#শারদীয়া_কিন্নর_দল
#চতুর্থ_পর্ব
#দ্বিতীয়_পাতা
আজ এনেছি একটি অণুগল্প, একটি গল্প, ও একটি স্মৃতি কথা
🌹🌹
✍️
#পুরুষোত্তম
#রামকিশোর_ভট্টাচার্য
পুরুষোত্তমপুরের ৫০০ বছরের প্রাচীন জীর্ণ জয়লক্ষ্মীর মন্দির ৷ সবাই বলে 'মায়ের থান' খুবই জাগ্রত ৷ আজ দেখলাম মন্দির নতুন হয়ে উঠছে ৷ নিখুঁত প্রাচীন নক্সা কাটছে বুড়ো মনসুর আর ফটিক বাগদী , মশলা মাখছে যুবক আফজল ৷
৯০ বছরের পন্ডিত তারক ভট্টাচার্য হাতে লাঠি ঘুরে ঘুরে দেখছেন নতুন ভাবে সেজে ওঠা মন্দিরের কাজ ঠিক হচ্ছে কিনা ৷
🌹🌹
✍️
#বেষ্টন
#মানস_সরকার
এত রাতে আগে কোনওদিনই বাড়ি ফিরিনি। লাষ্ট ট্রেন থেকে নামতেই বেশ ভয় হল। শীতের রাত। যে-তিনজন এ-ওদিক থেকে নামল, তারা হঠাৎই যেন কোথায় গায়েব। প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে বাইরে আসতেই ভয়ের ছোঁয়া আরও ঘন। যানবাহনের কোনও চিহ্নই নেই। এত রাতে এতটা পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হবে ভেবে জানুয়ারির শীতেও কপালে চলে এল ঘেমো ভাব। হাতঘড়ি দেখলাম। একটা পাঁচ। মোবাইল দিন দুই হল খারাপ। সারাতে দিয়েছি। বাড়ির লোক অপেক্ষা করতে করতে নিশ্চই এতক্ষণে গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে। বাড়ির লোক মানে অবশ্য বাবা, মা।
কী ভেবে ঘুমিয়ে পড়ল! আজকে ফিরব না ভেবে! আমার রোজগারেই চলে গোটা সংসার। শেষ কয়েক বছরে নিশ্চিন্তি ভাবটা যেন পরিবারের অনেকটাই বেড়ে গেছে। ভেবে লাভ নেই। অগত্যা রাস্তায় পা বাড়ানো। শুনশান। গ্রীষ্মকাল হলে কি এতটা নিশুতি হত! এল ই ডি’র ঝাপসা আলো নিস্তব্ধতা মেখে যেন আর একটু মৃদু। বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ি, নানা আকারের বাড়ি আর মলের ছায়ারা মিলে মিশে অজানা পরিবেশকে উসকে দিচ্ছে। হাঁটা দ্রুত করার চেষ্টা করি।
এ সব থেকে বাঁচতে, সব কিছুকে পিছনে ফেলে দিচ্ছিলাম। এমন সময় নজরে এল। মানে প্রথমে কানে এল, তারপর এক ঝলক পিছনে তাকিয়ে যা বুঝলাম আর কী। ঢলা প্যান্ট, জামায় মাঝারি উচ্চতার একজন মানুষ বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে আমার পিছনেই আসছে। হতেই পারে। প্রথমটায় কিছু ভাবতেই চাইনি। কিন্তু দু’দুটো মোড় ঘোরার পরই একটা কথা ভেবে বুকটা ধক করে উঠল। এ লোকটা তো আসলে আমাকে অনুসরণ করছে....
