Tuesday, 26 October 2021

বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা।


রাণু ভট্টাচার্য
শতদ্রু মজুমদার
স্বাগতা ভট্টাচার্য 
পূর্বা দাস
সুবীর মজুমদার 


অলক্ষ্মীর লক্ষ্মীপূজো
রাণু ভট্টাচার্য

--------------------------------

-  অলক্ষ্মী, বেরো, বেরো.... বেরো আমার বাড়ি থেকে।

-  আঃ করছো কি, ছাড়ো... পূজোর দিন..

-  এই অসীম, কি করছিস কি, ছাড় ওকে।

-  তুমি জানো না বড়দি, খালি পয়সা ওড়াবে!পঞ্চাশটা  টাকা রেখেছি সকালে ,  ঠিক দশটা টাকা সরিয়েছে! আবার বলে কিনা, টাকা জমায়! সারাক্ষণ ফুটানি। এটা কিনছে, ওটা কিনছে আর ঘর সাজাচ্ছে। চোর, বদমাস, মিথ্যুক!

      দরজার খোঁটাটা শক্ত করে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে রমা।  বিষচোখে সেদিকে তাকিয়ে তাসের আড্ডায় বেরিয়ে যায় অসীম।

     ধ্যাবড়ানো আলপনা মুছে রমা আবার আল্পনা এঁকেছে । লক্ষ্মীর পা, ধানের ছড়া, পদ্মফুল।ঝিলমিল হাসি তার মুখে। কিন্তু ভেতরে দামামা বাজছে, অলক্ষ্মী, অলক্ষ্মী, অলক্ষ্মী, অলক্ষ্মী।

চোখের জল লুকিয়ে রমা ভাবে, সে সত্যিই অলক্ষ্মী। নইলে, সেই যে চাঁদ সদাগরের গল্পে, সেই যে, বেহুলা, ভেলায় করে গাঙুরের জলে ভেসে গিয়ে ফিরিয়ে  এনেছিল স্বামীর প্রাণ, আর সে কিনা নিজের স্বামীর মনটা ফেরাতে পারলো না! অলক্ষ্মী নয়তো কি, সে?

         ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালে রমা। গলায় তার গুনগুন -

          ‌নিছনি নগর হতে কন্যা চম্পকনগরে

        ‌বধূবেশে কন্যা আসে লোহার বাসরঘরে।

         ‌ছিদ্র দিয়ে কালনাগিনী বধূর অগোচরে

         ‌দংশালো চাঁদের তনয় কুমার লখিন্দরে।

        কই? কোথায়? কোথা দিয়ে কালনাগিনী এসে ঢুকলো তার সংসারে?

       পূজো শেষ হলো। সবাই প্রসাদ পেলো। অনেক বলা সত্ত্বেও ননদ ননদাই ফিরে গেলো। রাতঘুমে অসীম ঘুমন্ত। আর তখন, রমার বুকে সেই দামামাটা আরও জোরে বেজে উঠলো, অলক্ষ্মী,অলক্ষ্মী, অলক্ষ্মী, অলক্ষ্মী।

       লক্ষ্মী ঠাকুরের সামনে জাগরণের নৈবেদ্য আর জাগরণের প্রদীপ গুছিয়ে রেখে তনুপুকুরের ঘাটে গিয়ে বসলো রমা। চারদিকে চাঁদের আলো, ধানের গন্ধ, পদ্মফুলের গন্ধ আর মায়ের গায়ের কাপড়ের গন্ধ।  হু হু করে উঠলো রমার মনটা। মাকে সে বলতো, মা, ঠাকুরকে জলে ফেলে দেয় কেন? মা বলতো, জলের ভেতর দিয়ে ভেসে ভেসে ঠাকুর তার নিজের দেশে ফিরে যায়। তবে লক্ষ্মীঠাকুরকে কিন্তু জলে ফেলতে নেই, ঘরে রেখে দিতে হয়। চোখের জলে রমা ভাবে, তা'হলে অলক্ষ্মীকে ফেলে দিতে হয় বুঝি? তাই বুঝি কুলো বাজিয়ে পাছদুয়ার দিয়ে অলক্ষ্মীকে বিদেয় করে বলে  -  অলক্ষ্মী, দূর হও, লক্ষ্মী তুমি ঘরে এসো! 

        ঘাটের সিঁড়িতে পুকুরের জল তার পা ছুঁয়ে ছিল। এবার বুক ছুঁল, মাথার চুল ছুঁল। আঃ কি শান্তি! কি আরাম তার বেপথু মনটায়!

     জলে মেশে চোখের বারি অন্তরে গুমরি

        অনন্ত ভাসানে চলে বেহুলা সুন্দরী।।


        এক বছর পর। আজ আবার কোজাগরী পূর্নিমা। অসীমের ব্যবসার কাঁচাপয়সা -  নতুন বৌ লক্ষ্মী সব ব্যাঙ্কে জমা করে দেয়। ঘরে আলো, পাখা, টিভি। কিন্তু পূজো হচ্ছে না আজ। লক্ষ্মী বলে দিয়েছে, ওসব বেগার খাটতে পারবে না সে। 

       উলু আর শাঁখের  আওয়াজে হু হু করে ওঠা অসীমের মনটা খান্ খান্ হয়ে যায় কিছু ভাঙার শব্দে। নাঃ ও কিছু নয়।  পুরোনো লক্ষ্মীর ভাঁড়টা ভেঙেছে তার বৌ। ঘরময় খুচরো পয়সা আর টাকা। কিন্তু, একি! এটা কি? কোণে হলুদের দাগ লাগা এ যে সেই দশ টাকাটা! গত কোজাগরী পূজোর দিনে এটার জন্যেই না সেই ভয়ানক ঘটনাটা ঘটে গেলো এ বাড়িতে?

       স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা  অসীম শুনতে পায় লক্ষ্মীর গলা।  - বাব্বাঃ শ'খানেক তো হবেই। কালই জমা দিয়ে আসবো ব্যাঙ্কে। ভালো হবে না? কি গো......


তারপর
শতদ্রু মজুমদার


খুব ছোটোবেলায়  গল্প বলে ঘুম পাড়াতো আমার মা l সেগুলো বানানো গল্প l কিন্তু দারুন  l ঘুম ছুটে যেত l মা ঘুমিয়ে পড়তো l আমি  ঠেলা মেরে বলতাম : তারপর কী হলো ?

----এখন ঘুমিয়ে পড় !

----তারপর কী হলো বলো না --

-----মনে পড়ছে না ---কাল বলবো ---এখন ঘুমিয়ে পড় !

কিন্তু পরের দিনও একই অবস্থা : তারপর 

যে কী হলো জানা হলো না !

 

(2)

আমার ছেলেকে   গল্প বলতাম l তার কোনও আগ্রহ ছিল না !সম্পূর্ণ গল্পই শোনাতাম l গল্প শেষ হবার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়তো !

 

( 3 )

আমার নাতনির নাম পাখি l সারাক্ষণ বকর বকর !রাত্তিরে ওকে গল্প শোনাতাম l শুনতে শুনতে কখনো ঘুমিয়ে পড়তো সে l কখনো আমি !গল্পের মাঝখানে থেমেও যেতাম l কিন্তু পাখি কখনোই বলে নি : তারপর কী হলো l 

একদিন সে বলল : মা বলেছে ইংলিশে স্টোরি বলতে !

----এ তো রূপকথা !কী অনুবাদ করবো --টুনটুনির গল্প ঠাকুমার ঝুলির কি ট্রানস্লেশন সম্ভব ?

---প্লীজ ডোন্ট টেল বেঙ্গলি স্টোরি !


(4 )

পাখি আর আমার ঘরে ঢোকে না l নিশ্চয় ওর মা এর নির্দেশ l ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ে l প্রচন্ড চাপ l পড়া ছাড়াও নাচ -আবৃত্তি -ছবি আঁকা l

মা 'র  হুকুম l বাবার ধমক !কোনও ব্যাপারে কৌতূহল  নেই l আগ্রহ নেই l সবই রুটিন মাফিক l   

(  5 )

ও যখন বড়ো হবে তখন আমি এই পৃথিবীতে থাকবো না !তাই মেয়েটার ভবিষ্যৎও আমার কাছে অজানাই থেকে যাবে !!


অস্তিত্ব
স্বাগতা ভট্টাচার্য


একজন নিরুদ্দেশ মানুষের

ফেলে যাওয়া পথে

ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে 

টুকরো সময়ের আলপনা ।

ঘর ,বারান্দায় অগোছালো রোদ্দুর

ভাসিয়ে দিচ্ছে গতকালের উপস্থিত উজ্জ্বল

মূহুর্ত ।

চাঁদের চুঁইয়ে পড়া আলোর সাথে

কড়া নাড়ার পুরনো শব্দ,

পুকুরপাড়ে নেমে আসা সাদা চাদর

জড়ানো কুয়াশা সকাল যেন

না কামানো দাড়ির সাথে অশৌচ

পালন করছে ।

এভাবেই টুপ করে ঠিকানা হারানো

নিরুদ্দিষ্ট  জীবন 

ছবিতে থাকে-ঘোলাটে সময়ের

ধূসর স্মৃতি ক্রমশঃ ফিকে হয় 

অস্তিত্ব ।


প্রতিবাদ


প্রতিবাদ আসলে মানুষের জন্য 

কাছের হয় কলম ,

তোষণে লেহনে মাছির মত 

উড়ছে মানুষ 

মরচে ধরছে মগজের ধার ॥

তবুও ভিজি মানুষের জন্য 

ঝড়ে ভাঙা ঘর 

গড়ে তুললে চাই ,

মানুষের জন্য সত্যিই কি প্রতিবাদে 

নামতে চাই ?

নিজের চোখে চোখ রাখ 

হাতের সাথে হাত ,

কলমের ডগালিখছে আজ  

প্রতিবারে প্রতিবাদ ।


রক্তকরবী
পূর্বা দাস


খবরটা দিল শ্রেয়সী।

- কি করবি, যাবি? আমায় তো কার্ড দিয়ে নেমন্ত করেছে, যেতেই হবে। তোকে হয়ত হোয়াটসঅ্যাপে জানাবে।


- দেখি কি করি। ভার্চুয়ালি বললে ভার্চুয়ালিই কাটিয়ে দেব। আমার অত সময় নেই এখন। একতাড়া খাতা দেখা বাকি। তবে কায়দা মেরে যদি বাড়িতে আসে, তখন...


যদিও ভালো করেই জানি কায়দা মারার মানুষ সে নয়। কেজি ওয়ান থেকে একসাথে। মাধ্যমিকে এগ্রিগেটে কুড়ি আর অংকে পাঁচ নম্বর বেশি পেয়েছিলাম। উচ্চ মাধ্যমিকে সায়েন্স নিয়ে একদম বিশ্রীভাবে ধ্যাড়ালাম। আর ওপথ মাড়াইনি। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে নিলাম ঝপ করে। ও কিন্তু দিব্যি চারটেতে লেটার আর জয়েন্টে একটা মারকাটারি রয্যাঙ্ক করেও স্কটিশে চলে গেল অংক নিয়ে পড়তে। ও হ্যা, ও নন্দিনী, আমি তনুকা। কয়েনের এপিঠ-ওপিঠ ছিলাম অনেকদিন পর্যন্ত। বন্ধুরা বলত, এত চিপকে থাকিস সবসময়, লেসবি নাকি! মাস্টার্স করার সময় থেকে একটু আলগা আলগা। আমি যাদবপুরের হস্টেলে। ও উত্তরপাড়া থেকে যাতায়াত করতো রাজাবাজার। হঠাৎ শুনলাম নন্দিনী বিয়ে করেছে। রাগে অভিমানে বেশ কয়েকবছর সব যোগাযোগ ছিঁড়ে ফেললাম। চাকরিটা পাওয়ার পর অনেকটা হালকা লাগল। ঠিকানা, ফোন নাম্বার জোগাড় করলাম। যাব, বলাতে একটু মিইয়ে গেল যেন। আমার ওসবে কান দেওয়ার ইচ্ছে নেই। একটা শনিবার কলেজ-ফেরত ওর শ্বশুরবাড়ি। সোনারপুরে একটা এঁদো গলিতে অনেক ঘোরাঘুরির পর একতলা পুরনো বাড়িটা খুঁজে পেলাম। কিন্তু নন্দিনীকে পেলাম না।

- মাস্টার্সটা কমপ্লিট করলি না, কি হয়েছিল, কি?

হি হি করে হেসে বলল, " পিরিত... পিরিত রে... রঞ্জনের সাথে নন্দিনের পিরিত।" 


আরও কয়েক বছর পরে স্মার্টফোনের দৌলতে বন্ধুরা আবার এককাট্টা। রিউনিয়নের ধামাকা। নন্দিনী দু একবার এল। তারপর অনেকদূর... বাচ্চারা ছোট... শাশুড়ির শরীর খারাপ। আমিও যেন স্বস্তি পেলাম।শুধু লেখাপড়া তো নয়, সব বিষয়েই ওর অদ্ভুত ক্যারিশমা কে কখনো টপকে যেতে পারিনি আমি। ও এলে কোথাও যেন আমার একটা নিঃশব্দ পরাজয়। শ্বশুরবাড়িতে যেদিন ওকে দেখেছিলাম, মুটিয়ে যাওয়া, এলোথেলো শাড়ি পরা... নন্দিনীর ওপর ছোটবেলা থেকে যে ঈর্ষার কাটাটা খচখচ করত যখন তখন তার ওপর যেন কেউ একটা নরম প্রলেপ দিল।

হারিয়ে ফেলে, হারিয়ে দিয়ে বেশ সুখে ছিলাম। কানাঘুষোয় খবর আসত, ও নাকি একটা সেলাই স্কুল করেছে। হরি! হরি! শেষ পর্যন্ত সেলাই দিদিমণি! সেসব আর চাক্ষুষ করার ইচ্ছাই হয়নি। তারপরেই এই ইনভিটেশন। প্রবল কৌতুহল টেনে আনল একাডেমিতে। নন্দিনীর একক প্রদর্শনী। আমাদের দেখে ওর চোখ ঝলসে উঠলেও উচ্ছ্বাসে ভাসছে পারেনি। বিশিষ্ট অতিথিরা এসেছেন। ওর আঁকা ছবি সাথে কিছু অনন্য ক্রাফট আইটেম ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বাইরে ডিসপ্লে বোর্ডে ওর ছবি এবং অন্যান্য সৃষ্টি বিক্রির টাকার পরিমাণ এবং সে টাকা কোথায় কোন ওয়েলফেয়ার সংস্থায় যাবে তার নাম। 


বেরোনোর সময় ওর ছায়াসঙ্গী কয়েকটি অল্প বয়সী মেয়েকে দেখে ওদের পরিচয় জানতে চাইলাম।

- ওরাই তো আমার অচলায়তনের চাকা রে। ভাঙতে পেরেছি বুঝলি... ওদের নিয়ে একটা ছোট স্কুল চালাই।

সেই কালো ফ্রেমের চশমা, ঝকঝকে চোখ, সেই ধারালো মুখ, পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির নন্দিনী। 


ওলা বুক করতে করতে শ্রেয়সী বলল," রক্তকরবী কখনো শুকোয় না, বল! "


