Sunday, 18 October 2020

চতুর্থ পর্ব তৃতীয় পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#চতুর্থ_পর্ব


#তৃতীয়_পাতা


আজ তিনটি গল্প প্রকাশ হলো। 


✍️


#আলাপ 

            

#অরুণ_দে 


---আমি ফাউ ।

ফাউ কাকে বলে , আশা করি আপনারা সকলেই জানেন । তবুও আমি না বলে পারছিনা । যেমন এই ধরুন , মাখা সন্দেশ এক কেজি কিনলেন  দোকানদার হাতে করে লেচির আকারে আরও খানিকটা দিয়ে দিলেন ,-এটাই ফাউ ।

এক /দেড় ডজন কলা কিনলেন , কলাওয়ালা একটা/দুটো বেশী দিয়ে দিলেন । -এটাও ফাউ ।

 এখনকার বড় বড় কোম্পানিগুলোতে তো ফাউ'এর ছড়াছড়ি । 'বায় থ্রি গেট থ্রি ।'

এই যে আমার বড় বড় দাদারা লোক্যাল ট্রেনে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে কাজ করছে , ওদের লাইসেন্স আছে । আমার নেই । আমি কম বয়সী ।

ওরা কাজ করতে করতে মাঝে মধ্যে অনুমতি দেয় ।

'ফাউ' হিসেবে আমি ঢুকে পড়ি লোক্যাল কামরায় ।

          এবার বলুন তো , ছেলেরা বিয়ে করার সময়

টাকা পায় ,গয়না পায় ,কণে পায় । ফাউ পায় কোনটি ?

বলতে পারলেন না তো !

নিতে কনে'টি পায় ফাউ ।

ঠিক মেয়েদের বেলায় ঘর পায় , বর পায় । নিতে বরটি পায় ফাউ ।

এই রাস্তা-ঘাটে , মাঠে জোড়া-জোড়ায় লীলা দেখতে পান সেখানে অসর্তক হয়ে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেই , এসে হাজির তাদের ফাউ । 

না । আর নয় । এমন উদাহরণ টানলে এই মেচেদা থেকে খড়্গপুর পোঁছে যাব । পাপী পেটকা স‌ওয়াল থেকেই যাবে । 

#

আজ আপনাদের কাছে এমন একটা জিনিস নিয়ে এসেছি , যা পৃথিবীর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মধ্যে অন্যতম । আপনার দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগেই  । বলুন তো কি ?

পারলেন না ।

লেখাপড়া , চাকরি-বাকরী , হিসেব-নিকেষ , সম্পত্তি আদান-প্রদান করতে গেলে একে অবশ্যই দরকার ।

বলুন ?

  আবার পারলেন না ।

প্রেম-বিরহ , কবিতা , গল্প , উপন্যাসের সৃষ্টি কর্তারা একে অনুপস্থিত করে একটি শব্দ‌ও প্রকাশ করতে পারেন না। ক‌ই বলুন ?

এবার‌ও সবাই চুপ ।

আমার শেষ ক্লু ।

ফাঁসির রায় দানের পর , ইনি মৃত্যুবরন করেন ।

 যাক্ কেউই যখন পারলেন না । তখন শেষ করলাম আমার দাদাগিরি ।

তাহলে দেখুন । 

এই হল , আপনাদের করা প্রশ্নের উত্তর ।

তিনটে কিনলে , একটা ফাউ । মাত্র দশ টাকা । 

চলতে আরম্ভ করলে থামবে না ।  আপনার মনের ভাবনা'কে প্রকাশ করতে গিয়ে আপনি থমকে গেলে ,এও থমকে থাকবে আপনার দু'আঙ্গুলের  মাঝে । আর ফাউটা যদি কাজে না লাগে ,  টুক করে ফেলে দেবেন । 

যেমন , পৃথিবীর স্টেশনে আমাকে চুপ-চাপ ফেলে দেওয়া হয়েছিল  , কোন একদিন ।


🌹🌹


✍️


#ছায়ানট 


#বাসবদত্তা_কদম 


শেয়ালদা থেকে আটটা ছেচল্লিস’এর লোকাল টা রোজ ধরে রেজ্জাক। 

কোনোদিন কল্যাণী, কখনো মদনপুর, শিমুরালী এমন কি গেদের দিকেও চলে যায়। কাস্টমার এর সঙ্গে দর কষাকষি ও নানান কথা কইতে কইতে।

