ওকে। তোমার ধারণা আছে এটা কত বিষাক্ত? " ঐ যে একটা কথা আছে রূপ দেখে মজলে কি মরলে। একটা মোটা কাপড় দিয়ে মাকড়সাটিকে ধরে একটা ঝোড়ায় ফেলে দিয়েছিলাম। সঙ্গী আমায় খুব বকা দিয়েছিল। গজগজ করে বলেছিল, " জানোনা ত পাহাড়ি মাকড়সা কত বিষাক্ত। " হেসে উওর দিয়েছিলাম, " এ বান্দা যে রূপের পূজারিণী। "


আরেক বর্ষাকাল। মেয়ে পড়ে নার্সারিতে। স্কুল থেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি। সিঁড়ি দিয়ে বকবক করতে করতে ফিরছি। পাকাবুড়ি, " আই(আমি) মায়ের হাত না ধরে উঠব " বলে গটমট করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করে। ঘরে ঢোকার দুটো সিঁড়ি আগে একটা সাপ মেয়ের থেকে প্রায় দশ হাত দুরে চুপ করে শুয়ে ছিল। "ওমা ওটা কি" বলে প্রশ্ন করায় আমি সাপটাকে দেখি এবং ভয়ের চোটে মেয়ের চুলের মুঠি ধরে একপ্রকার প্রায় ছুঁড়ে দিয়েছিলাম ওপরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতিবেশীর কোলে। খুব ভয় পেয়েগিয়েছিল মেয়েটা আমার। পাহাড়ি বর্ষার রূপটা যেন একটু ভয়ংকর।


 সেদিনই সন্ধ্যা থেকে ছিল লোডশেডিং। আর প্রবলধারায় বৃষ্টি। মেয়েকে খাইয়ে বাইরের কলে মুখ ধোয়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার চটির তলায় কি যেন আছে। ঘরের দরজার কাছে এসে টর্চটা জ্বেলে দেখি একটা সাপ নিজের মত করে গেটের দিকে চলে গেল। পরের দিন সকালে মেয়ে বলেছিল," আজ আল(আর) চুল ধরে টানবে না ত? খুব লাগে।" ওকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, " মারে তোর একটু যন্ত্রনার পিছে আমার মমতা লুকিয়ে ছিল"।


আরেক বর্ষাকাল। রাত তখন প্রায় দশটা। পাহাড়ে রাত দশটা মানে শুনশান। মেয়ে এবং কর্তা ঘুমোচ্ছিল। চেয়ারে বসে ঘর অন্ধকার করে টিভি দেখছিলাম। বিজ্ঞাপন বিরতি। জল খেতে উঠেছি। দেখি এক কাঁকড়া বিছা মনের আনন্দে চেয়ারের দিকে এগিয়ে আসছে। পারিনি সেদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখতে। কষ্ট হয়েছিল মনে। কিন্তু প্রতিবেশী দিদি বিছাটিকে দেখে বলেছিলেন, "এ কিন্তু খুব বিষাক্ত"।

আমার অনেক বন্ধুরা বলেন পাহাড়ি বর্ষা খুব সুন্দর। মনে মনে বলি হ্যাঁ রে একেক জনের কাছে সুন্দরের সংজ্ঞা যে একেকরকম।


**


#সুব্রত_দেব


#ছেলেবেলার_সেই_দিনগুলো


স্মৃতি সতত:ই সুখের।আর তা যদি শৈশবের আনন্দমুখর  দিনগুলো হয়, তো কথাই নেই।

 আমার জন্ম, বড় হয়ে ওঠা সবই চন্দননগরে।

 আমাদের সামনে বাড়ির এক জ্যেঠিমার কথা আজও মনে পড়ে। সকাল হলেই বড় জ্যেঠিমা ডাকত  - মন।

আমি ছুট্টে যেতাম। 

  -- কী রে বাঁশি নিবি ত?

আমি বললাম -দাও।

জ্যেঠিমা বলল - মার কাছ থেকে পয়সা এনেছিস ত?