সুবীর মজুমদার 
এ ভাবে কেউ ডাকবে না


চিন্তা কোরোনা, বৃষ্টি একদিন থেমে যাবে

তবে, আর একবার পড়ে নাও পূর্বাভাষ

দ্রাঘিমায় জমেছে পুরু মেঘের স্তর

জলোচ্ছাস ক্রমশ এগিয়ে আসছে 

মহা প্লাবনের আর বেশি দেরি নেই, চলে এসো,


নোয়ার নৌকোয় এখনও জায়গা আছে

আমি দাঁড়িয়ে আছি অল্প আগুন নিয়ে

সেই উত্তাপে আমরা কাটিয়ে দেবো হিমযুগ

তারপর অঙ্কুর আসবে শষ্য বীজে

ফিরে আসবে রোদ্দুরের দিন গুলো

নতুন অক্ষর লিপিতে লিখে রাখব সব অসম্ভব, 


পছন্দ মতো বেছে নেবো কোনো পাহাড়

গুহা থেকে দেখা যাবে ঝরনার জল

মাটিতে আঁকা হবে আলো ছায়ার জাফরী

হাঁটতে হাঁটতে এখন মনে করো কোনো কিংবদন্তি

নতুন সেই সভ্যতার নাম দেবো দিগন্তের মতো

আর বেশি দেরি নেই, ভাবতে ভাবতে চলে এসো।


খেলা ধূলা সম্পর্কিত


তোমার রিফ্লেক্স কমে এসেছে, স্লিপ থেকে চলে যাও থার্ডম্যানে

বুঝে নাও, তোমায় আসলে চলে যেতে বলছি, তুমি বাতিল

শেষ রেসের পরে ঘোড়াকে গুলি করা হয়, জান নিশ্চয়ই।


দেরি কোরোনা, অনেকে বসে আছে রিজার্ভ বেঞ্চে

ওরা তোমার সব রেকর্ড একে একে ভেঙ্গে দেবে

চলে যাও বলতে আর ভালো লাগছে না, এবার শূণ্যে গুলি করব


তারপরেও না গেলে তাক করব তোমার বুক

জার্সিটা খুলে রাখ , ওতে বুলেটের দাগ থেকে যাবে

আর শুনে রাখ ক’টা কথা, অযথা বিতর্ক রেখো না।


আত্মজীবনী দেখিয়ে নেবে ছাপানোর আগে

জেনে রেখ, তোমার কু কাহিনী সব জমা আছে সযত্নে

দেখবে তোমার বিজ্ঞাপন ধারাভাষ্য সব বন্ধ।



বিজয়া  সম্মিলনির শেষ অংশ 
সূচী
শুভশ্রী সাহা 
অরিজিৎ পাঠক
দত্তা 
অমর ঘোষ 
দেবাশিস দে
নব বন্দ্যোপাধ্যায় 
উৎপল ত্রিবেদী 

সাপ লুডো
শুভশ্রী সাহা


ড্রয়ার টা খুলে হাত বাড়াতেই হাত ঠেকল গুলিটার গায়ে।! কাঁচের গুলি ভেতরে নীল আর হলুদ মেশানো! বাচ্ছাদের খেলার   । তার ড্রয়ারে কি করে এলো! ভাবতে না ভাবতেই বুকে আবার একটু চিন চিনানি।  আঞ্জিওপ্ল্যাস্টির পর অঞ্জুর কড়া নির্দেশে সব ওষুধ সুবীর অফিসেও রাখে! ওষুধ খাবার পর গুলিটা হাতের মুঠ করলো সে। আহ! কতদিন পর!


-- আরে দাদা চলো, পার্টিতো  কখন এসে বসেই আছে। তবে  ব্যাটা সেন কিন্তু  খেলছে বস! সব একাই মারার তালে আছে। 

সুবীর অসীমের দিকে তাকাতেই ওর মণিতে স্পষ্ট একটা সাপ দেখতে পেল। 

 সুবীর  চমকে গেল। কিন্তু ওই এক মুহূর্তই।


--  স্যার মিটিং এর ফাইলটা,

শোন সুস্মিতা, সুবীর মাথা তুলতেই সুস্মিতার চোখের মণিতে  লিজাকে নগ্ন দেখল।  স্পষ্ট! কিন্তু  লিজা কেন ! হঠাৎ! 

আহ, এ সব কী হচ্ছে,    সেতো  সুস্মিতাকে সত্যি সত্যি এ ভাবে দেখতে চেয়েছিল!  কিন্তু সুস্মিতা যে একেবারেই অন্যরকম নিকলা!


সুবীর পাশ কাটালো। পার্টির সাথে রফা করছে সেন। কাঁচের টেবিলের প্রতিবিম্বে কিন্তু  সে লোকটার চোখে জাল দেখল। দেখেই ভয়ে  দ্রুত মিটিং ত্যাগ করে সে বেরিয়ে গেল।

আজ   এমন সব অদ্ভুত ছবি সবার চোখের মধ্যে কেন ভাসছে সে বুঝতে পারছে না।  এরা তার বহুদিন ধরেই  চেনা!  

-- হ্যালো! ওষুধ খেয়েছ?

কই, চুপ করে আছ কেন! অঞ্জুর উদবিগ্ন গলা

-- সুবীর অন্যমনস্কের মতো হ্যাঁ বলল অঞ্জুকে! হ্যালো বলার সাথে সাথেই তার একটা অপরিচিত গন্ধ নাকে এসেছিল।

গুলিটাকে  মুঠো করে ঠেলে দিল আবার ড্রয়ারে। শরীরটা ভাল লাগছে না, বাড়ি যাবে।


-- পার্কস্ট্রিটের সিগন্যালে আটকে থাকার সময়ই  সুস্মিতাকে দেখতে পেল চিরঞ্জীবের সাথে। চমকে গেল সে, চিরঞ্জীব আগে এই অফিসেই পোস্টেড ছিল। ও আর চিরঞ্জীব  তখন ট্যাক্স মুকুবের ঘুষের  টাকায় প্রায় প্রত্যেকদিন লিজার ফ্ল্যাটে--- চমক ভাঙল তার, তাই জন্য সে আজ সুস্মিতাকে লিজার মতই---  চিরঞ্জীবের হাঁ বেড়ে যেতে চিরঞ্জীবকে সুবীরই  কায়দা করে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি ভাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সুস্মিতা কি করছে চিরঞ্জীবের সাথে,  চিরঞ্জীবের চোখের মণিতেও কি সাপ ছিল! -- তার  আবার চিনচিনে অস্বস্তি শুরু হলো। বিনবিনানি  ঘাম হচ্ছে এসিতে বসেও। চিরঞ্জীবএত তাড়াতাড়ি  ফিরে এলো কি করে!


সিঁড়ি দিয়ে উঠে শোবার ঘরে ঢুকেই তার একটা অপরিচিত গন্ধ লাগল। রিস্টোয়াচ খুলে মুখ তুলতেই আয়নায় সে তার চোখে সাদা চাদর বিছানো খাট টা দেখল!

কিন্তু এখন তো কমলা  চাদর বিছানো --

--- তোমার চা, পেছনে কাপ হাতে অঞ্জু দাঁড়িয়ে। 

সুবীরের  চোখ বন্ধ করা। খুলতে সাহস হচ্ছে না আর। চিনচিনানি ব্যাথাটা টা বেশ বাড়ছে। ছড়িয়ে পড়ছে সারা বুক জুড়ে।তবুজোর করে সে খুলে সামনে তাকাতেই, অঞ্জুর চোখে  মণি বউদিকে দেখল। স্পষ্ট! মণি বউদি তার সেজদার বউ! তারা দুজন একসাথে --

কিন্তু অঞ্জুর চোখে মণি বউদি কেন-- তবে কি অঞ্জুও  মণি বউদির মতো কারুর সাথে--- 

কিছু একটা ধরতে গেল সুবীর মুঠো করে , হয়ত অঞ্জুকেই, জোর করে চোখ খুলে দেখল অঞ্জুর মণির বদলে অবিকল সেই নীল হলুদ গুলিদুটি স্থির হয়ে আছে।


অরিজিৎ পাঠক 
দুটি কবিতা 


প্যান্ডোরার বাকসো খুলে বসলে একে একে বেরিয়ে আসতে চায়

কালো সুতো, সেফটিপিন, হ্যারিকেন চিমনি, দুলালের তালমিছরি 

এত যে সমারোহে আকাশ যাপন 

সে ব্যাপারে হাতযশ কোনোদিনই ছিল না আমার

কতবার এক চিলতে মেঘকে গোটা আকাশ ভেবে ফেলে

দুরদার করে নেমে এসেছি ছাদের কার্নিশ বেয়ে

জন্মাবধি কেউ বলে দেয়নি‌ আমায়

ক্ষয়ে যাওয়া বিকেলগুলো যেখানে জমাট বেঁধে থাকে

তার ওপরে দোলনা লাগানো নীলচে বাগানটাকে আকাশ বলে

কতদিন দেরি করে ঘাটে পৌঁছেছি বলে

আমাকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছে দিনের শেষ খেয়াটি

কতদিন লাফ দিয়ে নৌকোয় উঠেছি বাঁধন খুলে দেবার পরেও

এপারে সব কিছু জড়ো হয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে

ওপারে জেগে উঠতে দেখেছি সাদা কালো রঙের ঘরবাড়ি, দোকান

এখনও অ

নেক রাত ভেজা পালক জড়িয়ে কাটানো হলো না

অনেকটা অপূর্ণ সময় চলে গেল শুধু ছল ছুতো করে, আর নয়

এবারে আমি স্থির হয়ে নদীর ধারে বসে 

অলস জলে চোখের মণির ছায়া ভাসতে দেখবো


ও টিকিটঘর, নোঙর তুলে দিতে বলো

                              আমি আর ওপারে যাবো না ।।


 **               _

জড়িয়ে থাকার চেয়ে শূন্যজাগতিক

সত্য বলে আর কিছু নেই

যেমন ছুটে আসা দ্যুতিমান তারা

পেয়েছিলো সূর্যের অপাপ আলিঙ্গন

ধূসরিত পৃথিবীর জন্মমুহুর্তক্ষনে 


তেমন করেই যদি আজও 

প্রেম আসে বীজধান মাঠে

যদি শিশির লাগায় চোখে সোহাগ শর্বরী

অশনি আঘাত আনে আলোকসামান্য 

অনিবার্য স্বেচ্ছামৃত্যু কোনো

ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মত, তবু 

স্নিগ্ধ ভেবে তাকে জড়িয়ে ধরাই শ্রেয়


হে প্রিয়, 

বৈরিজন্মের প্রেয়সী আমার

সম্ভোগঋতুর ছাই ছাই রৌদ্রগন্ধ 

আশরীর জড়িয়ে নেবার আগে 

আমাকে সামান্য ভিক্ষা দিয়ে যেও

তোমার অপরিসীম সমূলের অভিঘাতখানি


সুডৌল বাহুর প্রেষণে

মাংসপিণ্ড জুড়ে রক্তক্ষরণের পরে 

একবার সমর্পিতস্বরে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে

নিস্পন্দ আয়ুটির নাম ধরে ডেকো


                                       

______________


নহবৎ
দত্তা


 পেঁজা তুলোর মতো মেঘ দেখলে ভীষণ 

 ছুঁতে ইচ্ছে করে নীল। .

 বৃষ্টিভেজা মনের পাশে  রেখে দিই কালি ও কলম

 ভেসে আসা কাশফুল গন্ধে

 হারিয়ে যায় তোমার-আমার ঋণ 

 বছরের ঘুম ভেঙে যেন একদিন আমি জেগে উঠি !

 অনুভব করি আমারই মতন তুমিও

 পাখি হতে চাও মুক্তির খোঁজে।


 সমস্ত নিয়ম ভেঙে-চুরে শিউলি সোহাগে

 তিরতিরে মন নিয়ে জল থই থই ঘর ছেড়ে

  ছুট্টে পেরোই বারান্দা-সদর 

 দেখি,

  সমস্ত রাস্তা জুড়ে বসেছে নহবৎ


 শারদীয়ার ।। 


এ সময়ে দাঁড়িয়ে


 এখনো কর্ষণ বাকি ঋতুর মাটি 

 কলমের আঁচড়ে কাঁপছে খড়ের চাল

 ফোঁটা ফোঁটা রক্তে ঢাকছে শিশির ভেজা মাঠ।

 জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে হাত জোড় করে এগিয়ে আসছে কালো মানুষের দল…

 খালি গা, খালি পা

 পোড়া তামাকের গন্ধে ভাসছে শরীর।


 আমি এক কলম বিলাসী মানুষ

  হাতে সাদা খাতা নিয়ে

 এ সময়ে দাঁড়িয়ে আছি

 আলপথের মাঝ বরাবর 


 একটা সূর্যোদয়ের কবিতা লিখব বলে।


অমর ঘোষ 
পক্ষীরাজ


হঠাৎ জানা গেল পায়ের নীচে রাস্তা নেই

জানা গেল অতীত জলধারা থেকে যে নদী

সেও উধাও

গাছেরা ঝুলে আছে শূন্য থেকে


মাটিতে পা রাখার আপ্রাণ চেষ্টায়

হাওয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি


তরোয়াল ঘোরাতে ঘোরাতে জেনে ফেলি

আমার ঘোড়ার নাম পক্ষীরাজ -


চিহ্ন


মহারানীর রাজত্বে গফুর হঠাৎ রাগ দেখিয়ে ফেলেছিল

সেই থেকে মোষের পিঠ

আর সোজা হয়নি


তারপর অত খাল কাটা হল 

কত জলাধার 

কত মূর্তি খাড়া হল 

কিন্তু মোষের পিঠ আর সোজা হয় না 


অদূরে গমক্ষেতে হাওয়ারা ফিসফিস করে 

কথার পিঠে কথা ওঠে 

স্লোগান লেখা হয় আকাশে 


এখন গফুরেরা বড় একরোখা 

কিন্তু মোষের পিঠ সোজা হবে কি?


অসম্পূর্ণ


দাঁড়িয়ে আছি 

খুব কাছাকাছি 

দেখছি নিখুঁত করে 


তবু দেখা সম্পূর্ন হয়না 

অসমাপ্ত থেকে যায় দিন 

পর্ব ভেঙ্গে ভেঙে লেখা 

সেই চিঠি 

সেই স্বরবর্ণের ঝরঝরে 

মুক্তো বিন্দু


দিগন্ত চোখের তারা 


আয়নার ভেতরে ও বাইরে একই মানুষ হয় কি করে...


