Wednesday, 7 October 2020

আমন্ত্রিত লেখাগুচ্ছ ৫

 #শারদীয়া_কিন্নর_দল


#তৃতীয়_পর্ব


#আমন্ত্রিত_লেখাগুচ্ছ

বিষয়: কবিতা কেন

(সাক্ষাৎকারধর্মী লেখাটি লিখেছেন কবি উৎপল ত্রিবেদী। কিন্নর দল কয়েকটি প্রশ্ন রেখেছে। তার উত্তরে এই সাক্ষাৎকার বা নিবন্ধ।)


আজ প্রথম ভাগ


#উৎপল_ত্রিবেদী 



#কবিতা_কেন 


১: সাহিত্যের শুরু কবিতা থেকে। কেন মানুষ কবিতাকেই প্রথম আপন করেছে?


উঃ:-      কেবল ভারতবর্ষেই নয়,সম্ভবত গোটা বিশ্বেই প্রথম সাহিত্য বলতে কবিতাকেই বোঝায়।ভাষা মাত্রেরই একটি নিজস্ব গতিময়তা আছে।কিন্তু কবিতায় অতিরিক্ত একটি পরিশীলিত আবেগ আছে,উচ্চারণের মুহূর্তেই এক নতুন উন্মোচন আছে এবং ছন্দোময়তার কারনে একটি ওঠানামা আছে যা সব মিলিয়ে একটি নিগূঢ় রহস্যময়তার জন্ম দেয়।একধরনের "বাউন্স" তৈরি হয় কবিতার প্রাথমিক পাঠক্রিয়াতেই।যে কারনে যে গদ্য বা গদ্যভঙ্গীতে এগুলো একটু বেশি পাই সেই সব গদ্যকে আমরা কাব্যিক গদ্য বা গদ্য কবিতা অভিধায় অভিহিত করে থাকি।


বলে রাখা যাক যে এটা নিতান্তই আমার নিজস্ব মনে হওয়া।এর সাথে কোন তথ্য বা তত্ত্বের মিল বা অমিল খুঁজতে যাবার দরকার নেই।লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে সাধারন ভাবে আমাদের কোন একটি মুহূর্তের অনুভবকে প্রকাশ করতে আমরা কবিতার শরন নিয়ে থাকি।কারন বোধহয় এই যে এখনো অনেক বিতন্ডার পরেও কবিতা আমাদের কাছে তুলনামূলক সহজে ধরা দেয়।


জানি ঠিক এই বিন্দুতে এসে অনেকেই রে-রে করে উঠবেন।অনেকেই বলবেন --মানে কি?কবিতাকি এতই সহজে বোঝা যায়?খুব সহজবোধ্য হলে আমরা তো নাক কুঁচকে তাকে পদ্য বলে ঠেলে সরাই।তবে?


এই তবের কোন সহজ চওড়া রাজপথ সদৃশ জবাব নেই।এটা অনেকটাই "যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী"গোছের ব্যাপার। কেউ তাঁর উদ্দিষ্টে পৌঁছান আলপথ বেয়ে,কেউ গলিপথ তো কেউ আবার রাজপথ ধরে চলেন।ফারাকটা থাকেই।একটা বিষয়কে কেমনভাবে দেখব তার অনেকটাই নির্ভর করে পাঠকের মানসিকতার উপরে।বোঝা- নাবোঝার আগে অন্য একটি মানসিক ক্রিয়া বেশ তৎপর হয়।


সেটি--পাঠের আকাঙ্খা বা ইচ্ছা।এই প্রাথমিক শর্তটি যদি পালিত না হয় তাহলে কবিতায় কেন কোন সৃষ্টিকর্মেই মাথা গলানো যায়না।সবটাই তখন মাথার উপর দিয়ে চলে যায় মনে হয়।অথচ তেমনটা হবার কথা নয়।কোন পূর্ব নির্ধারিত ভাবনাকে পাশে সরিয়ে রেখে পড়তে না পারলে রসাস্বাদন সম্ভব নয়।


২: ছন্দ কবিতার সেকাল একাল। আপনার পর্যবেক্ষণ কি?