--আমি ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছি।

 --হ্যাঁ রে, বাঁশির দাম দশ পয়সা,যা মার কাছ থেকে নিয়ে আয়।

--আমি ফের বাড়ির দিকে যেতেই জ্যেঠিমা বলল -

থাক,কাল একসাথে কুড়ি পয়সা নিয়ে আসবি।

তারপর গরম রুটির ওপর ঝোলাগুড় লম্বা করে দিয়ে

পাকিয়ে বাঁশির মত করে আমার হাতে দিয়ে বলল

--যা বাঁশি বাজাতে বাজাতে চলে যা। আমি খেতে খেতে বাড়ি চলে আসতাম। পরেরদিন মার কাছ থেকে  পয়সা নিয়ে গেছি, বাঁশি রুটিও পেয়েছি।

মাকেও অবাক হতে দেখেছি -কী রে তোর জ্যেঠিমা পয়সা নিয়ে নিল?

--হ্যাঁ। 

এভাবেই চলছিল। সেবার পুজোর সময়। আমাদের 

একান্নবর্তী পরিবার।আয়ের লোক একজন।আমার বাবা। বাবা মিলে চাকরি করত। তখনো পুজোর জামা হয়নি। মহালয়ার দিন। জ্যেঠিমা মাকে ডাকল

-- একবার মন কে নিয়ে এসো ত।

মা আমাকে নিয়ে গেল।

--কী দিদি?

 -কিছু না।দেখো ত মনের জন্য এই জামাটা কিনেছি,

কেমন হয়েছে।

--ও মা! কী সুন্দর।

আমি ত লাফাচ্ছি।

 --মা বলল -এর ত অনেক দাম, আপনি আবার--

জ্যেঠিমা মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল--ঐ যে রুটির জন্য তুমি দশ -কুড়ি পয়সা দিতে আর তোমার দাদার কাছ থেকে চেয়ে চিণ্তে  যা দুএক পয়সা  পেতাম ,তাই জমিয়ে---- ছাড়ো ও সব কথা।

আজ জ্যেঠিমা নেই।স্মৃতি রয়ে গেছে। তখন প্রাইমারি স্কুল। একবার স্কুল থেকে হাতের কাজ দিল - মাটির ফল করে আনতে হবে। মার মাথায় ত আকাশ ভেঙে

পড়ল।আমি ঘ্যান ঘ্যান করছি-মা করে দেও না। মা চেঁচিয়ে উঠল -আমি ওসব মাটির কাজ পারি না।

কথাটা কানে যেতেই জ্যেঠিমা ডাকল -মন,এদিকে আয়। সারা দুপুর ধরে মাটির কলা,আপেল,লিচু,

আম,পেয়ারা হরেক ফল বানিয়ে দিল।কী অনায়াস

ভঙ্গি! বলল-তোর এই জ্যেঠিমা থাকতে তোর চিন্তা 

কী রে!


পাড়ার গলিপথে কত বিচিত্র ফেরিওয়ালা যে আসত তার ইয়ত্তা নেই।মিঠাই নিয়ে আসত একজন দাদু।ইয়া পাকানো গোঁফ,মাথায় গামছার পাগড়ি।

পাড়ার গলিতে ঢুকেই হাঁক পাড়ত -হাওয়া মেঠাই,বম্বের হাওয়া হাওয়া মেঠাই।মোটা বাঁশের গায়ে মিঠাই লাগানো,তা থেকে কিছুটা নিয়ে ঘুরিয়ে

ঘুরিয়ে মিঠাইয়ের হার,ফুল, প্রজাপতি বানিয়ে দিত।

   

পাড়ায় তখন একটাই বাড়িতে টিভি। অবস্থাপন্ন পরিবারটি ছিল খুব মিশুকে। লোকজন ভালবাসত।

 আমাদের বাড়িতে এসে মা কে বলে যেত -দিদি

যাবেন না আমাদের বাড়ি,আজ ভালো  বই দিয়েছে,

যাবেন কিন্তু। তা মা মাঝে মাঝেই যেত ছবি দেখতে।

 সেদিন আমিও গেছি কাকিমার বাড়ি।

ঘরে তিলধারণের জায়গা নেই। কী একটা হিন্দি  মুভি চলছে। একটা সিনে জনি ওয়াকার পার্ট করছে।

মা বললে - প্রতিভা,  অভিনয় করছে কে বলোতো?

