আজ মহাঅষ্টমী। দেবী আমাদের জীবত্ব থেকে দেবত্বে উন্নীত করুন। সন্ধি পেরিয়ে আমরা যেন তাঁর অমৃত পরশ পাই।
🙏
আজকের গল্প দেবী আরাধনার গল্প। লিখেছেন এই সময়ের অন্যতম বলিষ্ঠ কলমকার মহুয়া মল্লিক।
#দেবতার_গ্রাস
#মহুয়া_মল্লিক
(এক)
‘টিকলিকে কি আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি মা?”
নিবেদিতা গোছগাছ করছিল, মেয়ের কথা কানে যেতেই সেসব থামিয়ে ঘুরে দাঁড়াল, “মানে, আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাস মানে?”
“এত মানে মানে করছ কেন? ইটস ভেরি সিম্পল। না বোঝার তো কিছু নেই।” নেল ফাইলিং করতে করতে রিয়া এবার ফুঁসে উঠল।
এই হয়েছে এক জ্বালা। শহরের মানুষদের এখন গ্রামে পুজো কাটানোটা একটা ফ্যাশান। অনেকেই ঠিক পুজোর আগে আগে গাঁ গঞ্জের বনেদি বাড়ির পুজোর সন্ধান করে বেড়ায়। তাদের সঙ্গী হয়েও অনেকে বহুবার গেছে। একেই পুজোর ব্যস্ততা, তারপর অতিথি আপ্যায়নে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়। সারা বছর বাইরে থাকে দায়িত্ব পালন করেনা, শরিকদের এই অভিযোগ শুনতে শুনতে এমনিতেই বিরক্ত হয়ে যায় নিবেদিতা। তার উপর প্রতিবারই সমীরের বন্ধুবান্ধব না হয় অফিস কলিগদের আসা। কেউ পুজোর চারদিন কাটিয়ে যায়, কেউ আবার একবেলা কাটিয়ে চলে যায়। তাদের খাওয়া দাওয়া, বিশ্রামের আয়োজন, পুরনো বিছানা বার করে রোদে দেওয়া সব নিবেদিতাকে একা সামলাতে হয়। জা’রা এড়িয়ে এড়িয়ে চলে। নিবেদিতা সব সামলে নেবার পর ভালমানুষের মত মুখ করে সামনে এসে বলে, “সারা বছর অফিস সামলে পুজোর কটা দিনও তোমার বিশ্রাম নেই।”
“আর বিশ্রাম!” নিবেদিতা ফোঁস করে উঠেও সামলে যায়। এরা তাকে তাতিয়ে দিয়ে মজা দেখতে চায়। ট্রলিটা মোটামুটি গোছান হয়ে গেছে। সমীরের নতুন দুটো শার্ট দরজির দোকান থেকে এসে গেলেই সে দুটো নিয়ে নিলেই কাজ শেষ। মেয়ের দিকে তাকায়, রিয়ার মুখে অভিমানের মেঘ থমকে আছে। ওর মাথায় হাত রেখে নিবেদিতা জিজ্ঞেস করে, “ওর বাড়ির লোক সঙ্গে যাবে? টিন এজার একটা মেয়েকে নিয়ে যাওয়া মানে অনেক দায়িত্ব, আমি সেটা ভেবেই একটু রিএক্ট করে ফেলেছিলাম।”
“যেন ওর বাড়ির লোক গেলে তুমি কত খুশি হতে? আর আমাদের গ্রামের লোকজন সব বাঘ না ভাল্লুক যে ওকে চোখেচোখে রাখতে হবে? আমি ওকে বারণ করে দেব মা।”
মেয়ের রাগ দেখে নিবেদিতা ফিক করে হেসে ফেলে। ঠিক আছে এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। প্রতি বছরই এমন কত গেস্ট তাদের সঙ্গী হয়। বরং রিয়া আর টিকলি একসঙ্গে ঘুরবে ফিরবে। যদিও রিয়া দিব্যি ওখানে মানিয়ে নেয় সবার সঙ্গে। মাটিতে বসে কলাপাতায় খাওয়া, মেঝেতে ঢালাও বিছানা করে শোয়া সবকিছুই মেয়ে হাসিমুখে মেনে নেয়। নিজের মেয়েকে পুজোর কটা দিন নিবেদিতা চিনতে পারেনা। শহুরে মেয়েটা এই কটা দিন যেন মাটির মেয়ে হয়ে যায়। কে বলবে এই মেয়েটাই অন্য সময়, পান থেকে চুন খসলে অশান্তিতে ফেটে পড়ে।
সমীর বলে, যাকে যেখানে মানায়। এই কংক্রিটের শহরে জোর করে আটকে রাখলেই কি আমরা এই শহরের হয়ে গেলাম?
