Saturday, 10 October 2020

আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ ৬

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#তৃতীয়_পর্ব


#আমন্ত্রিত_লেখাগুচ্ছ


প্রথম ভাগ


#সাক্ষাৎকার


#নাটকের_জীবন_জীবনের_নাটক


 


#সৌম্যদেব_বসু


কিন্নর দল সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য – আপনি আপনার স্মৃতি থেকে বাংলা নাট্যজগতের কথা বলুন সৌম্যদা, সেই সব কথা যা আমরা কেউ জানিনা। সেটা ব্যক্তিগত হতে পারে বা গ্রুপ থিয়েটার নিয়ে হতে পারে। ক্রমশ বিস্মৃতিতে চলে যাচ্ছে সেসময়ের নাট্যজগত। তাই আপনার কাছে এসেছি।


সৌম্যদেব বসু – তুমি যা বলছ সেটা একটা ব্রড ব্যাপার। এই নিয়ে বলতে গেলে তো ভীষণ একটা বিশাল ব্যাপার হয়। মোটা বই হয়ে যায়। তার চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে বলতে শুরু করলে সেটা ছুঁয়ে যেটুকু আসে আর কি।


কিন্নর দল – হ্যাঁ, ওইটুকুই।


সৌম্যদা – যদিও আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারটা তত গুরুত্বপূর্ণ হবে কি? তবু বলছ যখন চেষ্টা করে দেখি। আসলে অনলাইন তো আমি দেখিনা। এটা ঠিক বুঝতে পারছি বলে মনে হচ্ছেনা।


কিন্নর দল – না না। আপনার স্মৃতি থেকেই বলুন। নিশ্চয় লেখাটা আপনাকে দেখাবো।


সৌম্যদা – না না। সে ঠিক আছে। এখন আমি তো সোজাসুজি নাটকে আসিনি। মূলত  কবিতার লোক। আবৃত্তি। পার্থদা গৌরীদির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মানে পার্থ ঘোষ গৌরী ঘোষ আর কি। মনে আছে ‘রাজা সাজা’তে প্রথম অভিনয় করি। তখন প্রবীর মুখোপাধ্যায় বলে একজন গ্রুপ করতেন। পরবর্তী কালে রবীন্দ্রসদন ও শিশির মঞ্চের তিনি এডমিনিস্ট্রেটর হয়েছিলেন। তাঁর একটা নাটকের দল ছিল। সেই দলে আমি নাটক করতাম। ক্রেমব্রাউন মঞ্চ আর আর একটা কি বলো? ওদিকে ঐ শেয়ালদার দিকে আর একটি মঞ্চ…


কিন্নর দল – ওদিকে তখন কি ছিল কিছুই তো জানিনা।


সৌম্যদা – হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। নেতাজী সুভাষ ইন্সটিটিউট। কাইজার স্ট্রিটের ওদিকে। সেইখানে তখন রিহার্সাল করতে যাই। তখন নাটক হচ্ছিল ‘গিরিশচন্দ্র’। সেখানে মুখ্য ভূমিকাটা ছিল অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির। রোলটা আমি করতাম। গান গেয়ে গেয়ে অভিনয় করতাম,  জানো। তো তখন খবর পেলুম নেতাজী সুভাষ ইন্সটিটিউটে অল বেঙ্গল আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হচ্ছে। আমি তখন আবৃত্তি প্রতিযোগিতা প্রচুর করি। গিয়ে নাম দিয়ে এলাম। পরের দিন আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হলো। দেখলাম আকাশবাণীর সব বড় বড় লোকেরা প্রতিযোগিতার বিচারক। প্রচুর প্রতিযোগী। পরের দিন গেলাম খোঁজ নিতে -দাদা, আমি কাল এসেছিলাম। আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিলাম। -ও হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। বলুন বলুন। কী যেন আপনার নামটা? তো আমি নাম বললুম। সে তো আমার দিকে প্রায় চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। ভয় পেয়ে গেলাম। কী হল রে বাবা। ভদ্রলোক বললেন, আপনি ফার্স্ট হয়েছেন। কিন্তু সেটা কথা নয়। কথা হল, পার্থ ঘোষ বলেছে আপনাকে একটু দেখা করতে। আমি তো হতভম্ব, বললাম, -ধ্যাত, কি বলছেন (হেসে)! ভদ্রলোক বললেন -আমি আপনাকে মিথ্যে কথা বলব কেন? আপনি চলে যান আপনার সময় মতন। এখন কী ব্যাপার জানো? আমি মফস্বলের ছেলে। আকাশবাণী দেখিনি। বাইরে থেকে দেখেছি। ভেতরে তো ঢুকিনি। তখন চাকরি করি। সেই কলকাতায় এসে পঙ্কজ ঘোষ নামে এক ভদ্রলোকের নাটকের দলে ভিড়ি। সেই দিয়ে শুরু। তারপর গেলাম আকাশবাণীতে। গিয়ে খোঁজ করতে জানলাম উনি এখন স্টুডিওতে। অপেক্ষা করতে লাগলাম। তখন পার্থদা ভীষণ স্মোক করতেন। স্মোক করার জন্য উনি বাইরে এসে আমাকে দেখতে পেলেন। চারমিনার খেতেন খুব। আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন -আরে সৌম্য! তুমি এসে গেছ? আমি তো চমকে গেছি। উনি আমার নাম মনে রেখেছেন? বুঝতেই পারছ, পার্থ ঘোষ আমার নাম মনে রেখেছেন! আমি গলে যাই আর কি! সত্তরের দশকের প্রথম দিক তখন। কাজ সেরে এসে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, রেজাল্ট কি হল? বললাম। উত্তরে বললেন, হ্যাঁ সে তো হবারই কথা। আমি তখন ‘বাঁশি’ খুব আবৃত্তি করতাম। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথা থেকে ‘বাঁশি’ শিখলে? এখন আমি তো কারুর কাছে আবৃত্তি শিখিনি। সেলফ টট যাকে বলে। শুনে বললেন, গৌরীও তাই বলছিল। আসলে আমরা তো অনেক জায়গায় আবৃত্তি করতে যাই। রবীন্দ্রসদন অমুক টমুক। যদি আমাদের সঙ্গে করতে বলি, রাজি আছো কি? আসবে? আমি আর একবার মরে গেলাম। কী বলছেন! আমি ওনাদের সঙ্গে আবৃত্তির সুযোগ পাবো? এখন বলো, এই লোকটার কি দরকার ছিল সৌম্যদেব বসুকে তুলে আনার? আসলে এরা এমনই ছিলেন।