       একটা কথা ইদানীং প্রায় সর্বজনীন।এটাকে অভিযোগও বলতে পারি। অনেকেই বলেন-- "আজকালকার কবিতায় ছন্দ নেই"।আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা কবিতা না পড়ার অজুহাত মাত্র। ছন্দছাড়া যা হয় তা ছন্নছাড়া।আর কবিতার নিজস্ব কিছু অন্তর্লীন বাঁধন আছে যাকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায়না।অনেকে বিশ্বজুড়ে অনেক বার অনেক রকম নিরীক্ষা করে ব্যর্থই হয়েছেন।তার কিছু গেছে ডাস্টবিনে, আর কিছু আছে(সম্ভবত) আর্কাইভে।


আসলে ছন্দ বিষয়ে আমাদের নিজেদের মনে অনেক ধন্দ আছে।ছন্দকে একটু সহজ করে ভাবা যাক।ছন্দ কি?চলিত বাংলার ছিরি ছাঁদ বলতে আমরা আসলে শ্রী এবং ছন্দকে বোঝাই।হাঁটার সময় আপনি বাঁ-পায়ের পর ডানপা বাড়াবেন।এটাই স্বত:সিদ্ধ।


এর ব্যতিক্রম হলে সেটা হাস্যকর মনে হবে।কবিতার ছন্দও মূলত তাই।চলার ধরন বা রকম।এক একটি কবিতায় চলন একেক রকম হয় তার বলার তাগিদের রকমফেরে।যেমন চলায় আছে মন্দগমন, দ্রুতগমন,দৌড় ইত্যাদি।সবটাই পরিস্থিতির রকমফেরে বদলে যায় ।তাই সাধারন অক্ষরবৃত্ত থেকে মন্দাক্রান্তার বা অনুষ্টুপ ছন্দের ভিতরে কবিরা ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হন। 


তবে এই প্রসঙ্গে একটি কথা মাথা পেতে মেনে নেব যে অনেক কবি আছেন যাঁদের ছন্দজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।কোন শব্দের পরে কোন শব্দটি ব্যবহার করলে সেটি একটি গতিময়তাকে ইঙ্গিত করবে বা গভীরতার দিকে নিয়ে যাবে সেটা কিন্তু কবিকে বুঝতেই হবে।এটা অনেকেই পারেন না।বোধকরি তাই জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন-

"সকলেই কবি নয়,কেউ কেউ কবি"।তেমনি সেই সূত্র ধরে বলি-- সকলেই কিন্তু পাঠক নন,কেউ কেউ পাঠক।


কবি তাঁর মেধা-মনন-হৃদয়বৃত্তি এক করে যে নির্মানটি পাঠকের সামনে রাখেন সেটিকে যথোচিত মর্যাদায় কাটা ছেঁড়া করে দেখার জন্যে পাঠককেও কিছু প্রস্তুতি রাখতে হয়। পাঠক কি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই প্রস্তুতি রাখেন?মনে হয় না।সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু,অন্তত বহিরঙ্গে,বদলে গিয়েছে।সেই বদলের সাথে তাল মিলিয়ে কবিতার হাত ধরতে হলে পাঠকের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি অনিবার্য।


৩: প্রতিটি যুগের বাঁকে কবিতার বাহ্যিক ও আঙ্গিকের পরিবর্তন হয়েছে। আপনার মতে তার তাৎপর্য কি?


বাংলা কবিতার কথা ধরা যাক। বলা হয় চর্যাপদ থেকে বাংলা কবিতার চলা শুরু হয়েছিল।তারপর হাজার খানেক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে।আমার ছেলেবেলার সাথেই বহিরঙ্গে এখনকার পৃথিবীর কোন মিল পাই না খুঁজে,তো চর্যাপদের যুগের সাথে কোথায় খুঁজব?কিন্তু একবার একটু চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে যদি উঁকি মেরে দেখা যায় তাহলে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে যে অন্তর্গত স্তরে কবিতা তেমন করে বদলায় নি।আজো কবিতাকে আবিস্কার করতে হয় যেমন করতে হত সেই চর্যাপদের যুগে।সেই প্রবহমানতা আমরা দেখেছি বৈষ্ণব পদকর্তাদের রচনায়,দেখেছি এবং স্তম্ভিত হয়েছি লালন ফকির,হাসন রাজাদের বাঁধা গানের কলিতে।


কিন্তু বহিরঙ্গের গঠনে কবিতা আগের কবিতার চেয়ে কয়েক যোজন দূরে অবস্থান করে।সমাজ পরিবর্তনের সাথে সৃষ্টি এবং স্রষ্টা উভয়েই বদলে যেতে বাধ্য হন।কারন সামাজিক বাধ্যবাধকতার রশিতে আমরা সকলেই কোন না কোন ভাবে বাঁধা পড়ে আছি।এটাকে বাধ্যবাধকতার চেয়ে বেশি করে সামাজিক দায়বদ্ধতাই বলতে চাইব।