বড় মাছ
দেবাশিস দে

 গিন্নী, তোমার কথাই ঠিক – এই দেখ কত বড় মাছ। আমার জীবনে এত বড় মাছ আমি কোনো দিন ধরিনি।

 শুকদেব মন্ডল তার শীকারটা দাওয়ায় গিন্নীর সামনে রেখে ঘরে  ঢুকে দরজা বন্ধ করে। বৌএর একটা কাপড় গলায় জড়িয়ে আড়কাঠে নিজের শরীরকে ঝুলিয়ে দেয়।

 দর্মার বাড়ি। মাটির মেঝে, ঘরের সামনে ছোটো দাওয়া, পুরোটাই টালির চাল, ঘরের দুদিকে দুটি জানলা। একটি তক্তোপোষ, তাতে তোষক বালিস সবই আছে। তবে ঘরের আসবাব ও অনান্য জিনিসে  দিন আনা দিন খাওয়ার ছাপ। দাওয়ার এক ধারে উনোন জ্বেলে শুকদেবের স্ত্রী কমলা রান্না করে। পাশে কমদামি কাঠে বানানো সেলফ্‌এ রান্নার সরঞ্জাম ও আনুষঙ্গিক টুকিটাকি থাকে। শুকদেব, কমলা আর ওদের দুটো ছেলে – বড়টা পাঁচ ছোটটা তিন – এই নিয়ে শুকদেবের ছোটো সংসার। পেশায় ছুতোর। মোটামুটি রোজই কিছু না কিছু রোজগার জুটে যায়। তাই দিয়ে দিনের শেষে বাড়ি ফেরার পথে বাজার করে আনে সে। বাড়ির সামনে ছোটো এক ফালি জমি। কলা লঙ্কা, লাউ, কুমড়ো গাছ আর কিছু শাকসব্জি লাগিয়েছে সেখানে।  জমির পাশে একটা ছোটো পুকুর। পানা ভর্ত্তি। পুকুরের মালিক অবশ্য শুকদেব নয় – অধীর মিত্র। শুকদেবের বাড়ির উল্টোদিকে যে হলুদ  রংএর দোতালা বাড়িটা দেখা য়ায় – ওটাই অধীর মিত্রর। অধীর মিত্র শুকদেবকে দয়া ও স্নেহের চোখে দেখেন। প্রয়োজনে শুকদেব ওঁর বাড়ির টুকটাক কাজও করে দেয়। অধীর মিত্র পুকুর থেকে খুব কমই মাছ ধরেন। মাঝে মাঝেই শুকদেব ঐ পানাপুকুরে বর্শা দিয়ে মাছ ধরে। অধীর মিত্র তাতে কিছু বলে না। বাজার থেকে মাছ কেনার তেমন ক্ষমতা নেই শুকদেবের। যে দিন পুকুরে মাছ পায় মাছ রান্না করে কমলা।

 কমলা দাওয়ায় রান্না করতে করতে হঠাৎ দেখে পানা পুকুরে পানাগুলি খুব নড়ছে। কমলা  বুঝে  যায় বড় মাছ আছে। শুকদেবকে বলে, ‘দেখ পুকুরে মনে হচ্ছে বড় মাছ আছে, ধরবে’? শুকদেব তার বর্শা নিয়ে এগিয়ে যায়। পানাগুলির নড়ন চড়ন লক্ষ্য করে বিদ্ধ করে সে। বর্শা আটকায়।

বর্শা আটকায় শুকদেবের পাঁচ বছরের ছেলের পিঠে। তা বুক ভেদ করে সামনে বেরিয়ে আসে। কমলা খেয়ালই করেনি তার বড় ছেলে খেলতে খেলতে কখন পুকুরের ধারে গিয়ে জলে পড়ে গেছে।


পাগলি জানে
নব বন্দ্যোপাধ্যায়


খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় সুরঞ্জনের। ভোরের পবিত্র পরিবেশ, দূষণহীন বাতাস,

কলকোলাহলহীন চরাচর খুব স্বাভাবিক ভাবেই অন্য অনেকের মতো মন আপ্লুত করে দেয়। বাড়ির কাছেই গঙ্গা। গঙ্গার ধারে পার্ক। সেই পার্কে কয়েক পাক ঘুরে শরীর মন খানিকটা সতেজ করতে বহু লোকই আসে  সুরঞ্জনের মতো। আসে কমবয়েসী মেয়েটিও।  আপনমনে

 বিড়বিড় করে। মাথার জটপড়া চুলে আঙ্গুল জড়ায়। খোলেও আবার। বোঝা যায় অনেকদিন চান করেনি। নোঙরা  জামাকাপড়ের  

দুর্গন্ধে কাছে ঘে৺ষতে চায় না কেউ।।

আজ  পার্কে হা৺টার পাট চুকিয়ে পুব আকাশে ঈশ্বরের রক্ত লাল চোখটির কাছে হাতজোড় করে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছিল সুরঞ্জন। হে মঙ্গলময়, এমন মধুর প্রভাতটি উপহার দেবার জন্য

আমার বিনত প্রণাম নিয়ো । সকলকে দেখার এই চোখ দাও ঠাকুর। সকলের

শুভ হোক ।

প্রণাম শেষে মাঠ ছেড়ে বেরোতে যাবে কাণের পাশে কেউ বলে উঠল,'কাকু- আজ কোনো অনুষ্ঠান হবে না?' ঘাড় ফিরিয়ে সুরঞ্জন দেখল সেই পাগলি মেয়েটা। হঠাৎ এই প্রশ্নের সামনে কেমন থতমত খেল সুরঞ্জন। জিগ্যেস না করে পারল না, 'কেন - অনুষ্ঠান কেন ?'

পাগলি আগের মতোই আঙ্গুলে মাথার চুল জড়াতে জড়াতে উত্তর দিল,'আজ যে একুশে ফেব্রুয়ারী!' কথা শেষ করে যেমন এসেছিল তেমনই চলে গেল সে সামনে থেকে।মাথা নিচু করে সুরঞ্জন বেরিয়ে এল পার্ক থেকে।


উৎপল ত্রিবেদী
শেষ কবিতার জন্য শোকগাথা 


তখন সন্ধ্যে নামছে গুটি গুটি পায়ে

দিনমনি হে,আরেকটুক্ষণ ছড়িয়ে রাখো আলো

নদীজলে আজ আমার মুখ দেখা হয়নি।

দক্ষিণদিকে মেঘ জমছে চাপ রক্তের মতো

আকাশকে বুঝি এইমাত্র গিলে ফেলবে

একটু সামলে দাও দিনমনি হে

আজ আরেকটু বড়দিন হোক।

আমার তো ঘন্টা বেজেই গিয়েছে,

ভালবাসা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে,পাশাপাশি

মূর্ছা গেছে অভিমান,

বেঁচে থাকার সাথে কবেকার আড়ি!

আমার নাড়ি-নক্ষত্রের হিসাব কাউকে দিইনি

কোনদিন দেখাইনি সাপলুডোর মই,

জানতাম ঘোড়ার আড়াই চালে

রাজা মরে বারবার।


অসহ্য দাবদাহে পুড়ে যাচ্ছি,

পুড়ছে দেশ,পুড়ে যাচ্ছে আত্মীয়-স্বজন

ল্যাম্পপোস্ট বেয়ে নেমে আসছে গলিত পাখির অবশেষ

আর আমি ,দিনমনি হে,

প্রার্থনায় নতজানু হচ্ছি--

আরেকটু ছড়িয়ে রাখো আলো,

আজ খুব বড়দিন হোক।


কবিতার পান্ডুলিপি


চন্দনের গন্ধ ছেড়ে

সাধের মুনিয়া পাখি উড়ে গেলে

যে রিক্ত খাঁচাটি পড়ে থাকে

তুমি তাকে সত্যিই স্বদেশ বলে ডাকো?


তোমার প্রান্তর ছুঁয়ে গলে গেল

যতগুলো বৃষ্টিমেঘ

যতখানি ভাসালো বাসর

তার নাম হোক তবে অনুৎপাদক ভালবাসা।


আমি ছড় দিতে গিয়ে দেখি

এস্রাজ কখন যেন তানপুরা হয়ে গেছে

কি করে মেলাবে সুর সন্ধ্যা মেঘ?

হংসধ্বনি বাতাসের কোথায় হারায়!


এইসব নরম শব্দের আড়ে

একটু একটু বেড়ে ওঠে

কয়েকটি চিল-কাক এবং শকুন

তাদের ধারালো চঞ্চু নিয়ে।


সব পাপ,সব প্রক্ষালন আর সমস্ত প্রতিমার তীরে

ভেসে আসা বিরহী কঙ্কাল তারা

ছিঁড়েখুঁড়ে আলো ফেলে দেখবে সরেজমিন

পাল্টে দেবে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের নাম।


তোমরা আর আমরা মিলে

গ্রাম থেকে গ্রামে যাব,শহরে শহরে

কবিতার পান্ডুলিপি,অধিকন্তু দু'-চার কলম

প্রকাশ্যে উড়িয়ে দেব

ন্যাড়া ক্ষেতে,বিদ্যুৎবিহীন রাজপথে।


ঠিকঠাক থাকলে সামনের বছর পাবে বেনিফিট ম্যাচ

সাদা টাকায় ভালো বকশিষ পাবে

সবই তো তুমি বোঝ, এবার অবসর নাও।



Sunday, 25 October 2020

বিশেষ কিন্নর ৬

 আজ দশমী।


আমাদের শারদীয়া কিন্নর দলের উৎসব শেষ হলো। 

আজ প্রধান সম্পাদকের কলমে আমাদের শেষ অঞ্জলি।


🙏


❤️


✍️


#চাঁদ 


#শতদ্রু_মজুমদার 


একটা লিটল ম্যাগাজিনের নাম সিঁড়ি l এর প্রতিটি সংখ্যাই বিশেষ সংখ্যা l মেলা -দিঘি -শ্মশান এর পর এবারের বিষয় চাঁদ !সম্পাদক জানিয়েছেন :কবিতা লিখতে হবে --ছড়া নয় !অবিশ্যি আগের সংখ্যায় ছড়া লিখেছিলাম !কিন্তু মাস খানেক হলো চাঁদ নিয়ে কোনো কবিতা লিখতে পারছি না !কবি সুকান্ত চাঁদকে ঝলসানো রুটির সঙ্গে তুলনা করেছেন l দীনেশ দাস বলেছেন :এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে !সাম্প্রতি সুবোধ সরকারের চাঁদ পড়লাম !দুর্দান্ত l মুশকিল হল আমার কলম দিয়ে একটা লাইনও বের হচ্ছে না l অথচ ছোটো বেলা থেকেই তো চাঁদ দেখে আসছি !আমাদের ভাড়া বাড়ির পিছন দিকে ছিল বাঁশবন !সেখানে চাঁদ দেখে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বিখ্যাত লাইন মনে পড়ত :বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই ---

গরমকালে রাতের দিকে রাজ মাঠে শুতে যেতাম !মাথার ওপর চাঁদ !মনে হত সরে সরে যাচ্ছে !কিন্ত চাঁদ স্থির l আসলে মেঘ সরে যেত বলে ওই রকম মনে হত !সে যাই হোক গিয়ে !

ডিউটিতে এলে আমার পকেটে একটা নোট বুক থাকে l কিছু মনে পড়লেই লিখে রাখবো !আমি 'মেঘমল্লার 'এপার্টমেন্ট এর কেয়ার টেকার !12ঘন্টা ডিউটি !চার হাজার দেয় !আগে একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করতাম l করোনার কোপে সেটা গেছে !একটা মাত্র ছেলে পালিয়ে বিয়ে করে আমাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না !আমার বউ ঘরে বসে ঠোঙা গড়ে !যেনতেন চলে যায় l 

#

তিন তলার একটা মেয়ে কবিতা লেখে !আমার সঙ্গে আলাপ আছে l আমাকে অনেক কবিতার বই দেয় পড়তে l ওর নাম রীতি l একদিন রীতিকে নিজের সমস্যার কথা বললাম !সে বললো একটু গভীর ভাবে ভাবুন ঠিক মনে আসবে !মাঝে মাঝে ছাদেও উঠতে পারেন l খুব ভালো চাঁদ দেখা যায় !একদিন উঠলাম !সেদিন ছিল পূর্ণিমা l নিটোল চাঁদ দেখলাম l আর সেটা দেখতে গিয়েই বিপত্তি !একটা নতুন স্কুটি চুরি গেল !দত্তবাবু রীতি মত চার্জ করলেন :আপনি ছাদে উঠেছিলেন কী করতে ?বলুন --আনসার মি !

আমি আস্তে করে বলি :চাঁদ দেখতে !

---হোয়াট ?বুড়ো বয়সে ভীমরতি !

#

কাজটা চলেই গেল !রীতি অনেক চেষ্টা করেছিল !কোনো ফল হলো না !আসার সময় সে আমার হাতে একটা চিরকুট দিয়েছিল !কবিতার লাইন ---মানে আমার কবিতার গাইড লাইন :

ছোটবেলায় মায়ের দেখানো চাঁদ 

মুছিয়ে দিয়েছে চোখের জল কত 

হায় !

সেই আমি আজ একই চাঁদের আলোয় মুছতে পারি না বুকের গভীর ক্ষত !


(কাব্যপংক্তি তানিয়া ব্যানার্জী )

বিশেষ কিন্নর ৫

 আজ মহানবমী। 

আজ রইল তৃষ্ণা বসাকের অনুবাদ গল্প। 


✍️


#আলোকবর্ষ


(ই সন্তোষ কুমার

মূল মালয়ালম থেকে  ইংরেজি অনুবাদ- পি এন  বেণুগোপাল)


ইংরেজি থেকে অনুবাদ- #তৃষ্ণা_বসাক 


‘জেমস, আমি আগে এখানে এসেছি। এখানে, এই রেলিংগুলো ধরে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম’ কমলা উচ্ছসিত গলায় বলল, ঝুলন্ত ব্রিজের রেলিংগুলো শক্ত  করে আঁকড়িয়ে, জলের  কলকল আওয়াজ শুনতে শুনতে।

‘যাত্রা শুরুর সময় তুমি বলেছিলে এটা’ জেমস হেসে বলল।

‘ও, তাই ? কিন্তু সত্যি, ঠিক এই জায়গাটাই। ঠিক এই জায়গাটাই। জাস্ট একটা ছোঁয়া, ব্যস সব মনে পড়ে যাবে। এটাই আশ্চর্য।’

‘সত্যি!’

‘হ্যাঁ জেমস। কিন্তু সেইসময় অনেক বেশি জল ছিল। দূর থেকেই শব্দ শোনা যেত। আমরা ঠিক বর্ষার পরেই এসেছিলাম।সেসময়ে আমরা ব্যঙ্গালোর থাকতাম, জানো। কেন, আমি যা বলছি, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?’

‘ওহ, এটা আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয় কমলা। তুমি অন্তত পাঁচ বছর আগে এসেছিলে, তাই না? তাহলে তুমি কী করে এত জোর দিয়ে বলতে পারো, তুমি ঠিক এই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে ছিলে?’

‘আমি পারি জেমস। আমি কিছু জিনিস দেখতে পাই, যা তুমি পাও না, যদিও তোমার চোখ বড় বড় করে খোলা।‘

‘তুমি সবসময় চোখের কথা বল’ জেমস বলল

কমলা জোরে হেসে উঠল। ‘আর কিছু না হোক, আমি অন্তত চোখ নিয়ে বলতে পারি, না জেমস?’

তারপর সে চুপ করে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জলস্রোতের শব্দ শোনার চেষ্টা করছিল।

একজন পর্যটক তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। ঝুলন্ত ব্রিজের রেলিংগুলো ক্যাঁচকোঁচ করে উঠল। 

‘হ্যাঁ আমি এখানে এমনি করেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ কমলা মনে করার চেষ্টা করল। সেটা সিজন টাইম ছিল, খুব ভিড়। লোকজন আমাদের গা ঘেঁষে ঠেলে চলে যাচ্ছিল। আর ব্রিজটা সাংঘাতিক দুলছিল। লোকের ধাক্কায় আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। ভাগ্যিস নন্দন আমায় ধরে ফেলেছিল। এইরকমই ছিল ও। সবসময় আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকত। নন্দন সবসময় আমার খেয়াল রাখত।’

‘আমার কথায় তুমি কি আপসেট হয়ে পড়লে?’ জেমস ওর ক্যামেরা শীর্ণ জলস্রোতের ওপর জুম করতে করতে জিগ্যেস করল।

‘এই, আপসেট হবার মতো কী আছে?’

‘কিছু না। কিন্তু আমি তোমাকে তোমার চোখ নিয়ে বলছিলাম’

‘তুমি আমার চোখ নিয়ে কথা বলোনি।ওটা আমার সমস্যা। চোখের দৃষ্টি নেই বলে তাকে কেন দোষ দিতে হবে, জেমস? আমি তোমায় একটা কথা বলব জেমস? নন্দন আমার চোখদুটোকে পুজো করত। ও বলত, আমার চোখ দুটো বড় বড়। সে এমনকি একবার আমার চোখে কাজলও টেনে দিয়েছিল’


‘তাই?’