তিরিশ বছর ধরে যাতায়াতে , বেশ পরিচয় হয়ে গেছে যাত্রীদের সঙ্গে। এখন তারা পরিচিত কাস্টমার। গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া, মোজা বিক্রি করতে কোনো অসুবিধা হয় না। তারা ওর থেকেই নেয়। 


সে বাড়িতে নিয়ে যায় মুঠো মুঠো রোদ্দুর। 


নতুনরা ঠিক ভরসা পায় না।  আজকালকার ছেলে মেয়েদের ‘মল-ই’ ভরসা। কিনবে, বিশ টাকার মাল আশি টাকায়। ওদের স্ট্যাটাস ধরে রাখাটাই বড় কথা।

এই করে 'ও' দুটো মেয়ের বিয়ে দিয়েছে।

ছেলেটা কে দিয়েছে, এ বছর কলেজে।

বাড়িটায় টালিরচালা তুলেফেলে, এসবেস্‌টহর দিয়েছে গত বছরে।

মনে আশা, ছেলেটার হিল্লে হয়ে গেলে  ছেড়ে দেবে এ ব্যবসা। 

পরক্ষণেই ভাবে, সে কি পারবে? এত বছরের সম্পর্ক, ছেদ করতে!


ক'দিন ধরেই লক্ষ্য করছে, ওর বগিতে ওরই মতন জিনিসপত্র  নিয়ে মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ছে একটা মাঝবয়েসী  ছেলে। 

রাগ হয়।  

ইচ্ছে হয় সপাটে চড় মেরে নামিয়ে দেয়। 

মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, হকার্স ইউনিয়নে ছেলেটাকে নিয়ে বলবে।

একে দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়।

কদিন আগে একটু ধমকেছিল। 

ছেলেটা কিছু বলেনি। নিচু করে রেখেছিল মুখ। 

আজ সকালে মদনপুর যাবার সময় নৈহাটি  থেকে এক-ই বগিতে উঠলো ছেলেটা। 

রেজ্জাকের পায়ের রক্ত মাথায় উঠছে, বেশ বুঝতে পারছে।

একসময় মনে হল টুক করে ধাক্কা দিয়ে......

লক্ষ্য করে দেখে, বেশ দু চারটে বিক্রি করছে নতুন ছেলেটা।   


এবার সে কল্যাণীতে নামার তোড়জোড় করছে। 

কিন্তু এ কি! ট্রেন টা ছাড়তেই, লোকের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। 

এমন সময় রেজ্জাকের ডান হাত টা ওর ডান হাত কে ধরে টেনে নেয় ভিতরে। কামরায় হৈ চৈ। ব্যস্ততা সকলের। ছেলেটা ছলছলে চোখ নিয়ে অন্যদের দিকে তাকিয়ে কাঁপছে।

রেজ্জাক এইক'দিন তেমন করে তাকায়নি ওর দিকে।যাও বা তাকিয়েছে, তাতে শুধু ছিল ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য। আজ ভালো করে ওর দিকে তাকিয়ে, চমকে ওঠে! এই রে!


এ তো একেবারে আমাদের শিবুর মুখ!

শিবু ওর খুব কাছের বন্ধু ছিলো। একসঙ্গে কাজ করতো। দু'বছর আগে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে এক্সিডেন্টে চলে যায়। 

পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো, ও তো শিবু হকারের ছেলে। দুবছর আগে ট্রেন এক্সিডেন্টে যে মারা গিয়েছিল।

রেজ্জাকের কাছে সব পরিস্কার হয়ে যায়।

ভারী হয়ে ওঠে মন।

ছেলেটার এখন ছায়ার দরকার। 

রেজ্জাক তাকালো করুণ হয়ে।


সে বুঝল, সে ক্রমেই একটা গাছ হয়ে যাচ্ছে।


🌹🌹


✍️


#বিনাশ


#নন্দিতা_সিনহা


ভর সন্ধ্যায় দরজায় খুব জোরে জোরে ধাক্কা শুনে জানালায় ছুটে গেলেন দাস গিন্নি। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছে । সুমিত্রার অমন জোয়ান তাগড়া ছেলে দুটোর বিদেশ বিভূঁই এ  রেলের চাকায় বেঘোরে মরার খবরটা এমনই বুকে ধাক্কা দিয়েছিল। কে দেয় আবার অমন ধাক্কা?  


আমরা দিদি..


কী চাই বাবা?


চাঁদা ...


সত্যি তো! কত বাচ্চার পেটে ভাত নেই। লকডাউনে বিল্টু প্রতাপদের হকারি গেছে। মাস্ক বেচে আর কত পায় ! বাচ্চা গুলো উপোসে মরে। চাঁদা করে ওদের জন্যই এখনো রান্না দরকার।এসব ভেবে তিনি বলেন, তা কত করে নিচ্ছ ? 