(২)
কথাটা ভাবতেই ভয়, উত্তেজনা অনেকগুণ বেড়ে গেল। কায়দা করে পিছন ফিরে তাকালাম।একটু সময় নিয়ে। সঙ্গে কিছু টাকা আর হাত ঘড়িটা আছে। সে রকম বুঝলে ছুটতে শুরু করব।
আর একবার তাকাতে একটু অবাকই লাগল। এ হাঁটায় তো বাবার মিল খুঁজে পাচ্ছি। বাবাও অনেকটা এ রকমই পা’টা টেনে হাঁটে। দূর থেকেও বুঝতে পারছি, লোকটার চেবানো। আর আমার বাবা পান খায়। বেশ সময় নিয়ে চেবায়। মাথাটা টুপি আর মাফলার দিয়ে প্রায় ঢাকা হলেও অবিকল বাবাকেই মনে হচ্ছে। এক পলক থামি। কী আশ্চর্য! পেছনের বাবার মতো অবিকল লোকটাও দাঁড়িয়ে গেছে। আর ভাবতে পারি না। অন্য একটা রাস্তা ধরে খুব তাড়াতাড়ি আর একটা রাস্তায় চলে যাই। বাড়ির পথটা এতে ঘুর হয়ে গেল। কিন্তু লোকটাকে নিশ্চিত এড়ানো যাবে।
এ রাস্তায় পড়তেই অন্যরকম ভয় গ্রাস করে। সার সার দোকানের চালা। তার পরেই একটা মস্ত বড় মোবাইল ফোনের টাওয়ার বসেছে। দূর থেকে দেখছি, আর কেবলি মনে হচ্ছে, চার পা’ ওলা একটা লোহার ঢ্যাঙা লোক দাঁড়িয়ে আছে। অনেক উঁচু থেকে তার দৃষ্টিটা যেন পড়ছে আমারই উপর।
আর ঠিক তখনই দৃষ্টিটা চলে গেল আড়াআড়ি। নাঃ! আগের লোকটা নয়। এবার এক ভদ্রমহিলা। এক ঝলকেই অন্যরকম লেগেছে। এতটা দূর থেকেও চিনতে পেরেছি শাড়ির রংটা। অবিকল মায়ের এই রঙের একটা শাড়ি আছে। দ্বিতীয় বারের ট্যারচা দৃষ্টি দিই। এবার ভীষণ, ভীষণ অবাক লাগছে। এত রাতে এ তো অবিকল আমার মা। কী হচ্ছে এটা। মায়ের মতো বাঁধা চুল, ঐ উচ্চতা। ভাবতে পারছি না একদম। ভয় ঠেলে রেখে এবার অবাক হচ্ছি বেশি।
প্রায় দৌড়তে দৌড়তেই পিছনে আসা সে ভদ্রমহিলাকে আরও পিছনে রেখে ঘুর পথে আর একটা রাস্তায় চলে আসি। বুঝতে পারছি। শর্টকার্টের পথ এখন লংকার্ট। এ রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে আগের থেকে ভয় বেড়ে গেল শতগুণে। যে-দিক দিয়ে হাঁটছি তার উল্টো দিকটায় আছে লম্বা পাঁচিল। আর পাঁচিলের ওপারে আছে বহু প্রাচীন কবরখানা। কেন যে মরতে এ পথে এলাম!
হাঁটার গতি বাড়িয়েই দিয়েছিলাম। অনুভূতি বশেই পিছনে তাকিয়ে দেখি, আমাকে আবার কেউ অনুসরণ করতে শুরু করেছে। তাকালাম পিছনে। না, এবার আর কারোর সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছি না। অনেকটা লম্বা। সুঠাম চেহারা। জ্যাকেট পড়ে থাকলেও নিচে যে পাঞ্জাবি আছে, তা বুঝতে পারছি। নেমে আসা কুয়াশা ধাঁধা বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। তবে মাথায় টুপি থাকলেও চোখে চশমা আছে বোঝা যাচ্ছে। এ রকম মানুষ কি ক্ষতিকারক হতে পারে! রাতের বেলার কবরস্থানের পাশে কারোর অনুসরণ কতটা নিরাপদ!
আগের দু’বার ছুটে অন্য রাস্তা ধরেছিলাম। এবারেও কি তাই করব? সত্যিই কি এই লোকটা আমাকেই অনুসরণ করছে?
দাঁড়িয়ে পড়ি। না। পেছনের ব্যক্তি দাঁড়ায় না। হেঁটে এগিয়ে আসতে থাকে আমার দিকে। আমাকে পেরনোর মুহূর্তে লক্ষ্য করি তার সাথে কারোর মিলকে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে এ চেহারাকেই অনেকবার দেখেছি। আমাকে অতিক্রম করে সে এগিয়ে যায়।
খেয়াল হয়, আমি আমার বাড়ির কাছাকাছি। সে বাড়ির ঝুলবারান্দায় অপেক্ষা করছে এই মধ্যরাত্রিতে যারা, তারা আর কেউ নয়, নিশ্চিতভাবে আমার বাবা আর মা। স্বস্তির শ্বাস ফেলে, নির্ভয়ে এবার এগিয়ে যাই......