এঁর সূত্রেই আমি মেঘনাদবধ কাব্য যে করতে পেরেছিলাম। একটা আবৃত্তির আসর হলো খুব বড় করে যেখানে অজিতেশ রাবণ করতেন। তো সেখানে পার্থদা নিয়ে গেলো।


কিন্নর দলঃ আমরা কিন্তু এগুলো খুব মিস করি। আচ্ছা, এই অনুষ্ঠানগুলো একটা কি রেকর্ড করা যেত না? বলুন তো?


সৌম্যদাঃ সত্যিই তাই। খুব বড় জিনিস হারিয়েছি। আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু এটার কোনো রেকর্ড নেই সত্যি। কাজী সব্যসাচী সূত্রধর করেছিলেন। দু একবার অজিতেশ রাবণ করেছিলেন। সে এক বিশাল ব্যপার। সেই সময়তেই, আমি থিয়েটারের লোক, আগে আগে গিয়ে বসতুম, গিয়ে দেখতাম চুপ করে বসে আছেন। একা অজিতেশ। এত সময়ানুবর্তিতা! গিয়ে পাশে বসতুম। বললেন, ও, তুমি নাটক করো। একথা সেকথা হতে হতে বললেন, নাটক করার জন্য চাকরিটা ছাড়তে পারবে? একেবারে ডায়রেক্ট। আমি বললুম, না। বললেন, তাহলে হবেনা। সোজা একদম। নাটক করতে গেলে হোল টাইমার হতে হবে। আমি তখন কী বলব? সবে একটা চাকরি পেয়েছি। কাঠ বেকার ছিলুম। বাবা রিটায়ার করে গেছেন। কলসীর জল শেষ। টিউশানি করি প্রচুর। ঐ করে একটা সরকারি ক্লার্কের সমান রোজগার করি। বাবা বহুকাল রিটায়ার করেছেন। একেবারে সাধারণ একটা রাজ্য সরকারের চাকরি ছিল বাবার। কী মাইনে বলো না! পাঁচ টাকা কাটাত পিএফে।


কিন্নরদলঃ অথচ দেখুন সেই সময় এমন বাবা মায়েদের আমরা কত শ্রদ্ধা করেছি ভালো বেসেছি…


সৌম্যদাঃ শুধু তাই নয়, এখন আমার মনে হয় যে আমি তাঁদের কত কষ্ট দিয়েছি। আমি আমার বউ আমার ছেলে, তিনজনে মিলে বেরিয়ে যেতাম নাটক করতে। যতটা সম্ভব রান্নাবান্না গুছিয়ে রেখে যেত আমার বউ। আমরা তখন তৃপ্তি মিত্রর কাছে আছি। নাটক শেষে এক একদিন এমন রাত হয়ে যেত যে কারোর না কারোর বাড়ি রয়ে গেছি। বাবা মা তো একা! এখন মনে হয় আমি যদি আবার জন্মাই আর উনি যদি আবার বলেন, আবার নাটক করবি? আমি বলব, দিদি, না। ও যা করেছি আর হবেনা। আমি বাবা মায়ের এক ছেলে। তাঁদের সাপোর্ট না থাকলে এতটা হয়ে উঠত না।


