মহাপঞ্চমী থেকে শুরু হলো বিশেষ কিন্নর।
যারা কলম ধরেছেন তাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই।
ইতি
কিন্নর দলের পক্ষে
সম্পাদকমন্ডলীর সদস্যগণ
🙏
🌹🌹🌹
#সম্পর্কের_রসায়ন_সম্পাদক_ও_লেখক
#জ্যোতিপ্রকাশ_সাহা
দুটো গল্প দিয়ে শুরু করি। ঠিক গল্প নয় ঘটনা। আজ থেকে প্রায় তিপান্ন বছর আগে তৎকালীন সময়ের একজন নবীন লেখক আমেরিকা থেকে ফিরছেন। ভীষণ জনপ্রিয় লেখক তখন তিনি। দমদম বিমানবন্দরে নেমে তিনি ট্যাক্সিতে উঠে যাবেন এমন সময় দেখেন এক ভদ্রলোক ট্যাক্সির জানলা দিয়ে তাকে কিছু বলতে চাচ্ছেন। সেই লেখক তাঁকে দেখেই অবাক, সাগরদা আপনি? সেই ভদ্রলোক অর্থাৎ লেখকের সাগরদা বললেন, এদিকে এসেছিলাম, শুনলাম তুমি আসছো, তাই একটু অপেক্ষা করে গেলাম। তা বলি কি, এই বিদেশ ভ্রমণের লেখাটা মাথায় রেখো।
পাঠক, নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধে হচ্ছেনা, এই সাগরদাই হচ্ছে বিখ্যাত সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। হ্যাঁ, যখনকার কথা বলছি তখন সাগরময় ঘোষ খাতায়-কলমে সম্পাদক ছিলেন না। কিন্তু সেই সময়ে দেশ পত্রিকার সম্পাদক অশোক কুমার সরকার তাঁকে "দেশ" সম্পাদনার ক্ষেত্রে প্রায় সমস্ত ক্ষমতাই দিয়ে দিয়েছেন। তাই ভাল একটা লেখা যোগাড়ের জন্য তিনি বিমানবন্দর অবধি পৌঁছে গিয়েছিলেন। লেখক ছিলেন মনিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, যাকে আমরা 'শঙ্কর' নামেই চিনি। সৃষ্টি হয়েছিল 'এপার বাংলা ওপার বাংলা'। ধারাবাহিকভাবে সেই সময় ‘দেশে'তে প্রকাশিত হয়েছিল।
এই ঘটনাটা উল্লেখ করলাম এই কারণে যে একজন প্রকৃত সম্পাদক একজন লেখকের কাছ থেকে কিভাবে লেখা বের করে আনতে হয় সেটা জানেন এবং তার জন্য ধৈর্য ধরতে পারেন। ধৈর্যের কথা যখন উঠলো তখন আর একটা ঘটনার কথা বলি, রামকিঙ্কর বেইজকে নিয়ে সমরেশ বসুর 'দেখি নাই ফিরে' উপন্যাসের জন্য এই সাগরময় ঘোষ দশ বছর অপেক্ষা করেছিলেন।
আসলে সম্পাদককে একটু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হয়। কার কাছ থেকে ভালো লেখা পাওয়া যাবে, সেইটা আগেই তাকে বুঝতে হয়। তারপর লালন পালন। প্রবীণ নবীন সকল লেখকদের কাছ থেকে তার সেরা লেখাটা আদায় করার দক্ষতাই একজন সম্পাদকের মান নির্ধারিত করে। এই কাজে সম্পাদক সাগরময় ঘোষ অনেকটাই এগিয়ে থাকবেন। সম্পাদক অবশ্যই জ্ঞানী মানুষ হবেন, কিন্তু তার সেই জ্ঞানকে জাহির না করে লেখকদের মতকে প্রতিষ্ঠা দেওয়াই তার প্রধান কাজ হওয়া উচিত।
এ ব্যাপারে আর একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি। বুদ্ধদেব বসু তখন 'কবিতা' পত্রিকা করছেন। তরুণ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা তার কাছে পাঠিয়েছেন। কবিতাটির একটি লাইন সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু অন্যমত পোষণ করে কবিতাটি ফেরত পাঠালেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। উদ্দেশ্য কবিতাটি সুনীল আবার নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করে তার কাছে পাঠাবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন হয়ে গেলো সুনীল আর কবিতা তার কাছে পাঠাচ্ছেন না। তাই তিনি নিজেই সুনীলকে তাগাদা দিলেন তোমার কবিতা, কি হলো? সুনীল আবার সেই কবিতাটি এতোটুকু কাটাছেঁড়া না করে বুদ্ধদেব বসুর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। বুদ্ধদেব বসু বুঝলেন, এবং কবিতাটি তিনি তার পত্রিকায় ছাপতে দিলেন। অর্থাৎ তিনি নিজস্ব অহংকে বিসর্জন দিয়ে একজন তরুণ কবিকে মান্যতা দিলেন। একজন সম্পাদক এভাবেই লেখক-কবি তৈরি করেন। সাগরময় ঘোষ রসিকতা করে বলতেন, আমি তো স্টেজের মালিক, স্টেজ ভাড়া দিই, নাচবে তুমি। ভুগলে তুমি ভুগবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই অনন্য। একজন লেখককে বুঝিয়ে দেওয়া, লেখা ভালো না হলে তুমি কিন্তু আর পাঠক মনে জায়গা করে নিতে পারবে না।
এতো গেল বাণিজ্যিক কাগজের সম্পাদকের কথা। বাণিজ্যিক কাগজের সম্পাদকের অনেকগুলো সুবিধা থাকে। তারা লেখকের কাছ থেকে টাকা দিয়ে লেখা কেনেন, ফলে লেখক জানেন যদি পাঠকের পছন্দ না হয় তাহলে বাণিজ্যিক কাগজ আর তার লেখা চাইবে না, তাই সদা সচেষ্ট থাকেন লেখার মান নিয়ে। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের এই সুবিধাটুকু নেই। তারা লেখকের ভালো লেখাটুকু পাওয়ার জন্য কোন টাকা পয়সা দিতে পারেননা। তাই তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর জোর দিতে হয়। অধিকাংশ লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক একটা অহমিকায় ভোগেন। তারা নিজস্ব অহংবোধে ভাল লেখকদের পাত্তা দিতে চান না। এটা কখনই কাম্য নয়। লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের, যারা ভালো লিখছেন, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রটি মেরামত করতে হবে। কোন ঘটনায় লেখক এর ওপর ক্ষুব্ধ হলেও, যদি সে ভালো লেখে, তাকে আবার লেখার জন্য আহ্বান জানাতে হবে। সম্পাদকের নিজস্ব ইগোকে বর্জন করতে হবে। প্রকৃত সম্পাদক এটাই করে থাকেন। লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, লেখকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করে, ভালো লেখাটি আদায় করলে, তার পত্রিকাটিও যথার্থ মানে পৌঁছতে পারবে বলে মনে করি।
❣️❣️

No comments:
Post a Comment