আধুনিক কবিতার ভাষা এবং কবিতার/কবির দায়বদ্ধতা নিয়ে দু'-একটা কথা বলা দরকার। সময়ের চলার সাথে ভাষার চলন এবং ব্যবহার বদলাবে এটা তো সর্ববাদীসম্মত সত্য।কারন সময়ের প্রাথমিক শর্তই হল প্রতিটি প্রগ্রেসনের সাথে তাল মিলিয়ে কার্য এবং কারনকে সঙ্গে নিয়ে বদলে যাওয়া।এটা কোন চেষ্টাকৃত বিষয় নয়,শব্দ ব্যবহারের অনায়াস কৌশল বদল।লেখার ভাষাকে প্রকাশ্যের ভাষার সঙ্গী করে তোলার স্বাভাবিক প্রয়াস।অবশ্য বদলে যাবার পর আজ যত সহজে কথাটা বলা গেল ,যাঁরা প্রথম এই পথ দেখিয়েছিলেন তাঁদের কাছে কাজটা ঠিক এতটা সহজ ছিলনা।নিন্দে-মন্দ কিছু কম হয়নি তাঁদের।তবু তাঁরা আমাদের পথবদলের দিশারী।তাঁদের প্রণাম।


৪: কবিতার দায়বদ্ধতা ও পাঠকের দায়বদ্ধতা এ নিয়ে আপনার বিশ্বাস বিশদে যদি বলেন...


এরপরের কথাটি অবশ্যই আধুনিকতা বিষয়ে।প্রসঙ্গ যখন দায়বদ্ধতা এবং আধুনিক কবিতা,তখন আধুনিক শব্দটি জরুরী।দায়বদ্ধতা খায় না মাথায় দেয় সেটা জানা জরুরী।তবে আবারো বলে রাখি এই গদ্যে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দই নেহাতই আমার ব্যক্তিগত মনে হওয়া।পঞ্চাশ বছর ধারাবাহিক কবিতা লিখে আসার পর অন্তত নিজের মনে হওয়াটুকু খোলা মনে লেখার একটা অধিকার জন্মায় বটে।এটা হয়ত উত্তরদায়বদ্ধতা।আমার তো তাই মনে হয়।


আমি কবিতার/কবির দায়বদ্ধতার আগে আধুনিক এই শব্দটাকে একটু নেড়ে দেখতে চাইব।কারন আমরা প্রায়শই আধুনিকতা এবং সাম্প্রতিকতা শব্দ দুটিকে এক অর্থে ব্যবহার করে আধুনিক--এই শব্দটিকে লঘু করে ফেলি।আধুনিকতা কোন ফ্যাশন বা স্টাইল স্টেটমেন্ট নয়।সময়,কাল,যাপিত এবং যাপনযোগ্য যাবতীয় সংক্রমণের অতীত এবং তীব্র রকমে ঘাতসহ একটি অরূপ অস্তিত্বের নাম আধুনিকতা। প্রাথমিক ভাবেই এটি একটি বোধ যার উদ্ভাস প্রকাশিত শব্দে নয়,অনুভূত বোধে।মহাকালের নির্মম মারকে অতিক্রম করে যে সৃষ্টি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়,আমার বিবেচনায় তাই-ই আধুনিক।বাকিসব একেকটি নির্ধারিত সময় পিঞ্জর।


একটা প্রশ্ন নিজের ভেতরেই উঠতে চাইছে--তবে কি যা কিছু আধুনিক কেবল তাদেরই অধিকার সৃষ্টির জয়যাত্রায় অংশ নেবার?অন্যেরা সকলে ব্রাত্য?


