Monday, 19 October 2020

চতুর্থ পর্ব চতুর্থ পাতা

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#চতুর্থ_পর্ব


#চতুর্থ_পাতা


আজ এসেছে চারটি অণুগল্প। আক্ষরিক অর্থেই চারটি অণুগল্প। 


✍️


#পাঁজর


#সমীরণ_রায় 


এক্সরে প্লেট টা আলোর দিকে তুলে ধরে ডাক্তার বাবু বললেন,-আপনার বুকের পাঁজর তো একদম ঠিক আছে অনিমেষ বাবু।কোনো ক্র্যাক তো চোখে পড়ছে না।ডাক্তার বাবু অনিমেষ বাবুর দিকে হাসি মুখে তাকালেন,-বয়েস হয়েছে তো আপনার।সাবধানে থাকবেন।উনআশির অনিমেষ অবাক হয়ে তাকালেন ডাক্তার বাবুর দিকে,-আপনি কিছুই খুঁজে পেলেন না ডাক্তারবাবু।কিছুই চোখে পড়লো না আপনার?তার পর কাঁপা কাঁপা হাতে আস্তে আস্তে নিজেই এক্সরে প্লেট টা আলোর দিকে তুলে ধরলেন ডাক্তার কে দেখানোর জন্য -দেখুন ডাক্তার বাবু।এই দেখুন ।এই খান টা।ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।

কাঁপা হাতের আঙুল দিয়ে নিজের বুকের পাঁজরের নানা ভাঙা জায়গায় দেখাতে দেখাতে নিজেই বিড়বিড় করে চললেন -আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমার পুরোটাই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।


🌹🌹


✍️


#সৈকত_থেকে


#দত্তা 


সন্ধ্যে নেমে আসছে। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেলো সৈকতে বসে কেবলই সমুদ্রের ঢেউ গুণে চলেছে মানবী। প্রতিটা ঢেউ যেন এক একটা সেকেণ্ডের কাঁটা। একহাত দূরেই বসে আছে সৌম্য । তার চোখও নিবদ্ধ ঐ ঢেউগুলোর দিকে , অসম্ভব শান্ত ও স্থির। তিথির একরকম জোরাজুরিতেই তাদের এইবার দীঘা ঘুরতে আসা। কবে যে এতটা বড় হয়ে গেছে মেয়েটা মানবী বুঝতেই পারেনি এতদিন।লকডাউনের কারণে ইদানীং অফিসের কাজ সে বাড়ি বসেই সারে । সেদিন রাতে খাবার টেবিলে বসে মুখ নীচু করে রুটির শেষ টুকরোটা মুখে পুরতে পুরতে বলেছিলো, " মা, দূরত্বটা তোমাদের মনের। সোনালী মুখার্জি সেটা মেপে দিয়েছে মাত্র। একবার শেষ চেষ্টা করো না তোমরা , আমার জন্য? একটু কোথাও ঘুরে এসো দু'জনে।আমি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি!" বলেই আর্দ্র চোখে তাদের দিকে তাকিয়েছিলো অনেকক্ষণ । সে চোখে কি ছিলো জানে না মানবী কিন্তু নিজেকে ভীষণ দীনহীন মনে হয়েছিলো তার।তাকিয়ে দেখেছিলো সৌম্যও খাওয়া বন্ধ করে থালায় আঙুল ফেলে চুপ করে বসে আছে।


"সৌম্য না!" 

একটা জলদগম্ভীর কন্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরলো মানবীর। দেখলো সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন সাদা কোঁচকানো পাঞ্জাবী পরিহিত এক ভদ্রলোক।মাথার কোঁকড়ানো চুল হাওয়ায় ফুলেফেঁপে বুনো ঝোপের মত লাগছে ।

"আরে নিরুপমদা, এখানে?একাই? আলাপ করিয়ে দিই , আমার স্ত্রী, মানবী।"

মানবী দু'হাত আলগাভাবে তুলে নমস্কার জানালো। এই মানুষটার কথা সৌম্যর মুখে আগে বহুবার শুনেছে সে। খুব রসিক মানুষ।কিন্তু কিছুতেই সেই সব গল্পের সাথে এনাকে মেলাতে পারলো না সে। সৌম্যর প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে পায়ের তলার বালির দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বললেন," আমি একাই রয়ে গেছি সৌম্য। দীপালী চলে গেছে আমাকে ছেড়ে ।আর, রিয়াকে, ওরা ছিনিয়ে নিয়েছে।"

"মানে?" সৌম্য অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে বসলো।

"জঙ্গলটায় ওরা কেউ খুঁজে পায়নি রিয়াকে। শুধু আমার হাতে একমুঠো ছাই এনে দিয়েছিলো পাশের বাড়ির পবনদা।ভানু, রবীন , কাস্টমসে ছিলো যারা ওরাও এসেছিলো। সবাই মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিলো।"

