Sunday, 18 October 2020

চতুর্থ পর্ব প্রথম পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


শুরু হলো #চতুর্থ_পর্ব 


#প্রথম_পাতা 


আজ দুই নারীর কলমে দেবীকে স্মরণ। প্রথম কলম মাননীয়া অধ্যাপিকার মননে উঠে আসা এক বোধ। 

দ্বিতীয় কলম এক মরমী সমাজ সচেতন নারীর। তিনি একটি এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত যা আক্ষরিক অর্থেই দশভূজা। তাঁর থেকে আমরা জেনে নেবো মানুষের মানবিক মুখ। 


🙏


#মৃত্যুরূপেন_সংস্থিতা'


 


#সুস্মিতা_সাহা।


 


'জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন'


 


খুব সহজেই এই কথা বলে দিতে পেরেছেন কবি -কিন্তু সে মৃত্যু যখন সামনে এসে দাঁড়ায় ! আমাদের কোন প্রস্তুতি না থাকা সত্বেও চলে যেতে হয় সেই হিমশীতল অন্ধকারে। আগে থেকে কোনো অভিজ্ঞতা থাকার কোন রকম সুযোগই নেই।তাই 'মৃত্যু রূপেন সংস্থিতা' - এই বিষয়টি শুনলেই কিরকম জীবন বিমুখ একটি ভাবনা মনে হয়। তবে কি মা দুর্গা মৃত্যু রূপেন সংস্থিতা!  কিন্তু তিনি যে তাঁর কমলকলি সম হস্তে সদা সর্বদা বরাভয় দান করেন। সে কি তাঁর


 


জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার আশীর্বাদ নয়? খুব দ্বিধাগ্রস্ত মনে থম মেরে বসে থাকি খানিক ক্ষণ।


 


হঠাৎ ঘোর কেটে যায়, চোখ বন্ধ করে মায়ের কাঞ্চন বর্ণা ঘামতেলে জ্বল জ্বলে মুখটি মনে করতে চেষ্টা করি - মিনিট খানেক বা তার বেশি অমনি কোথা থেকে হুড়মুড় করে ঝড়ের প্রবল হুংকার শোনা যায়। 


 


নাহ্ আটচালাটা আর এ বছর না সারালেই নয়, ছেলে মেয়ে নিয়ে ব্রাহ্মণ পরিবারের সোমত্ত বৌ দাঁড়াবে কোথায়? কালো দুর্যোগের রাত নেমে এসেছে - অপুষ্টির শিকার মেয়েটি মারা যায় ম্যালেরিয়ায়। আকাশও  বোধকরি কেঁদে ওঠে সর্বজয়ার কান্নার শব্দে।


 


সে মেয়েটির নাম দুর্গা - আমাদের প্রিয় সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের  'পথের পাঁচালী' র দুর্গা। শুধু দুর্গা নয়, মারা যায় তাঁর 'মৌরীফুলে'র সরলা অসহায় গ্রামের বধূটি ,মারা যায় ক্ষেন্তি - সেই লোভী কিশোরী মেয়েটা। মুশকিলটা হোলো কি জানেন - মারা যাচ্ছে সন্তান - ক ' দিন বেশ খানিকটা কান্নার পরিবেশ বাড়িতে, তারপর সব খুব স্বাভাবিক। পিতা মাছ ধরতে বসে পড়ে, মা ঐ গরীবের সংসারে রান্নাবান্না করে, খুব যেন ক্যাজুয়াল একটা বাতাবরণ তৈরি করলেন লেখক বিভূতিভূষণ। দেখিয়ে দিলেন জীবনের বাস্তব চিত্র - বিশেষ করে মেয়েদের মৃত্যু বাংলাদেশের কোন আশ্চর্য ঘটনা নয়। ও তো আকছার হচ্ছে আবার জন্মাচ্ছে আবার মরছে।মেয়ে কি কম পড়িয়াছে নাকি এ পোড়া দেশে।


 


