Friday, 23 October 2020

বিশেষ কিন্নর ২

 আজ মহাসপ্তমী। শুভ শারদীয়ার শুভেচ্ছা জানবেন সকলে। আজ একটি অনুবাদ গল্প রইল। রূপান্তর করেছেন প্রখ্যাত অনুবাদক নন্দিতা ভট্টাচার্য। 

🙏


✍️


#পাথর_ও_প্রজাপতি

                                                      


মূল অসমীয়া গল্পঃ মনিকা দেবী 

                                                     

 বাংলা রূপান্তরঃ #নন্দিতা_ভট্টাচার্য


১৯৭৯ সালে মঙ্গলদই শহরে জন্ম । গুয়াহাটী সন্দিকৈ মহাবিদ্যালয়ে কলেজ শিক্ষা আরম্ভ এবং কটন মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী । তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশ হয় ‘অসম বানী ‘ কাগজে। প্রকাশিত গল্প সংকলন প্রিয় আলাপ, সখিয়তী, মইদাম’র জোনাকী(২০০৮), জহর-মহর এবং বানপানী আহিচি চমাকে-ভমাকে । বর্তমানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত মনিকা দেবী ২০০৫ সালে ‘ প্রিয় আলাপ ‘ বইটির জন্য ‘ মুনীন বরকটকী পুরস্কার এবং ২০১৪তে ‘ জহর-মহর’ বইটির  সাহিত্য একাডেমীর যুব পুরস্কার লাভ করেন। 


কাপড় মেলা তারে প্রজাপতিগুলো পড়েছিল নির্জীব, নিষ্প্রাণ। মেলে দেয়া কাপড়ে ও প্রজাপতিগুলোকে বসিয়ে দিল। প্রজাপতি আঁকড়ে ধরে রইল কাপড়গুলোকে। উড়ে উড়ে পড়ে গেল না, আপ্রাণ ঝুলে রইল ।

অনেকদিন আগে ও একঝাক প্রজাপতি দেখেছিল । রংবেরঙ্গের একঝাক প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছিল মাঠে। ওদের গাঁয়ের মাঠ। প্রজাপতির পেছন পেছন ছুটেছিল । প্রজাপতি ওকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। 

প্রজাপতির কথা ভাবতে ভাবতে মাধব ছাদের ওপরে গিয়ে দাঁড়াল। 

                                             ****  

বলতে গেলে কাছের কেউ নেই আমাদের । একটি মাত্র দেওর , নাম মহেন। মহেনকে  নিজের ছেলের মতই দেখতাম। গ্রামের বাড়ী থেকে নিয়ে এলাম ওকে। পড়াশোনা করালাম । দাদা ওকে চাকরি যোগাড় করে দিল। শহরে কেনা জমিতে ওকে এনে স্থিতু করলাম। ঘরবাড়ী গুছিয়ে দিলাম। ধুমধাম করে বিয়েও দিলাম।

ভাবলাম বুড়ো বয়েসে সাহারা দেবে। তেষ্টা পেলে জল দেবে,ক্ষিদেতে এক গরাস ভাত । আর পাব উভৈনদীর স্নেহ ভালবাসা।

 কিন্তু বিয়ে করেই মহেন হাঁড়ি আলাদা করল, আলাদা থাকতে শুরু করল।আলাদা হল চরু-হাঁড়ি , কথা বার্তা। সবকিছুই অন্যরকম । এখনই এই অবস্থা , আমরা বুড়োবুড়ি অথর্ব হলে তো এরা কলা দেখাবে ।

এখন মাধবই আমাদের আশা ভরসা। অন্ধের যষ্টি । গ্রাম থেকে নিয়ে এসছি ওকে । অনাথ ছেলেটি । গ্রামে কাকার কাছে থাকত। আমরা নিয়ে আসায় কাকা খুশীই হয়েছেন। ভাবছে আপদ বিদায় হল।

আমাদের জন্য মাধব অপুতের পুত, আমি না বিইয়ে কানাইয়ের মা। ওকে লেখাপড়া শেখাচ্ছি।  ম্যাট্রিক দিয়েছে এবার। পাশও করবে একবারে। উনি বলেছেন ওকে কোনও একটা অফিসেও ঢুকিয়ে দেবেন। 

মাধবের বিয়ে দেব ধুমধাম করে। মাধবের বৌ দেবে তেষ্টায় এক গেলাস জল, ক্ষিদেয় এক গরাস ভাত এবং উভৈনদীর স্নেহ- মমতা। 

ছেলে বৌ , নাতি পুতি সহ ভরভরন্ত সংসার । আবার আমার সংসার উপচে পড়বে।

 এগুলো ভাবতে এত ভাল লাগে । 

আলসেতে প্রজাপতি হয়ে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে ।

                                            **** 

বরখুড়ী ওকে বড় ভালবাসে। আর ও ভালবাসে প্রজাপতি। শহরের প্রজাপতিগুলো নির্জীব, নিষ্প্রাণ । গ্রামের ফেলে আসা প্রজাপতির কথা কথা খুব মনে পড়ে ওর । 

বরখুড়ী ওকে নিজের ছেলের মত ভালবাসে । পরীক্ষার কয়দিন ওকে কুটোটি নাড়ত দেয় না । পড়ার টেবিলেই রেখে যায় ফল-মূল-দুধ । ভাট–চা সব কিছুই ঘরেই পৌঁছে যায়।   