মানবীর মাথার ভেতর ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো , গা হাত পা ঝিমঝিম। হাত বাড়িয়ে সৌম্যর ডান হাতের কব্জিটা চেপে ধরলো। বুঝতে পারলো সৌম্যর হাতটাও বেশ শিথিল হয়ে গেছে। দু'জনের মধ্যে এখন ইঞ্চি কয়েক ব্যবধান মাত্র। নিরুপমবাবুর দৃষ্টি এখন দূরের ঢেউয়ে নিবদ্ধ । সৌম্য বাঁ হাতটা মানবীর হাতের ওপর রাখলো।


এভাবেই বেশ কয়েক মিনিট কাটার পর নিরুপমবাবু কিছু না বলেই ঢেউয়ের দিকে এগোতে শুরু করলেন। উদ্বেগের স্বরে সৌম্য বলে উঠলো , "চলো , ফিরি।"


মানবী দেখলো , নিরুপমবাবুর ঝাঁকড়া চুল আর সাদা পাঞ্জাবী অন্ধকারের মধ্যে বিন্দুর মত মিলিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের ভেতর ঠিক কতখানি অন্ধকার থাকে কে জানে! পালানোর পথ কি ঢেউ জানে? ফেরার জন্য পেছন ঘুরে সে দেখলো, রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। মানবী ভাবতে থাকলো রাস্তার বিতর্কিত আলোগুলো এতটা মায়াবী হয় কেন?


🌹🌹


✍️


#রং_নম্বর


#রীতা_মজুমদার


ফোন বাজছে।এই সাত সকালে ফোন করল কে ? বিরক্তির সঙ্গে ঘুম ভাঙলো পারমিতার। রবিবার পারমিতা একটু দেরী করে ওঠে।এটাই তার অভ্যাস। বিয়ের পর থেকে অর্নব এটাই দেখে আসছে। রবীন্দ্রনাথের গান ভেসে আসছে। কিন্তু ঠিক কোন দিক থেকে ? পারমিতা বুঝতে পারছে না। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে কিছুই বোঝা যায় না।অর্নব কখন পাশ থেকে উঠে গেছে পারমিতা বুঝতে পারেনি। অবশ্য প্রতি রোববার বেড টি টা অর্নব নিজে বানায়। আজও তাই বেড টি নিয়ে হাজির। এর পর বাজার যাবে। ফোনটা এগিয়ে দেয় পারমিতার দিকে। মন থেকে বিরক্তি ভাব চলে গেল পারমিতার।


এরকম দুয়েকটা কল আসে। তখন শুধুই শুনতে হয়। বলার কিছুই থাকে না। ফোন রেখে ধীরে ধীরে ব্যালকনির দিকে পা বাড়াল পারমিতা। চোখে জল আসছে। খুব কষ্ট করে সেই জল বাঁধ দিল পারমিতা। নিজেই অবাক হয়ে গেল। বিশ বছর !! বিশ বছর কম সময় না। এতগুলো বছর পরও কষ্ট হচ্ছে। ঠিক আপনজনের মত। তবে কি সুজয়কে সে এখন ও ভালোবাসে ? সুজয়ের সঙ্গে প্রথম বিয়ে হয় পারমিতার খবর কাগজে বিঞ্জাপন দিয়ে বিয়ে। বছর খানেকের মধ্যে ডির্ভোস হয়ে গেল। দুজনের সম্মতিতে ডির্ভোস। খুব সহজেই হয়ে গেল। সুজয়ের মা ফোন করেছিল। গতকাল মাঝরাতে সুজয় মারা গেছে। সেরিব্রালস্ট্রোক।


পিঠে অর্নবের হাত। অর্নব কখন ব্যালকনিতে এসেছে বুঝতে পারেনি পারমিতা। "কার ফোন তোমাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে "--- অর্নবের গলায় উদ্বেগ। প্রথম বিয়ের কথা সবই জানে অর্নব। কিন্তু সুজয়ের মৃত্যুর কথা বলল না পারমিতা। বলতে ইচ্ছে করল না। " রং নম্বর, কি ভাষায় যে কথা বলল সেটাই বুঝলাম না। বুঝতে চেষ্টা করলাম বেশ খানিকটা সময় ধরে "--- স্বাভাবিক সুরে কথাগুলো বলল পারমিতা।স্বাভাবিক সুরে কথাগুলো বলতে খুব কষ্ট হল তার।


