#শারদীয়া_কিন্নর_দল
#তৃতীয়_পর্ব
#আমন্ত্রিত_লেখাগুচ্ছ
৩
ধারণ না মারণ?
(#বিষয়ঃ_রাজনীতির_ধর্ম_ধর্মের_রাজনীতি)
#হাসি_সাহা
শৈশবের অলিন্দ থেকে সব ধর্মের নদী স্রোত প্রত্যক্ষ করতে করতে কবে যেন মন মানবধর্মের সাগরে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
২০১৮ প্রাণের টানে বেড়িয়ে পড়েছিলাম ইউরোপ সফরে। আমার ধারণা ছিল ইওরোপে ভিখারী নেই। সে ধারণা যে কতটা ভুল তা বুঝেছিলাম বিভিন্ন দেশে শরনার্থীদের দেখে। এরা বেশীর ভাগই সিরিয়া যুদ্ধে ভাগ্যহতের দল। গীর্জা, নদীর ধার, দ্রষ্টব্য স্থান, অর্থাৎ যেখানে জনসমাগম হয়, সেখানে ছেলেপুলে, পোষ্য, ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বসে আছে। কেউ বা কিছু প্রতিভা প্রদর্শনে অর্থ রোজগারের পথের সন্ধান করে নিয়েছে।
ধর্মীয় যুদ্ধই এদের আশ্রয়হীন করেছে। সর্বশেষ গন্তব্যস্থল ইটালী। পৌঁছলাম ইটালীর টুস্কানির পিসা নগরে। বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক গ্যালিলিওর জন্মভূমে। পথে হাঁটছি মনে ভিড় করছে হাজারো প্রশ্ন। এই সেই স্থান যেখানে এক বিজ্ঞানী রাজশক্তি ও ধর্মীয় শক্তির বিপক্ষে লড়াই করে গেছেন। তিনি দূরবীক্ষন যন্ত্রের উন্নত সংস্করনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘুরছে। সূর্য স্থির।
এর পরিণতিতে ধর্মীয় অনুশাসকের দল তাঁকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করেন। তাদের জনপ্রিয়তা হারানোর আশঙ্কায়। তবু বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। গ্যালিলিওর প্রদত্ত তথ্য চিরন্তন প্রমানিত হয়ে গেছে। হার মেনেছে রাজনীতি আর ধর্মের যৌথ অভিসন্ধি।
দেশে বিদেশে যুগে যুগে রাজনীতি আর ধর্মের চিরকালই সহাবস্থান। মহাকাব্যিক যুগেও এর ব্যাত্যয় ঘটেনি।
ভারত তথা ভারতবাসীর আধ্যাত্মিক চেতনা চিরকালই সমাদৃত। এই আধ্যাত্মিক ভূমেই আগমন ঘটেছে বহু জাতির। অতঃপর শক হুণ মোগল পাঠান এক দেহে লীন হয়ে গেছে। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে নানা ভাষা- নানা মতের- ভারতবর্ষ ধর্ম সম্পর্কে যে উদারতার সাক্ষ্য যুগে যুগে রেখেছে তা হঠাৎ প্রশ্নের সম্মুখীন কেন?
স্বামী বিবেকানন্দ যিনি তাঁর উচ্চ আদর্শের জন্য ভারতবর্ষের যুবসমাজের প্রতিনিধি হিসাবে পূজ্য ছিলেন হঠাৎই এক হিন্দু ধর্মবিলাসী দল তাঁকে রাজনীতির স্বার্থে নিজ ধর্মের পরাকাষ্ঠা করে তুলতে রীতিমত উঠে পড়ে লেগেছেন।
তাহলে তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ কে? হিন্দু ধর্মগুরু? না। তিনি মানবতার প্রচারক, যাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল 'যত মত তত পথ' এ। যখনই ভারতবর্ষ ধর্মীয় সঙ্কটের মুখোমুখি হয়ে বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হয়েছে সেখানেই রাজনীতি হেরে গেছে আর সেই অঙ্গন থেকেই উঠে এসেছে মানবধর্ম।
চৈতন্য, কবীর, নানক ভক্তিআন্দোলনের মধ্যেই মানবতার জয়গানই গেয়েছেন। হারিয়ে গেছে রাজনীতি। আজও চিরউজ্জ্বল তাদের দর্শন। এইভাবেই যুক্তিবুদ্ধির আলোকে আলোকিত সমাজ সংস্কারকের সহযোগিতায় ও সংগ্রামে সমাজ থেকে দূরীভূত হয়়েছে সতীদাহের মত ঘৃণ্য নৃশংস প্রথা। বিদ্যাসাগরের হাত ধরে নারী এসেছে শিক্ষাঙ্গনে।
কালস্রোতে ধর্মীয় কুসংস্কারের পঙ্কিল জটাজালছিন্ন করে বিশ্ববাসী বিজ্ঞানকে সাথী করে জীবনকে সহজ করার চেষ্টায় যখন ব্রতী কালের চাকাকে পিছন দিকে ঘুরিয়ে রাষ্ট্রনেতারা তখন থালা বাজিয়ে, অঙ্গে গোবর দলনে, গোমূত্র পান করে দেশবাসীকে করোনা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে গিয়ে পক্ষান্তরে তারাই করোনাক্রান্ত হয়ে দেশের সবচেয়ে দামী হাসপাতালের সেবা গ্রহণ করছেন।
এ ধর্ম হল দরিদ্র জনগনের আফিং। অশিক্ষিত দরিদ্র দেশবাসীর চোখে ধর্মের পট্টি বেঁধে সরকারী অক্ষমতা, যথা লাগাতার দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি. বেকারত্ব, আর্থিক মন্দা, নারী নির্যাতন, শিক্ষায় গৈরিকীকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে রাজনীতির যুদ্ধ জয়ের সামগ্রিক ক্ষেত্র প্রস্তুত। ধর্ম কথার প্রকৃত অর্থই আজ অপসৃত। আজ এই ধারণের ক্ষমতা মারনের ক্ষমতায় রূপান্তরিত যা মানুষের মধ্য ভেদকে প্রকট করে দূরত্ব বৃদ্ধি করে চলেছে।
বর্তমান বিশ্ব ভাবছে সংকীর্ন ধর্ম আচরন ভিন্ন অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন। কিন্তু সভ্য মানুষ প্রকৃত অর্থে মানব ধর্মের চাতক।
❤️
🌹🌹
{হাসি সাহা হোলি চাইল্ড স্কুল, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তাঁর বিষয় বাংলা সাহিত্য। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষা লাভ করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষাসংক্রান্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকেন।}
No comments:
Post a Comment