কিন্নরদলঃ বাবা মায়ের সাপোর্ট আর বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটা না থাকলে হয়না, এও ঠিক।


সৌম্যদাঃ সেই অর্থে কিন্তু আমার বাবা মা যে নাটকের লোক ছিলেন তা নয়। তবে আমাকে কখনও বাধা দেননি সেটা ঠিক। বরং উৎসাহ দিয়েছেন। আমার এলাকা থেকে বেরিয়ে এসে এভাবে কলকাতাকেন্দ্রিক নাটকে ঢুকে পড়া আর কারোর সেভাবে হয়েছে বলে জানিনা। তৃপ্তি মিত্রর ওখান থেকে তারপর রাজা সাজা। সেখান থেকে একজন বহুরূপী ভেঙে দল করেছিলেন, নামটা স্মরণে আসছেনা, সেখানে গেলাম…


কিন্নরদলঃ আচ্ছা, এই যে দল ভেঙে ভেঙে যাওয়া, এটা কেন? এতে তো সার্বিকভাবে ক্ষতিই হয়েছে নাটকের?


সৌম্যদাঃ পারসোনালিটি ক্ল্যাশ! মুখ্য জায়গাটা তো তাই। তারপরে আরও অনেক ব্যাপার থাকে। মুখ্য হলো, লাইম লাইটে কে থাকবে। ধরো আমরা যে তৃপ্তি মিত্রর গ্রুপে যে রক্তকরবী করতাম, সেখানে সতীনাথ করত রাজা, আমার বউ অঙ্গনা করত নন্দিনী, আমি করতাম বিশু। তুমি জানো তো? অঙ্গনা তামিল। সে কিন্তু বেসিক্যালি নাটকের মেয়ে নয়। নাচের। আমার পাল্লায় পড়ে সে এলো নাটকে। যা হয় আর কি (হাসি)। এই সময় আমার অফিসে বিসর্জন হচ্ছে, অভিনেত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। অপর্ণা কে হবে? তখন রানিকে (আমার বউ) নিয়ে গেলাম। সবে বিয়ে করেছি। তখন বাড়িতে বেশ একটা গোলমাল শুরু হল। হ্যাঁ? নতুন বউ কিনা অফিসের ক্লাবে নাটক করবে? এটা একটু হয়েছিল। বোঝাতে হল, অন্য কোথাও তো নয়। নিজেদের ক্লাবে।


কিন্নরদলঃ সে সময় একটা ইনহিবিশান ছিল। ভাড়াটে অভিনেত্রী। স্টার থিয়েটারে রবিবারের সকালে অফিস রিক্রিয়েশান ক্লাবের নাটক, বৈকুণ্ঠের উইল, অভিনয় করছেন মলিনা দেবী। আমরা দেখেছি। তখন ওরকম হলে ঢুকে পড়া যেত। বাচ্চার দল বসে পড়তাম নাটক দেখতে। সরযু দেবীকেও দেখেছি।


সৌম্যদাঃ হ্যাঁ। মলিনা দেবীর দুই নাতি তো আমাদের সঙ্গে নাটক করত তৃপ্তি মিত্রর গ্রুপে। আমরা ওনার বাড়িতে গিয়ে থেকেছি। নাটকের শেষে রাত হয়ে গেলে থেকে যাওয়া হতো। এখন মনে হয় বাড়ির লোকগুলোকে অত্যাচারও করেছি।


কিন্নরদলঃ না। তা কেন? সেসময় আমরা এভাবেই অভ্যস্ত ছিলাম। এখন একে অত্যাচার মনে করা হয়।


সৌম্যদাঃ এখন তো থিয়েটারের জায়গাগুলোও তো বদলে গেছে। এরকম পাল্টে পাল্টে যাবেই।


কিন্নরদলঃ থিয়েটারও আর মধ্যবিত্তর নেই, এটা মনে হয় সব দেখে।


সৌম্যদাঃ না নেই। একদম নেই। আর মধ্যবিত্ত তো নিজেই পাল্টে গেছে। সে তো এখন উচ্চ মধ্যবিত্ত। গণ্ডগোল এখানেই। মানুষের পকেটে এখন প্রচুর ডিসপোজেবল মানি। খুব মুশকিল। অপব্যায় করার প্রচুর সুযোগ। তারা এখন ভোগে চলে গেছে। আগে যত আন্দোলন অমুক তসুক, সব তো মধ্যবিত্ত থেকেই। এখন যখন তার পকেটে পয়সা এসে গেছে সে আর ঐ আন্দোলনে যায়না। সে এখন স্কচের বোতল খুলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে বসে পড়ে। নাটকের জায়গাতেও তো এই ছবি, কোনো সন্দেহ নেই! এখন তো থিয়েটারের কত লোকজন দেখি গাড়ি করে গ্রুপে আসছে। এটাকে খারাপ বলছিনা। দেখো এরা স্টেজ করছে, পাশাপাশি সিরিয়ালও করছে। এটার ভালো দিকও আছে। আবার খারাপ দিকও অনেক। স্টার তৈরি হচ্ছে। দেবশঙ্কর আছে, একটা ঝুল নাটক দেখতে চলে গেলো। হাউজফুল! অত্যন্ত ভালো নাটক করেন সীমা মুখোপাধ্যায়। অসম্ভব ভালো। কেউ তাঁর নাটক দেখতে যায়না। কারণ বক্স নেই। ভাবতে পারো? কাকে দেখতে যাচ্ছে? কৌশিক সেন। স্টার।