ঠিকই মেয়েদের মৃত্যু আবার একটা ঘটনা।তবে লেখক বিভূতিভূষণ ক্ষেন্তির হাতে লাগানো পুইঁ  চারাটিকে একেবারে শাঁসে জলে বড়ো করে দিয়েছেন গল্পের শেষে।মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী তাও বাড়ুক না কেন ঐ রুগ্ন তুচ্ছ গাছটা।


 


 


বড়ো বেদনার মতো বেজেছিল বড়ো কন্যার অকাল মৃত্যু- চেষ্টা করেছিলেন জামাতাকে সন্তুষ্ট করতে - পারেন নি। আটকানো যায় নি আদরের মাধুরীলতার একরাশ কষ্ট বুকে নিয়ে চলে যাওয়া। শুধু মৃত্যুপথযাত্রী কন্যার শিয়রে বসে উপনিষদের অপূর্ব স্তোত্র পাঠ করতে ভোলেন নি স্থিতধী এক সাধক-তিনি রবীন্দ্রনাথ। সেই সব দুঃখ জল হয়ে ঝরে পড়েছে কি 'দেনাপাওনা' গল্পের নিরুপমার মৃত্যু আঁকতে আঁকতে। অসম্ভব শান্ত স্বভাবের মানুষ রবীন্দ্রনাথ এই গল্পের শেষে শেষ কথাটি বলেন বিদ্রুপের হাসি মাখিয়ে - ''বাড়ির বড়ো বউ মরিয়াছে,...এমন চন্দন কাষ্ঠের চিতা এ মুলুকে কেহ কখনো দেখে নাই।'' কি নিদারুণ মৃত্যু - কি শান্ত ভাবে সাদামাটা কয়েকটি কথায় এঁকে দিলেন রবীন্দ্রনাথ।নারী শক্তি রূপে যদি মা দুর্গাকে বুঝি তাহলে নিরুপমা- র মৃত্যু শয্যার প্রান্তে তিনিও তো ছিলেন - তখনো এমনি বরাভয় দান করেছিলেন তিনি! কি জানি!


 


 


অথবা সেই বয়ঃসন্ধির দামাল ছেলেটি শৈশবের গ্রাম ছেড়ে - মায়ের কোল ছেড়ে শহরে চলে যেতে বাধ্য হয়। তারপর একদিন তুমুল ঝড় - আকাশ যেন কাঁদছে আকুল হয়ে - ডুব জলে ভেসে ভেসে ফটিক এক বাও / দো বাও খুঁজে বেড়ায়। অবশেষে জননীর স্নেহের পরশ পেয়ে রওনা দেয় নিরুদ্দেশের পানে। ছুটি শেষে আরেক ছুটি কাটাতে বিশ্বপ্রকৃতি তাকে কোলে তুলে নেয়। বিশ্ব প্রকৃতি নিজেই তো অভয়া - জননী।


 


ওপার বাংলার এক মা ও তার অসুস্থ সন্তানের চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করি এইবার। রুগ্ন ছেলের শিয়রে মা একা রাত জাগছে।ভনভন করা বুনো মশা - এঁদো ডোবা - পচা পুকুরের সঙ্গে রাত জাগছে এক অসহায় মা। কালরাত্রি কাটিয়ে ছেলেটি কি জীবনের মুখ দেখতে পারবে? ওষুধের বদলে ঘরের চালে এসে হাজির মরণের দূত। মা তবুও আকুল প্রার্থনায় মাথা কুটে মরে আল্লার দরগায় - 


 


''নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে দরগায় মানে দান/ 


 


ছেলেরে তাহার ভাল কোরে দাও, কাঁদে জননীর প্রাণ।'' এক অভয়া জননী ভিক্ষা মাগে আরেক অভয়া জননী'র চরণে। 


 


খুব প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 


 


'কালো বস্তির পাঁচালি' কবিতাটি।


 


''ক্ষুধার আগুন দাউ দাউ দাউ


 


কান্না ভাজা ঘরে;


 


মায়ের কোলে দুধের শিশু 


 


দুধ ছাড়া আজ মরে।' 


 


বানভাসি বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে ঘর উঠান সব কিছু- 


 


''বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ..


 


আমি কি তোর মা? 