“কে আটকে রেখেছে তোমাদের?” ভ্রু কুঁচকে নিবেদিতা সেইসব মুহূর্তে অবাক হয়ে সমীরকে দেখে। পুজো কেটে গেলেই সবকিছু আবার স্বাভাবিক। ঐ কটা দিন এ বাড়ির মানুষগুলো যেন একটা ঘোরের মধ্যে কাটায়। প্রথম প্রথম কলকাতার পুজো ছেড়ে গাঁয়েগঞ্জে পড়ে থাকতে নিবেদিতার একদম ভালো লাগতনা। একবার জোর করেই নিজের জন্য নেপাল যাবার টিকিট করে ফেলল। রিয়া তখন জন্মায়নি। সমীর কিছু বলেনি, টিকিটটা দেখে মুচকি হেসেছিল। তারপর বলেছিল, “কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে দেব, তুমি অসুস্থ। যাও নিজের মত কাটাও, আমার তরফ থেকে কোনও চাপ নেই।”
নিবেদিতা খুশি হয়েছিল, তবে সমীরের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মুচকি হাসির রহস্যটা ধরতে পারেনি। সেটা পেরেছিল সপ্তমীর রাত্রে। ষষ্ঠীর দিনটা নিবেদিতা একা ছটফট করেছে। সপ্তমীর সকালে তার ফ্লাইট। সে একা ঘুরতে যাচ্ছে শুনে মা বাবা চোখ কপালে তুলেছিল। অনেক মেয়েই এখন সোলো ট্রাভেলার হিসাবে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে, নিবেদিতা ল্যাপটপ খুলে সেইসব দেখিয়ে বাবা মাকে আশ্বস্ত করেছিল ঠিকই, কিন্তু ষষ্ঠী থেকেই কেমন অস্থিরতা বাড়তে শুরু করল। সপ্তমীর ভোরে ট্যুরটা ক্যান্সেল করে একটা গাড়ি নিয়ে শ্বশুরবাড়ির পুজোয় যোগ দিতে বেড়িয়ে পড়েছিল। ওকে দেখেই সমীরের মা, কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেছিল, “বলেছিলাম না জগজ্জননী ঠিক আমার বৌমাকে সুস্থ করে দেবেন।”
সপ্তমীর রাতে সিঁড়ির কোণে একটু একান্তে সমীর, নিবেদিতাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আমি জানতাম তুমি ঠিক এখানে ছুটে আসবে। তোমার লাফালাফি দেখছিলাম শুধু। মাঝখান থেকে কিছু টাকা গচ্চা গেল।”
“তুমি জানতে?” অবাক হয়ে নিবেদিতা জিজ্ঞেস করে। “হ্যাঁ জানতাম তো মা তোমাকে আমাদের এই জামগ্রামে ঠিক টেনে আনবেন।” ভুল বলেনি সমীর। সেই থেকে যতই হাবেভাবে বিরক্তি দেখাক, নিবেদিতা নিজেও এই কটা দিন নন্দীবাড়ির পুজো ছাড়া আর কিছু কল্পনা করতে পারেনা। সারাবছর এই দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
(দুই)
নন্দীবংশের দশ পুরুষ আগের দুই বংশধর, কুবেরশঙ্কর ও কামদাশঙ্কর নামের দুই যুবক উত্তর চব্বিশপরগনার হালিশহর থেকে হুগলী জেলার পান্ডুয়ার অন্তর্গত এই জামগ্রামে আসেন ভাগ্য অন্বেষণে। গ্রামেই একটি বটবৃক্ষের তলায় তাঁরা তেলেভাজার দোকান দেন। তেলেভাজা বোঝ তো? মাধবদাদু প্রতিবারের মত একই কাহিনী অতিথিদের শোনাতে শোনাতে রিয়াদের মত ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করেন। এইসব কেক পেস্ট্রি খাওয়া আদুরে বাচ্চারা কি তেলেভাজা বুঝবে? টিকলি ঘার নেড়ে জানায়, চপ, বেগুনিকে তেলেভাজা বলে। মাধবদাদু খুশি হয়। অতিথিদের মধ্যে বড়দের হাতে হাতে চায়ের কাপ। সবাই গল্পে মশগুল। আসলে এই বিশাল অট্টালিকার মত বাড়ি দেখেই সবাই বুঝে গেছে এর কন্দরে কন্দরে অনেক গল্প লুকিয়ে আছে। রিয়াই বলেছিল, “মাধবদাদু এই দুর্গা পুজো কেন শুরু হয় সেই গল্পটা শোনাও।” উৎসাহে মাধব দাদুর কোটরে ঢোকা চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে ওঠে। তিনি এ বাড়ির পুরনো ঢাকি, এখন তাঁর বংশধররা এই কাজ করে থাকে। টিকলি তাড়া দেয়।