কিন্নরদলঃ আপনি শেষ নাটকটা কবে করলেন সেটা বলুন সৌম্যদা।


সৌম্যদাঃ সম্ভবত রক্তকরবী, ধরো পঁচাশি ছিয়াশি সাল। তার একটু আগেই আমি আকাশবাণীতে নাটকে পাশ করেছি। জগন্নাথদা ঊর্মিদি এদের সঙ্গে বাইরে বাইরে শ্রুতি নাটকের অনুষ্ঠান করছি। এরপরে তৃপ্তি মিত্রর কাছে এলে ব্যাপারটা এরকম হল, যে অন্য আর কিছু করতে পারবেনা। যেটা বলতে ভুল করছি, থিয়েটার সেন্টারের সঙ্গে আমরা খুব ভালোভাবে যুক্ত হয়েছিলাম। যে নাটকের কথা কেউ বলেনা আজকাল, সেটা হল অভিজ্ঞান শকুন্তলম। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের মাঠে। সেখানে পুরো কণ্ব মুনির আশ্রম তৈরি করা হয়েছিল। মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন তরুণ রায় দীপান্বিতা রায়। দেবরাজ এবং অনুরাধা। অনসূয়া ও প্রিয়ম্বদার একটিতে আমার গিন্নী করত। এটা কিন্তু একটা দারুণ ব্যাপার হয়েছিল। কিন্তু এটাকে একদম গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।


কিন্নরদলঃ কেন?


সৌম্যদাঃ কারণ তরুণ রায়কেই গুরুত্ব দেওয়া হতো না।


কিন্নরদলঃ কী অন্যায়!


সৌম্যদাঃ হ্যাঁ, অন্যায় তো বটেই! কারণ রাজনৈতিক। উনি ছিলেন বেসিক্যালি কংগ্রেস। যেমন তপন সিংহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী তপন সিংহকে দাদাসাহেব ফালকে দেওয়াতে তবে গুরুত্ব পেলেন। শুধু তো সত্যজিত ঋত্বিক আর মৃণাল! আজকে একাঙ্ক নাটক যে প্রতিযোগিতা হয়, কেউ জানেনা এর শুরু তরুণ রায়ের হাতে, নিজের বাড়িতে একটি ছোট্ট মঞ্চ করে। একশোটি সিট ছিল। প্রথম সেখানেই সারা ভারত একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতা হয়। শম্ভু মিত্র তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্রেরা বিচারক হিসেবে থাকতেন। কেউ জানেনা।


কিন্নরদলঃ লজ্জার কথা। আমাদের সমস্ত ঐতিহ্য আমরা গুলে খেয়ে ফেলেছি।


সৌম্যদাঃ সব নাটকের মধ্যে আমি অভিজ্ঞান শকুন্তলম নিয়েই কথা বলছি। কারণ ওর গুরুত্ব আছে। দেবরাজ এই নাটকে তিনটে ভাষারীতি ব্যবহার করেছে। সংস্কৃত প্রাকৃতগন্ধী বাংলা ও একেবারে কলকিয়াল বাংলা, তিনটেই ব্যবহার করেছে। প্রচুর নাচ ছিল। গানের ডিরেকশান দিয়েছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। ফোক ডান্স ছিল। আমি নেচে নেচে গান গেয়ে পার্ট করেছি। এই ডান্সের ডিরেকশান দিয়েছিলেন শম্ভু ভট্টাচার্য। আবার ক্লাসিকাল যে নাচ, অনসূয়া প্রিয়ম্বদার নৃত্য পরিকল্পনা করেছিলেন মুরলীধর মাঝি ও এইচ মুনরো। মুরলীধর মাঝি তো ওড়িশি আর মুনরো ছিলেন কুচিপুরিতে বিখ্যাত। তিনজন বিখ্যাত ডান্সার নাচের পরিকল্পনা করেছিলেন। এবং বাঁকুড়া থেকে এসেছিল ছউ নাচের শিল্পীরা। যখন মাছের পেট কেটে আংটিটা বের করা হচ্ছে তখন নাচ গান করে পার্ট করেছি। একটা কথাও কেউ বলেনা। আমি বিভাস চক্রবর্তীকে বলেছিলাম, তার কারণ তো একটাই বিভাসদা? উনি কংগ্রেস করতেন। বিভাসদা বললেন, হ্যাঁ, ইউ আর রাইট। চৌত্রিশ বছরের শাসন তো! খাতায় নাম লেখানো নেই! তাই! এদের স্থান নেই।