 


চোখের জলে ঘর ভেসে যায় 


 


তাপ তো কমে না।''


 


 


বিশের বিষ এই বছরে - চিনি না জানি না ওদের কাউকে - শুধু দেখেছি একটু শান্তি একটু আশ্রয়ের খোঁজে মরিয়া হয়ে পাড়ি দিয়েছিলো রেল লাইনের ধাতব ধারালো দাঁতের সারি ধরে। তারপর, না তারপর আর কিছু নেই।শুধু পড়ে আছে রক্তের টাটকা দাগ - হতাশার মুখ আর কিছু তাজা খবর। নিউজ পেপারে টিভি চ্যানেলের ফেসবুকে তাদের জন্য হাহুতাশ এবং চটজলদি চায়ের পেয়ালায় তুফান তোলা।কার দোষ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।


 


 


'তারপর কি আর পড়ে থাকে ?


 


পড়ে থাকে মৃত্যু মহিমাময়ী মৃত্যু ! 


 


আর এক মুঠো শিউলি,


 


এক থালা বাড়া ভাতে ছাই! '


 


 


কলকাতা শহরের মানুষ জন ভারি চমৎকার-  বন্ধু বৎসল মানুষ। একে অন্যের বিপদে সব ফেলে দৌড়ে যায়। একে অন্যের হাঁড়ির খবর রাখে। সবাই সবার সুসময়ে  পাশে থাকে - থাকে দুঃসময়ে আরো বেশি করে। তবু তো কলকাতা শহর একজন মানুষের মৃত্যু দেখলো - দেখে পাশ কাটিয়ে চলে গেল পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো।এখনো চোখের সামনে ভাসে সেই অচেনা লোকটির দুই পা ছড়ানো চেহারাটা। ভুলে গেছি সব একটি দিনের মধ্যেই। এও এক মৃত্যু - মানবতার মৃত্যু। সহানুভূতির হাত সরে যাওয়া তো আরেক ধরণের মৃত্যু। 


 


আমার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছে শুনলাম যে মৃত করোনা পজিটিভ চিহ্নিত রোগীদের তো হসপিটাল থেকেই সৎকারের ব্যাবস্থা করা হয়েছে কিন্তু সুস্থ মানুষ গুলিকেও তার আত্মীয় স্বজন বাড়িতে ফেরত নিয়ে যেতে পারছে না।অসহায় তো তারাও - এই ভয়াবহ মারের অথবা মারীর আক্রমণ থেকে কে রক্ষা করবে? কাকে কাকে রক্ষা করবে আর কাকে কাকে মারবে? 


 


 


রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে পরিবেশ বলতে শুধু আকাশ বাতাস নদী জলের দূষণ নয়, মানুষের অন্তরের ঐশ্বর্য দূষণ এক বিরাট অবক্ষয় পৃথিবীর বুকে। আজ ২০২০তে দাঁড়িয়ে এই বিপর্যয় একেবারে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মানুষ জনকে। 


 


'প্রিয় ফুল  খেলবার দিন নয় অদ্য 


 


ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা। '


 


 


পিছিয়ে যাই বরং ১৭৬০-এর মধ্য যুগের শেষ পর্বের কবির কাছে - 


 


'ভুজঙ্গপ্রয়াতে কহে সতী দে 


 


সতী দে সতী দে সতী দে সতী দে।'


 


রাগে প্রলয় নৃত্য শুরু করলেন রুদ্র, প্রিয় পত্নী সতীর বিরহে, রসাতল যায় যায়। বাঁচাও কে কোথায় আছো। দেবতা - মানব- জীবজগতের এই আকুল ক্রন্দনে এগিয়ে এলেন পরিত্রাতা  বিষ্ণু - সুদর্শন চক্রের আঘাতে একান্ন পীঠে ভাগ করে ছড়িয়ে দিলেন সতী মায়ের দেহ।শান্ত হোলো ত্রিভুবন - ধ্যানে মগ্ন হলেন রুদ্র। জন্ম নিলেন সতী উমা রূপে  হিমালয় ও মেনকার ঘরে। মৃত্যু থেকে শেষ নয়, শুরু হোলো পুরাণের আরেক অধ্যায়ের। ফিনিক্স পাখির মতোই-ধ্বংসের থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ওড়ার স্বপ্ন দেখে সে।কারণ সে শিখেছে অভয় মন্ত্র - জীবন তাকে শিখিয়েছে এই মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র।