মাধবদাদু শুরু করেন, তেলেভাজার দোকান বেশ ভালই চলছিল। একদিন দু’জনে দুপুরে দোকান বন্ধ করে পুকুর ঘাটে যান স্নান করতে। সেখানে গিয়ে তো চক্ষু চড়াক। এক ফকিরবাবা নিজের পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বার করে পুকুরের জলে পরিস্কার করছেন। এইরকম দৃশ্য দেখে দু’জনেই ভয়ে কাঁপতে থাকে। ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে ফকিরবাবা ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরান, তারপর বলেন, “যা দেখলি কারুকে বলবি না, এ জিনিস আমি কারুকে দেখাইনা। এই নে এই স্বর্ণমুদ্রাটা রাখ। এই দিয়ে নতুন ব্যাবসা শুরু কর, তোদের ভাগ্য ফিরে যাবে।
কুবেরশঙ্কর ও কামদাশঙ্কর পরের দিন ভোরের আলো ফোটার আগেই স্বর্ণমুদ্রাটি হাতে নিয়ে চলে যান ভাগ্য অন্বেষণে। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যান বিদ্যাধরী নদীর তীরে। সেখানে সেইসময় জাহাজ আসত। বেচাকেনা চলত। স্বর্ণমুদ্রাটি ব্যায় করে কিছু সুপুরি কিনে অপেক্ষা করতে থাকেন নদীর পাড়ে বসে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন, এক বিদেশী বণিক সমস্ত সুপুরি উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। সেই শুরু, তারপর তাদের নিজস্ব আড়ত হল। তাঁদের ব্যাবসা এতই ফুলেফেঁপে উঠল যে একসময় নন্দীরা পূর্বভারতের প্রধান সুপুরি রফতানিকারী ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেন।
ফকিরবাবার আশীর্বাদে একে একে সবই হল, ধনসম্পত্তি, মানসম্মান, প্রতিপত্তি, জামগ্রামের এই প্রাসাদ। দুর্গাপুজোর প্রচলনও হল। তবে প্রথম দিকে ভোগ দেওয়া প্রথার প্রচলন ছিলনা। প্রায় আড়াইশ বছর আগে একবার ব্যাবসায় প্রচুর লাভ হবার পর ভোগের প্রচলন হল। তবে এই বংশের পুজোর নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। নবমীর দিন ভোগ দেওয়া হয় মা’কে। আর এই ভোগ প্রথম দুজন ফকিরকে উৎসর্গ করা হয়, ফকিরদের খাওয়াদাওয়ার পর বাড়ির লোক সহ অতিথিরা ভোগ গ্রহণ করেন। আসলে নন্দীবংশের পূর্বপুরুষরা বিশ্বাস করতেন, ফকিরবাবার কৃপাতেই তাঁদের এই বাড়বাড়ন্ত। এখন তো দেশগ্রামেও তেমন ফকিরবাবাদের দেখা মেলা ভার! তাই দুইজন সজ্জন মুসলিম ব্যক্তিকে আগে ভোগ উৎসর্গ করা হয় এখন।
মন্ত্রমুগ্ধের মত সবাই এতক্ষণ মাধবকাকার মুখে পারিবারিক ইতিহাস, পুজোর উৎপত্তি শুনছিল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চূড়ান্ত নিদর্শন এই অজ পাড়াগাঁয়ের পুজোয়। কেউ কেউ বলল, “অনেক পুণ্য করলে এমন পুজো দেখার সৌভাগ্য হয়।”
টিকলি খুব এক্সাইটেড। রাত পোহালেই তো নবমী। এই আশ্চর্য ভোগ নিবেদন সে দুচোখ ভরে দেখবে।
(তিন)