‘হ্যাঁ’

‘ওহ, তাহলে সে তো নিশ্চয় দারুণ রোম্যান্টিক’

‘এটা কী, মাই ডিয়ার জেমস? ভালবাসার মানুষের চোখে কাজল পরানোর মধ্যে কিছু দোষ আছে?’

‘কে জানে? এটা কিন্তু কোনদিন আমার কাছে আশা করো না কমলা।’

‘জেমস, প্লিজ তুলনা করো না। প্রত্যেকে আলাদা, তাই না?’

যদিও তারা দুজনেই ঝর্নার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, তবু খুব গরম লাগছিল। 

চারটের ম্লান সূর্য বালির ওপর পাতার ছায়াচ্ছন্ন ছবি আঁকছিল। 

রাস্তার ধারের ফেরিওলার কাছ থেকে ওরা শশা কিনল। শসাগুলো সত্যি ঠান্ডা ছিল। এক কামড় দিয়ে, কমলা তার শসাটা ফালি ফালি করে দিতে বলল আর ফেরিওলাকে বলল তার ফালিগুলোয় লংকা গুঁড়ো আর নুন লাগিয়ে দিতে। কিন্তু জেমসের চা খেতে ইচ্ছে করছিল।

কমলা জিগ্যেস করল ‘তুমি ঝর্নার ছবি তুলেছ?’

‘হুঁ,’ অলসভাবে বলল জেমস। কিন্তু তার ক্যামেরা তার কাঁধে প্রিয় পোষ্যের মতো জিরোচ্ছিল। 

কমলা নিজের শসাটা শেষ করে বলল ‘বেড়াতে বেরিয়ে এইসব ছোট ছোট জিনিস নিয়ে খুশি থাকত নন্দন। কখনো কেউ ভাবতে পারে নন্দন খুব কিপ্টে, কিন্তু ঘটনা সেটা নয়। আসলে বাইরের খাবার থেকে সমস্যা হবে এই দুশ্চিন্তা করত। প্রায়ই বলত ‘পেট গড়বড় করবে’ কিন্তু যাই কারণ হোক, বেড়ানোর দুদিনের মধ্যেই সে একটা কাঠির মতো রোগা হয়ে যেত।

জেমস ওকে একটা কিছু জিগ্যেস করতে গিয়েও করল না

কমলা হাসল ‘ কাঠির মতো! তুমি কী করে দেখলে? তোমার জিভে এই প্রশ্নটাই উশখুশ করছে, না জেমস?’

‘এই, না’ জেমস নিজের লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করল। 

‘হ্যাঁ সোনা, আমি মন পড়তে পারি। আমরা যখন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরি, তখন তো নিজেদের চেহারা বুঝতে পারি, পারি না, জেমস?’

‘আমার এক কাপ চা চাই’ জেমস বলল।

তার সেলফোন বেজে উঠল, কিন্তু সে উপেক্ষা করল। ঝর্না থেকে সরু পথ ধরে বেরনোর জায়গাটা বেশ খানিকটা দূরে। ক্লান্ত কমলা ফুটপাথের ধারে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে পড়ল। 

‘অনেকদিন পরে এতটা হাঁটলাম আমি।’ ‘আমার পা ব্যথা করছে’ জেমস বলল। কমলা তার শাড়ির নিচটা তুলে পায়ের ডিমে মাসাজ করল। তার গা দিয়ে ঘামের গন্ধ বেরোচ্ছিল। কয়েকটা মেয়ে তাদের পাশ দিয়ে জোরে জোরে কথা বলতে বলতে ঝর্নার দিকে হেঁটে গেল।কমলা মাথা নিচু করে তার পা মাসাজ করতে থাকল যতক্ষণ না ওদের গলার স্বর দূরে মিলিয়ে গেল। 

‘তুমি কি ওদের দিকে তাকালে?’ কমলা জিজ্ঞেস করল

‘কাদের দিকে?’

‘এক্ষুনি আমাদের পাশ দিয়ে গেল, ওই মেয়েগুলো’

‘না তো, কেন?’

‘মিথ্যুক, তুমি  মেয়েদের দেখো না, নাকি?’

‘ওহ ওরা!’

‘ওরা কি সুন্দর ছিল?’

‘হবে হয়তো’

‘ লুকোচ্ছ কেন? সৌন্দর্য তো দেখার জন্যেই তাই না?’

‘ওহ, তোমার সঙ্গে থেকে কী করে আমি অন্য মহিলাদের দিকে তাকাব?’ জেমস হাসল

‘মহিলা নয়, মেয়ে। এরা কমবয়সী। ওদের কথা শুনলেই বোঝা যায়’

‘ওকে কমলা। হোক না’

‘নন্দনের সঙ্গে যখন থাকতাম, এই একটা দারুণ জিনিস ছিল। ও আমার জন্যে সবকিছু বর্ণনা করত।’

‘তুমি নিশ্চয় হিংসেয়  জ্বলে পুড়ে মরতে’

‘কেন? আমি তো আর বাচ্চা ছিলাম না’ কমলা হাসল

‘শুনবে জেমস। ব্যাঙ্গালোরে থাকতে প্রতি সন্ধেয় আমরা কোন না কোন মলে যেতাম আর ছেলেমেয়েদের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা ওদের কথা আলোচনা করতাম। দারুণ মজা হত। তুমি যদি টিটকিরি না করো, তবে তোমায় একটা দুষ্টুমির কথা বলি’

‘আমি তোমায় ঠাট্টা করি না। তুমি এর মাস্টার’

‘ধন্যবাদ জেমস’

‘বেশ। কিন্তু কী যেন আমায় বলতে যাচ্ছিলে তুমি?’

‘হাহা, মজার কথা একটা। কোথায় যেন থামলাম? হ্যাঁ, আমরা মলের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম তরুণ তরুণীরা ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। নন্দন আমায় বলেছিল, ছেলেমেয়েগুলোর লো ওয়েস্ট জিনসের ওপর দিয়ে ওদের অন্তর্বাস দেখা যাচ্ছে। সে সময় ওটাই চলছিল’

‘তো?’

‘তো কী? আমি নন্দন কে বলতাম আমাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানাতে। সারা সন্ধে ওই অন্তর্বাসগুলো নিয়ে আমরা মজা করতাম’

কমলা হাসতে শুরু করল, হেসেই চলল, যতক্ষণ না কাশতে শুরু করল।

‘তুমি একটু খেপি আছো কমলা’ জেমস বলল ‘তুমি একা নও, তোমরা দুজনেই। ও কেন তোমায় ছেড়ে চলে গেল আমি বুঝতে পারি না। তোমরা সত্যিই মেড ফর ইচ আদার’

কমলা কোন সাড়া করল না। সে তার শাড়ি ঠিক করল আর হাত জোড় করে ওখানেই অলসভাবে বসে রইল।তারপর সে তার চোখ বুজল। জেমস ওর চোখের পাতার পাণ্ডুর নগ্নতার দিকে তাকাল না। সে ক্যামেরা বার করে একটা পাতা ঝরানো গাছের ছবি তোলার চেষ্টা করল। পত্রহীন শাখায় তিনটে পাখি কিচিরমিচির করছিল। 

আবার তার সেলফোন বাজল। কিন্তু সে আগের মতোই কয়েকবার বাজার পর থামিয়ে দিল।

‘চলো যাওয়া যাক’ কমলা বলল। ‘ড্রাইভার নিশ্চয় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে’ 

‘এটা ওর কাজেরই মধ্যে পড়ে। এর জন্যে কি আমরা ওকে টাকা দিই না?’

‘ফোনটা ধরলে না কেন?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘ভাবলাম পরে ধরব’

‘এলিজাবেথ ছিল, তাই না?’

‘হ্যাঁ কেন?’

‘আন্দাজ করলাম। ও  এখনও তোমাকে ফোন করে যায়?’

‘ওর গরজ। আবার ফোন করবে’

‘কী সেই মহা দরকার?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘ওহ, কিছু না’

‘কিন্তু তবু... নাকি আমাকে বললে কোন সমস্যা হবে?’

‘কীসের সমস্যা? ও নিজেই তো একটা সমস্যা’

কমলা হাসে ‘ দাঁড়াও আমাকে আন্দাজ করতে দাও। ওয়াইল্ড গেস।তোমার কাছে এমন কিছু আছে যাতে ওর ক্ষতি হতে পারে। একটা চিঠি, কিছু তথ্য...। এইরকম কিছু, তাই না?’

‘এটা তো তোমার গেস, তাই না? আমি কেন বলব এটা ঠিক না ভুল?’

‘ইয়েস। এটাই আমার প্রশ্নের একদম সঠিক উত্তর’ কমলা হাসল। তারপর সে চুপ হয়ে গেল। 

‘এরকম করো না জেমস’ কমলা বলল ‘ওকে  ছেড়ে দাও’

জেমস সাড়া করল না।

‘জাস্ট ছেড়ে দাও’ কমলা বলল মাথা তুলে। ‘তুমি যদি রাগের মাথায় র‍্যাশ  কিছু করো তো পরে পস্তাবে। ঘৃণা জিনিসটা ভালবাসার মতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একঘেয়ে হয়ে যায়’

এবারেও জেমস কোন উত্তর দিল না। সে তাকিয়ে দেখল ডাল থেকে পাখিগুলো উড়ে গেছে। 

‘তোমার এক্স-র নামটা যেন কী? ওহ,হ্যাঁ, নন্দন। তুমি কি নন্দন বলে ডাকো?’ হঠাত জিগ্যেস করল সে।

‘আমার স্বপ্নে’ এই কথা বলে কমলা ওর হাত ধরল। কমলার হাত  অস্বাভাবিক রকমের  ঠান্ডা, জেমস ভাবল।

‘আচ্ছা, এই জায়গাটা কি ভালো জেমস?’

‘হ্যাঁ, কেন একথা জিগ্যেস করছ?’

‘আমি জানি না। কিন্তু কেন জানি গতবারের মতো লাগছে না’

‘কমলা উঠে এই বেঞ্চের একদম ধারে গিয়ে দাঁড়াও, হাতদুটো নামাও। এইতো, এবার আমি একটা ছবি নেব’

‘ঠিক আছে?’

‘একদম। আর একটা’

‘এই দিনের আলোয় তুমি ফ্ল্যাশ ব্যবহার করলে কেন?’

‘তুমি কি করে বুঝলে?’

‘আমি বুঝি। এটাই। নন্দন কখন ফ্ল্যাশ ইউজ করত না। ও স্বাভাবিক আলো পছন্দ করত।’

ওরা যখন গেট পেরিয়ে পার্কিং লটে গিয়ে দাঁড়াল, ক্যাব ড্রাইভার ওদের কাছে গাড়ি নিয়ে এল। সকালে হোটেলেই গাড়ি ঠিক হয়ে গেছিল। ড্রাইভার এক মাঝ বয়সী লোক। ও বলেছিল ওর বউ মালয়ালি। বোধহয় এই জন্যই কি  সে এদের প্রতি কন্সিডারেট ছিল? বুদ্ধ মন্দিরে পৌঁছতে এক ঘন্টার বেশি লাগল। ততক্ষণে গোধূলি হয়ে গেছে। কমলা নন্দনের সঙ্গে তার স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছিল। 

সেবার তারা মদিরের সামনে একটা হোটেলে উঠেছিল। সেটা চালাত লামারা। সন্ধেবেলা ওরা মন্দিরের রাস্তা ধরে অনেক ভেতরের গ্রামে চলে গিয়েছিল। রাস্তাটা ছিল নির্জন, পরিত্যক্ত। অন্ধকার হয়ে গেলেও নন্দন হাঁটা থামায়নি। সেটা ছিল উদবাস্তুদের গ্রাম, তাদের বাড়ি, মন্দির, ইস্কুল, দোকান আর তারপর ভুট্টা খেত। নন্দন তাকে সব খুঁটিয়ে বলেছিল। ফেরার পথে রাস্তার ধারের ঝুপড়ি থেকে ওরা চা খেয়েছিল। এটা চালাত একজন তরুণ উদ্বাস্তু। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা এই জায়গাতেই। তার মাতৃভূমি তার কাছে ছিল কানে শোনা এক দেশ।নন্দন সবসময়েই এইসব খুঁটিনাটি জানতে আগ্রহী ছিল। 

‘আমরা লামাদের হোটেলে থাকতে পারতাম’ কমলা বলল

‘ওই হোটেলে হয়তো বিদ্যুৎ জল কিছুই নেই’ ভাঙ্গা ভাঙ্গা মালয়ালমে ড্রাইভার বলল

‘কিন্তু বিদ্যুৎ দিয়ে কমলা কী করবে, তাই না?’জেমস বলতে বলতে থেমে গেল 

‘সত্যি।’ কমলা হাসল। ‘সবসময় আমরা কেন বিদ্যুৎ চাই? আমাদের আগেকার দিনের  লোক কি এটা ছাড়া বাঁচেনি?’

একজন ভিখারি তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইল, সে চেঁচিয়ে বলছিল সে অন্ধ। জেমস তার পার্স থেকে কিছু খুচরো বার করে তাকে দিল। 

‘একি জেমস, তুমি ওকে ভিক্ষা দিলে?’

‘বেচারা চোখে দেখতে পায় না’

‘ও কি চোখে দেখতে পায় না বলেই গরিব?’

‘তাই নয় কি?’

‘না। তাহলে তোমার হিসেবে আমিও তো গরিব?’

‘কক্ষনো না’

‘সেক্ষেত্রে তুমি ওকে ভিক্ষা দেবে কেবল সে অন্ধ বলে?’

জেমস উত্তর দিল না। দূরে সে দেখল বৌদ্ধ মন্দিরের সোনালি তোরণ আর সূর্যের আলোক স্নান । সে দৃশ্যটার ছবি নেবে কিনা ভাবল। 

‘একজনের চোখের দৃষ্টি নেই। ব্যস এইটুকুই’ কমলা বলে চল্ল ‘প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা সীমাবদ্ধতা আছে । তুমি কি সবাইকে ভিক্ষা দিয়ে চলবে? অন্ধ বলে ও যে কমা মানুষ তা কিন্তু নয়’

‘ওহ কমলা, তুমি আর তোমার দর্শন! নাকি এটা সেই ভদ্রলোকের থেকে এসেছে?’

‘নন্দন কক্ষনো কাউকে ভিক্ষা দিত না। এটা ছিল ওর নীতি’

‘তুমিও দাও না। এখানেই গল্প শেষ, তাই না?’