 


 


অভয়া -অচলা -অপূর্বা যে নামেই ডাকি না কেন তিনি যে মা। প্রকৃতি মা - ধরিত্রী মা। পাপে ধরাতল পূর্ণ হলে তিনি ধরেন সংহার মূর্তি, হয়ে ওঠেন কালিকে পরমেশ্বরী। যাঁর হাতে খড়্গ ও নরমুণ্ড।রক্তে লাল পা ফেলে ফেলে নৃত্য করতে করতে এগিয়ে চলেন পথের সকল অনাচার দু' পায়ে মাড়িয়ে।


 


ঘোর অন্ধকার তমসা রজনীতে তাঁর পুজো হয় - 


 


জাগতিক মোহমায়া, পার্থিব লোভ লালসা বিনাশ করে তাঁকে যে আবার নতুন সৃষ্টির আয়োজন করতে হবে। বিনাশ হবে অন্যায়ের - বিনাশ হবে বৈষম্যের - বিনাশ হবে আগ্রাসী লোভের।তারপর মা কালী করালবদনী নিঃশ্বাস নেবেন - এবং আবার সৃষ্টি করবেন 'অন্নপূর্ণা' রূপে জগত সংসার। ভরিয়ে তুলবেন ফুলে ফলে।


 


প্রকৃতি ও পরিবেশও তো মাদার আর্থ, তাঁর বুকের ভেতর থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে মানুষের লোভের হাত বার করে আনছে শস্য-খনিজ সম্পদ - যা প্রকৃতি মায়ের বুকের রক্ত দুধ।এই দুধে মানবের পুষ্টি ও উন্নয়ন কিন্তু বেশি পেলে যা হয়! তাই তো রবি ঠাকুর বলেছেন - 'প্রকৃতিকে অতিক্রম কিছু দূর পর্যন্ত সয় তারপর আসে বিনাশের পালা।'


 


 


বেশ তাই মানলাম।মা অভয়া এবারে আসছেন মৃত্যু রূপেন সংস্থিতা হয়ে - আসছেন লোভ লালসা কামনা কণ্টকিত পথ পেরিয়ে - আসছেন নারীমেধ যজ্ঞের রক্ত স্পর্শ করে - আসছেন মুখে কষ্টের ছাপ বহন করে, আসছেন তবুও তিনি আসছেন। নাহলে এই অকৃতজ্ঞ মানব জাতির পুনরায় উত্থান হবে কি করে?


 


এই লকডাউনে করোনা কালেও যে ক্ষুদে মানুষ গুলি মা অথবা মেয়ে অথবা বৌমা অথবা বোন অথবা শুধু সহকারিনী হয়ে খেটে যাচ্ছে। কখনো অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে, কখনো শিল্প চর্চা কখনো ব্যাবসা কখনো হাতিবাগানের মোড়ে পাউরুটি বিক্রি করছে বা আরো আরো অনেক কিছু। এই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে পত্রিকা প্রকাশ করছে - চুটিয়ে সংসার করছে।বাড়ির সকলের মন ও শরীর এবং পরিবেশ সুস্থ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সেই তারাও যে একেকজন এক একটি অভয়া। অতকিছু বোঝে না বলে যাদের ক্যাবলা কান্ত বলা হয় তারা দিব্যি মোবাইলে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এই মেয়ে গুলি নিঃশেষ হয়ে যাবে তবু আপনাদের জন্য প্রাণ দেবে,শুনছেন এই যে সমাজের কর্তারা? এরা একা বাঁচবে না - সবাইকে নিয়ে আগামী পৃথিবীর বুকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। এঁদের জন্য মা অভয়া হয়ে উঠবেন 'জীবন রূপেন সংস্থিতা'।


 


এইটুকুই মা দুর্গা অথবা মা কালী অথবা মা অভয়া'র চরণে আমার নিবেদন।


✍️❣️❣️

 


#সত্যভারতী_এক_দেদীপ্যমান_শিখা


#রানু_ভট্টাচার্য


 