🌹🌹
✍️
#স্মৃতি_কথা
#মীনা_রায়
আমার সব থেকে ভালো লাগে স্মৃতি চারণ করতে।
জীবনটা নেহাত কম হলো না। স্মৃতি কথা জমা হলো অনেক। যা আমাকে সততই প্রীতি দিয়ে ভরিয়ে তোলে। অনেক কিছুই দেখলাম জীবন ভরে।
জন্মের সময় থেকে যে গ্রামের পরিবেশে বড় হয়েছি তা আমার ভালোবাসার ভালোলাগার গ্রাম। উজ্জ্বল হীরক দ্যুতির মতো অনুভূতিতে ভরিয়ে রেখেছে আমাকে জীবনের মাঝ বয়স পর্যন্ত।
বর্তমানের শহর জীবনের বন্ধুতা সম্পর্কের টানাপোড়েন গুলো থেকে সর্বদা রক্ষা করে আমার শৈশব কৈশোর যৌবনেতে পাওয়া সেই সুখময় সুন্দর সুসম্পর্ক গুলোর আনন্দঘন আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ সহজ সরল মানুষ জনের ভালোবাসার স্মৃতিরূপ।
মনে মনে ভ্রমণ করি সেই বারোমাস তের পার্বণের গ্রাম বাংলাতে। আমি ক্লাস ফাইভে পড়েছি, সে ১৯৭৫ সালে। তখন আমার হাতে মেয়েদের ব্রতকথা বই পেয়ে আনন্দ আর ধরে না ! গল্প গুলো পড়তাম আর ভাবে ভক্তিতে পরিপূর্ণ হতাম।
বৈশাখ মাসে নববর্ষ বরণের দিনটিতে আমরা আমাদের গৃহ তথা এলাকার প্রসিদ্ধ দেবতা শ্রী শ্রী কালারুদ্র দেবের সঙ্গে ঢাকের বাদ্যি বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে গঙ্গা স্নান করতাম। বাটা হলুদ ও সর্ষের তেল ঠাকুর কে মাখিয়ে সেই প্রসাদি হলুদ সমস্ত ভক্ত সম্প্রদায় সানন্দে মাখতাম । আমাদের বয়সী মেয়েদের চলতো সারা মাসব্যাপী ভোরবেলা উঠে যে ব্রত পালন , সেটি ছিল পুণ্যিপুকুর। তুলসী মঞ্চের নিচে গর্ত করে সেখানে শুশুনি - কলমি শাক,ধান গাছ লাগিয়ে নানা মন্ত্রে পুজো।সঙ্গে বেল কাঁটা দিয়ে সেই পুণ্যি পুকুর পাড়ে দশ পুতুল এঁকে পুজো করতাম।
জ্যোষ্ঠ্যমাসে অরণ্য বা জামাই ষষ্ঠী পুজো তো গ্রামের সবাই একই বট নিম তমাল খেজুরের মিলিত ঝোপের নিচে পাথরে পুজো করতো। তবে ব্রাহ্মণ শূদ্রদের পাথর দেবতা এবং পুরোহিত ভিন্ন ছিল।
গ্রামটি ভাগীরথীর তীরে তাই এই মাসে দশহরা গঙ্গা পূজো হতো বেশ সমারোহে।
গঙ্গার পশ্চিম তীর রাঢ় বঙ্গের বোলপুর, কীর্ণাহার,কেতুগ্রাম প্রভৃতি বহু গ্রামের মানুষ জন আমাদের নৈহাটির পাশের গ্রাম উদ্ধারণপুরে আসতেন ; খোল করতাল ঝাঁঝি বাজিয়ে কীর্তন দল নিয়ে গঙ্গাস্নানের পুণ্যসঞ্চয় উদ্দেশে।
আষাঢ় মাসে রথযাত্রা।আমাদের বাড়ির একটা বড়ো রথ টানা হোত। আর ছোটরা নিজেরা সবাই রথ বানাতাম। পাঁচটি পিটুলি ফল আর আট টুকরো নারকেল কাঠি দিয়ে আমিও রথের চুড়া বানিয়ে খেলতাম।
শ্রাবণ মাসে ঝুলনযাত্রা ছিল কাছাকাছি শহর কাটোয়ার বিখ্যাত উৎসব। মানুষের ঝুলন এবং কিছু ভক্তি মুলক নাটক বিদ্যুতের আলো মাইক্রোফোন সহযোগে মনোগ্রাহী করে তোলা হতো এবং আজও হয় । বিভিন্ন সংঘ গুলোর মধ্যে সুন্দর করবার প্রতিযোগিতাতে আনন্দ অন্য মাত্রা পেতো।