দিদি এবারের দুগগা পুজোর খচ্চা বাড়ছে । গত বারের থেকে বেশি দেবেন। 


পুজো !!


দাস গিন্নি অবাক হলেন। আবছায়ায় ওদের ভাল করে দেখেন, ঢোকা কপাল, চোখা চোখ। ঠিকঠাক পা রাখতে পারছে না মাটিতে।আরো অবাক হন, দিদার বয়সীকে এরা দিদি বলে কেন?এ পাড়ায় না হোক তিরিশ বছর আছেন তারা.... তাকে দিদি? উদ্দেশ্য টা কী ?


এবার পুজোটা না করলেই তো হয়। চারিদিকে যা অবস্থা! 


কী বলেন, মাইরি,  হেসে বাঁচি না। পাব্লিক  বছরে চারটে দিন আনন্দ ফুত্তি, মা আসবে, ঢাক বাজবে না !


ঢাক বাজবে ,আবার?


চারপাশের এত মানুষের বুকের ভিতর যে বেদনার ঢাক বেজে চলেছে অহর্নিশ তাতে এদের কোনো হেলদোল নেই!  পুজোতে ঢাকের শব্দ চাই?


ঢাক শুনে দিদি থম মেরে গেলেন যে! মাইরি,আমাদের গোপাল যা দারুন বাজাতে পারে.. দেখবেন নাকি পরখ করে?


কে যেন তাকে ঠেলে সরিয়ে,সামনে এলো।


এবার আবার  গোদের ওপর বিষফোঁড়া সেনিটাইজার। কুমোর,  লাইট,শোলা প্যান্ডেল পোসাদ, খচ্চা কম? তাপর ভোগের খরচ


দাস গিন্নি ওদের মহাপ্রসাদের কথা স্মরণ করলেন। 


একজন হঠাৎ চোখ লাল করে বলল, এবারে কম দিলে কিন্তু বহুত লাফড়া হয়ে যাবে। গলায় শাসানি। দাস গিন্নিও  কেমন যেন  হঠাৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। 


বিল্টুর বউটা তখন বেরচ্ছিল। লকডাউনে রান্নার কাজ নিয়েছে। ছেলেগুলো আড়চোখে  তাকে দেখে কনুই এর ঠেস দিয়ে নিঃশব্দ বার্তা চালাচালি করল।


একজন শিস দিয়ে গান ধরল। দাস গিন্নির খুব নার্ভাস লাগল, বুঝতে পারলেন, তাঁর বুকের ভিতরটায় কারা যেন গরম শিশে ঢেলে দিল। নাকে যেন বাতাস আর    ঢুকছে না। তিনি জানালাটা আঁকড়ে ধরলেন। দেখলেন, দাস বাবু ছুটে আসছেন। আর কিছু মনে ছিল না। 


তারপরে কেটে গেছে বেশ কয়েক দিন। হঠাৎ বিকল হৃদযন্ত্র সচল হয়েছে। হাসপাতাল তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে। 


কিন্তু ছাড় পেলেন না দাস বাবু। 


আজ অষ্টমীর সকাল। মাইকে অঞ্জলির মন্ত্রের সাথে মিশে যাচ্ছে প্রেতায় নমহ, প্রেতায় নমহ, সর্ব মঙ্গলে মঙ্গল্যে...


শ্রাদ্ধে বসেছে সাদা থান


পুরোনো জামা গায়ে বিল্টুর বাচ্চাদের অসহায়  চোখগুলো মন্ডপে মন্ডপে দেবীর  চক্ষু দান করেছে। 


দাস বাবু দিনরাত এক করে হাসপাতালে ছুটোছুটি করেছেন, কোথায় খেয়েছেন কোথায় ঘুমিয়েছেন, কেউ জানে না। জামা কাপড়ের ছিরিছাদ ছিল না। কোভিড- সুরক্ষার লক্ষণ রেখা তাঁকে দমাতে পারে নি। তিনি তাঁর দেবীকে ফিরিয়ে এনেছেন ঘরে। 


শুধু কোভিড তাকে ছাড়ল না। কখন যেন অক্সিজেনের অভাবে তাঁর পৃথিবী চুপিচুপি হারিয়ে গেল।  


এই প্রথম আজ অঞ্জলির মন্ত্রকে দাস গিন্নির এত কদর্য লাগল।

🌹🌹

No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...