#শারদীয়া_কিন্নর_দল
#তৃতীয়_পর্ব
#আমন্ত্রিত_লেখাগুচ্ছ
#বিষয়_অতিমারী
৪
#রাজার_অসুখ
#গার্গী_রায়চৌধুরী
এমন হবে কে ভেবেছিল? এই সুখ, এই প্রাচুর্য্য, এই নিশ্চিন্ত আরামের পাকা ধানে মই দেবে কেউ সেটা কে জানত? মেয়েটা বিদেশে পড়তে গেছে, ওখানেই বিয়ে করে নেবে ওরা, সাদা ছেলে, ভিসা তো আগেই ছিল এবার পাসপোর্টও পাবে। আমরা যাব, নামেই বুড়োবুড়ি , জিভে এখনও লাল টপকায়, বেশ টের পাই, ছমাস থাকবো আরামের দেশে, ওদের সংসার গুছিয়ে দেবো। আমাদের বেশ দুটো ঋতু হবে। পুরোটা ঝাঁ চকচকে হলে ভালো লাগে কারো?
তাই একটা ছ’মাস কাটিয়ে বাকি ছ’মাস ফিরবো এই ময়লা ময়লা, ঘাম ঘাম দেশে। এতো সব প্ল্যান ভর্তি ঘটি দিব্যি স্টেডি ছিল এতদিন, উল্টায়নি। এই সেদিনও তো, ঠাণ্ডা এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে গরম কফিতে চুমুক। জিম টোন্ড টিশার্টের চোখে চোখ রেখে মুচমুচে কামড় দিতে দিতে ইঙ্গিত হাসি। সেই ঠোঁট ঢেকে দেবে মাস্ক, এতো সাহস জমে ছিল নাগালের মধ্যেই? কে জানত !!!
সর্বশক্তিমান মানুষ, বুদ্ধির জোরে, টেকনোলজির পায়তারা কশে আজ পায়ের তলায় ফেলেছে সমস্ত জীব জগতকে। তাকে কিনা চ্যালেঞ্জ করবে একটা কি এক নাম, গোত্র, আভিজাত্যহীন ভাইরাস। ছ্যাঃ। এতো টি আর পি কোভিড কে দেওয়ার চেয়ে একটা কন্সপিরেসি থিওরির কথা ভাবাও ভালো। মানুষ, হ্যাঁ হ্যাঁ মানুষই কোভিড-কে তৈরি করেছে ল্যাবে, মানুষই এই মহামারীর স্রষ্টা। মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সেতো একমাত্র মানুষই করতে পারে। আর কাউকে সে স্ট্যাটাস দেওয়া যায় না। প্রকৃতিকেও না। মানুষের চেয়ে প্রকৃতি বড় নাকি? সে তো তার রূপ গুণ ঢেলে সাজিয়ে নিয়ে বসে আছে মানুষের দাসত্ব করবে বলে।
প্রকৃতি হল মানুষের সার্ভিস প্রভাইডার। বাস্তুতন্ত্রের নিয়মকে কাঁচকলা দেখিয়ে জঙ্গল কেটে সাফ করেছি, মানুষ আর জীব জন্তুর মধ্যেকার দুরত্ব কমিয়েছি, জীবজন্তু আর মানুষের মধ্যে ব্যাধির ক্রসওভার ঘটিয়েছি, এমনকি বন কেটে যথেচ্ছ নগরায়ন করে জীবজন্তুদেরও বিপদে ফেলেছি, জঙ্গলের নিয়ম মেনে তারা নিজেদের মধ্যে দুরত্ব বজায় রাখতে পারছে না, ব্যাধির আদানপ্রদান ঘটিয়ে পৃথিবী জুড়ে মহামারী ডেকে এনেছি, বেশ করেছি। সবাই জানে চোরের মা-ই সবচেয়ে বড় দাদা থুরি দিদি হয়ে বড় গলা করে। বন্য প্রাণী মেরে ব্যাবসা চালানোর আগে থোরাই ভাবার সময় ছিল আদুর বাদুর চালতা বাদুরের গোবেচারা ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে এমন সুপার পাওয়ার পেয়ে গিয়ে এই হারে ক্ষমতার অপব্যবহার করা শুরু করবে। এসব ক্ষমতা-টমতা মানুষের একচেটিয়া এরিয়া।
যদিও কানাঘুসো খবর আছে ছোটো চোখ চিঙ্কিরাই এইসব ছাইপাঁশ খায় আর ওদের থেকেই নাকি যত? আরে না না সাধারণ চিঙ্কিদের অত টাকা কোথায়? বন্য জন্তু মেরে চোরা বাজারের থ্রু তে তারা নাকি ওসব চালান করে সাদা চামড়াদের কাছে। ওরাই তো গরম পকেটের খরিদ্দার।
সে যাই হোক ভালো রকম একটা শিক্ষা হল বলো? এরপর আশা করি প্রকৃতির উপর, জীব জগতের উপর মানুষের এরকম বেপরোয়া মাস্তানিটা একটু কমবে? আশার ছলনায় ভুলে এইসব আবেগরসে চোবানো চিন্তাগুলো কে পাল্টা প্রশ্ন করি, এই যে দাদা সিন্ডিকেটের মাস্তানি কমেছে?