কমলা মন্দিরের হলের মেঝেতে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, যেন প্রার্থনা করছে। নৈঃশব্দ্য রহস্যময় মন্ত্রের মতো চারপাশে অনুরণিত হচ্ছে, সে অনুভব করল। 

রাতের জন্যে ওরা একটা হোমস্টেতে গেল। জেমস আগের রাতে ইন্টারনেটে এটা খুঁজে বার করেছিল। দোতলা একটা বাড়ি। অতিথিরা ওপরতলায় আর বয়স্ক দম্পতি নিচতলায়। তাদের ছেলেমেয়ে বাইরে আর তারা অন্য কিছু না, মূলত সঙ্গ পাবার জন্যেই অতিথিদের রাখত। ভাড়াও তুলনামূলকভাবে সস্তা, যেহেতু এটা টুরিস্ট সিজন নয়। 

‘ওরা ভেবেছে আমরা কাপল’ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বলল জেমস।

‘তুমি ওদের শুধরে দিতে পারতে’

‘যদি আমাদের চলে যেতে বলে তখন? এই রাতে আমরা কোথায় যাব? উনি আমাকে বললেন মিসেসের খেয়াল রাখতে। এও বললেন ব্যালকনির রেলিংগুলো নিচু, তোমাকে যেন একা যেতে না দি’

‘চিন্তা করো না। আমি ঘরের বাইরে বেরব না’

‘আমি ওদের কাছে এখন হিরো’

‘হ্যাঁ, তুমি এক বেচারি অন্ধকে নতুন জীবন দিয়েছ?’ কমলা হাসল

বিছানায় যাবার আগে জেমসের আবার একটা ফোন এল। কে ফোন করছে না দেখেই সে ফোনটা কেটে সাইলেন্ট মোডে করে দিল। 

কমলা তখনও বৌদ্ধ মন্দিরের কথা ভাবছিল। গতবার তারা দিনের বেশির ভাগ সময়টাই ওখানে কাটিয়েছিল। মন্দিরের চারপাশে ঘুরে বেড়িয়েছিল। হলে তিব্বতি কারুকাজ, দেওয়ালে পবিত্র মন্ত্রের ক্যালিগ্রাফি... নন্দন তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছিল। মাঝে মাঝেই লামাদের ধর্মচক্রের শব্দ। একটা বোর্ড থেকে নন্দন লামাদের পরম্পরার কথা পড়ে শুনিয়েছিল। তারপর তারা প্রার্থনা ঘরে চুপ করে বসেছিল। কমলা স্মৃতির মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে সে তার চোখ বুজল। 

‘এই ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’ কপালে ওর হাতের স্পর্শে চোখ খুলল কমলা। ছোট খসখসে হাত।

‘তুমি ড্রিংক করেছ, তাই না জেমস?’

‘জাস্ট একটা’ জেমস বলল ‘ফর আ বুস্ট’

‘আমার ভালো লাগে না’ কমলা বলল ‘ তুমি ড্রিংক করলে কিছুই ঠিকঠাক থাকে না’

‘জাস্ট ফ্র দা হেক অফ ইট। এলিজাবেথ কিন্তু এরকম ছিল না। মাঝে মাঝে আমরা একসঙ্গেও ড্রিংক করতাম’

‘ঠিক ড্রিংক নিয়ে কথা না। তুমি ড্রিংক করলে মনে হয় আমি অ্যালকোহলের সঙ্গে শুয়ে আছি। যেন ঘরে অন্য একটা লোক রয়েছে’

‘কিছু এসে যায় না’ জেমস ওকে কাছে টানল

‘এত জোরে ধরো না আমাকে জেমস। আমার লাগে’

সে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। যখন সে তার ঘাড় চাপল, কমলা কাশছিল, যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।  জেমসের ভালো লাগল না।

সে কল্পনা করছিল সে কমলার শরীরে পর্যটন করছে। ঝর্না, সরোবর উঁচু নিচু। ও কমলার গালে চুমু খেতে চাইলে, ও মুখ ঘুরিয়ে নিল। 

‘ তোমার মুখে মদের গন্ধ’ কমলা বলল। জেমস হঠাৎ মুখ সরিয়ে নিল।

‘তুমি সংগত দিচ্ছ না, কমলা’ ও বলল ‘এই জন্যেই কি আমরা এতটা দূরে এলাম?’

যেন সান্তনা দিচ্ছে এমনভাবে ওকে জড়িয়ে ধরল কমলা।এই আলিঙ্গন ওকে মনে পড়িয়ে দিল যখন বিকেলে ঝার্নার ধারে কমলার হাত ওকে ছুঁয়েছিল, সেই শীতল স্পর্শের কথা। 

‘এলিজাবেথ আবার ফোন করেছিল, তাই না?’ কমলা জিগ্যেস করল

‘পাগল একটা’

‘এসব ভুলে যাও জেমস। তুমি এত অ্যাডামেন্ট কেন? আফটার অল, সে তোমার সঙ্গে তো অনেকদিন ছিল, তাই না?’


‘শিট!’ জেমস নিজের আলিঙ্গন থেকে কমলাকে সরিয়ে দিল।

‘আমি জানি, ও তোমাকে পছন্দ করত। সেটাই কি যথেষ্ট নয়? এটা কি বাধ্যতামূলক যে সারাজীবন একজনকেই পছন্দ করবে?’

‘ওহ, আমি কক্ষনো ওকে সেভাবে পছন্দ করিনি। ও এমন একটা কুত্তি’

জেমস একটা সিগারেট ধরাল। অর্ধেক খেয়ে সে নিভিয়ে কমলার হাত মাসাজ করতে শুরু করল ,হয়তো আরেকবার চেষ্টা করতেই।

সে অনুভব করল তার ডান বাহুতে কিছু একটা বেরিয়ে আছে, কাঁধের নিচে।

‘এটা কী?’

‘’ওহ ওটা’ কমলা বলল ‘একটা স্টিলের রড’

‘কী করে?’

‘একটা অ্যাক্সিডেন্ট। ঠিক আছে।’ কমলা তার বাঁ হাত দিয়ে ডান হাত ছুঁল। ‘ এই জন্যে তোমাকে বলেছিলাম আস্তে করে জড়াতে। এখনও লাগে এখানে। যদিও অনেক বছর হয়ে গেল’

‘কীভাবে হল?’

‘বেশ অনেকদিন আগে’ কমলা ক্যাজুয়ালি বলল

‘এটা বের করে দেবার সময় হয়নি?’

‘হ্যাঁ, আমার মনে হয়। কিন্তু না, এটা একটা স্মৃতি, তাই না জেমস? ওটা এখানেই থাকতে দাও’

জেমস কমলার রাতপোশাক খুলছিল।আলো জ্বালা রেখেই তারা নগ্ন হল। কমলা ওর কপালে নরম চুমু খেল। তারপর সে বিছানায় উঠে বসল।

‘আমার বুকটা দেখো’ যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, এমনভাবে বলল কমলা ‘এখানে একটা ফিকে লাল আঁচিল আছে না?’

‘কোথায়?’

‘এখানে... বাম বুকের নিচে, হার্টের খুব কাছে’

‘আমি আর বিশ্বাস করব না কমলা যে তুমি দেখতে পাও না’ জেমস আঁচিলটায় ঠোঁট চেপে বলল।

‘আমি জানতাম না’ কমলা হাসল

‘তাহলে? ওহ, নিশ্চয় নন্দন বলেছে, তাই না?’ জেমস বিদ্রূপ করে বলল।

‘আবার একবার তুমি ঠিকই ধরেছ’

যেকোন কারণেই হোক, এই প্রথমবার জেমস তার খুব কাছে নন্দনের উপস্থিতি টের পেল। ও শীতল হয়ে গেল।

‘শুধু তাই নয়, সে এমনকি আমার শরীরের জলবায়ুও জানত। বৃষ্টি, কুয়াশা, উষ্ণতা, একদম সত্যিকারের।

একবার আমার নিপলের দিকে তাকাও জেমস। এখন নিশ্চয় ওগুলো কালো, তাই না?’

‘তো?’ 

‘এর মানে আমার এখন মুড নেই। আমি বললাম না তোমায়? মুড থাকলে নিপলগুলো লাল হয়ে যেত’ কমলা হাসল। 

জেমসের আবার সন্দেহ হল নন্দন কাছেই আছে। তার মনে হল, যদিও নন্দন অদৃশ্য তবু ও তার কাছে হেরে যাচ্ছে। সে  জোর করে ওকে কাছে টানল। প্রায় আক্রমণ। কমলা নিঃশব্দে ওর জোর মেনে নিল। তার মনে হল তার মাথায় মৌমাছি গুনগুন করছে। জেমসের ভয়ঙ্কর খিদে থিতিয়ে গেল , কমলা অনুভব করল জেমস পাশে অবসন্ন হয়ে পড়ে আছে। গর্জমান নৈঃশব্দ্য ওকে ফুঁড়ে চলে যাচ্ছিল, সে ঘুমে তলিয়ে গেল।

ঘুম ভাঙতে কমলা সচেতন হল যে সে নগ্ন, হাতড়ে হাতড়ে সে তার রাতপোষাক পরে নিল। দূর থেকে, বোধহয় ব্যালকনি থেকে জেমসের গলা শোনা গেল। সে ফোনে তর্ক করছিল। তারপর কমলা শুনতে পেল সে ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে।

দুপুর অব্দি সে ঘর থেকে বেরোল না। একটি মেয়ে তার ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসে টেবিলে রাখল, কিন্তু সে ছুঁয়েও দেখল না। 

দুপুরে জেমস এল 

‘তুমি ব্রেকফাস্ট খাওনি?’ জেমস জিগ্যেস করল। 

‘আমার খিদে নেই’

‘স্নান করে নাও। লাঞ্চ করে আমরা বেরিয়ে যাব।’

‘কোথায়?’

‘থালাকাভেরি’ সে বলল ‘ ক্যাব আসবে’

‘না’ কমলা বলল ‘আমার শরীর ভালো লাগছে না’


‘ঠিক আছে, তাহলে গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু এসো কিছু খেয়ে নাও’

‘খিদে নেই’ কমলা বলল

‘জ্বর জ্বর?’

‘না’

‘তাহলে?’

‘তাহলে তাহলে তাহলে কিচ্ছু না। জাস্ট আমাকে একা থাকতে দাও’

‘আশ্চর্য নয় যে ও তোমাকে ডিভোর্স করেছিল’ জেমস ফেটে পড়ল

কমলা চিৎকার করে উঠল।

‘কে?’ কমলা কাঁপছিল। ‘কে আমাকে ডিভোর্স করেছে জেমস? কে তোমাকে এইসব ফালতু  কথা বলেছে?’

‘ওহ, বলব সেটা তোমায়? তুমি কি ওই নামটা সবসময় মন্ত্রের মতো জপছিলে না?’

কমলা কান্নায় ভেঙে পড়ল। দুজনের কেউই কিছুক্ষণ কথা বলল না। 

‘জেমস চলো লাঞ্চ করে আসি’ কমলা একটা তোয়ালে দিয়ে নিজের মুখ মুছে বলল। তারা চুপচাপ লাঞ্চ খেল। 

বিকেলে তারা ট্যাক্সিতে ম্যাঙ্গালোরের দিকে রওনা দিল। ট্যাক্সি অবিরাম শুষ্ক সব গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল।

‘জেমস’ কমলা ডাকল ‘সরি। আমি কি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি?’

‘ওহ না’ জেমস বলল

‘হ্যাঁ জানি কিন্তু... কিন্তু কিছু জিনিস বদলানো যায় না। এই স্টিল রডের মতো, সবসময় আমার মধ্যে থেকে যায়’

‘আমাদের সম্পর্কটা ছিল অনন্য, জেমস, মেড ফর ইচ আদার বলেছিলে তুমি। একদম তাই। আমাদের একটা গোপন চুক্তি হয়েছিল যে যদি আমাদের সম্পর্ক ভেঙ্গেও যায়, কোন আফসোস করব না। সেইকারণেই আমি তোমার সঙ্গে এলাম। এই ট্যুরটা করলাম। কিন্তু আমার মনে হয় আমি এই ভূমিকাটা জাস্ট হ্যান্ডল করতে পারছি না’

‘ছাড়ো’ জেমস বলল 

‘না, এটা অন্য কিছু। তুমি জিগ্যেস করছিলে ও কেন আমাকে ছেড়ে গেল। এতক্ষণ পর্যন্ত সেটা একটা গোপন কথা ছিল। আমি কাউকে বলিনি। এমনকি ম্যাঙ্গালোরের বন্ধুদেরও না। আমি কখনো কারো সহানুভূতি চাইনি। এমনিতেই আমার অন্ধত্বই আছে লোকের আহা উহুর জন্যে। এ নিয়ে আমি ফেড আপ। এর ওপর বিধবা যোগ হলে... না, আমি নিতে পারব না।’ 

‘কী বললে কমলা? বিধবা?’

‘সেটাই সত্যি কথা। নন্দন আর বেঁচে নেই। আমি একজন বিধবা।’

জেমস ওর হাত ধরল। হাতের শীতলতায় সে আবার বিস্মিত হল। 

টিলা আর উপত্যকার মধ্যে দিয়ে গাড়িটা মোটামুটি একই গতিতে চলছিল। 

‘কাবেরীর জন্ম একটা ছোট ঝর্না থেকে, তাই না?’ কমলা নিচু গলায় বলল ‘আর তারপর সে কত গ্রাম শহরে জল নিয়ে যায়, কত  খেতে সেচ দ্যায়। সত্যিই আশ্চর্য জেমস। আমার বোকার মতো গোঁ! আমাদের থলকাবেরি যাওয়া উচিত ছিল’

‘কিছু এসে যায় না। আমরা আবার আসতে পারি’ জেমস বলল

‘গত বার যখন এসেছিলাম, তখন নিচের ঢিপিমতো জায়গাটায় অনেকক্ষণ বসেছিলাম’ কমলা মনে করছিল ‘ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। একটা ছোট্ট মেয়ে এসে আমাদের পাশে বসল। নন্দন ওর ছবি তুলেছিল। আমি ছবিটা বাঁধিয়ে আমার ঘরে রেখেছি। এখনও ওখানেই আছে। তুমি খেয়াল করোনি?’

জেমস উত্তর দিল না। 

‘জেমস, তুমি আমাদের বেড়ানোর ছবি তুলেছ তো, না?’ কমলা জানতে চাইল ‘কার্ডটা কোথায়?’

‘ক্যামেরার মধ্যে’ জেমস বলল ‘ম্যাঙ্গালোরে গিয়ে প্রিন্ট করাব’

‘প্রিন্ট দিয়ে আমি কী করব? তুমি আমাকে কার্ডটা দেখাও। আমি একটু ছুঁই, অনুভব করি’

সে ক্যামেরা থেকে  কার্ডটা বার করে ওর মুঠোয় রাখল। 

ওকে হতবাক করে কমলা ওটা মুখে পুরে চিবোতে লাগল। তারপর গাড়ির দরজা খুলে থু থু করে ফেলে দিল।

‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি কমলা? সমস্ত ছবি গুলো নষ্ট হয়ে গেল, বুঝেছ?’ জেমস চিৎকার করে বলল

‘যেতে দাও’ ক্যাজুয়ালি বলল কমলা

জেমস বাইরে তাকাল। গাড়ি একটা ছোট শহরে ঢুকছে। ট্রাফিকের ভিড় বাড়ছে।

‘ বেজন্মা কোথাকার! আমি যখন ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ছবি তুলেছ না?’ কমলা জিগ্যেস করল। ‘আমার নগ্ন অবস্থায় তুলেছ। আমি সেটা আন্দাজ করেছিলাম’

জেমস ওর দিকে সতর্কভাবে তাকাল। ওই সাদা চোখের তারা... তার মধ্যে থেকে বিচ্ছুরিত আলো...  যেন তাকে আঘাত করবে, সে ভয় পেল। 

কমলা জোরে হাসল ‘ তুমি একজন অন্ধকে ব্ল্যাকমেল করতে পারবে না। কক্ষনো না! অন্ধের  নগ্নতা থাকে তার মনে। তবু, আমি চাই না ওই ছবিগুলো তোমার জিম্মায় থাকুক। তুমি এগুলো রাখার যোগ্য নও। তুমি জাস্ট একটা বিশাল... বিশাল বেজন্মা’

জেমস হাত দিয়ে মুখ মুছল। তারপর সে বাইরের দিকে তাকাল।

এখন গাড়ি ওয়ান-ওয়ে ট্রাফিক দিয়ে যাচ্ছে। ওদের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, হর্ন আর ভিড়ের আওয়াজ। গাড়িটা থেমে থেমে চলেছে। আরও কিছুক্ষণ এমন গুটিগুটি চলার  পর শেষ পর্যন্ত একটা সিগন্যালে দাঁড়াল।

‘জেমস সিগন্যালটা দেখো’ কমলা বলল

জেমস দেখল

‘ডিজিটগুলো দেখতে পাচ্ছো? পড়ো। আমরা এই সিগন্যালে আর কতক্ষণ দাঁড়াব?’