ঠিক তেমন মনে হয়না।দায়বদ্ধতা এবং আধুনিকতা সর্বদা হাতধরাধরি করে চলতে পারেনা।আধুনিকতা সময়কে অতিক্রম করে সময়ান্তরে অনায়াস সঞ্চরমান।


দায়বদ্ধতা,পক্ষান্তরে,বাস করে সময় পিঞ্জরে।সে তার গায়ে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস-ভূগোলের খবরটুকুই রাখে।আর এই সসীম কালখন্ডের যোগফল থেকে সিঞ্চন করে যা উঠে আসে তাকে আধুনিকতার তকমা দিতে চাইব।দায়বদ্ধতা বিষয়টির সাথে খন্ডকালের সম্পর্ক অনেক বেশি।দেশকালের বিচারে আজ যা বর্তমান বলে সত্যের দাবি নিয়ে ধ্বজা তোলে তার তাৎক্ষণিক ফার-অসার নিয়ে প্রকাশিত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সমাহার হল দায়বদ্ধতা।সে নিত্যবর্তমান।তার সাথে আধুনিকতার সম্পর্ক এই যে আধুনিকতা যে প্রবহমানতার চিহ্ন আঁকে সে পথের প্রতিটি বাঁকে আলো ফেলে সময়ের পদছাপগুলিক প্রকট করে দায়বদ্ধতা।সময়কে জয় করার অঙ্কের শুরুটা ঐখান থেকে।


একটা কথা স্পষ্ট করে মাথায় রাখা দরকার --দায়বদ্ধতার কোন নির্ধারিত ধরন নেই।সে নিজেই একটি ধরন যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন হয়ে যায় ব্যক্তির মানসিক বিন্যাসে, বিশ্বাসে এবং নৈমিত্তিক যাপনে।


এই বিন্যাস,বিশ্বাস এবং যাপন থেকেই তৈরি হয় পাঠকের পাঠরুচি ,অভিপ্রায় এবং পাঠক্রিয়া।দীনেশ চন্দ্র সেনের সেই অমর উক্তিটি মনে রাখুন--"কেহ সপ্তকান্ড রামায়ন পড়িয়া অনায়াসে প্রশ্ন করিতে পারেন--ইহাতে কিসের উপপত্তি হইল?"


এই হল সেই বিশ্বাস,বিন্যাস এবং যাপন।তবু আমার নিজস্ব বিশ্বাস যতদূর সম্ভব সব পড়া উচিত।আমরা সবাই জানি মুদ্রার আলোকিত অংটি" সত্য কিন্তু শেষ সত্য নয়"।তার অন্ধকারের অস্তিত্বই  আলোকিত অংশের মহিমা বাড়ায়।তারপর একজন প্রস্তুত পাঠক নিজেই নিজের গতিপথ স্থির করতে পারেন।


পাঠকের শুধু তো নয়,দায়বদ্ধতা প্রধানত কবির উপর বর্তায়। তিনি লেখেন।তাঁর কিছু মনে হওয়াকে শব্দরূপ দেন কবি।আমরা পড়ি।কারো ভাল লাগে,কারো লাগে না।সে তো ব্যক্তিগত রুচির বিষয়।সেখানে কোন কথা চলে না।তবু একটা কথা এখানেও থাকে।পাঠকের উচিত নয় কোন লেখকের লেখা সম্বন্ধে পূর্বনির্ধারিত মানসিক গঠন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়তে শুরু করা।যদিও এমন পাঠকের সংখ্যা খুব কম নয়।তবে লেখার সময়ে নিশ্চই কোন কবি এই বাতুল পাঠকদের কথা মাথায় রেখে লিখবেন না।তিনি তাঁর বিশ্বাসকে সঙ্গী করে শব্দ সাজাবেন এবং সেই শব্দ সমাহার শেষপর্যন্ত কবি এবং পাঠক উভয়কেই একটি সত্যের কাছে পৌঁছে দেবে বা সেই অভিমুখের দিকে এগিয়ে দেবে।তাই শেষ অবধি কবিতা লেখা-পড়া-অনুধাবন একটি যৌথ ক্রিয়া,যেখানে সকলের অংশভাগ,দায়ভাগ প্রায় সমান।


তাই শুধু কবিতা নয়,সংস্কৃতির যে কোন বিভাগেই স্রষ্টার সাথে তাঁর পাঠক,রসিক বোদ্ধা শ্রোতা বা দর্শক সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।



২য় ভাগ


৫: আজকের জীবনে কবিতা, কবির দায়বদ্ধতা, এসব কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? 