বরখুড়ীর সঙ্গে ও বাজারে যায় । বরখুড়ী ওকে সার্ট কিনে দেয়, প্যান্ট কিনে দেয় । গেঞ্জি , জাঙ্গিয়াও কিনে দেয় খুড়িমা। ম্যাট্রিক পাস করলে খুড়িমা ওকে একটা ঘড়ি কিনে দেবে। এখনও ওর ঘড়ি যে নেই তা নয় ! তাবে পরীক্ষায় পাশ করলে একটা দামী ঘড়ি পাবে। একজোড়া দামী জুতোও পছন্দ করে রেখে এসেছে ও । 

ওর জীবনে কোনও কিছুর অভাব নেই। শুধু প্রজাপতিগুলো হারিয়ে গেছে ওর জীবন থেকে । 

ছাদে এলেই ও প্রজাপতিগুলোর কথা ভাবে। 

বরখুড়ি ওকে কাপড় মেলতে দেয় না । মেখলা-পেটিকোট এগুলো ছুঁতে দেয় না ওকে। ছোটখুড়ি ওকে বার বার কাপড় মেলতে বলে ওর ভালই লাগে। ছাদে আসতে পারলে ওর খুব আনন্দ হয়। কাপড় মেলার ক্লিপগুলোকে ওর প্রজাপতির মত লাগে। 

সত্যিকারের প্রজাপতিগুলো তো ওকে কেউ ফিরিয়ে দেবে না। 

                                            ***** 

দাদা বউদিরা এই মাধবটাকে এখনও পুষে রেখেছে কেন ?

আমি কি করে জানব ? 

ওরা মরলে এই মাধবই তো সব সম্পত্তির মালিক হবে। আমারদের বুড়ো আঙ্গুল চুষতে চুষতে দিন যাবে। 

ও আমিও ভাবছি কথাটা । ভাবতেই থাকবে নাকি কিছু পথ বার করবে। ওর মতলব তো ভাল বুঝছি না । মেয়ে দুটোও বড় হচ্ছে। খেয়াল আছে তোমার?

সেই তো, কখন কি হয় ঠিক নেই। 

জেনে শুনেও কেউ সাপ পুষে রাখে! কাপড় মেলতে পারলে ওকে আর পায় কে। এদের দুজনের প্যান্টি মেলতে গিয়েও এক গাদা সময় কাটিয়ে আসে। নাড়া চাড়া করে। 

কি করি বলত ! আমাকে এতদিন বলনি কেন ? এটা একটা কথার কথা হল!  কিছু একটা তো করতেই হবে।  ভয়ংকর বিপদ হবে নয়ত ।

                                           **** 

তারপর বাড়ী একদিন তোলপাড় । ছোটখুড়ির চিৎকারে গগন ফাটল। দৌড়ে এলেন ছোট খুড়া । মাধব নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে ছোটখুড়ির চান দেখছিল। ছাদে দাঁড়িয়ে ও নাকি সবসময় ছোটখুড়ির চান দেখে। আজ ধরা পড়েছে।  ছোটখুড়ি নাকি ব্যাপারটা আজই খেয়াল করলেন ছোটখুড়ির চোখে চোখ পড়েছিল বলে !

খুড়িদের চানঘর নাকি ছাঁদ থেকে খুব স্পষ্ট দেখা যায় । পেছনের বেড়ার ফুটো দিয়ে নাকি ভেতরে কেউ চান করলে তাকে পরিষ্কার দেখা যায়। ছোটখুড়ি চিৎকার করে বাড়ী মাথায় তুললেন। ছোট খুড়া মাধবকে টেনে হিঁচড়ে বড়খুড়ার সামনে এনে ফেললেন । আজই কিছু একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। হয় ছোটখুড়ারা থাকবেন নয়ত মাধব থাকবে এই বাড়ীতে। 

                                             **** 

হেস্ত-নেস্ত করা হল । মাধব পোটলা।  পুটলি বাঁধল । ছোট পুটুলি । এতগুলো জামা কাপড়ের মধ্যে থেকে ও শুধু পুরানো জামাটাই নিল। আর দুটো প্যান্ট। তাতেই ভরে গেল ওর ছোট ঝোলা। বরখুড়ী সুর ধরে কাঁদলেন । বারে বারে তিনি মাধবের পথ আটকাতে লাগলেন। চোখের জলে রাস্তা অস্পষ্ট হল। 

মাধবেরও খুব কষ্ট হচ্ছিল। তবুও কাঁদল না মাধব । মাধবের চোখের জল পাথর হয়ে স্থির আটকে রইল। 

                                               ****

অনেকদিন আগে অনেকগুলো প্রজাপতি সঙ্গে  উড়ে বেড়াচ্ছিল ও। বাতাস থেকেও হাল্কা ছিল ওর শরীর । 

এখন থম মেরে পড়ে রইল একটি নিস্পন্দ পাথর। প্রজাপতি ওকে আর উড়িয়ে নিতে পারছে না। প্রজাপতির ছিন্ন ভিন্ন শরীর পড়ে রয়েছে। 

ওর মনের মাঝের উড়ন্ত প্রজাপতিরা মাথা খুঁড়ে মরছে পাথরে । 

                                             **********


🌹🌹



No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...