 এই নাটকের একটি মাত্র শো করা গিয়েছিল ঐ সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের মাঠে। এবং আমরা এইটাতেই আমন্ত্রিত হলাম সারা ভারতবর্ষের উজ্জয়িনীতে সংস্কৃত নাট্য সমারোহ হয়, সেখানে আমরা অভিনয় করলাম। বম্বেতেও শো করি। তখন অমল পালেকর এসেছিলেন খবর নিতে যে, কলকাতা থেকে একটি দল অভিজ্ঞান শকুন্তলম করছে। দেবরাজ সহ আমাদের সঙ্গেও কথা হল। তরুণ রায়ও ছিলেন। এই যে এখন দেবশঙ্কর হালদারের মতো অভিনেতারা কোনো নির্দিষ্ট দলে আটকে নেই, এই ব্যাপারটা কতকাল আগে মেসোমশাই মানে তরুণ রায়, করেছিলেন। দিবারাত্র ওখানে পড়ে থাকতুম তো! ঐ যে মঞ্চ, থিয়েটার সেন্টার, আজ তার চিহ্নমাত্র নেই। একটা ছোট্ট ফলকে কেবল লেখা আছে এখানে থিয়েটার সেন্টার ছিল। এখন সেখানে আবাসন। সে বাড়ি ভাঙা পড়ে গেছে।


দেবরাজ অনেক অন্যরকমের নাটক করেছে। বিষবৃক্ষ করত। তাতে রানি একটা লিড রোল করত। মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে দিবারাত্রির কাব্যের রিহার্সাল শুরু হয়েছিল। কিন্তু ওটা অভিনয় হল না। বাস্তবিক থিয়েটার সেন্টারের সূত্রে আমরা সারা ভারত ঘুরেছি। পুজোর সময় দিল্লি বম্বে উড়িষ্যা উজ্জয়িনী সব জায়গায় যেতাম। সে যে কী আনন্দ! ট্রেনে করে বাঙালি দল হইহই করতে করতে চলেছি। সে এক অন্য আনন্দ।


তুমি লিখো এটা। তৃপ্তি মিত্র, আফটার শম্ভু মিত্র, রক্তকরবী করেছিলেন। সেটা নিয়েও কিন্তু তথাকথিত মধ্যবিত্ত সমাজ গুরুত্ব দেয়নি। লিখো কিন্তু।


কিন্নরদলঃ আমাদের একটা পুরুষতান্ত্রিকতা আছে না? শম্ভু মিত্রর ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে উনি একক দল করছেন, এর প্রশংসা? মানতে পারে না মানুষ।


সৌম্যদাঃ একটা বই আছে জানো। নাট্য আন্দোলনের তিরিশ বছর। একটা রূপরেখা আছে। কারা করেছে কোথায় তিরিশ বছর যাবত, গ্রুপগুলোর নাম, আশ্চর্য আশ্চর্য রকমের সব গল্প, লেখালিখি আছে। পড়ে বেশ চমকে যেতে হয়। 


এখানে খানিকটা অংশ আছে। যেখানে আমাদের তরুণ  রায়কে নিয়ে থিয়েটার সেন্টার, সেখানে ওরা বলছে যে, আজ একাঙ্ক নাটকের যে জোয়ার এসেছে দিকে দিকে একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, নবতরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে,  তাকে যদি আমরা স্বীকার করি তবে তার মূল খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই,  ১৯৫৫ সালে তরুণ রায়ের থিয়েটার সেন্টারে তার কাজ শুরু।  এবং অমৃতবাজার বলছে ভারতবর্ষে এই ধরনের প্রচেষ্টা এই প্রথম। একটা বাড়িতে এইভাবে হল করে থিয়েটার সেন্টার বলে একটা প্রতিষ্ঠান চালু কতখানি পাশে থাকলে সম্ভব!


 স্টেটসম্যান লিখছে, A well equipped and excellently designed miniature stage and auditorium for the first time to uphold opportunities to the various dramatic groups with meager resources to produce experimental plays regularly.


এঁদের মধ্যে রয়েছেন তারাশঙ্কর, অহীন্দ্র চৌধুরী, শম্ভু মিত্র। উৎকর্ষ বিচারের ভার যাদের ওপর ছিল আর কি। এছাড়া প্রফুল্ল রায় মোহন সাগর, প্রেমেন্দ্র মিত্র কে এম ওলাধা, বি এন  সিংহ প্রমুখ। মানে  থিয়েটার সেন্টার শুধু যে প্রতিযোগিতা করে ক্ষান্ত ছিলেন তা নয়,  ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষাতেও নাট্য উৎসব করেছিলেন চার বছর ধরে।