কাকিমা প্রায় লাফিয়ে উঠল-- চিনি, চিনি ।  -ও হল

জনি মেরা নাম।  সেদিন  ঘরের সবাই অনেক কষ্টে

হাসি চেপেছিল।আরেকদিনের কথা - স্কুলের রেজাল্ট বেরিয়েছে। তা মা জিজ্ঞেস করল -প্রতিভা

 ছেলেরা কেমন রেজাল্ট করল।

--আর বলেন কেন দিদি,কোনো রকমে পাস দিয়েছে।

  ওদের পিছনে এত টিউমার দিয়েছি, তাও দেখো--

  সবই আমার কপাল।

 


#মীনা_রায়


#আমার_মা


মা ! 


একাক্ষর মন্ত্রসম সম্বোধন। 


মা ডাকলেই মনে বল পাই। 


সঙ্কটময় সংসারে কঠিন সময়ে মা ডেকে পাই -- প্রাণে আরাম, মনে আনন্দ, আত্মায় প্রশান্তি। 

সবার মা থাকে। আর মা সবার প্রিয়। আমার মা আজ স্মৃতি কথায়। 


মা কে আমার মনে পড়ে না । ঠিক এমনটাও নয়। যে বছর আমি সাম্মানিক ইতিহাসে গ্রাজুয়েট হলাম , সেই বছরেই মা ইহলোক ত্যাগ করলেন। 


আমার রেজাল্টটাও শোনা হয়নি। রোগ যন্ত্রণায় ব্যস্ত ছিলেন বড়ো। 


তাঁর ইচ্ছা ছিল আমার পড়াশোনা যেন মাস্টার্স ডিগ্রি হয়। বি.এড টিচার ট্রেনিং নিয়ে মাস্টারি করি।আসল কথা স্বাধীন যুগে স্বাধীন ভাবে যেন মুক্ত জীবন পাই। 


অসুস্থ মায়ের সঙ্গে সেই এক মাস রাত জেগে পেয়েছি মায়ের একান্ত ভালোবাসার সান্নিধ্য। আর

অফুরান আশীর্বাদ। এই বল আর ভরসা নিয়ে আমার আজকের আমি হয়ে ওঠা।

আমাদের ব্রাহ্মণ বাড়ি। গৃহস্থ কৃষিজীবী বাবা। নিত্য সেবা ছিল বাড়ির বাইরে নিজেদের মন্দিরে। যেখানে বিরাজ করেন আজও-- সদা জাগ্রত কালারুদ্রদেব, রামসীতা ,লক্ষ্মণ, হনুমানজী,

নারায়ণ, মা মঙ্গলচন্ডী।


আমার মা অন্তিমা। নাম শুনে জানতে চেয়েছিলাম 

নামের ব্যাখ্যা। মা ছিলেন নয় ভাইবোনের কনিষ্ঠা।

অন্তিম অর্থ শেষ স্ত্রী লিঙ্গে আপ যোগে আকার হয়ে অন্তিমা। মানে আর কন্যা চাই না।


 সে যুগে সন্তান একের পর এক জন্মাত সব ঈশ্বরের ইচ্ছায়। 

মা কতটা লেখাপড়া শিখেছিলেন জানি না।তবে গীতা পড়তেন। মনসা মঙ্গল পড়তেন বহু লোক সমাবেশে সভাতে বসে। যুগ অনুযায়ী মা খুব সাহসী ছিলেন। পরিশ্রমী ছিলেন। সেবাপরায়ণ, সমাজসেবী ,কর্তব্যনিষ্ঠাও ছিল মায়ের মধ্যে। 

শ্বশুরবাড়িতে থাকা আমার দিদিদের মা পত্র লিখেছেন। হাতের লেখা স্পষ্ট পড়া যেতো।


১৯৮৬ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি ছিল সরস্বতী পুজো। আমার মায়ের ওই বিদায় বেলায় বাবা বললেন--সবেমাত্র ষাট বছর পার করলে অন্তি ! 


আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে দক্ষিণ অভিমুখী ভাগীরথী প্রবাহিত। আমাদের নিজস্ব স্নানের ঘাট আছে। বর্ষার জলে কত মৃত পশু মানুষও ভেসে আসতো। আমাদের স্নান ঘাটের ওপরেই ছিল বাগান। কত রকম গাছ গাছালি। বর্ষার নদী ভাঙনে মাটি আলগা হয়ে সেই সব গাছ যেতো নদীর দিকে ঝুঁকে। আর ভরা ভাদ্রে নদীতে বন্যা হতো।জল ঠেলে উঠতো আমাদের ধান ঝরানোর খামারে।খেজুর গুড় তৈরীর শালে। মৃত দেহ ভেসে এসে ফুলে পঁচে কদাকার আকৃতি হোত। দুর্গন্ধ ছড়াতো।


নদী তীরবর্তী পাশের পাকা সড়ক দিয়ে মানুষ জনের যাতায়াতে।দুর্গন্ধে কেউ থুতু ফেলতো।কেউ নাক চাপা দিতো। কিন্তু গন্ধের হদিস বার করতো না কেউ। আমার মা সাঁতার জানতো।সাহসীও বটেন।তিনি উদ্ধার করতেন সেই মৃত দেহ। নাকে মুখে কাপড় বেঁধে কোমড়ে গামছা জড়িয়ে বাঁশের লগা দিয়ে ওই গলিত শবকে ঠেলে দিতেন নদীর স্রোতের মুখে। ব্যাস পাড়াখানা লোকের সঙ্গে পথচারীরাও দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পেতো। 


কার ফোঁড়া পেকে টনটনে ব্যথায় কষ্ট হচ্ছে জানতে পারলেই মা অপারেশন করে পুঁজ রক্তের বীজটা বার করে সুস্থ করে তুলতেন। গরম জল,বরিক পাউডার, তুলো,এন্ট্রিব্যাকট্রিন ,ছূঁচ আগুনে পুড়িয়ে এই সব তাঁর সংগ্রহে থাকতো।

আর ছিল ঈশুমুল গাছের সবুজ পাতা । যার রস নারকেল তেলের সঙ্গে ফুটিয়ে ফোঁড়ায় লাগালে আরাম পেয়ে সুস্থ হতো রোগী। 


বন্ধ্যা বলে সমাজে অসম্মান হচ্ছিল কোনো বধূর।  তাকে তিনি নিকটবর্তী কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সুচিকিৎসার ফলে মাতৃত্বের আস্বাদ দিয়েছিলেন। 

আমার মা কাজের লোকের সঙ্গে নিজেও কাজ করতেন। মুড়ি ভাজা, ধানসিদ্ধ , ঢেঁকিতে চাল তৈরীতে সিঁকে দেওয়া, যাঁতা ঘুরিয়ে ডাল ও ছাতু তৈরী হতো তখন বাড়িতেই। 

গুড়ের ভিয়েন করে বাড়িতে কত রকমারি নারু,মুড়কি,চালভাজা তৈরী হতো তখন।পরিবারে লোক সংখ্যাও প্রচুর ।কাজও নানা রকম। গোয়াল গোরু ,ঘুঁটে সব ছিল।চাষী গৃহে সারা বছর ক্ষেতের ফসল সামলাতেই কত সময় যেতো। আমার মায়ের শ্রমের তাই অন্ত ছিল না। 


তার পরেও মা করতেন কুরুশ ,ছুঁচ দিয়ে হাতের কাজ। তাস খেলতেন -টুয়েন্টি নাইন, বিন্তি,কলব্রে।কখনো লুডো, চাইনিজ চেকার।

মা গান গাইতেন।গল্প বলতেন। বার ব্রত সব ছিল ।ঠাকুর বাড়ি বলে কথা !


মায়ের গায়ের কাজ মাখা ঘাম ঝরা সেই গন্ধটা পেতে আজও আমি স্মৃতি হাতড়ে মরি একান্তে।

**




No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...