মা কাকিমাদের মত রিয়া এবার লাল পাড় সাদা শাড়ি পরেছে। সামনের বছর টুয়েলভে উঠবে, এই আব্দারটুকু নিবেদিতা মেনে নিয়েছে। বুদ্ধি করে টিকলির জন্যও শেষ মুহূর্তে একইরকম আরেকটা শাড়ি কিনে ফেলেছিল। দুই বান্ধবী, কাকে একটা ম্যানেজ করে পান্ডুয়ার বাজার থেকে টানা নথ আনিয়েছে। দুজনেই সুন্দর করে সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টিকলি তো সকাল থেকে কতবার যে জিজ্ঞেস করেছে, “আন্টি ভোগ কটা নাগাদ শুরু হবে? ফকিরবাবারা কোথায় বসে খাবেন?” নিবেদিতা নৈবেদ্যের থালা সাজাতে সাজাতে বলে হবে হবে, সব সময় মত হবে। এই মেয়েটাকে জিন্স, কেপ্রি আর হটপ্যান্টের বাইরে কোনদিন অন্যকিছু পরতে দেখেনি। এই মেয়েও কটা দিন এখানকার মেয়েদের মতই সালোয়ার কামিজ পরেছে। আজ তো আবার শাড়ি পরে দিব্যি ম্যানেজ করে ফেলেছে। সত্যিই মায়ের লীলা। মায়ের ছোঁয়ায় সবাই কেমন পাল্টে যায়! উগ্রতা, নীচতা, হিংসা ভুলে সবাই আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠে। ঠাকুরদালানে বসেই হাসিমুখে দর্শনার্থী সামলাতে সামলাতে নিবেদিতা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিল একবার। কী অদ্ভূত প্রশান্তিতে ভরা মুখ, স্নিগ্ধ মাতৃ মূর্তির দিকে তাকালে বুকে ভরসা জাগে। দু”হাত কপালে ঠেকায় সে।
নিবেদিতা অনেকক্ষণ ধরে দেখছে বাড়ির পুরুষদের মধ্যে গুঞ্জন। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতেই তারা বারবার ঘড়ির দিকে চোখ রাখছে। ব্যাপারটা কি? কোনও সমস্যা নাকি? আশেপাশে মেয়ে দুটোও নেই, বাড়ির মহিলারা কাজে ব্যস্ত। কাকে যে জিজ্ঞেস করে নিবেদিতা ! নিজে প্রসাদের থালা নিয়ে বসে আছে, এসব ছেড়ে উঠতেও পারছেনা।
মাধবকাকা এসে ধুপ করে সিঁড়ির এক ধারে বসে থামে মাথা রাখে। “এদিকে তো বিপদ মেজমা, বেলা যে বয়ে যায়, এখনও তো বাবারা এসে পৌঁছল না। তারা না অন্নভোগ গ্রহণ করলে এতজন কখন খেতে বসবে বলুন তো?”
সর্বনাশ! বেলা যে বয়ে যাচ্ছে নিবেদিতা টের পায়নি। এবারে জনসমাগমও তেমন হয়েছে। প্রসাদ দিতে দিতে হিমসিম খেয়ে যেতে হচ্ছে। বেশ কয়েকবার মূল প্রসাদের সঙ্গে ফল কেটে মেশান হয়েছে। নিবেদিতা বলে, “কারুকে খোঁজ নিতে পাঠাচ্ছেনা কেন?”
ছোটকর্তা নিজে গেছে এনফিল্ড নিয়ে। দুজনকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে আসবে। সেটা শুনে আশ্বস্ত হয় নিবেদিতা। কিন্তু একটু পরেই সমীরের ছোট ভাই ফিরে এসে জানায়, “অতিথিদের পরিবারে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, তারা বর্ধমান গেছে, ফিরলেই এখানে চলে আসবে।”
মাথায় বজ্রাঘাত হয় সকলের। একেই ফকিরবাবাদের পাওয়া যায়না। অল্প সংখ্যক মুসলিম পরিবারের বসবাস, তাদের মধ্যে থেকেই অতিথি নির্বাচন করে নিমন্ত্রণ করা হয়। সবকিছুরই একটা নিয়ম আছে, হুট করে কারুকে ধরে এনে ভোগের থালার সামনে বসিয়ে দিলে তো হয়না! সমীরের ভাই বলছে, এত চিন্তা করার কিছু নেই। ফোনে কথা হয়েছে। মেমারী রেলগেটে গাড়ি আটকে গেছে তাই দেরি হচ্ছে, ওঁরা এলেন বলে।
একটু পরেই সবাই দেখে সেই দুজনের বদলে অন্য দুইজন মুসলিম ভদ্রলোক হেঁটে আসছেন ঠাকুরদালানের দিকে। মাকে করজোড়ে প্রণাম করে বাড়ির পুরুষদের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন। “আজ্ঞে, আমরা সেলিমদের আত্মীয়, আপনাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে আমাদেরকে পাঠান হল।”