 এই উৎসবে অংশ নিয়েছিল বহুরূপী, লিটল থিয়েটার, মুখোশ,  অনামিকা,হিন্দি সাঁঝঘর, এমেচার থিয়েটার গ্রুপ, পাঞ্জাবী অন্ধ্র অ্যাসোসিয়েশন, গুজরাট সাহিত্য মন্দির ইত্যাদি।


  এর পর একটা চিঠি দিয়েছেন বইতে, আনন্দবাজার পত্রিকায় পরাজিত নায়ক দেখার পর সন্তোষ কুমার ঘোষ একটা চিঠি লিখেছেন।


লেখক লিখছেন:


 সন্তোষ কুমার ঘোষ একটা খোলা চিঠি লিখেছেন, সেটা আমি এখানে ছেপে দিলুম। লেখকের নাম সুনীল দত্ত। সন্তোষ কুমার ঘোষ লিখছেন, 


“রাজনীতি নিয়ে খোলা চিঠি লিখেছিলাম মনে পড়ছে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী কে।  কিন্তু এবারের চিঠিটা তরুণ বাবু আপনাকে।  অব্যবহিতহেতু আপনি পরাজিত নায়ককে নিয়ে  জয়যাত্রায়  বেরিয়েছেন। থিয়েটার সেন্টার নামের ছোট কেন্দ্রবিন্দুতে ছাড়িয়ে আপনি করেছেন বৃহত্তর পরিধিতে। আগামী শুক্রবার ফাইন আর্ট একাডেমির প্রেক্ষাগৃহে, পরে শুনেছি দেশের নানা দিক থেকে বেরিয়ে যাবার বাসনাও আপনার আছে। সাহসের তারিফ করি আপনার সেই সঙ্গে বলিহারিও বলি। সাহসের কথাটা  উঠছে এইজন্যে তরুণবাবু, আপনার পেছনে তো কোন দলগত প্রচার নেই? পৃষ্ঠের  পোষণ যাকে বলে? এতোদিন ধরে এতো নাটক করলেন, কিন্তু কি সোচ্চারে কি কানাকানিতে কাউকে  তো কোনো উচ্চবাচ্য করতে শুনিনি ? হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন যাকে বলে, আপনার বেলায় তো এতোটুকু নেই?  তার কারণ যতদূর জানি আপনি কখনো কোন আখড়ায় নাম লেখাননি। নিজের সাধ্য বিশ্বাস আর আদর্শে স্থিত আছেন। বাংলা মঞ্চের জন্য অনেকে অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু নিজের বসতবাড়িতে প্রতিকূল অবস্থায় একটা থিয়েটার বসিয়েছেন, বহালও রেখেছেন, কে! কজন! এই নিষ্ঠা এই আদর্শ পুড়েও যা পোড়েনি, অথচ তথাকথিত প্রাগতিক হাওয়া পালে লাগালে এর চেয়ে ঢের বেশি আপনার হিল্লে হয়ে যেত। অনেকের হয়েছে। এই দেখুননা, আপনার নাটক তো কম দেখলাম না! কম সে কম দশ বারোটা। কই উপযাচক হয়ে কখনো কিছু লিখেছি? না। আপনার বেলায় যে সংকোচ বোধ করেছি অন্যের বেলায় কিন্তু সেটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু এবারের না লিখে পারছিনা তরুণ বাবু। আপনার পরাজিত নায়ক আমার সমস্ত দ্বিধা প্রতিরোধ কে পরাস্ত করেছে।”  


কিন্নরদলঃ নাটকের বিষয়টা কি?


সৌম্যদাঃ নাটকের বিষয়টা হলো এক প্রবঞ্চকের গল্প। মনে করো পরাজিত এ নাটকের নায়িকাও “জীবনে যে মেয়েটি বারবার কোন প্রতারিত হলো পরাজিত মানুষের হাতে, শেষ ঘটনায় দেখছি আর একবার পরাজিত সে। মাত্র দু'তিনদিনের সাহচর্য্যে সাচ্চা মানুষ বলে যাকে গ্রহণ করতে যাচ্ছিল,  ভালোও বেসে ফেলেছিল কিনা বলা যায়না। দু'ঘণ্টার ঘাত-প্রতিঘাতে অভিনয় দেখা গেল সে মানুষটাও খড় মাটির।  

তার সব রঙ ধুয়ে গলে কাদা হয়ে গেছে। এই ট্রাজেডি প্রধানত ওই মেয়েটিরই যাকে দীপান্বিতা অতি সাবলীল অভিনয়ে অত্যন্ত বিশ্বাসী মর্মগ্রাহী রূপ দিয়েছেন। আপনার অভিনীত চরিত্রটিতে তবু বাচনে আতিশয্য আছে, শেষক্ষণের গদগদ প্রলাপের সংলাপের তো তুলনাই নেই, কিন্তু স্বভাবী ও স্বচ্ছন্দ অভিনয় কতদূর যেতে পারে এই নাটকে দীপান্বিতা ও তার কলাকৌশল তার উদাহরণ।” 

 আরও লিখছেন, “যদি বরদাস্ত করেন তবে বলি বিষয়বস্তু বাহ্যত রাজনৈতিক, আসল কথা মানুষের, যে মানুষ সংগ্রামী, আরোহণকামী, সাপলুডোর খেলা যার ওঠানামার প্রতীক। আর প্রয়োগ প্রকরণ?  এককথায় এমন পরিচ্ছন্ন নিপুণ ঠাসা নাটক বাংলায় অনেকদিন দেখিনি। 

সারাক্ষণ মঞ্চে আপনারা দুজন। মনে করুন যেখানে আপনি জনতাকে পেছনে রেখে বক্তৃতা করে যাচ্ছেন। কী দ্যোতনা! কোন তুলনা হয়না সেই অভিনয়ের!” 