নাহ। জনগণের উপর রাষ্ট্রের চাপান উতরের মাস্তানি কমেছে? নাহ। ভোট দখলের মাস্তানি? নাহ। এমনকি গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কথা জেনেও ঘরে ঘরে এসি লাগানোর মাস্তানি? কমেছে দাদা? নাহ নাহ। তবে হঠাৎ করে এরকম দুরাশা করে বসলেন কেন ভাই মানুষ প্রকৃতির প্রেমিক সেবক হয়ে উঠে তাকে কোলে বসিয়ে আদর করবে? তবে তো সামনে আরও এরকম বা আরও বেশি ভয়ংকর মহামারী টারি... হ্যাঁ, আসবে, আসতেই পারে। কালকের কথা কে জানে। আপনি ভাই বড্ড ব্যাকডেটেড, কিস্যু খোঁজ খবর রাখেন না।
আজকের মানুষ শুধু বর্তমান নিয়ে বাঁচে দাদা। তার স্লোগান লিভ লাইফ কিং সাইজ। আর রাজা হতে গেলে কে না জানে আগ্রাশনি অস্ত্র। নইলে জাত থাকে না। তাই ঘুরে ফিরে ওই সংক্রমণের রিস্ক থাকবেই।
এ তো গেলো বড় মানুষের কথা কিন্তু আমাদের মতো পাতি মধ্যবিত্তের কি হবে দাদা? ধুর ছাই হাওয়া দেখে এটাও বোঝেনা এখন আর মধ্য বলে কিছু থাকবে না। হ্যাভস অ্যান্ড হ্যাভ নটস শুধু ক্রিজে। তবে আমরা তো গিয়ে পড়ব হ্যাভ নটস এর দলে নাকি? হ্যাঁ কি। রোগ হলে চিকিৎসা পাবো? ওষুধ? নাহ। দামে পোষাবে না। হাসপাতালে ভর্তি? বেড পাবে না। পেলেও অনেক টাকা লাগবে। পেনশানের টাকা? পাবে না, উঠে যাবে। মাস মাইনে? গরু খাটা খাটিয়ে কেটে কুটে হাতে যা দেবে তাতে ওসব হবে না। তবে কি করবো? নিজ মাল মানে নিজের শরীর নিজের দায়িত্বে রাখবে, খাটানোর জন্য ওই শরীরটুকু ছাড়া অন্য মূলধন তো আর থাকবে না হাতে। তাই কেউ ললিপপ নাড়ালেই ছুটে গিয়ে সেটা মুখে পোরা যাবে না। দিনরাত লোভ হাটাও প্রাণ বাঁচাও স্লোগান জপতে জপতে শরীরে যা সয় তাই খেয়ে পরে থাকতে হবে আর কি।
তবে যে শুনছিলাম ওষুধ বেরিয়ে যাবে আজ কালের মধ্যে? বেরিয়েছে? একটু সময় নিচ্ছে। কারা সময় নিচ্ছে? ওই রাজা উজির রা। ওষুধ কে বানাচ্ছে? গবেষক। তা সে কি বলছে? সে কিছু বলছে না। তবেই বোঝো। কাক বলল কান নিয়ে যাচ্ছি আর তুমি কানে হাত রেখে দেখলেও না সেটি আছে না নেই ছুটলে কাকের পিছন পিছন। আগে ওষুধ বেরনোর নিয়ম কানুন কম্পিউটারে সুইচ টিপে জেনে নাও নিজ দায়িত্বে। দেখবে গবেষণার পাঁচটি স্তর পেরিয়ে তবে আলো দেখে একটি ওষুধ। সময় লাগে কমপক্ষে দু’বছর। এমনকি ফাইনাল স্তরে পৌঁছেও পরীক্ষায় ফেল করে বাতিল প্রমাণিত হয়ে যেতে পারে নতুন ওষুধ। বক্তৃতা করার আর শোনার আগে চোখ কান খুলে জেনে নাও আসল সত্যি।
বড় চিন্তায় পড়লাম। তবে কি এই মহামারী এই দুর্যোগ...? নিত্য সঙ্গী হবে। নিজেকে সতর্ক রেখে এর মোকাবিলা করার সিস্টেম নিজের মতো করে নিজের মধ্যে ডেভেলপ করতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য ও কোয়ালিফায়েড ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগে থাকা এই সিস্টেমের একটা জরুরি স্টেপ। আর? আর কি যা চেয়েছিলে তাই করেছ অর্জন। কি চেয়েছিলাম? একলাষেরে জীবন কাটাতে, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে নিজের পিঠ বাঁচাতে। আর এখন প্রাণ বাঁচাতে মুখে ঠুলি এঁটে বোবা হয়ে পরস্পরের থেকে আলাদা, বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাও গে যাও। এটাই চেয়েছিলে না তুমি? হে জীব শ্রেষ্ঠ মহা মানব !!!
(ডক্টর গার্গী রায়চৌধুরী অনেক বছর ক্লিনিকাল রিসার্চের সঙ্গে যুক্ত। তিনি সিরিয়াস সাহিত্য চর্চা করেন। এই নিবন্ধটি কিন্নর দলের জন্য লিখিত। অসুখ এভাবে একশো বছরের আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে স্তব্ধ করেনি। আগামী দিনে নিবন্ধটি আজকের কথা মনে পড়াবে। 🙏)
No comments:
Post a Comment