      কলকাতা ১৯২৭ ।  সাইমন কমিশন ভারতের সংবিধান পুনর্গঠন করতে এল। অথচ কমিশনের সাতজন সদস্যই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সভ্য। একজন ভারতীয়ও নেই তাতে। শুরু হ'ল প্রতিবাদ,  প্রতিরোধ,  আন্দোলন।  সেই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হলেন উনিশ বছরের তরুণ ছাত্র  শচীন্দ্রনাথ মিত্র। ক্রমশ শচীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন উল্লেখযোগ্য এক স্বাধীনতাসংগ্রামী এবং রাজনৈতিক নেতা।


 


        দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। হয়নি দেশভাগও। আইনজীবীর পেশা আর রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তের পথ থেকে সরে এলেন শচীন্দ্রনাথ। অন্তরে সেবার প্রদীপ জ্বালিয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাহ্য করে আরও কয়েকজন যুবককে সাথী করে দীক্ষা নিলেন মানব সেবাব্রতে। কাজ শুরু করলেন গোয়াবাগান বস্তিতে। গড়ে উঠল নৈশ বিদ্যালয়। শুরু হ'ল আজকের সত্যভারতীর পথ চলা। ১৯৪৫ সালের ২৬শে জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করলেন 'সত্যভারতী'। 'সত্যভারতী' নামটাও তাঁরই দেওয়া। সেদিনকার সত্যভারতীর সেই অঙ্কুরটি আজ ডালপালা মেলে বিরাট এক মহীরুহ। 


 


       ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট।  ভারত স্বাধীন হ'ল। ভাগ হ'ল বাংলা ও পাঞ্জাব। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটে মাটি ছেড়ে এপার বাংলায়। যে যুবকের দল গোয়াবাগানের বস্তিবাসীদের উন্নয়নে নিজেদের নিযুক্ত রেখেছিলেন,  তাঁরা এবার এগিয়ে এলেন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের চেষ্টায়।  ৪৪/১ গ্রে  স্ট্রীটে স্থাপিত হ'ল  সত্যভারতীর অফিস।  কর্মকাণ্ড শুরু হ'ল শিয়ালদহ,  বৌবাজার, বড়বাজার অঞ্চলে।


 


         কিন্তু একই সময়ে শুরু হয়ে গেল সাম্প্রদায়িক হানাহানি। ১৯৪৭ এর তেসরা সেপ্টেম্বর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক শান্তি মিছিল বেরোলো। পুরোভাগে শচীন্দ্রনাথ। কিছুদূর যাবার পর নাখোদা মসজিদের সামনে বিপথগামী এক যুবকের ছুরিকাঘাতে শহীদ হলেন শচীন্দ্রনাথ। মাত্র আঠারো দিন উপভোগ করেছিলেন কষ্টলব্ধ স্বাধীনতার স্বাদ।  আটত্রিশ বছর বয়সে শেষ হয়ে গেল শচীন্দ্রনাথের মানবসেবার স্বপ্ন।


 


         সত্যভারতী কিন্তু থেমে গেলনা। এগিয়ে এলেন পুষ্পরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়।  শচীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতির বেদনা ভুলে সত্যভারতীর কর্মযজ্ঞের ঋত্বিক পুষ্পরঞ্জনের সাথী হলেন আত্মত্যাগী আরও কিছু সমাজসেবী।  বয়স হার মেনেছিল পুষ্পরঞ্জনের কাছে।  ৯৬ বছর বয়সেও তিনি ছিলেন কর্মক্ষম যুবক।  স্বাধীনতাসংগ্রামী তাম্রপত্রপ্রাপকদের একজন। গান্ধিজীর লবণ সত্যাগ্রহের সঙ্গী। ভারতসরকারের কাছ থেকে বরিষ্ঠ সমাজসেবী পুরষ্কারও পেয়েছিলেন।


 