এরপর উনি আরো অনেক কিছুই লিখেছেন। শেষে লিখছেন, “আপনার রুচি ও সাহসের  আমি প্রশংসা করি।” 


অথচ তরুণ রায় লোকটা কিন্তু যে তিনজনের নাম করা হয় বাংলা নাট্যমঞ্চের প্রাণপুরুষ বলে, অন্তত আধুনিক কালের, তাদের পাশাপাশি থাকার মতনই।  দেখো কত লোকের নাম করা হয়, বিভাস চক্রবর্তী ইত্যাদি ইত্যাদি, অথচ তাঁর নামটি সুচতুরভাবে বাদ রাখা হয়েছে। পরবর্তীকালে অরুণদা মানে চেতনা নাট্যগোষ্ঠী, এদের অনেকেরই তো নাম করা হয়েছে। অথচ তরুণ রায় সেভাবে পিকচারেই আসেন না।

 

কিন্নরদলঃ লজ্জার কথা।

 

সৌম্যদাঃ মুখোশ নাট্য সংস্থা কিন্তু প্রচুর নাটক করেছে। ওঁদের গ্রুপটির নাম আর কি।  ওনার নাম কি ছিল জানো তো? ধনঞ্জয় বৈরাগী মানে সাহিত্যিক ধনঞ্জয় বৈরাগী। বহু উপন্যাস গল্প ইত্যাদি লিখেছেন নাট্যরূপ দিয়েছেন। 


কিন্নরদলঃ মানে পেননেম ছিল ধনঞ্জয় বৈরাগী? বিখ্যাত মানুষ তো!


সৌম্যদাঃ হ্যাঁ প্রচুর উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ লিখেছেন। 

ইতিমধ্যে থিয়েটার সেন্টার একবার আগুনে পুড়ে যায়। তাকে আবার সারিয়ে ঠিকঠাক করে ফেলেন। তারপরে আর হলো না। বয়স হয়ে গিয়ে ছিল শেষের দিকটায়। ওই অভিজ্ঞান  শকুন্তলমই ওনার শেষ প্রযোজনা। প্রধানত দেবরাজ রায়, ওনার ছেলে, ওটাকে ধরে রেখেছিল। 


এই নাটকে একটা মজার ঘটনা আছে। দেবরাজ দুস্মন্তের  ভূমিকায়।  একটা সিন ছিল যেখানে সে শকুন্তলার বিরহে কৃশ হয়ে গিয়েছে। সে মঞ্চে এসে বলছে যে, হ্যাঁ আমি কৃশ হয়ে গিয়েছি। নাটকটা হয়ে যাবার খানিক পরে মেসোমশাই মানে তরুণ রায় বলছেন, এই শোনো অনুরাধা, ওকে কাল থেকে এই এইটুকু করে ভাত দেবে। সবাই মিলে তখন খেতে বসেছি খাবার টেবিলে, মেসোমশাই, মানে তরুণ রায়, গল্প করতে করতে বলছেন। আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। আসলে ঘটনা হলো দেবরাজ মঞ্চে যখন ডায়লগটা বলছিল তখন দর্শকের আসনে অনেকেই হেসে উঠে ছিলেন। মেসোমশাই সেটা লক্ষ্য করেছেন। 

বলছেন তাই, হলের লোকজন হেসেছিল। তোমরা খেয়াল করেছিলে?


কিন্নর দল: রক্তকরবীর অভিজ্ঞতা বলুন কিছু দাদা। 


সৌম্যদা: (হেসে) মজার কথা শোনো। একবার মহাজাতি সদনে আমাদের শো হচ্ছে। দিদি, মানে তৃপ্তি মিত্রর রক্তকরবী। 