আরেকটি কথা প্রসঙ্গত উত্থাপন করি এইখানে।আশা করি তা অসঙ্গত হবে না।অনেকেই এই কথা জিজ্ঞাসা করে থাকেন যে দায়বদ্ধতার ধরনটি কেমন হবে কবির।


আমার মনে হয় কোন নির্দিষ্ট ধরন বা রকম বা প্রকার দিয়ে দায়বদ্ধতাকে গন্ডীবদ্ধ করতে চাওয়াটা সঠিক কাজ নয়। আমি বা আমরা যে সমাজে আছি,যে কালখন্ডে জীবন যাপিত হচ্ছে সেখানকার সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিন্যাস এবং বিভাজন আসলে সচেতন মানুষের দায়বদ্ধতার অভিমুখ স্থির করে দেয়।এটা ঐতিহাসিক সত্য।আমরা কবি হই বা পাঠক,সবার আগে সমাজবদ্ধ জীব যার কিছু অধিকার, কর্তব্য আছে,যে শেষ পর্যন্ত একদলা আকাঙ্খাকে বুকের মধ্যে লালন করে সযত্নে।


আমরা সবাই সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে কিছু হয়ে উঠতে চাই।মানুষ হিসাবে পরিপূর্ণতার প্রতি তার চিরন্তন দৌড় আসলে তার প্রাথমিক অধিকার।এইখানে এসে ম্যাকলীশ লী'র কথা--A poem should not only mean but be" শব্দবন্ধটি ভীষণ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ব্যক্তিজীবনেও ওই poem শব্দটিকে জীবনের সাথে বদলে নিলে দায়বদ্ধতার মূল গুরুত্ব সহজেই নিরূপনযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। মানুষ একা বাঁচে না,কবিতাও সঙ্ঘবদ্ধতায় শ্বাস নেয় বুক ভরে।এই সঙ্ঘবদ্ধতা থেকে জন্মনেয় সংগঠনের,সেখান থেকে দেশ এবং জাতির চৈতন্য নির্মিত হতে থাকে। চেসোয়াভ মিউশ তখন কবিতাকে প্রশ্ন করেন--কাকে বলে কবিতা যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা জাতিকে?


দায়বদ্ধতার প্রশ্ন এইবিন্দুতে তার বর্শাটি গিঁথে দাঁড়ায়।কারন এখান থেকে তার নতুন যাত্রারম্ভ।নতুন কবিরা আসেন এইসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে।কবিতা তখন ন্যায়ের লড়াই লড়তে অগ্রগামী সেনার ভূমিকায় নামে।


৬: আপনার মনে হয় এই বিরোধ, এই কাব্যবিমুখতা, মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তবে একরকম বিকৃতি? একটু বলুন। 


কবিতাকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা  কিছুতেই বন্ধ হয়না। বাঙালি মধ্যবিত্ত পিতা তাঁর সন্তানকে প্রশ্ন করেন--কোবতে লিখছ?তা কি করবে শুনি ওসব ছাইপাঁশ লিখে?চিড়িয়াখানার বাঘের চাকরি করবে?


পন্ডিতপ্রবর দুই নাকে নস্য গুঁজে ভ্রু কুঞ্চন করে জানতে চান--যখন বিশ্বের তাবৎ প্রশ্নের জবাব বিজ্ঞান এবং দর্শন দিয়ে ফেলছে তখন আবার কবিতার বোঝা বওয়া কেন বাপু?


বিরোধিতা করার জন্য বিরোধ আসলে একধরনের মানসিক বিকৃতি।নইলে এঁরা,যাঁরা ভাবেন যে বিশ্বের সমস্ত সঠিক কেবল তাঁদেরই অধিগত, একটু নড়াচড়া বা নাড়াচাড়া করলে দেখতে পেতেন অ্যালডাস্ক হাক্সলী অনেক আগে লিখে রেখে গিয়েছেন যে কবিতা ব্যতীত আমাদের বিজ্ঞান এবং যাবতীয় প্রগতি ভয়াবহ রকমে দরিদ্র।


 যদি নেহাতই অতদূর যেতে ইচ্ছে না হয়,যদি মনে হয় ই এ রবার্টস বা হাক্সলী সাহেব বড্ড পুরনো তাহলে একবার চোখ রাখা যাক না কেন আমাদের ঘরের মানুষ কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথদের দিকে।স্বাধীনতার লড়াইয়ের সেনাদের বুকে আগুন ভরে দিয়েছিলেন তো কবিতা দিয়েই।বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়,দীনেশ দাশদের মতো কবিরা মানবতা এবং সমানাধিকারের স্বপক্ষে যে দলিল রেখে গিয়েছেন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব খুব মূর্খ ব্যতীত অন্য কেউ অস্বীকার করার স্পর্ধা দেখাতে পারেন?