সাদরে আপ্যায়ন করে ভিতর মহলে ওঁদের বসান হল। বাড়ির বড়বউ পঞ্চব্যাঞ্জনের থালা সাজিয়ে দিল অতিথিদের সামনে। তৃপ্তি করে দুজনে খেয়ে উঠে বললেন, “নিন আপনাদের কাজ শুরু করে দিন। গনগনে রোদে অতিথিরা অপেক্ষা করছেন। আমাদের নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, আমরা একটু ঘুরেফিরে চারদিকটা দেখি।”
হৈ হৈ করে কর্মযজ্ঞ শুরু হল। প্রায় তিনশ মানুষ ভোগ খাবার আশায় অপেক্ষা করে আছেন। ত্রিপলের ছাউনির নিচে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। নিবেদিতা অনেকক্ষণ থেকে রিয়াকে দেখতে পাচ্ছেনা। কোথায় গেল মেয়েটা? ওর ভাইবোনেদের বাহিনী তো এদিকেই আছে। এমনকি টিকলিকেও দু একবার দেখেছে। কিন্তু রিয়া, সে কই? মায়ের মন কু ডাকে। নিবেদিতা এসব ছেড়ে একটু এগিয়ে যাচ্ছিল, পিছন থেকে কে যেন ডাকল, “মেজমাকে বল, মিষ্টি আর পান মেজমার দায়িত্বে আছে।”
একটু পরেই আবার একটা হৈ হৈ। মাধবকাকাই খবর এনে দিল, “মেজমা শুনেছেন? সেলিম বাবুরা তো এসে হাজির হয়েছেন, তাঁরা অবাক, কোনও আত্মীয়কে তো তাঁরা পাঠাননি।” নিবেদিতার এসবে মনে নেই, হবে কেউ। শহরেও তো কত বিয়ে বাড়িতে আমন্ত্রিতের বদলে অন্য লোকজন খেয়ে যায়। মেয়েটা যে কোথায় গেল!
পল্টু ছুটতে ছুটতে আসে, “ও মেজমা, রিয়াদিদি পুকুর পাড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।” নিবেদিতা সব ছেড়ে পড়িমরি দৌড়ায়। সঙ্গে টিকলি সহ আরও অনেকে। চোখেমুখে জল ছিটিয়ে রিয়ার জ্ঞান ফেরান হল। সমীর গজগজ করছে, “নিশ্চয় শাড়ি পরে হোঁচট খেয়েছে, এই রোদের মধ্যে না ঘুরে ঠাকুরদালানে বসতে পারত।”
রিয়া চোখ খুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। তারপর পুকুর ঘাটের বাঁধানো সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, “এখানেই তো সেই শেরওয়ানি পরা ভদ্রলোক ছিলেন, কোথায় গেলেন?” নিবেদিতার মুখেচোখে ভয়। সেই মুসলিম ভদ্রলোকদের কারুকে উদেশ্য করেই রিয়া কিছু বলছে। লোকটা কি গাছে ঘেরা নির্জন এই পুকুর পাড়ে মেয়েটাকে একা পেয়ে...
“লোকটা না খাবার পর এদিকে এল, তারপর পেট থেকে নাড়িভুঁড়িগুলো বার করে জলে ধুচ্ছিল। জলে আমার ছায়া পড়তেই আস্তে আস্তে মুখ ঘুরিয়ে আমাকে দেখে হাসল। তারপর বলল, বেটি এ জিনিস আমি কারুকে দেখাইনা, তুই দেখে ফেলেছিস, তোর খুব ভাল হবে, আমি দোয়া করছি।” শিউরে উঠলেন উপস্থিত সবাই। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল প্রত্যেকের। ফকিরবাবা আজও নন্দী বংশকে বিপদআপদের হাত থেকে আগলে রাখছেন, বুঝতে কারুর অসুবিধা হলনা। টিকলি জীবনেও এমন পুজো কোনদিন দেখেনি। সবাইকে দেখে টিকলিও মাথায় হাত ছোঁয়াল, যদিও জানেনা মা দুর্গা নাকি ফকিরবাবা কার জন্য এই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। নাকি সবশক্তির এক অদ্বিতীয় আধারের উদ্দেশে সবাই এই নবমীতে প্রণত !
( মূল তথ্যকে অবিকৃত রেখে এই কাল্পনিক কাহিনি রচনা করা হয়েছে।
তথ্য সূত্র - মুসলমানের দুর্গাপুজো, চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য)
🌹🌹

No comments:
Post a Comment