       সত্যভারতীর কেন্দ্রীয় কার্যালয় গ্রে ষ্ট্রীট থেকে স্থানান্তরিত হ'ল কোন্নগর নবগ্রাম কেন্দ্রে। পুষ্পরঞ্জন সহযোগী হিসেবে পেলেন নিবেদিতপ্রাণ  প্রমথরঞ্জন সরকারকে। শুরু হ'ল সত্যভারতীর তহবিল গঠনের কাজ।  তহবিল গড়ে না উঠলে সেবাকাজ এগোবে কি করে? খাদি গ্রামোদ্যোগ থেকে ঘি কিনে নবগ্রামে বিক্রি শুরু করলেন পুষ্পরঞ্জন। লভ্যাংশ জমা হতে লাগলো সত্যভারতীর তহবিলে। জমি কেনা হ'ল সত্যভারতীর। তৈরী হ'ল তাঁতশালা। কাপড় গামছা তৈরী করে বিক্রী করে তার লভ্যাংশও রাখা হ'ল সেই তহবিলে। এছাড়া হ'ল দস্তানা তৈরীর কেন্দ্র। গরীব দুঃস্থ মহিলাদের কর্মসংস্থান করে দস্তানা তৈরী করিয়ে সত্যভারতীর তহবিল বাড়ানো হ'ল। 


 


        ততদিনে পূর্ববঙ্গের লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল  মানুষ এপার বাংলায়। বাস্তুহারা এই মানুষরা ওপার বাংলা থেকে আর কিছু আনতে না পারলেও নিজেদের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে আসতে ভোলেননি। নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি  -   যাঁরা উপবাস করতে হলেও মর্যাদাবোধের কারণে ভিক্ষা করবেন না, এমন পরিবারকে সকলের অলক্ষ্যে সত্যভারতীর তরফে সাহায্য দেওয়া হ'তো। গরীব বাচ্চাদের দেওয়া হ'তো গুঁড়ো দুধের প্যাকেট আর হোমিওপ্যাথিক ওষুধ।  সপ্তাহান্তে সত্যভারতীর কর্মীরা বেরোতেন মুষ্টিভিক্ষার ঝোলা নিয়ে। গ্রীষ্মে, বর্ষায়, শীতে   -   অক্লান্ত  পরিশ্রম করে কর্মীরা সেই মুষ্টিভিক্ষালব্ধ চাল বিলি করতেন  সর্বহারা পরিবারগুলিকে।


        বারাসাতের নবপল্লীতে, শ্রীরামপুরের রাজ্যধরপুরে সত্যভারতীর আরও দুটি শাখা হ'ল।  উদ্বাস্তু পরিবারগুলির শিশুদের শিক্ষার জন্য এই তিন কেন্দ্রেই প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হ'ল।  ক্রমশঃ উচ্চ বিদ্যালয়ও। উদ্বাস্ত পরিবারের কন্যার বিবাহ, গৃহনির্মান ইত্যাদি কারণে ঋণের প্রয়োজনে বারাসাতে হ'ল নবপল্লী কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক, পল্লবিত হয়ে যার মূলধন এখন আটশো টাকা থেকে বেড়ে একশো সাত কোটি টাকা।


 


        স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ভারতে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা বিতরণ না হলে কিছু হবার জো নেই। সত্যভারতী মান্যতা দিল মহানপুরুষের সেই বানীটিকে।


 


       শিশু আর মহিলাদের জন্য এখন আছে ক্রেশ, চাইল্ড স্পনসরশিপ প্রোগ্রাম, চিল্ড্রেন কটেজ, স্ব-আধার আবাসন, হোষ্টেল, কর্মরতা মহিলা আবাসন, বৃদ্ধাবাস, চাইল্ডলাইন আর বিশেষ দত্তক প্রদান সংস্থা প্রকল্প। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার,বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও শুভানুধ্যায়ী অনেকে। আশার কথা, বহু স্বার্থত্যাগী তরুণ ও যুবকও সত্যভারতীর কর্মকাণ্ডে উৎসাহী হয়ে আজ এর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।


 


        সেই পঁচাত্তর বছর আগে শচীন্দ্রনাথ মিত্র সেবাব্রতের যে প্রদীপটি জ্বালিয়ে ছিলেন, পুষ্পরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের হাত ঘুরে সেই প্রদীপটি তাঁর সহযোগীদের হাতে আজও সমানভাবে দেদীপ্যমান।


✍️🌹🌹

No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...