🌹🌹


✍️


#ত্রিপল 


#মধুরিমা_চক্রবর্তী 


চন্দ্রনাথবাবু তাঁর পাকানো গোঁফে তা দিতে দিতে বাড়ির সামনে পায়চারি করছেন। মাথায় ছাতা। চোখে হাল্কা হলুদ কাঁচের চশমা। টকটকে রঙ, কোঁকড়া চুল আর ছ'ফুট উচ্চতায় আজও তাঁকে এই পঞ্চাশ বছর বয়সেও নায়ক মনে হয়। তিনি হেঁকে বললেন,"এদিকটায় একটু ফাঁক রয়ে গেল। জল ঢুকবে যে। ঠিক করে ঢাকো।" ঘূর্ণিঝড় আসবে শুনেই গোটা দোতলা বাড়িটা তিনি লোক লাগিয়ে ত্রিপল দিয়ে ঢেকেছিলেন। এই ক'দিন আগে বাড়ির বাইরেটা নতুন রঙ হয়েছে। তাই ঝড়ের খবর হতেই তিনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। কিন্তু হলে কী হবে! যা প্রচণ্ড ঝড় হল কাল, তাতে ত্রিপল আর ঠিকঠাক নেই। যেভাবে তছনছ হয়ে গেছে তাতে কিছু নতুন ত্রিপল আবার লাগাতে হচ্ছে অনেক জায়গায়। ভালো খরচের ব্যাপার। তা হোক। চন্দ্রনাথবাবুর এসব ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য নেই। এখন ক'দিন বৃষ্টির রেশ থাকবে। আবহাওয়া দপ্তর বলেছে। হঠাৎ ত্রিপলের একটা কাপড় নিচে পড়ে গেল। চন্দ্রনাথবাবুর পায়ের ঠিক সামনে। কিন্তু তিনি কিছু বোঝার আগেই দু'টো কালো কালো নোংরা মতো হাভাতে লোক ছোঁ মেরে ত্রিপলটা নিয়ে দৌড় দিল। চন্দ্রনাথবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন,"অ্যাই, অ্যাই, তোরা কারা? আমার ত্রিপল নিয়ে যাচ্ছিস কেন?" ওরা পেছন ফিরে কী বলল কে জানে। কিন্তু চন্দ্রনাথবাবুর যেন কানে এল,"যাদের মাথায় ছাদ নেই, এ ত্রিপল তাদের।" কে বলল কথাটা! আশেপাশে তো কেউ নেই! চন্দ্রনাথবাবুর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কাছেপিঠে একটা কলোনি আছে। ছোটো ছোটো খোলার ঘর। সেটা কালকের ঝড়ে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। পাড়ার ছেলেগুলো ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে। এমন একটা পাড়ায় থেকে তিনি গর্ব বোধ করলেন। এ-ক-শো টাকা চাঁদা দেওয়ার আত্মপ্রসাদ অনুভব করলেন। তিনি ভাবলেন, ওই সব আধা মানুষগুলো একটু ভিজলে কিচ্ছু হবে না। বড়ো জোর একটু জ্বর হবে, কাশি হবে। আবার সেরে যাবে। ওদের ওষুধ লাগে না। খাওয়া জুটছে, এই না কত! ভাবতে ভাবতে খেয়াল হল, সেই লোক দু'টো বেশ কিছু দূর চলে গেছে। তিনি আবার চেঁচালেন,"আয় এদিকে। ত্রিপলটা নিয়ে আয় বলছি। নাহলে লোক দিয়ে ধরে আনাবো। শাস্তিও পাবি।" তিনি দেখলেন তাঁর ধমকে কাজ হয়েছে। লোক দু'টো ত্রিপলটা মাথার ওপর ধরে এদিকে ফিরে আসছে। কিন্তু তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিনি একবার চোখ রগড়ালেন। একী! লোক যেন দু'টো নয়! চারটে! তারপর আটটা... ষোলোটা... বত্রিশটা...! ক্রমশ বাড়ছে। যত কাছে আসছে তত বাড়ছে সংখ্যাটা। চন্দ্রনাথবাবুর চশমার পাওয়ার গণ্ডগোল করছে নাকি! রঙিন চশমা খুলে ফেললেন চোখ থেকে। সাদা চোখেও একই জিনিস দেখলেন। বাড়তে বাড়তে এখন অগুনতি লোক। এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। আশ্চর্য ভাবে ওই একটা ত্রিপলের নিচে সবার মাথা ঢেকে গেছে। আসতে আসতে ওরা খানিকটা তফাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। চন্দ্রনাথবাবু হতবাক হয়ে দেখছেন। ভীত হয়ে দেখছেন। তাঁর মাথায় ধরা ছাতা হাত থেকে খসে পড়ে গেছে।


🌹🌹

No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...