একদিন আগে এখানে ম্যাজিক শো হচ্ছিল। পি লাল খুব নামকরা, তাঁর শো চলছিল। কোনও কারণে তিনি অনেক জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে একটি সিংহ এনেছিলেন এবং কোনওভাবে সেটি ভেতরে কোথাও রয়ে গিয়েছিল। এবার তার তো গায়ের গন্ধ চারিদিকে ছড়াচ্ছে। কিছু করার নেই।  দিদি বললেন একটা বড় দেখে রুম স্প্রে কিনে নিয়ে আয়। গোটাকয়েক রুম ফ্রেশনার কিনে এনে চারিদিকে বেশ করে ছড়িয়ে টড়িয়ে দিয়ে নাটক শুরু হলো। নাটকে আমি বিশু করি আর রানী নন্দিনী।  নাটকের গান আছে, তরী ছিল চেনার কূলে, (সুর সহযোগে), এই গানটি।  বাঁধন যে তার গেল খুলে। গানটা বুঝতে পারছো তো? ও চাঁদ, চোখের জলের লাগল জোয়ার। তাপস সেন আলো করেছিলেন। আমি তো খুব মন দিয়ে হাত মেলে গান গাইছি, হঠাৎ সিংহটা ডেকে উঠলো, হুম হুম। (অট্টহাসি)  


কিন্নরদলঃ বহু অভিজ্ঞতা আপনার। জীবন ভরে গিয়েছে। 


সৌম্যদাঃ সত্যিই। নাটক করতে গিয়ে যে কত রকম অভিজ্ঞতা মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমার খুব অ্যাজমা ছিল জানো তো। বেশ ভালো মতন। এখন অবশ্য ভালো হয়ে গিয়েছে। যে সময় দিদির ওখানে নাটক করি তখন ভুগতাম বেশ টান উঠত। একদিন একাডেমিতে  শো।  হাউস ফুল হয়ে গিয়েছে।  বেশ ভালোরকম টিকিট বিক্রি হয়েছিল আমাদের। এইবারে মেকাপ টেক আপ নিয়ে আমার হঠাৎ প্রচন্ড টান উঠলো।  দৌড়ে ছেলেরা গেল। হাজরা থেকে সব ডাক্তার কমপাউনডার নিয়ে এলো।  তিনি আমাকে ডেরিফাইলিন ও ডেকাড্রন,  দুটো ইনজেকশন দিলেন। খানিকক্ষণ মরার মত পড়ে থেকে তারপর  স্টেজে উঠলাম।  দিদি বললেন, ও সৌম্য, আজ তোর গানটা অন্য সব দিনের চেয়ে ভালো হয়েছে।  


 কিন্নরদলঃ ভালো টিচারের লক্ষণ।  অদ্ভুত উৎসাহ দিয়ে বেস্টটাকে বার করে আনা। 


  সৌম্যদাঃ ভালো লাগছে। তুমি নাটক বোঝো তো। মানে তোমার নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ডটা তো আছে। সেজন্য এত ভালো লাগছে। আমার বলতেও ভালো লাগছে।  

নাট্য আন্দোলনের তিরিশ বছর বইটা পেয়ে দেখলাম এগুলো নোট করা আছে। আমাদের  প্রথম সেই নাটক 'রাজা সাজা' তার উল্লেখ আছে। ১৯৬২ তে শুরু।  আমি অবশ্য অনেক পড়ে গেছি আশি টাসি নাগাদ। এটা সেই প্রবীর মুখোপাধ্যায় করতেন। তোমায় বলেছি পরবর্তীকালে প্রবীরদা শিশির মঞ্চের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হয়েছিলেন।  আটষট্টি সালে সেকেন্ড টাইম দীপান্বিতা করছে রাজা সাজা।


 ১৯৬৬ সালে শুরু হয় মুক্তাঙ্গনে।  আমি গেছি অনেক পরে।  ক্রেম ব্রাউন মঞ্চের কাছাকাছি একটা ছেলের বাড়িতে রিহার্সাল হত। সে ছেলেগুলো নকশাল ছিল।  রিহার্সাল খাটের তলা থেকে সড়কি টর্কি অমুক তসুক বার করে  চারটি ছেলে বেরিয়ে গেল।  জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার? উত্তর দিলো,  ওই কোনও খবর পেয়েছো হয়ত।  নবারুণ বদে এইসব দু'চারটে নাম মনে আছে।  কিছুক্ষণ পরে সব হাতটাত ধুয়ে চলে এলো। যেন কিছুই হয়নি। আসলে অপারেশন সেরে এলো। এসে বললো চলো চলো রিহার্সাল দিই। 


কিন্নরদলঃ মেরে ফেলতো না? এটাই বড্ড খারাপ লাগে। ঠান্ডা মাথায় কিভাবে এদেরকে খুনি বানিয়ে দিয়েছিল।


সৌম্যদাঃ হ্যাঁ সেটাই। অসীম চট্টোপাধ্যায়। লিখছেন দেশে। পড়ে দেখো। তুমি ওই থিয়েটার সেন্টার আর তৃপ্তি মিত্রর আরব্ধ নাট্য বিদ্যালয়ের কথাটা লিখো, জানো। কেউ এঁদের কথা বলে না তো। আমিও বাহাত্তর পেরিয়ে যাচ্ছি। আর গেলেই হয়। এখন অন্তত বলে যাই। যে কটা মানুষ জানতে পারেন সেটাই লাভ।


🌹🌹


No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...