দু'দুটি বিশ্বযুদ্ধের ঝাপটে বিধ্বস্ত ইওরোপকে কি নতুন করে পোপা,হোলুব,মিউশরা সঞ্জীবনী দান করেন নি?


৭: দুরুহ কবিতা বড় মুশকিলে ফেলে দেয়। সে নিয়ে কিছু বলুন। শেষ প্রশ্নে আসি। কবিতা কেন? 


খুব প্রাথমিকভাবে কবিতা বাঁচতে শেখায়।পুনরুজ্জীবনের মন্ত্রের উদ্গাতা কবিতাই সব যুগে।জীবনের প্রতিটি অনুভূতিকে একমাত্র কবিতাই তার উচ্চারণে বাঁধতে পারে।এইখানেই দায়বদ্ধতা সম্পর্কিত যাবতীয় তর্কের অবসান হয়।অবসান হয় কবিতার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে যাবতীয় তর্কেরও।

কথা ফুরায় কই?যতবার ভাবি এই তো,আর কি ই বা বলতে বাকি রইল?আমরা সামান্য কবিতা পাঠক এর বেশি আর কিছু বলতে পারিনা।কিন্তু তখনই মনে হয় "আরো কিছু বাকি আছে।বাকি আছে শেষ বজ্রপাত"।


কবিতার দুরূহতা নিয়ে একটি দুটি কথা নিবেদন করার ইচ্ছা জাগছে।অনেকেই অভিযোগ করেন কবিতা অত্যন্ত দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে।কিছুই বোধগম্য হয়না।


অভিযোগটি আজকের নয়।কবিতার সৃষ্টির আদিকাল থেকে এই অভিযোগ কবিতার গায়ে এঁটুলির মত সেঁটে আছে।আমার দৃঢ় বিশ্বাস চর্যাপদ বিশ্লেষণ করতে বললে অনেক বিদগ্ধ মানুষ হিমশিম খাবেন।ঐ ব্যাসকূট ছাড়ানো সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। বিষ্ণু দের কবিতা অনেকেই বোঝেন না বলে তিনি তুলনামূলকভাবে কম পঠিত থেকে গিয়েছেন। এখানে বলা দরকার যে দুর্বোধ্যতার দুটি প্রান্ত আছে এবং দুই প্রান্তে আছেন যথাক্রমে কবি ও পাঠক। কবি এবং পাঠকেরও দুটি করে প্রান্ত আছে।কবিদের দুইপ্রান্তে প্রজ্ঞাবান ঋদ্ধ কবি এবং হাইব্রিড কবি।পাঠকদের দুটিপ্রান্তে ঋদ্ধ প্রাজ্ঞ পাঠক এবং অনিচ্ছুক অপ্রস্তুত পাঠক।একজন প্রজ্ঞাবান ঋদ্ধ কবির কবিতা যখন আমাদের অধিকাংশের মত অর্ধশিক্ষিত পাঠকের হাতে পড়ে তখন তা বোধের অতীত হতে বাধ্য।তাই বিষ্ণু দের শীলভদ্র পঞ্চমুখ বা উর্বশী ও অর্টেমিস পড়ে অনেক 

পাঠকের মনে হয় আখ নয় কাঠ চিবিয়েছেন এতক্ষণ।


আমাদের অজ্ঞানতার দায় তো কবির নয়,পাঠককেও প্রস্তুতি নিতে হয়।নইলে আখের বদলে কাঠই ভবিতব্য।তবে কিছু কবি অবশ্যই আছেন যাঁরা কবিতাকে শব্দের ব্যায়ামের আখড়া করে তুলতে চান। পাঠককে কবিতা থেকে দূরে সরিয়ে দেবার এরচেয়ে সহজ পন্থা আর হয়না। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বর্তমান সময়ের কিছু কবি এই কাজটিই মন দিয়ে করে চলেছেন।আরেকটি বিষয়কে এই কবিরা সযত্নে এড়িয়ে চলতে চান।সেটি কবিতার ছন্দ। যেমন তেমন ভাবে যা কিছু লিখলেই সেটা কবিতা হয়না।কবিতার নিজস্ব কিছু দাবী আছে এই সহজ সত্যটি জোর করে বুঝতে না চাইলে তাঁরা বরং কবিতা থেকে দূরে থাকলেই কবিতার উপকার হয়।

ভিক্ষে দরকার নেই হে মহামান্য কবিবর,আপনার কুকুর সামলান।


🙏

🌹🌹

No comments:

Post a Comment

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...