‘আরও চুরাশি সেকেন্ড’ জেমস লাল সংখ্যাগুলো পড়ে আস্তে আস্তে বলল।


🌹🌹


লেখক পরিচিতি- ই সন্তোষ কুমার মালয়ালম ভাষার এই প্রজন্মের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য লেখক। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা পনেরোর বেশি। সেরা গল্প সংগ্রহের জন্যে এবং উপন্যাস অন্ধাকরানঝি –র জন্যে দুবার পেয়েছেন কেরালা সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার যথাক্রমে ২০০৬ আর ২০১২ সালে। এই উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ- আইল্যান্ড অফ লস্ট শ্যাডোজ  ২০১৫ সালের ক্রসওয়ার্ড পুস্কারের জন্য বাছাই করা হয়েছিল। তাঁর দুটি গল্প থেকে মালয়ালম সিনেমা হয়েছে। তাঁর লেখা অনুবাদ হয়েছে ইংরেজি, তামিল, হিন্দি এবং জার্মান ভাষায়। বাংলায় অনুবাদ এই প্রথম। 


অনুবাদক পরিচিতি-তৃষ্ণা বসাক এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ কবি ও কথাকার। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কল্পবিজ্ঞান, মৈথিলী, হিন্দি ও মালয়ালম অনুবাদকর্মে তিনি প্রতিমুহুর্তে পাঠকের সামনে খুলে দিচ্ছেন অনাস্বাদিত জগৎ। জন্ম কলকাতায়। শৈশবে নাটক দিয়ে লেখালেখির শুরু, প্রথম  প্রকাশিত কবিতা ‘সামগন্ধ রক্তের ভিতরে’, দেশ, ১৯৯২। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘আবার অমল’ রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯৯৫। 


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক তৃষ্ণা পূর্ণসময়ের সাহিত্যকর্মের টানে ছেড়েছেন লোভনীয় অর্থকরী  বহু পেশা। সরকারি মুদ্রণ সংস্থায় প্রশাসনিক পদ, উপদেষ্টা বৃত্তি,বিশ্ববিদ্যালয়ের  পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে আঞ্চলিক ভাষায় অভিধান প্রকল্পের দায়িত্বভার- প্রভৃতি বিচিত্র  অভিজ্ঞতা তাঁর লেখনীকে এক বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। 

প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- পূর্ণেন্দু ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার ২০১২, সম্বিত সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩, কবি অমিতেশ মাইতি স্মৃতি সাহিত্য সম্মান ২০১৩, ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩, ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫, সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮, সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯,  কবি মৃত্যুঞ্জয় সেন স্মৃতি সম্মান ২০২০ ও অন্যান্য আরো পুরস্কার।

Saturday, 24 October 2020

বিশেষ কিন্নর ৩

 


মহাষষ্ঠীর শুভেচ্ছা। গ্রহণ করবেন। 
আজ এসেছে অনুবাদ। কবিতা। বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক আর্তুর রাঁবোর দুটি কবিতা।  

#অনুবাদ_কবিতা 

#তানিয়া_ব্যানার্জি 

কবি পরিচিতি 

আর্ত্যুর র‍্যাঁবো (১৮৫৪-১৮৯১)
বিশ্ব কবিতার বিস্ময় বালক ফরাসী কবি জ্যঁ নিকোলা আর্ত্যুর র‍্যঁবো পৃথিবীব্যাপী প্রকৃত কবিতাপ্রেমীদের কাছে সত্যিই এক বিস্ময়।
১৮৫৪ সালের ২০ অক্টোবর ফ্রান্সের শার্লভিল শহরে জন্ম তাঁর। মাত্র ৩৭ বছরের ছোট্ট জীবনে তিনি মূলতঃ কবিতা লিখেছিলেন ১৮৭০-৭৪,এই পাঁচ বছরই।প্রথম দিকে তিনি ছন্দবদ্ধ কবিতা দিয়েই তার কবিজীবন শুরু করলেও কবি জীবনের শেষ দুটি বছর তিনি গদ্যকাব্য রচনা করেছিলেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে ঘোষণা করে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মাত্র দুটি কবিতার বই আর ৮০ টি কবিতা এই গ্রহের মানুষ পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। চিরবাউন্ডুলে বাউল মন নিয়ে বেড়ে ওঠা কবি নিজের লেখা বহু কবিতা বহু পান্ডুলিপি একবার পড়েই ছিঁড়ে ফেলতেন,নইলে আরও কিছু কবিতা আমরা পেতাম।কবিতা বিষয়ে ধারণা বর্তমান সময়ের কবি ও কবিতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
"কবিতা লেখা যায় না,লেখা হয়।কবিতাকে কবি লেখেন না,বরং কবিকে মাধ্যম করে কবিতা রচিত হয়।"
১৮৯১ সালের ১০ নভেম্বর সকাল ১০ টায় এই বোহেমিয়ান কবি তার ৩৭ বছরের বিচিত্র জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

#শাশ্বত 

মিলনের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে প্রতিদিন সূর্য মিশে যায় সাগরের বুকে
এ এক শাশ্বত অনুভব। 
জ্বলন্ত দিনে, নিস্তব্ধ রাতে আত্মার প্রহরী ফিসফিসিয়ে বলে যায় এক অনাদি মিলনগাথা
নিত্যকার চাহিদা থেকে মুক্তি চাও
পাড়ি দাও অনন্তের পথে
আশাহীন, নিস্তরঙ্গ স্থৈর্য 
শেষে একমাত্র যন্ত্রণা চিরন্তন। 
তবুও,
অনাদিকালের সূর্য প্রতিদিন হারায় অনন্ত সাগরের বুকে 
মিলনের শাশ্বত অনুভব যন্ত্রণার বুকে মিলিয়ে যায়।

❣️❣️

#ফুল 

একটি সোনার দেহলী-রেশমের সুতোয় বোনা ধুসর পাতলা সবুজ মলমলের জাল,
তামাটে সূর্যের মতো বিবর্ণ স্ফটিকের থালা।
আমি দেখছি রুপোর ফিলিগ্রির গালিচায় লতানো গাছের মতো বিছিয়ে আছে, চোখে আর চুলে। 
হলদে গিনি আর রত্নের ঝলকানি,
মেহগিনির থামের ওপর পান্নার সবুজ গম্বুজ। 
সাদা একগোছা মলমল আর চুনীর ঝরণা। 
ভগবানের চোখের মত নীলাভ গভীর আর মায়াময়। 
আকাশ আর সাগর আলিঙ্গন করে মর্মরের তাজা ও সতেজ গোলাপ।

❣️❣️


বিশেষ কিন্নর ৪


 আজ মহাঅষ্টমী। দেবী আমাদের জীবত্ব থেকে দেবত্বে উন্নীত করুন। সন্ধি পেরিয়ে আমরা যেন তাঁর অমৃত পরশ পাই। 

🙏


আজকের গল্প দেবী আরাধনার গল্প। লিখেছেন এই সময়ের অন্যতম বলিষ্ঠ কলমকার মহুয়া মল্লিক। 


#দেবতার_গ্রাস


#মহুয়া_মল্লিক                         

                                 (এক)

‘টিকলিকে কি আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি মা?”

নিবেদিতা গোছগাছ করছিল, মেয়ের কথা কানে যেতেই সেসব থামিয়ে ঘুরে দাঁড়াল, “মানে, আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাস মানে?”

“এত মানে মানে করছ কেন? ইটস ভেরি সিম্পল। না বোঝার তো কিছু নেই।” নেল ফাইলিং করতে করতে রিয়া এবার ফুঁসে উঠল।

এই হয়েছে এক জ্বালা। শহরের মানুষদের এখন গ্রামে পুজো কাটানোটা একটা ফ্যাশান। অনেকেই ঠিক পুজোর আগে আগে গাঁ গঞ্জের বনেদি বাড়ির পুজোর সন্ধান করে বেড়ায়। তাদের সঙ্গী হয়েও অনেকে বহুবার গেছে। একেই পুজোর ব্যস্ততা, তারপর অতিথি আপ্যায়নে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়। সারা বছর বাইরে থাকে দায়িত্ব পালন করেনা, শরিকদের এই অভিযোগ শুনতে শুনতে এমনিতেই বিরক্ত হয়ে যায় নিবেদিতা। তার উপর প্রতিবারই সমীরের বন্ধুবান্ধব না হয় অফিস কলিগদের আসা। কেউ পুজোর চারদিন কাটিয়ে যায়, কেউ আবার একবেলা কাটিয়ে চলে যায়। তাদের খাওয়া দাওয়া, বিশ্রামের আয়োজন, পুরনো বিছানা বার করে রোদে দেওয়া সব নিবেদিতাকে একা সামলাতে হয়। জা’রা এড়িয়ে এড়িয়ে চলে। নিবেদিতা সব সামলে নেবার পর ভালমানুষের মত মুখ করে সামনে এসে বলে, “সারা বছর অফিস সামলে পুজোর কটা দিনও তোমার বিশ্রাম নেই।”

“আর বিশ্রাম!” নিবেদিতা ফোঁস করে উঠেও সামলে যায়। এরা তাকে তাতিয়ে দিয়ে মজা দেখতে চায়। ট্রলিটা মোটামুটি গোছান হয়ে গেছে। সমীরের নতুন দুটো শার্ট দরজির দোকান থেকে এসে গেলেই সে দুটো নিয়ে নিলেই কাজ শেষ। মেয়ের দিকে তাকায়, রিয়ার মুখে অভিমানের মেঘ থমকে আছে। ওর মাথায় হাত রেখে নিবেদিতা জিজ্ঞেস করে, “ওর বাড়ির লোক সঙ্গে যাবে? টিন এজার একটা মেয়েকে নিয়ে যাওয়া মানে অনেক দায়িত্ব, আমি সেটা ভেবেই একটু রিএক্ট করে ফেলেছিলাম।”

“যেন ওর বাড়ির লোক গেলে তুমি কত খুশি হতে? আর আমাদের গ্রামের লোকজন সব বাঘ না ভাল্লুক যে ওকে চোখেচোখে রাখতে হবে? আমি ওকে বারণ করে দেব মা।”

মেয়ের রাগ দেখে নিবেদিতা ফিক করে হেসে ফেলে। ঠিক আছে এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। প্রতি বছরই এমন কত গেস্ট তাদের সঙ্গী হয়। বরং রিয়া আর টিকলি একসঙ্গে ঘুরবে ফিরবে। যদিও রিয়া দিব্যি ওখানে মানিয়ে নেয় সবার সঙ্গে। মাটিতে বসে কলাপাতায় খাওয়া, মেঝেতে ঢালাও বিছানা করে শোয়া সবকিছুই মেয়ে হাসিমুখে মেনে নেয়। নিজের মেয়েকে পুজোর কটা দিন নিবেদিতা চিনতে পারেনা। শহুরে মেয়েটা এই কটা দিন যেন মাটির মেয়ে হয়ে যায়। কে বলবে এই মেয়েটাই অন্য সময়, পান থেকে চুন খসলে অশান্তিতে ফেটে পড়ে। 

সমীর বলে, যাকে যেখানে মানায়। এই কংক্রিটের শহরে জোর করে আটকে রাখলেই কি আমরা এই শহরের হয়ে গেলাম?

“কে আটকে রেখেছে তোমাদের?” ভ্রু কুঁচকে নিবেদিতা সেইসব মুহূর্তে অবাক হয়ে সমীরকে দেখে। পুজো কেটে গেলেই সবকিছু আবার স্বাভাবিক। ঐ কটা দিন এ বাড়ির মানুষগুলো যেন একটা ঘোরের মধ্যে কাটায়। প্রথম প্রথম কলকাতার পুজো ছেড়ে গাঁয়েগঞ্জে পড়ে থাকতে নিবেদিতার একদম ভালো লাগতনা। একবার জোর করেই নিজের জন্য নেপাল যাবার টিকিট করে ফেলল। রিয়া তখন জন্মায়নি। সমীর কিছু বলেনি, টিকিটটা দেখে মুচকি হেসেছিল। তারপর বলেছিল, “কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে দেব, তুমি অসুস্থ। যাও নিজের মত কাটাও, আমার তরফ থেকে কোনও চাপ নেই।” 

নিবেদিতা খুশি হয়েছিল, তবে সমীরের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মুচকি হাসির রহস্যটা ধরতে পারেনি। সেটা পেরেছিল সপ্তমীর রাত্রে। ষষ্ঠীর দিনটা নিবেদিতা একা ছটফট করেছে। সপ্তমীর সকালে তার ফ্লাইট। সে একা ঘুরতে যাচ্ছে শুনে মা বাবা চোখ কপালে তুলেছিল। অনেক মেয়েই এখন সোলো ট্রাভেলার হিসাবে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে, নিবেদিতা ল্যাপটপ খুলে সেইসব দেখিয়ে বাবা মাকে আশ্বস্ত করেছিল ঠিকই, কিন্তু ষষ্ঠী থেকেই কেমন অস্থিরতা বাড়তে শুরু করল। সপ্তমীর ভোরে ট্যুরটা ক্যান্সেল করে একটা গাড়ি নিয়ে শ্বশুরবাড়ির পুজোয় যোগ দিতে বেড়িয়ে পড়েছিল। ওকে দেখেই সমীরের মা, কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেছিল, “বলেছিলাম না জগজ্জননী ঠিক আমার বৌমাকে সুস্থ করে দেবেন।”

সপ্তমীর রাতে সিঁড়ির কোণে একটু একান্তে সমীর, নিবেদিতাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আমি জানতাম তুমি ঠিক এখানে ছুটে আসবে। তোমার লাফালাফি দেখছিলাম শুধু। মাঝখান থেকে কিছু টাকা গচ্চা গেল।”

“তুমি জানতে?” অবাক হয়ে নিবেদিতা জিজ্ঞেস করে। “হ্যাঁ জানতাম তো মা তোমাকে আমাদের এই জামগ্রামে ঠিক টেনে আনবেন।” ভুল বলেনি সমীর। সেই থেকে যতই হাবেভাবে বিরক্তি দেখাক, নিবেদিতা নিজেও এই কটা দিন নন্দীবাড়ির পুজো ছাড়া আর কিছু কল্পনা করতে পারেনা। সারাবছর এই দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।


                                     (দুই)

 নন্দীবংশের দশ পুরুষ আগের দুই বংশধর,  কুবেরশঙ্কর ও কামদাশঙ্কর নামের দুই যুবক  উত্তর চব্বিশপরগনার হালিশহর থেকে হুগলী জেলার পান্ডুয়ার অন্তর্গত এই জামগ্রামে আসেন ভাগ্য অন্বেষণে। গ্রামেই একটি বটবৃক্ষের তলায় তাঁরা তেলেভাজার দোকান দেন। তেলেভাজা বোঝ তো? মাধবদাদু প্রতিবারের মত একই কাহিনী অতিথিদের শোনাতে শোনাতে রিয়াদের মত ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করেন। এইসব কেক পেস্ট্রি খাওয়া আদুরে বাচ্চারা কি তেলেভাজা বুঝবে? টিকলি ঘার নেড়ে জানায়, চপ, বেগুনিকে তেলেভাজা বলে। মাধবদাদু খুশি হয়। অতিথিদের মধ্যে বড়দের হাতে হাতে চায়ের কাপ। সবাই গল্পে মশগুল। আসলে এই বিশাল অট্টালিকার মত বাড়ি দেখেই সবাই বুঝে গেছে এর কন্দরে কন্দরে অনেক গল্প লুকিয়ে আছে। রিয়াই বলেছিল, “মাধবদাদু এই দুর্গা পুজো কেন শুরু হয় সেই গল্পটা শোনাও।” উৎসাহে মাধব দাদুর কোটরে ঢোকা চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে ওঠে। তিনি এ বাড়ির পুরনো ঢাকি, এখন তাঁর বংশধররা এই কাজ করে থাকে। টিকলি তাড়া দেয়।