আমাদের ছিল ঘাস মাটির পুতুল ইট গুঁড়ো ইত্যাদি দিয়ে ঝুলন সাজিয়ে আনন্দ।
ভাদ্র মাসে নৈহাটির পার্শ্বর্বর্তী নলিয়াপুর গ্রামের ভ্রমর পুকুরের পাড়ে বসতো ভাদু মেলা। লক্ষ্মীপুজো, ভাদ্রের সংক্রান্তির দিনে ওই অঞ্চলে মনসা পুজো , ভাদুগান ও ঝাঁপান গানের প্রচলন আছে।
আশ্বিন মাসের বড়ো উৎসব দুর্গা পুজো। আমাদের গ্রামে বারোয়ারি পুজো একটাই হতো ।আর তা হতো আমাদের বাড়ির সামনে। ব্রাহ্মণ ভট্টাচার্য বাড়ির ফড়িংদা।মহালয়ার পর থেকে গঙ্গার তীরে বসে বীজ মন্ত্র --অং নম,বঃ নম, চং নম মুখস্ত করতেন। ভট্টাচার্য জ্যাঠ্যাইমা মা দুর্গাকে আলতির সময় চামর দুলিয়ে বাতাস করতেন। নবমীর আরতির পর কাঁদতেন।
আমাদের বাড়িতে মহাসমারোহে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো হতো।
কার্তিক মাসে আমার ছিল সকালে যম পুকুর পুজো । সন্ধ্যায় ফুল সাজিয়ে প্রদীপ জ্বেলে সন্ধ্যা রতি। "আতা আতা আতা/ দুধ কলমির পাতা/সূর্য্যি গেল মায়ের কোলে দীপ্তি এলো ভেসে " ...ইত্যাদি মন্ত্রে ।কাটোয়ার কার্তিক লড়াই এক আঞ্চলিক বিশাল উৎসব।অনেকটা চন্দন নগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর মতোই বাজনা আলোক সজ্জা।
অগ্রহায়ণ আমার সাঁঝ পুজনী ব্রত আর গ্রাম বাংলার নবান্ন উৎসব ,ইতুপুজো বিখ্যাত। আমাদের কালারুদ্র ওরফে কালাচাঁদ ঠাকুরকে নবান্ন পুজো দিয়েই সবাই আশপাশের গ্রামের মানুষও নতুন অন্ন প্রসাদ মুখে তোলে আজও।
পৌষ মাসে লক্ষ্মীপুজো পিঠেপুলি উদ্ধারণপুরে পৌষমেলা বেশ সপ্তাহ ব্যাপী মানুষ জনের আনন্দের সীমা থাকে না।ম্যাজিক, পুতুল নাচ ,যাত্রা , হরিনাম সংকীর্তনে ভরে থাকে আজও এলাকা।এখানেই কালিকা প্রসাদ অবধূত শ্মশানে বসবাস করে উদ্ধারনপুরের ঘাট হাসি কান্নার হাট লেখেন।তারাশঙ্করের উপন্যাসেও বহুবার অজয়ও ভাগীরথীর মিলন স্হল শাঁখাই তে -মণি ঘাটের উল্লেখ আছে।
নিকটেই কাটোয়া। গৌরাঙ্গ দেবের কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস নেওয়ার বৈষ্ণব তীর্থ ভূমি। নৈহাটির অনতি দূরে জ্ঞানদাসের জন্ম। আশেপাশে বৈষ্ণব পদকর্তা অনেকেই চন্ডীদাস, গোবিন্দদাস।মহাভারত রচয়িতা কাশীরাম দাস,কবি কঙ্কন মুকুন্দ রাম বহু গুণীজন জন্মেছেন।
মাঘ মাসে বাড়িতে সরস্বতী পুজো হতো বড় প্রতিমা। পরের দিন শীতল ষষ্ঠী। ঠান্ডা গোটা সিদ্ধ খাওয়ার চল।
ফাল্গুনে দোল ।রঙের উৎসব।শিবরাত্রি।
চৈত্র মাসে লক্ষ্মী,নীলপুজো,কালারুদ্রদেবের গাজন মেলা, সে তো মাস ব্যাপী বিশাল বড় উৎসব।বোলান গান,শ্মশান নাচ ওই এলাকায় প্রসিদ্ধ। বিস্তারিত বলবার পরিসর আজ নেই। যার সমাপ্তি পয়লা বৈশাখে নববর্ষের শুরুতে গঙ্গা জলে ডুবে মাথায় কালাচাঁদ স্পর্শের স্নানে । বলেছি স্মৃতি কথার সূচনায়।
🌹🌹
___________________
No comments:
Post a Comment