মাধবদাদু শুরু করেন, তেলেভাজার দোকান বেশ ভালই চলছিল। একদিন দু’জনে দুপুরে দোকান বন্ধ করে পুকুর ঘাটে যান স্নান করতে। সেখানে গিয়ে তো চক্ষু চড়াক। এক ফকিরবাবা নিজের পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বার করে পুকুরের জলে পরিস্কার করছেন। এইরকম দৃশ্য দেখে দু’জনেই ভয়ে কাঁপতে থাকে। ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে ফকিরবাবা ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরান, তারপর বলেন, “যা দেখলি কারুকে বলবি না, এ জিনিস আমি কারুকে দেখাইনা। এই নে এই স্বর্ণমুদ্রাটা রাখ। এই দিয়ে নতুন ব্যাবসা শুরু কর, তোদের ভাগ্য ফিরে যাবে।

কুবেরশঙ্কর ও কামদাশঙ্কর পরের দিন ভোরের আলো ফোটার আগেই স্বর্ণমুদ্রাটি হাতে নিয়ে চলে যান ভাগ্য অন্বেষণে। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যান বিদ্যাধরী নদীর তীরে। সেখানে সেইসময় জাহাজ আসত। বেচাকেনা চলত। স্বর্ণমুদ্রাটি ব্যায় করে কিছু সুপুরি কিনে অপেক্ষা করতে থাকেন নদীর পাড়ে বসে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন, এক বিদেশী বণিক সমস্ত সুপুরি উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। সেই শুরু, তারপর তাদের নিজস্ব আড়ত হল। তাঁদের ব্যাবসা এতই ফুলেফেঁপে উঠল যে একসময় নন্দীরা পূর্বভারতের প্রধান সুপুরি রফতানিকারী ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেন। 

ফকিরবাবার আশীর্বাদে একে একে সবই হল, ধনসম্পত্তি, মানসম্মান, প্রতিপত্তি, জামগ্রামের এই প্রাসাদ। দুর্গাপুজোর প্রচলনও হল। তবে প্রথম দিকে ভোগ দেওয়া প্রথার প্রচলন ছিলনা। প্রায় আড়াইশ বছর আগে একবার ব্যাবসায় প্রচুর লাভ হবার পর ভোগের প্রচলন হল। তবে এই বংশের পুজোর নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। নবমীর দিন ভোগ দেওয়া হয় মা’কে। আর এই ভোগ প্রথম দুজন ফকিরকে উৎসর্গ করা হয়, ফকিরদের খাওয়াদাওয়ার পর বাড়ির লোক সহ অতিথিরা ভোগ গ্রহণ করেন। আসলে নন্দীবংশের পূর্বপুরুষরা বিশ্বাস করতেন, ফকিরবাবার কৃপাতেই তাঁদের এই বাড়বাড়ন্ত। এখন তো দেশগ্রামেও তেমন ফকিরবাবাদের দেখা মেলা ভার! তাই দুইজন সজ্জন মুসলিম ব্যক্তিকে আগে ভোগ উৎসর্গ করা হয় এখন।

মন্ত্রমুগ্ধের মত সবাই এতক্ষণ মাধবকাকার মুখে পারিবারিক ইতিহাস, পুজোর উৎপত্তি শুনছিল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চূড়ান্ত নিদর্শন এই অজ পাড়াগাঁয়ের পুজোয়। কেউ কেউ বলল, “অনেক পুণ্য করলে এমন পুজো দেখার সৌভাগ্য হয়।”

টিকলি খুব এক্সাইটেড। রাত পোহালেই তো নবমী। এই আশ্চর্য ভোগ নিবেদন সে দুচোখ ভরে দেখবে।

                                    (তিন)

মা কাকিমাদের মত রিয়া এবার লাল পাড় সাদা শাড়ি পরেছে। সামনের বছর টুয়েলভে উঠবে, এই আব্দারটুকু নিবেদিতা মেনে নিয়েছে। বুদ্ধি করে টিকলির জন্যও শেষ মুহূর্তে একইরকম আরেকটা শাড়ি কিনে ফেলেছিল। দুই বান্ধবী, কাকে একটা ম্যানেজ করে পান্ডুয়ার বাজার থেকে টানা নথ আনিয়েছে। দুজনেই সুন্দর করে সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টিকলি তো সকাল থেকে কতবার যে জিজ্ঞেস করেছে, “আন্টি ভোগ কটা নাগাদ শুরু হবে? ফকিরবাবারা কোথায় বসে খাবেন?” নিবেদিতা নৈবেদ্যের থালা সাজাতে সাজাতে বলে হবে হবে, সব সময় মত হবে। এই মেয়েটাকে জিন্স, কেপ্রি আর হটপ্যান্টের বাইরে কোনদিন অন্যকিছু পরতে দেখেনি। এই মেয়েও কটা দিন এখানকার মেয়েদের মতই সালোয়ার কামিজ পরেছে। আজ তো আবার শাড়ি পরে দিব্যি ম্যানেজ করে ফেলেছে। সত্যিই মায়ের লীলা। মায়ের ছোঁয়ায় সবাই কেমন পাল্টে যায়! উগ্রতা, নীচতা, হিংসা ভুলে সবাই আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠে। ঠাকুরদালানে বসেই হাসিমুখে দর্শনার্থী সামলাতে সামলাতে নিবেদিতা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিল একবার। কী অদ্ভূত প্রশান্তিতে ভরা মুখ, স্নিগ্ধ মাতৃ মূর্তির দিকে তাকালে বুকে ভরসা জাগে। দু”হাত কপালে ঠেকায় সে।

নিবেদিতা অনেকক্ষণ ধরে দেখছে বাড়ির পুরুষদের মধ্যে গুঞ্জন। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতেই তারা বারবার ঘড়ির দিকে চোখ রাখছে। ব্যাপারটা কি? কোনও সমস্যা নাকি? আশেপাশে মেয়ে দুটোও নেই, বাড়ির মহিলারা কাজে ব্যস্ত। কাকে যে জিজ্ঞেস করে নিবেদিতা ! নিজে প্রসাদের থালা নিয়ে বসে আছে, এসব ছেড়ে উঠতেও পারছেনা।

মাধবকাকা এসে ধুপ করে সিঁড়ির এক ধারে বসে থামে মাথা রাখে। “এদিকে তো বিপদ মেজমা, বেলা যে বয়ে যায়, এখনও তো বাবারা এসে পৌঁছল না। তারা না অন্নভোগ গ্রহণ করলে এতজন কখন খেতে বসবে বলুন তো?”

সর্বনাশ! বেলা যে বয়ে যাচ্ছে নিবেদিতা টের পায়নি। এবারে জনসমাগমও তেমন হয়েছে। প্রসাদ দিতে দিতে হিমসিম খেয়ে যেতে হচ্ছে। বেশ কয়েকবার মূল প্রসাদের সঙ্গে ফল কেটে মেশান হয়েছে। নিবেদিতা বলে, “কারুকে খোঁজ নিতে পাঠাচ্ছেনা কেন?”

ছোটকর্তা নিজে গেছে এনফিল্ড নিয়ে। দুজনকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে আসবে। সেটা শুনে আশ্বস্ত হয় নিবেদিতা। কিন্তু একটু পরেই সমীরের ছোট ভাই ফিরে এসে জানায়, “অতিথিদের পরিবারে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, তারা বর্ধমান গেছে, ফিরলেই এখানে চলে আসবে।”

মাথায় বজ্রাঘাত হয় সকলের। একেই ফকিরবাবাদের পাওয়া যায়না। অল্প সংখ্যক মুসলিম পরিবারের বসবাস, তাদের মধ্যে থেকেই অতিথি নির্বাচন করে নিমন্ত্রণ করা হয়। সবকিছুরই একটা নিয়ম আছে, হুট করে কারুকে ধরে এনে ভোগের থালার সামনে বসিয়ে দিলে তো হয়না! সমীরের ভাই বলছে, এত চিন্তা করার কিছু নেই। ফোনে কথা হয়েছে। মেমারী রেলগেটে গাড়ি আটকে গেছে তাই দেরি হচ্ছে, ওঁরা এলেন বলে।

একটু পরেই সবাই দেখে সেই দুজনের বদলে অন্য দুইজন মুসলিম ভদ্রলোক হেঁটে আসছেন ঠাকুরদালানের দিকে। মাকে করজোড়ে প্রণাম করে বাড়ির পুরুষদের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন। “আজ্ঞে, আমরা সেলিমদের আত্মীয়, আপনাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে আমাদেরকে পাঠান হল।”

সাদরে আপ্যায়ন করে ভিতর মহলে ওঁদের বসান হল। বাড়ির বড়বউ পঞ্চব্যাঞ্জনের থালা সাজিয়ে দিল অতিথিদের সামনে। তৃপ্তি করে দুজনে খেয়ে উঠে বললেন, “নিন আপনাদের কাজ শুরু করে দিন। গনগনে রোদে অতিথিরা অপেক্ষা করছেন। আমাদের নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, আমরা একটু ঘুরেফিরে চারদিকটা দেখি।”

হৈ হৈ করে কর্মযজ্ঞ শুরু হল। প্রায় তিনশ মানুষ ভোগ খাবার আশায় অপেক্ষা করে আছেন। ত্রিপলের ছাউনির নিচে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। নিবেদিতা অনেকক্ষণ থেকে রিয়াকে দেখতে পাচ্ছেনা। কোথায় গেল মেয়েটা? ওর ভাইবোনেদের বাহিনী তো এদিকেই আছে।  এমনকি টিকলিকেও দু একবার দেখেছে। কিন্তু রিয়া, সে কই? মায়ের মন কু ডাকে। নিবেদিতা এসব ছেড়ে একটু এগিয়ে যাচ্ছিল, পিছন থেকে কে যেন ডাকল, “মেজমাকে বল, মিষ্টি আর পান মেজমার দায়িত্বে আছে।”

একটু পরেই আবার একটা হৈ হৈ। মাধবকাকাই খবর এনে দিল, “মেজমা শুনেছেন? সেলিম বাবুরা তো এসে হাজির হয়েছেন, তাঁরা অবাক, কোনও আত্মীয়কে তো তাঁরা পাঠাননি।” নিবেদিতার এসবে মনে নেই, হবে কেউ। শহরেও তো কত বিয়ে বাড়িতে আমন্ত্রিতের বদলে অন্য লোকজন খেয়ে যায়। মেয়েটা যে কোথায় গেল!

পল্টু ছুটতে ছুটতে আসে, “ও মেজমা, রিয়াদিদি পুকুর পাড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।” নিবেদিতা সব ছেড়ে পড়িমরি দৌড়ায়। সঙ্গে টিকলি সহ আরও অনেকে। চোখেমুখে জল ছিটিয়ে রিয়ার জ্ঞান ফেরান হল। সমীর গজগজ করছে, “নিশ্চয় শাড়ি পরে হোঁচট খেয়েছে, এই রোদের মধ্যে না ঘুরে ঠাকুরদালানে বসতে পারত।”

রিয়া চোখ খুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। তারপর পুকুর ঘাটের বাঁধানো সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, “এখানেই তো সেই শেরওয়ানি পরা ভদ্রলোক ছিলেন, কোথায় গেলেন?” নিবেদিতার মুখেচোখে ভয়। সেই মুসলিম ভদ্রলোকদের কারুকে উদেশ্য করেই রিয়া কিছু বলছে। লোকটা কি গাছে ঘেরা নির্জন এই পুকুর পাড়ে মেয়েটাকে একা পেয়ে...

“লোকটা না খাবার পর এদিকে এল, তারপর পেট থেকে নাড়িভুঁড়িগুলো বার করে জলে ধুচ্ছিল।  জলে আমার ছায়া পড়তেই আস্তে আস্তে মুখ ঘুরিয়ে আমাকে দেখে হাসল। তারপর বলল, বেটি এ জিনিস আমি কারুকে দেখাইনা, তুই দেখে ফেলেছিস, তোর খুব ভাল হবে, আমি দোয়া করছি।” শিউরে উঠলেন উপস্থিত সবাই। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল প্রত্যেকের। ফকিরবাবা আজও নন্দী বংশকে বিপদআপদের হাত থেকে আগলে রাখছেন, বুঝতে কারুর অসুবিধা হলনা। টিকলি জীবনেও এমন পুজো কোনদিন দেখেনি। সবাইকে দেখে টিকলিও মাথায় হাত ছোঁয়াল, যদিও জানেনা মা দুর্গা নাকি ফকিরবাবা কার জন্য এই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। নাকি সবশক্তির এক অদ্বিতীয় আধারের উদ্দেশে সবাই এই নবমীতে প্রণত !


( মূল তথ্যকে অবিকৃত রেখে এই কাল্পনিক কাহিনি রচনা করা হয়েছে।

তথ্য সূত্র - মুসলমানের দুর্গাপুজো, চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য)

🌹🌹


Friday, 23 October 2020

বিশেষ কিন্নর ২

 আজ মহাসপ্তমী। শুভ শারদীয়ার শুভেচ্ছা জানবেন সকলে। আজ একটি অনুবাদ গল্প রইল। রূপান্তর করেছেন প্রখ্যাত অনুবাদক নন্দিতা ভট্টাচার্য। 

🙏


✍️


#পাথর_ও_প্রজাপতি

                                                      


মূল অসমীয়া গল্পঃ মনিকা দেবী 

                                                     

 বাংলা রূপান্তরঃ #নন্দিতা_ভট্টাচার্য


১৯৭৯ সালে মঙ্গলদই শহরে জন্ম । গুয়াহাটী সন্দিকৈ মহাবিদ্যালয়ে কলেজ শিক্ষা আরম্ভ এবং কটন মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী । তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশ হয় ‘অসম বানী ‘ কাগজে। প্রকাশিত গল্প সংকলন প্রিয় আলাপ, সখিয়তী, মইদাম’র জোনাকী(২০০৮), জহর-মহর এবং বানপানী আহিচি চমাকে-ভমাকে । বর্তমানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত মনিকা দেবী ২০০৫ সালে ‘ প্রিয় আলাপ ‘ বইটির জন্য ‘ মুনীন বরকটকী পুরস্কার এবং ২০১৪তে ‘ জহর-মহর’ বইটির  সাহিত্য একাডেমীর যুব পুরস্কার লাভ করেন। 


কাপড় মেলা তারে প্রজাপতিগুলো পড়েছিল নির্জীব, নিষ্প্রাণ। মেলে দেয়া কাপড়ে ও প্রজাপতিগুলোকে বসিয়ে দিল। প্রজাপতি আঁকড়ে ধরে রইল কাপড়গুলোকে। উড়ে উড়ে পড়ে গেল না, আপ্রাণ ঝুলে রইল ।

অনেকদিন আগে ও একঝাক প্রজাপতি দেখেছিল । রংবেরঙ্গের একঝাক প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছিল মাঠে। ওদের গাঁয়ের মাঠ। প্রজাপতির পেছন পেছন ছুটেছিল । প্রজাপতি ওকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। 

প্রজাপতির কথা ভাবতে ভাবতে মাধব ছাদের ওপরে গিয়ে দাঁড়াল। 

                                             ****  

বলতে গেলে কাছের কেউ নেই আমাদের । একটি মাত্র দেওর , নাম মহেন। মহেনকে  নিজের ছেলের মতই দেখতাম। গ্রামের বাড়ী থেকে নিয়ে এলাম ওকে। পড়াশোনা করালাম । দাদা ওকে চাকরি যোগাড় করে দিল। শহরে কেনা জমিতে ওকে এনে স্থিতু করলাম। ঘরবাড়ী গুছিয়ে দিলাম। ধুমধাম করে বিয়েও দিলাম।

ভাবলাম বুড়ো বয়েসে সাহারা দেবে। তেষ্টা পেলে জল দেবে,ক্ষিদেতে এক গরাস ভাত । আর পাব উভৈনদীর স্নেহ ভালবাসা।

 কিন্তু বিয়ে করেই মহেন হাঁড়ি আলাদা করল, আলাদা থাকতে শুরু করল।আলাদা হল চরু-হাঁড়ি , কথা বার্তা। সবকিছুই অন্যরকম । এখনই এই অবস্থা , আমরা বুড়োবুড়ি অথর্ব হলে তো এরা কলা দেখাবে ।

এখন মাধবই আমাদের আশা ভরসা। অন্ধের যষ্টি । গ্রাম থেকে নিয়ে এসছি ওকে । অনাথ ছেলেটি । গ্রামে কাকার কাছে থাকত। আমরা নিয়ে আসায় কাকা খুশীই হয়েছেন। ভাবছে আপদ বিদায় হল।

আমাদের জন্য মাধব অপুতের পুত, আমি না বিইয়ে কানাইয়ের মা। ওকে লেখাপড়া শেখাচ্ছি।  ম্যাট্রিক দিয়েছে এবার। পাশও করবে একবারে। উনি বলেছেন ওকে কোনও একটা অফিসেও ঢুকিয়ে দেবেন। 

মাধবের বিয়ে দেব ধুমধাম করে। মাধবের বৌ দেবে তেষ্টায় এক গেলাস জল, ক্ষিদেয় এক গরাস ভাত এবং উভৈনদীর স্নেহ- মমতা। 

ছেলে বৌ , নাতি পুতি সহ ভরভরন্ত সংসার । আবার আমার সংসার উপচে পড়বে।

 এগুলো ভাবতে এত ভাল লাগে । 

আলসেতে প্রজাপতি হয়ে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে ।

                                            **** 

বরখুড়ী ওকে বড় ভালবাসে। আর ও ভালবাসে প্রজাপতি। শহরের প্রজাপতিগুলো নির্জীব, নিষ্প্রাণ । গ্রামের ফেলে আসা প্রজাপতির কথা কথা খুব মনে পড়ে ওর । 

বরখুড়ী ওকে নিজের ছেলের মত ভালবাসে । পরীক্ষার কয়দিন ওকে কুটোটি নাড়ত দেয় না । পড়ার টেবিলেই রেখে যায় ফল-মূল-দুধ । ভাট–চা সব কিছুই ঘরেই পৌঁছে যায়।   

বরখুড়ীর সঙ্গে ও বাজারে যায় । বরখুড়ী ওকে সার্ট কিনে দেয়, প্যান্ট কিনে দেয় । গেঞ্জি , জাঙ্গিয়াও কিনে দেয় খুড়িমা। ম্যাট্রিক পাস করলে খুড়িমা ওকে একটা ঘড়ি কিনে দেবে। এখনও ওর ঘড়ি যে নেই তা নয় ! তাবে পরীক্ষায় পাশ করলে একটা দামী ঘড়ি পাবে। একজোড়া দামী জুতোও পছন্দ করে রেখে এসেছে ও । 

ওর জীবনে কোনও কিছুর অভাব নেই। শুধু প্রজাপতিগুলো হারিয়ে গেছে ওর জীবন থেকে । 

ছাদে এলেই ও প্রজাপতিগুলোর কথা ভাবে। 

বরখুড়ি ওকে কাপড় মেলতে দেয় না । মেখলা-পেটিকোট এগুলো ছুঁতে দেয় না ওকে। ছোটখুড়ি ওকে বার বার কাপড় মেলতে বলে ওর ভালই লাগে। ছাদে আসতে পারলে ওর খুব আনন্দ হয়। কাপড় মেলার ক্লিপগুলোকে ওর প্রজাপতির মত লাগে। 

সত্যিকারের প্রজাপতিগুলো তো ওকে কেউ ফিরিয়ে দেবে না। 

                                            ***** 

দাদা বউদিরা এই মাধবটাকে এখনও পুষে রেখেছে কেন ?

আমি কি করে জানব ? 

ওরা মরলে এই মাধবই তো সব সম্পত্তির মালিক হবে। আমারদের বুড়ো আঙ্গুল চুষতে চুষতে দিন যাবে। 

ও আমিও ভাবছি কথাটা । ভাবতেই থাকবে নাকি কিছু পথ বার করবে। ওর মতলব তো ভাল বুঝছি না । মেয়ে দুটোও বড় হচ্ছে। খেয়াল আছে তোমার?

সেই তো, কখন কি হয় ঠিক নেই। 

জেনে শুনেও কেউ সাপ পুষে রাখে! কাপড় মেলতে পারলে ওকে আর পায় কে। এদের দুজনের প্যান্টি মেলতে গিয়েও এক গাদা সময় কাটিয়ে আসে। নাড়া চাড়া করে। 

কি করি বলত ! আমাকে এতদিন বলনি কেন ? এটা একটা কথার কথা হল!  কিছু একটা তো করতেই হবে।  ভয়ংকর বিপদ হবে নয়ত ।

                                           **** 

তারপর বাড়ী একদিন তোলপাড় । ছোটখুড়ির চিৎকারে গগন ফাটল। দৌড়ে এলেন ছোট খুড়া । মাধব নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে ছোটখুড়ির চান দেখছিল। ছাদে দাঁড়িয়ে ও নাকি সবসময় ছোটখুড়ির চান দেখে। আজ ধরা পড়েছে।  ছোটখুড়ি নাকি ব্যাপারটা আজই খেয়াল করলেন ছোটখুড়ির চোখে চোখ পড়েছিল বলে !

খুড়িদের চানঘর নাকি ছাঁদ থেকে খুব স্পষ্ট দেখা যায় । পেছনের বেড়ার ফুটো দিয়ে নাকি ভেতরে কেউ চান করলে তাকে পরিষ্কার দেখা যায়। ছোটখুড়ি চিৎকার করে বাড়ী মাথায় তুললেন। ছোট খুড়া মাধবকে টেনে হিঁচড়ে বড়খুড়ার সামনে এনে ফেললেন । আজই কিছু একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। হয় ছোটখুড়ারা থাকবেন নয়ত মাধব থাকবে এই বাড়ীতে। 

                                             **** 

হেস্ত-নেস্ত করা হল । মাধব পোটলা।  পুটলি বাঁধল । ছোট পুটুলি । এতগুলো জামা কাপড়ের মধ্যে থেকে ও শুধু পুরানো জামাটাই নিল। আর দুটো প্যান্ট। তাতেই ভরে গেল ওর ছোট ঝোলা। বরখুড়ী সুর ধরে কাঁদলেন । বারে বারে তিনি মাধবের পথ আটকাতে লাগলেন। চোখের জলে রাস্তা অস্পষ্ট হল। 

মাধবেরও খুব কষ্ট হচ্ছিল। তবুও কাঁদল না মাধব । মাধবের চোখের জল পাথর হয়ে স্থির আটকে রইল। 

                                               ****

অনেকদিন আগে অনেকগুলো প্রজাপতি সঙ্গে  উড়ে বেড়াচ্ছিল ও। বাতাস থেকেও হাল্কা ছিল ওর শরীর । 

এখন থম মেরে পড়ে রইল একটি নিস্পন্দ পাথর। প্রজাপতি ওকে আর উড়িয়ে নিতে পারছে না। প্রজাপতির ছিন্ন ভিন্ন শরীর পড়ে রয়েছে। 

ওর মনের মাঝের উড়ন্ত প্রজাপতিরা মাথা খুঁড়ে মরছে পাথরে । 

                                             **********


🌹🌹



Wednesday, 21 October 2020

বিশেষ কিন্নর ১

 মহাপঞ্চমী থেকে শুরু হলো বিশেষ কিন্নর। 

যারা কলম ধরেছেন তাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই। 


ইতি


কিন্নর দলের পক্ষে

সম্পাদকমন্ডলীর সদস্যগণ


🙏


🌹🌹🌹


#সম্পর্কের_রসায়ন_সম্পাদক_ও_লেখক


#জ্যোতিপ্রকাশ_সাহা 


দুটো গল্প দিয়ে শুরু করি। ঠিক গল্প নয় ঘটনা। আজ থেকে প্রায় তিপান্ন বছর আগে তৎকালীন সময়ের একজন নবীন লেখক আমেরিকা থেকে ফিরছেন। ভীষণ জনপ্রিয় লেখক তখন তিনি।  দমদম বিমানবন্দরে নেমে তিনি ট্যাক্সিতে উঠে যাবেন এমন সময় দেখেন এক ভদ্রলোক ট্যাক্সির জানলা দিয়ে তাকে কিছু বলতে চাচ্ছেন। সেই লেখক তাঁকে দেখেই অবাক, সাগরদা আপনি? সেই ভদ্রলোক অর্থাৎ লেখকের সাগরদা বললেন, এদিকে এসেছিলাম, শুনলাম তুমি আসছো, তাই একটু অপেক্ষা করে গেলাম। তা বলি কি, এই বিদেশ ভ্রমণের লেখাটা মাথায় রেখো। 

পাঠক, নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধে হচ্ছেনা, এই সাগরদাই  হচ্ছে বিখ্যাত সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। হ্যাঁ, যখনকার কথা বলছি তখন সাগরময় ঘোষ খাতায়-কলমে সম্পাদক ছিলেন না। কিন্তু সেই সময়ে দেশ পত্রিকার সম্পাদক অশোক কুমার সরকার তাঁকে "দেশ" সম্পাদনার ক্ষেত্রে প্রায় সমস্ত ক্ষমতাই দিয়ে দিয়েছেন।  তাই ভাল একটা লেখা যোগাড়ের জন্য তিনি বিমানবন্দর অবধি পৌঁছে গিয়েছিলেন।  লেখক ছিলেন মনিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, যাকে আমরা 'শঙ্কর' নামেই চিনি। সৃষ্টি হয়েছিল 'এপার বাংলা ওপার বাংলা'। ধারাবাহিকভাবে সেই সময় ‘দেশে'তে প্রকাশিত হয়েছিল।  

এই ঘটনাটা উল্লেখ করলাম এই কারণে যে একজন প্রকৃত সম্পাদক একজন লেখকের কাছ থেকে কিভাবে লেখা বের করে আনতে হয় সেটা জানেন এবং তার জন্য  ধৈর্য ধরতে পারেন। ধৈর্যের কথা যখন উঠলো তখন আর একটা ঘটনার কথা বলি, রামকিঙ্কর বেইজকে নিয়ে সমরেশ বসুর 'দেখি নাই ফিরে'  উপন্যাসের জন্য এই সাগরময় ঘোষ দশ বছর অপেক্ষা করেছিলেন। 

    আসলে সম্পাদককে একটু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হয়। কার কাছ থেকে ভালো লেখা পাওয়া যাবে, সেইটা আগেই তাকে বুঝতে হয়।  তারপর লালন পালন।  প্রবীণ নবীন সকল লেখকদের কাছ থেকে তার সেরা লেখাটা আদায় করার দক্ষতাই একজন সম্পাদকের মান নির্ধারিত করে। এই কাজে সম্পাদক সাগরময় ঘোষ অনেকটাই এগিয়ে থাকবেন। সম্পাদক অবশ্যই জ্ঞানী মানুষ হবেন, কিন্তু তার সেই জ্ঞানকে জাহির না করে লেখকদের মতকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া‌ই তার প্রধান কাজ হ‌ওয়া উচিত। 

  এ ব্যাপারে আর একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি। বুদ্ধদেব বসু তখন 'কবিতা' পত্রিকা করছেন। তরুণ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা তার কাছে পাঠিয়েছেন। কবিতাটির একটি লাইন সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু অন্যমত পোষণ করে কবিতাটি ফেরত পাঠালেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। উদ্দেশ্য কবিতাটি সুনীল আবার নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করে তার কাছে পাঠাবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন হয়ে গেলো সুনীল আর কবিতা তার কাছে পাঠাচ্ছেন না। তাই তিনি নিজেই সুনীলকে তাগাদা দিলেন তোমার কবিতা, কি হলো? সুনীল আবার সেই কবিতাটি এতোটুকু কাটাছেঁড়া না করে বুদ্ধদেব বসুর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। বুদ্ধদেব বসু বুঝলেন, এবং কবিতাটি তিনি তার পত্রিকায় ছাপতে দিলেন। অর্থাৎ তিনি নিজস্ব অহংকে বিসর্জন দিয়ে একজন তরুণ কবিকে মান্যতা দিলেন। একজন সম্পাদক এভাবেই লেখক-কবি তৈরি করেন। সাগরময় ঘোষ রসিকতা করে বলতেন, আমি তো স্টেজের মালিক,  স্টেজ ভাড়া দিই, নাচবে তুমি। ভুগলে তুমি ভুগবে।  এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই অনন্য। একজন লেখককে বুঝিয়ে দেওয়া, লেখা ভালো না হলে তুমি কিন্তু আর পাঠক মনে জায়গা করে নিতে পারবে না।

  এতো গেল বাণিজ্যিক কাগজের সম্পাদকের কথা। বাণিজ্যিক কাগজের সম্পাদকের অনেকগুলো সুবিধা থাকে। তারা লেখকের কাছ থেকে টাকা দিয়ে লেখা কেনেন,  ফলে লেখক জানেন যদি পাঠকের পছন্দ না হয় তাহলে বাণিজ্যিক কাগজ আর তার লেখা চাইবে না, তাই সদা সচেষ্ট থাকেন লেখার মান নিয়ে। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের এই সুবিধাটুকু নেই। তারা লেখকের ভালো লেখাটুকু পাওয়ার জন্য কোন টাকা পয়সা দিতে পারেননা। তাই তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর জোর দিতে হয়। অধিকাংশ লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক একটা অহমিকায় ভোগেন। তারা নিজস্ব অহংবোধে ভাল লেখকদের পাত্তা দিতে চান না। এটা কখনই কাম্য নয়।  লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের, যারা ভালো লিখছেন, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রটি মেরামত  করতে হবে। কোন ঘটনায় লেখক এর ওপর ক্ষুব্ধ হলেও, যদি সে ভালো লেখে, তাকে আবার লেখার জন্য আহ্বান জানাতে হবে। সম্পাদকের নিজস্ব ইগোকে বর্জন করতে হবে। প্রকৃত সম্পাদক এটাই করে থাকেন। লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, লেখকদের সঙ্গে  সুসম্পর্ক স্থাপন করে, ভালো লেখাটি আদায় করলে, তার পত্রিকাটিও যথার্থ মানে পৌঁছতে পারবে বলে মনে করি।


❣️❣️



বিজয়া সম্ভার

 বিজয়া সম্মিলনির কবিতা ও গল্পের প্রথম অংশে আমরা প্রকাশ করলাম নিম্নলিখিত লেখকদের লেখা। রাণু ভট্টাচার্য শতদ্রু মজুমদার স্বাগতা ভট্টাচার্য  পূর...